পাগলামি/হ্যাংলামি
মাস গেলে রোজগার করে ৩০-৩৫ হাজার টাকা, কিন্তু ব্যবহার করে ৭০-৭৫ হাজার বা এক লাখ টাকা দামের ফোন। আপনার আত্মীয়, বন্ধু-পরিচিতদের মধ্যে এমন একাধিক লোক নিশ্চয়ই আছে। আপনি নিজেও তেমন একজন হতে পারেন। নইলে প্রতিবার আইফোনের নতুন মডেল বাজারে আসার দিন ভারতের বিভিন্ন শহরের আইফোনের দোকানগুলোর বাইরে নোটবন্দির সময়কার এটিএমের লাইনের মত বড় লাইনে দাঁড়ায় কারা? তা নিজের রোজগারের চেয়ে অনেক বেশি দামের ওই ফোনগুলো ব্যবহার না করলে কী ক্ষতি হয়? কিচ্ছু না। তবু এত লোক ব্যাপারটা ঘটায়। ওটা যদি নিন্দনীয় না হয়, তাহলে আপনার বাড়ির কাজের লোকের ছেলে, যার মাসিক রোজগার দশ হাজারের নিচে, সে যদি ১৫ হাজার টাকা দিয়ে লায়োনেল মেসিকে দেখার টিকিট কিনে থাকে – সেটা পাগলামি হবে কেন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আপনি বলবেন ‘আমি ইএমআই দিয়ে নিজের পয়সায় ফোন কিনেছি। কার কী বলার আছে? এটা আমার পার্সোনাল চয়েস।’ ঠিক কথা। কিন্তু আপনি ইংরিজি জানেন এবং আপনার ক্রেডিট কার্ড আছে বলে আপনার ‘পার্সোনাল চয়েস’ আছে, আর ও দুটো গুণ না থাকায় টোটোচালক ছেলেটার ব্যক্তিগত পছন্দ নেই – এমন তো নয়। ‘নিজের পয়সা’ কথাটা ভুল বলছেন। আপনার নিজের ওই ফোনটা কেনার পয়সা নেই বলেই ইএমআই, অর্থাৎ মাসিক কিস্তিতে কিনেছেন। গোদা বাংলায় – ধারে কিনেছেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের বেকার ছেলেটাও কারও থেকে ধার নিয়ে বা বাবা-মাকে দিয়ে ধার করিয়েই মেসিকে দেখার টিকিট কিনেছিল। আপনার বিলাস দামি ফোন কেনা, ওর বিলাস জীবনে অন্তত একবার রক্তমাংসে মেসিকে দেখে চর্মচক্ষু সার্থক করা। এক অর্থে, আপনার চেয়ে ওর বিলাসে রুচির পরিচয় বেশি। কারণ আপনি যেটার পিছনে পয়সা খরচ করেছেন সেটা সারা পৃথিবীতে কয়েক কোটি আছে, কারখানায় তৈরি হয়। কিন্তু কারখানায় মেসি তৈরি করা যায় না, ওই প্রতিভা একমেবাদ্বিতীয়ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন – মানুষকে চেনা যায় তার বাজে খরচে। কথাটা যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে ১৩ ডিসেম্বর (শনিবার) যারা একগাদা টাকা খরচ করে মেসিকে দেখতে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে গিয়েছিল, তারা, যারা যায়নি কিন্তু হাতের দামি স্মার্টফোন থেকে ওদের পাগল বা হ্যাংলা বলছে – তাদের চেয়ে উন্নততর মানুষ। অবশ্যই তারা হুজুগে, কিন্তু যারা আইফোন স্টোরের বাইরে রাত থাকতে লাইন দেয় তারাও সমান হুজুগে। যদি তাদের দেখে নাক না সিঁটকান, তাহলে মেসিকে যারা দেখতে গেছে তাদের হেয় করারও কিছু নেই।
ওহো! মেসি তো আবার খেলোয়াড়। কিন্তু এখানে খেলবেন না জেনেও লোকে কেবল মুখখানা দেখতে গিয়েছিল, অতএব এটা অর্থহীন হ্যাংলামি। তাই না? একমাত্র ভারতের মত অনুন্নত দেশের লোকেরাই এসব করে বলছেন তো? আবার ভুল। রাত জেগে ইউরোপের যেসব ক্লাবের খেলা দেখেন, প্রায় প্রত্যেকের নিয়ম হল – অন্য কোনো ক্লাব থেকে খুব সম্ভাবনাময়, বা ইতিমধ্যেই বিখ্যাত, কাউকে সই করানো হলে তাকে জার্সি দেওয়ার কাজটা করা হয় ক্লাবের স্টেডিয়ামে ঘটা করে। সমর্থকদের সামনে সেদিন ওই ফুটবলারকে হাজির করা হয়, তাঁরা মাঠ ভরিয়ে দেখতেও যান। সেদিন কোনো খেলাধুলো হয় না কিন্তু। স্রেফ খেলোয়াড়কে দেখতেই যান ফুটবলপ্রেমীরা। বামপন্থী দাদারা ব্যাপারটাকে ‘একুশ শতকের লগ্নি পুঁজির ফলে ফুটবলারের পণ্যায়ন’ ইত্যাদি শক্ত শক্ত কথা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন হয়ত। করলে ডাহা ভুল করবেন। কারণ গত শতকের আটের দশকে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক কমিউনিস্টদের দখলে এবং সেই চাপে পুঁজিবাদী দেশগুলোও কল্যাণমূলক অর্থনীতি নিয়ে চলছে, তখনো এই খেলোয়াড়কে সমর্থকদের সামনে হাজির করা বড় ব্যাপার ছিল। দিয়েগো মারাদোনা যখন নাপোলিতে যোগ দেন, তখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিনের বেশকিছু ছবি ইন্টারনেট ঘাঁটলেই পেয়ে যাবেন, আসিফ কাপাডিয়ার মারাদোনাকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রেও পাবেন। নাপোলি কিন্তু ইতালির এলিট ক্লাবগুলোর মধ্যে ছিল না। শহরটাকে এবং ক্লাবটাকে মিলান ইত্যাদির লোকেরা দুচ্ছাই দুচ্ছাই করত। ওই ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে প্রচুর শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন, মারাদোনা তাঁদেরই নায়ক। ইতালীয় ফুটবলের ফেল করা ছাত্র নাপোলিকে ইতালি এবং ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন বলেই ওই শহরে আজও মারাদোনা ভগবান, তাঁর মূর্তি আছে (সেটাকে আবার মারাদোনার মতই দেখতে)।
সুতরাং ‘আমাদের তৃতীয় বিশ্বের লোকগুলো (বা দক্ষিণ এশিয়ার লোকগুলো) আর মানুষ হল না’ বলে হীনমন্যতায় ভোগা অথবা অন্যরা না হলেও, আপনি স্মার্ট হয়েছেন বলে আত্মশ্লাঘা বোধ করার কোনো কারণ নেই।
তাছাড়া ফুটবলের চেয়ে গ্ল্যামারের আকর্ষণ তো আপনাদের সকলের কাছেই বেশি। নইলে দেড় দশক আগে দেশের বড়লোকদের মস্তিষ্কপ্রসূত ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হওয়া নিয়ে লাফিয়েছিলেন কেন? তার আগে দেশে ফুটবল খেলা হচ্ছিল না? চালু হয়ে যাওয়ার পর প্রিয় ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানকে ওই লিগে যেতেই হবে – এই দাবিতে আছাড়ি পিছাড়ি করছিলেন কেন? দেশে যেটুকু ফুটবল পরিকাঠামো ছিল স্থানীয় ছোট ছোট ক্লাবগুলোর দৌলতে, সেটুকুরও বারোটা বাজিয়ে দিয়ে সেই লিগ আজ বন্ধ। তা নিয়ে কতটা চেঁচামেচি করেছেন? ইউরোপে কিন্তু বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের মত বড় ক্লাব সমর্থকদের আপত্তিতেই নিজেদের মধ্যে আলাদা করে এলিট লিগ চালু করতে চেয়েও পারেনি।
তালা ভাঙা, চেয়ার ভাঙা, কার্পেট হরণ ইত্যাদি
যে কোনো খেলায় মাঠে খেলা দেখতে যায় হাজার হাজার লোক। তারা সকলে শান্ত, ভদ্র, লক্ষ্মী – এরকম বিশ্বাস করে কারা? আর যে-ই করুক, পুলিস প্রশাসন তথা সরকারের করা উচিত নয়। কিন্তু দেখা গেল, তারা সেরকমই ভেবেছিল। এত যে ভাইরাল ভিডিও ঘুরছে স্টেডিয়াম লণ্ডভণ্ড করার, কটা পুলিস দেখতে পাচ্ছেন? অন্তত লুণ্ঠনকারীদের কারও দিকে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যাচ্ছেন কয়েকজন পুলিসকর্মী, কেউ পালাচ্ছে – এরকম কিছু দেখেছেন? সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে অবাধ লুঠপাটের ছবি। আদালতে পুলিস জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজন পুলিসকর্মীই বরং আহত। এ তো স্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতা। পুলিস থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না বা যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না।
পয়সা খরচ করেছি, তার দাম পাইনি। অতএব অন্যায়ভাবে হলেও উশুল করে নেব – এই মানসিকতা অত্যন্ত নিন্দনীয়। কিন্তু ও থেকে আজকের সমাজে কেউ কি মুক্ত? নইলে ট্রেনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরার বেড কভার, বালিশের ওয়াড় বাড়ি নিয়ে চলে যায় কারা? একটু সোশাল মিডিয়া খুঁড়ে দেখুন, তারকাচিহ্নিত হোটেলের অভিজাত বোর্ডারদের অসভ্যতার বেশকিছু ভিডিও-ও পেয়ে যাবেন। কথা হচ্ছে, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন পশ্চিমবঙ্গে সরকারের সম্পত্তি। তার ক্ষতিসাধন আটকানোর দায়িত্ব তো সরকারের পুলিসবাহিনীর। তারা ব্যর্থ হল কেন? ভাগ্যিস এবছরের মাঝামাঝি বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম ঘিরে যা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হয়নি। কোনো প্রাণহানি হয়নি। কিন্তু হওয়া আটকানোর মত প্রস্তুতি পুলিশের ছিল কি? দেখে শুনে তো মনে হচ্ছে না।
কাণ্ডগুলো বাংলাভাষীরা করেছে, নাকি অবাঙালিরা করেছে – এ প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। বাঙালিরা করে থাকলে দোষ কম নয়, অবাঙালিরা করে থাকলে বেশি নয়। প্রশাসনের কাজ ছিল বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে দুষ্কৃতীদের আটকানো। সে কাজে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এখন প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েক ঘন্টা ধরে এরকম কাণ্ড ঘটলে আপনি বাটপাড়দের উপর রাগ করবেন, না প্রশাসনের অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন – সেটা আপনার ‘পার্সোনাল চয়েস’।
দায় কার?
রাজকোষে চুরি হয়ে গেলে সরকার ‘চোর চাই যে করেই হোক’ বলে চিৎকার করবে এবং যে কোনো লোক পেলেই তার চলবে – এ হল চিরকেলে সত্য। এক্ষেত্রে হাতের কাছেই তেমন চোর পাওয়া গেছে – শতদ্রু দত্ত। ইতিমধ্যেই তাঁর ১৪ দিনের পুলিসি হেফাজতও মঞ্জুর হয়েছে। কিন্তু এই মামলা শেষ অবধি কোনদিকে গড়ায়, তা যদি কোনো সংবাদমাধ্যমের আদালত প্রতিবেদক আমাদের দয়া করে নিয়মিত জানাতে থাকেন – ব্যাপারটা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক হতে পারে। শতদ্রুকে কিসে অভিযুক্ত করা হবে? চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, প্রতারণা? যাতে অভিযুক্ত করা হবে তাতে সর্বাধিক শাস্তি কী? এই তো কদিন আগে প্যাটিস বিক্রেতা রিয়াজুল শেখ, মহম্মদ সালাউদ্দিন, শ্যামল মন্ডলকে রীতিমত মারধোর করল তিনজন কাপুরুষ। তাদের বিরুদ্ধেই এ রাজ্যের পুলিস এমন কোনো অভিযোগ আনতে পারেনি, যাতে অন্তত সাতদিন তাদের আটকে রাখা যায়। সেখানে শতদ্রু কাউকে মারেননি, কিছু চুরি করেছেন বলেও এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ নেই। প্রতারণা যে করেননি তার প্রমাণ তো মেসি, লুই সুয়ারেজ আর পল রদ্রিগোর উপস্থিতিই। যদি না তিনি আরও কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, যা আমরা জানি না।
আপাতত জানা গেছে যে পুলিসের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়েছে – নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব শতদ্রুর ছিল। এদেশে কি প্রাইভেট পুলিশবাহিনীও চালু হয়েছে নাকি? জানতেই পারিনি! আমরা তো জানতাম কোনো অনুষ্ঠানে জনসমাগমের সম্ভাবনা থাকলে পুলিসকে জানিয়ে তাদের অনুমতি নেওয়াই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দায়িত্ব। পুলিস ঠিক করে অনুষ্ঠানের দিন তাদের পক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব কিনা। সে নিয়ম কি বদলে গেল? এরপর থেকে কি মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নিরাপত্তা এজেন্সি? ইডেন উদ্যানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ বা আইপিএল ম্যাচে নিরাপত্তা দেবে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের কোনো নিজস্ব বাহিনী?
কেস গুবলেট হয়ে যাওয়ার পর থেকেই রাজ্য সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে এটা ছিল ‘প্রাইভেট ইভেন্ট’। নাহয় তাই। কিন্তু সে অনুষ্ঠানে তো উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ছাড়াও নানা জ্ঞানীগুণী মানুষ। মেসি, সুয়ারেজ, রদ্রিগোদের কথা বাদ দিন। আমাদের মন্ত্রী, আমাদের সিনেমার নায়িকা, আমাদের দুর্দান্ত সাংবাদিক প্রমুখের কিছু হলে তার দায়িত্ব কার হত? এই নাটকের শেষ দৃশ্যে কী হবে? কালীঘাটের দেবীমূর্তির সামনে করজোড়ে ‘দোষ কারো নয় গো মা’ গায়নপূর্বক যবনিকা পতন?
কার্টুনের নাম পশ্চিমবঙ্গ
আসলে কেন এমন হল, বুঝতে কারও বাকি নেই। পয়সা হজম হয়ে গেলে খেল ঠিকঠাক খতম হল কিনা তা দেখার কষ্ট এ রাজ্যে আর কেউ করে না। তবে এসব স্পষ্ট বলা বারণ, বুদ্ধিমান বুঝিয়া লও। বললেই টের পাওয়া যাবে যে এ রাজ্যের পুলিস মোটেই অদক্ষ নয়, প্রশাসনও বাবুরাম সাপুড়ের নিরীহ সাপ নয়। অভাব ন্যূনতম যোগ্যতার এবং পরিমিতিবোধের। প্যান্ডেলে টালিগঞ্জের নায়ক-নায়িকাকে এনে পুজো উদ্বোধন করা আর কিংবদন্তি আন্তর্জাতিক ফুটবলার ও তাঁর সঙ্গীদের স্টেডিয়ামে নিয়ে এসে লাখখানেক টিকিট কেটে আসা লোকের সামনে উপস্থিত করা যে এক জিনিস নয় – তা উপলব্ধি করতে যে যোগ্যতা লাগে, তা তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির আছে। আমাদের মন্ত্রীদের নেই। মেসিকে হাতের কাছে পেলেই যে জড়িয়ে ধরতে নেই, বারবার সেলফি তোলার হ্যাংলামি যে উচ্চপদস্থ জনপ্রতিনিধি এবং তাঁদের পরিবার পরিজনকে মানায় না, তা বুঝতে যে পরিমিতিবোধ প্রয়োজন তা রাহুল গান্ধীর আছে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী অমৃতা ফড়নবীশের নেই, আমাদের এখানকার নেতা মন্ত্রী এবং তাঁদের পরিবার পরিজনেরও নেই।
সোজা কথায়, বাঙালির মধ্যে যোগ্য ব্যক্তির আকাল পড়েছে। সামান্য একটা খেলার অনুষ্ঠান নির্ঝঞ্ঝাটে মিটিয়ে ফেলার মত লোকও পাওয়া যাচ্ছে না। রাজ্যের কোথাও বড় কিছু ঘটলেই কী কী কারণে তাঁরা দায়ী নন, এর ব্যাখ্যা দিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন আমাদের নেতৃস্থানীয়রা। এটা আসলে নেতৃত্ব দিতে না পারার নিদর্শন, যে যত ভোটেই জিতে আসুন না কেন। ভোটে জেতার ক্ষমতা আর কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে করার যোগ্যতা এক জিনিস নয়।
এ তো গেল সরকার পক্ষের কথা। আমাদের মধ্যে যোগ্য লোকের এতই অভাব যে মেসি বিভ্রাটের চেয়ে অনেক বড় এবং রাজ্যের মানুষের জন্যে অনেক বেশি ক্ষতিকর ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও বিরোধী দলগুলো রাজ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা দূরের কথা, দিনের পর দিন চাপে ফেলার মত আন্দোলনই করে উঠতে পারে না। সারদা কেলেঙ্কারি বা ক্যামেরার সামনে ঘুষ নেওয়ার মত ঘটনা ঘটিয়েও এ রাজ্যে কোনো নেতার বিরোধীদের ভয়ে হাঁটু কাঁপে না। কেনই বা কাঁপবে? রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের তো কর্মসূচি হল হিন্দু-মুসলমান, মন্দির আর গীতাপাঠ। তাঁদের আর উপায়ও নেই, কারণ রাজ্য সরকারের দুর্নীতি নিয়ে বেশি লাফালাফি করলে নিজেদের নেতাদের নামই উঠে আসবে। তাঁরা অনেকেই তো তৃণমূল কংগ্রেস থেকে এসেছেন। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে আন্দোলন করতে গেলে আবার কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ উঠে পড়তে পারে। এদিকে বাংলার বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবে, যিনি সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্ব পেয়ে এমন চমৎকার কাজ করেছেন যে ফুটবল খেলাটাই বন্ধ হয়ে আছে, তিনি অবশ্য দিব্যি বুক ফুলিয়ে মেসি বিভ্রাট নিয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত দিয়ে বসে আছেন। আমাদের মা-ঠাকুমারা দেখলে বলতেন ‘চালুনি বলে, ছুঁচ, তোর পিছে কেন ছ্যাঁদা?’
আরো পড়ুন কর্পোরেট মর্জি ও অকর্মণ্যতার কল্যাণে ভারতীয় ফুটবলের লকডাউন
অন্যদিকে বাম রাজনীতি নস্ট্যালজিয়ায় জবজবে। তৃণমূল মেসিকে এনে সামলাতে পারল না; আমরা কিন্তু পেলে, মারাদোনাকে এনেছিলাম, কোনো গোলমাল হয়নি – একথা তাঁরা গলা ফাটিয়ে বলছেন। শতকরা একশো ভাগ সত্যি কথা বলছেন। পেলের কলকাতায় আগমনের সময়ে আমার জন্ম হয়নি, কিন্তু তখনকার লোকেদের কথা থেকে এবং প্রতিবেদন থেকে তো জানাই যায় যে এরকম কেলেঙ্কারি হয়নি। আর মারাদোনা যেবার প্রথম কলকাতায় আসেন (ডিসেম্বর ২০০৮) এবং ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসা চেটেপুটে নিয়ে নিজেকেও নিঃশেষে ঢেলে দেন – সেবার সাংবাদিক হিসাবে সকালের মহেশতলার অনুষ্ঠান থেকে সন্ধেবেলার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের অনুষ্ঠানের সাক্ষী ছিলাম। মানুষের উন্মাদনা ছিল, কোথাও কোথাও কিঞ্চিৎ বিপদের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু কোনো নেতা বা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ মারাদোনা আর তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছে যাওয়া মারাদোনার দিকে বল ছুড়ে দেওয়ার বুদ্ধি বা রুচিও তখন ছিল আয়োজকদের। ফলে মোহনবাগান মাঠে নিরাপত্তারক্ষীদের দুশ্চিন্তার তোয়াক্কা না করে এবং বিরাট করে বানানো মঞ্চে উপবিষ্ট নেতা ও প্রাক্তন ফুটবলারদের পাত্তা না দিয়ে মারাদোনা বল নিয়ে ভেলকি দেখিয়েছিলেন। তারপর মঞ্চের দিকে না গিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। নির্ঘাত মেসিও দেখাতেন। কিন্তু বলটা দেবে কে? ‘খেলা হবে’ তো এ রাজ্যে স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
মুশকিল হল, যে কোনো ইস্যুতেই আজকের বামেরা বামফ্রন্ট সরকার কী করেছিল তা তুলে ধরেন। যেন আর কিছু তাঁদের করার নেই। তাহলে রাজ্যের মানুষের করণীয় কী? বামফ্রন্ট সরকারকে টাইম মেশিনে করে ফিরিয়ে আনা? নাকি জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সুভাষ চক্রবর্তীকে প্ল্যানচেট করা? নাকি কোনো বিপ্লবী মতে বিয়ে করা দম্পতির সন্তান হিসাবে তাঁদের পুনর্জন্মের অপেক্ষায় থাকা? রাজনৈতিক দল অবশ্য আকাশ থেকে পড়ে না। আমরা কেমন তারই চমৎকার নিদর্শন এই মেসি বিভ্রাট। আজকের পশ্চিমবঙ্গ নিজেই নিজের কার্টুন। আর সেই কার্টুনের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র মনে হল আর্জেন্টিনার জার্সি পরা এক যুবককে। একটা ক্লিপে দেখলাম, সে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলছে ‘ছাব্বিশে মানুষ বুঝবে। মেসি গেছে, পিসিও যাবে।’
ভাবুন! একটা রাজ্যের স্কুলশিক্ষার সাড়ে বারোটা বেজে গেল নিয়োগ দুর্নীতিতে, উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান নেই বলে কলেজের ক্লাস ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, পুলিস দুষ্কৃতীদের ভয়ে থানাতেই টেবিলের তলায় লুকিয়ে পড়ে, তোলাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে গেছে টালা থেকে টালিগঞ্জ, ধর্মীয় মেরুকরণ এমন অভূতপূর্ব জায়গায় পৌঁছেছে যে মসজিদ তৈরি বনাম গীতাপাঠের রাজনীতি হচ্ছে, খোদ কলকাতায় আমিষ খাবার বিক্রি করার জন্যে মার খেতে হচ্ছে গরিব ব্যবসায়ীকে আর নিগ্রহকারীদের মালা পরানো হচ্ছে। মোটে দেড় বছর আগে খোদ কলকাতার সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হয়ে গেলেন। তারপর একদিন কিছু উন্মত্ত লোক সেই হাসপাতালে ঢুকে পড়ে ভাংচুর চালাল, তার জন্যে কার শাস্তি হয়েছে তা আমরা আজও জানতে পারলাম না। এতকিছুর জন্যে বাঙালি যুবকটির সরকারের উপর রাগ নেই। সে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় মেসিকে দেখতে পেল না বলে!
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









“সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক কমিউনিস্টদের দখলে এবং সেই চাপে পুঁজিবাদী দেশগুলোও কল্যাণমূলক অর্থনীতি নিয়ে চলছে”..
এইসব coping কথা বার্তা বন্ধ করেন…
Welfare state is achievement of Democracy and free market.. কোনো কষ্ট কল্পনা করে communism কে বাহবা দেবার মত কিছু নয়…
Communist রা নিজেরা তো নিজেদের rule করা “পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক” including in west bengal জায়গায় economic planning আর mismanagement করে পর্বতের মূষিক প্রসব করেছে.. মানুষকে না দিতে পেরেছে economic improvement … না দিতে পেরেছে শিক্ষা স্বাস্থ্য..
এইসব comrade দের জন্য working class of bengali people are moving out of the state into south india for work…