আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই বাংলায় এক মহামানবের জন্ম হয়েছিল। একদিকে তাঁর ছিল দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতকে তর্কে পরাভূত করবার মত প্রজ্ঞা, অন্যদিকে ছিল বাঙালি জনতাকে ভাবাবেগে আপ্লুত করবার জনমোহিনী ক্ষমতা। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, তাঁর ছিল অবিচল কৃষ্ণপ্রেম। কৃষ্ণ তথা ঈশ্বরের বিরহে দীর্ণ শ্রীচৈতন্যের রূপ ধরা পড়েছে বৈষ্ণব পদকর্তার পদে:
আজু হাম কি পেখলুঁ নবদ্বীপ চন্দ।
করতলে করই বয়ন অবলম্ব।।
পুন পুন গতাগতি করু ঘর পন্থ।
খেনে খেনে ফুলবনে চলই একান্ত।।
ছল ছল নয়ন-কমল সুবিলাস।
নব নব ভাব করত পরকাশ।।
পুলক-মুকুলবর ভরু সব দেহ।
রাধামোহন কছু না পায়ল থেহ।।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সেই মহামানব প্রথমেই আঘাত করলেন ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নকে। উচ্চারণ করলেন অভেদ ও সুন্দর সাম্যের বাণী, “চণ্ডালপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তিপরায়ণ”। দলে দলে নিম্নবর্ণের, নিম্নবর্গের মানুষ যোগ দিলেন তাঁর সঙ্গে। ভেঙে দিতে চাইলেন শাক্ত-বৈষ্ণব-মুসলমানের ভেদ। এইভাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন হয়ে উঠল সর্বহারা মানুষের উত্থান, আর তার নায়ক হিসাবে আবির্ভূত হলেন আমাদের নিমাই বা শ্রীচৈতন্যদেব। যাঁকে নিয়ে অনেক পরে বাঙালি কবি লিখবেন “বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া”।
বস্তুত, বাঙালি জাতি ও সমাজের মূলমন্ত্রই হল সমন্বয়। নানা ভাষা, নানা জাতির মানুষের মিলনের ফলে এর জনজীবন গড়ে উঠেছে, তাই এর সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময়। তাই তো বিশালাক্ষী দেবীর ভক্ত চণ্ডীদাস হয়ে যান অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব পদকর্তা। একবর্ণ বাংলা না লেখা ‘মৈথিলী কোকিল’ বিদ্যাপতি হন বাঙালির আত্মার আত্মীয়। নওয়াজিস খান, আলি রজা, আকবর আলি, মির্জা হোসেন আলি, সৈয়দ মর্তুজারা লেখেন শাক্ত ও বৈষ্ণব পদ। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই মাটিতে ঘটেনি – একথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়; কিন্তু তাতে বাঙালির সমন্বয়বাদী ঐতিহ্য মিথ্যা হয়ে যায় না।
তারপর পাঁচশো বছর পার হয়ে গিয়েছে, ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। “নিপীড়িত মানুষের চোখের জল” পরিণত হয়েছে তাদের “আফিমে”। নিমাই সন্ন্যাসী সর্বহারা মানুষের উত্থান ঘটিয়েছিলেন, তাঁর ধর্ম আজ ইসকন নামক সংগঠনের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসার রূপ ধারণ করেছে। কিছুদিন হল সেই প্রতিষ্ঠানেরই সন্ন্যাসী অমোঘ লীলা দাসের এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেই ভিডিওতে তিনি অপর দুই ধর্মবেত্তা শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের সমালোচনা করেছেন।
ISKCON ‘Monk’ Amogh Lila outrageously Insults two of Bengal’s biggest Hindu spiritual Monk Swami Vivekananda & Ramakrishna Parmahansa & feels everything about them is wrong . pic.twitter.com/H7j5kLRpp0
— সত্যান্বেষী (@satyanewshi) July 10, 2023
সমালোচনা করেছেন না বলে ব্যঙ্গ করেছেন বলাই সমীচীন। নচেৎ সমালোচনার ঊর্ধ্বে কেউই নন, তাই সঠিক অর্থে সমালোচনা করলে বিশেষ কিছু বলার থাকত না। আগে দেখে নেওয়া যাক অমোঘ লীলা বাবাজির বক্তব্য কী। তাঁর মতে, বিবেকানন্দ সিদ্ধপুরুষ হতে পারেন না, কেননা তিনি আমিষ, বিশেষত মাছ খেয়েছেন। স্বামীজির কর্মযোগ থেকে বিখ্যাত উক্তি – গীতা পড়ার চেয়ে ফুটবল খেলা ভাল। বাবাজি এই ভাবনাকেও ব্যঙ্গ করেছেন। ব্যঙ্গে রুচির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী “যত মত তত পথ”-কেও ব্যঙ্গ করায় তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়ে ইসকন তাঁর জন্য কিছু উদ্ভট শাস্তি ঘোষণা করেছে।

কিন্তু বর্তমান ভারতের প্রেক্ষিতে তাঁর এই মন্তব্য আরও বিশদ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বাবাজির বক্তব্য ভাল করে শুনলে বোঝা যায়, তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য যত না রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ, তার থেকেও বেশি বাঙালি জনসমাজের খাদ্যাভ্যাস ও তার সমন্বয়বাদী চিন্তার ঐতিহ্য। অর্থাৎ বাঙালি জীবনধারাকেই তিনি ভুল বলে মনে করেন। লক্ষণীয়, একজন হিন্দু সন্ন্যাসী ব্যঙ্গ করছেন অন্য হিন্দু সাধুদের। অথচ এক দশকের বেশি সময় ধরে আমরা শুনে আসছি – হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই, আমাদের সকলের শত্রু মুসলমান। সমন্বয়ী বৈশিষ্ট্যের হলেও আমাদের মনে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা একেবারে ছিল না তা নয়। অনুকূল পরিস্থিতিতে সেই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে আজকাল। বহু বাঙালি হিন্দু মুসলমানদের বাঙালি বলেই মানতে চান না, তাদের দেশ থেকে বার করে দেওয়া হলেই খুশি হবেন। বাঙালি মুসলমানদের তাই ঘরে বাইরে আক্রমণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, “বাংলাদেশী” ও “রোহিঙ্গা” বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরীর ঘটনা তার অন্যতম উদাহরণ।
কথা হল, হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি হিন্দু কিন্তু এই আক্রমণের আওতার বাইরে থাকছে না। কারণ ভারতে এখন চলছে ফ্যাসিবাদী শাসন এবং ফ্যাসিবাদ কখনো কোনো বৈচিত্র্যকে মেনে নিতে পারে না। আমাদের শাসকদের মনে হিন্দুধর্মের একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলা চেহারা রয়েছে, যারা সেই ছকের বাইরে তাদেরই তারা আক্রমণ করে। বাঙালি হিন্দু সততই সেই ছকের বাইরে, অতএব পলাশ অধিকারীর মত ঘটনা বা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের তাড়াতে চাওয়ার চেষ্টা হয়েই চলেছে। আসামে এনআরসি করে বারো লক্ষ বাঙালি হিন্দুর নাগরিকত্ব বাতিল করার প্রসঙ্গ তো বাদই দিলাম।
আরো পড়ুন বাতিল করার সংস্কৃতির কোপে নজরুল: সাম্প্রদায়িকতার শিকড় গভীরে
ইসকনের বাবাজির মন্তব্যকে এই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। তা হল, এর আগে বাঙালি হিন্দু আক্রান্ত হলেও তার ধর্মীয় আচার ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি। ইসকনের বাবাজি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তা করেছেন। অর্থাৎ আরএসএসের কল্পনার হিন্দুরাষ্ট্রে হিন্দু বাঙালির ধর্মাচরণের স্বাধীনতা মুসলমান বাঙালির মতই অরক্ষিত – একথা প্রমাণ হয়ে গেল বাবাজির বক্তব্যে।
বাবাজি একদিক থেকে বাঙালির উপকার করলেন। তিনি আমাদের, মানে বাঙালি হিন্দুদের, ভেবে দেখার সুযোগ করে দিলেন আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে দেবে কিনা। তা ঘটা যদি প্রতিরোধ করতে হয়, তবে আমাদের নিজেদের মনে যে বিদ্বেষের বিষ রয়েছে, তাকে বিসর্জন দিতে হবে। এরপরেও কি কারোর পরিচয় জিজ্ঞেস করতে গেলে বলব, “আপনি বাঙালি, নাকি মুসলমান?” এখনো কি বাঙালি বলে বিতাড়িত হওয়ার সমস্যা কেবল প্রবাসী শ্রমিকদের ভেবে এড়িয়ে যাব? এই আত্মসমীক্ষার সুযোগ দেওয়ার জন্য বাবাজির অমোঘ লীলাকে ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








