প্রায় তিনমাস ধরে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল একটি মেয়ের ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে। তিলোত্তমাকে আর জি কর হাসপাতালে তাঁর কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাক্ষেত্র আর জি কর হাসপাতালের ভিতরেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং মৃত্যুর আগে বা পরে তাঁকে ধর্ষণও করা হয়। এ বিষয়ে এতদিনে আলোচনা, পর্যালোচনা কম হয়নি। তাঁর প্রাপ্য সুবিচারের দাবিতে উদ্বেল হয়ে উঠেছে মহানগরী, পথে নেমেছেন ডাক্তারি ও অন্যান্য পেশার নানা সাধারণ, অসাধারণ মানুষ। পাশাপাশি একই সময়ে একাধিক ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। মানুষ প্রশ্ন তুলেছে – আর কতবার এ জিনিস দেখতে হবে? বিভিন্ন বয়সী, বিভিন্ন পেশার মেয়েরা নির্যাতিতা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক প্রশাসনিক তৎপরতা ও সংবেদনশীলতারই অভাব দেখা গেছে, সুবিচার তো পরের কথা।
তবে এই লেখায় আমরা প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে কথা বলব না। বলব অন্য একটি বিষয় নিয়ে, যাকে বলতে পারি মানুষের সচেতনতার অভাব। খুব সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় একটি বাম দলের এক নেতার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছিলেন এক তরুণী সাংবাদিক। প্রশংসনীয় যে সিপিএম তৎপর হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্ত নেতা তন্ময় ভট্টাচার্যকে সাসপেন্ড করে এবং ব্যাপারটি দলের আভ্যন্তরীণ অভিযোগের কমিটিতে (ইন্টারনাল কমপ্লেন্টস কমিটি) নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, পুরো প্রক্রিয়াটি বিশাখা গাইডলাইন সম্মত। অথচ দেখা গেল, পার্টির সদস্য সমর্থকদেরই অনেকে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করলেন। কেন শুধু মেয়েটির অভিযোগের ভিত্তিতে সাসপেন্ড করা হবে? কেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা হল না? অনেকেই অভিযোগকারী সাংবাদিকের দিকেই আঙুল তুললেন। বললেন তাঁর উচিত ছিল সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার আগে পুলিসে যাওয়া। অনেকে এমন প্রশ্নও তুললেন যে এর আগেও তাঁর অস্বস্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেদিন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন কেন? কেনই বা সাক্ষাৎকার শেষ না করেই বেরিয়ে এলেন না? এসব প্রশ্ন কেবল সিপিএমের কর্মী সমর্থকরাই তুলেছেন তা নয়। অন্যরাও তুলেছেন। অর্ধেক আকাশের মতই ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ করার ব্যাপারেও মহিলারা তাঁদের উপস্থিতি যথেষ্ট জানান দিয়েছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রশ্ন ওঠে, এমনটা কেন হল? প্রায় তিনমাস ধরে একটি মেয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ তুলে যাঁরা যন্ত্রণা পাচ্ছেন, রাস্তায় নামছেন, অনভ্যস্ত গলায় স্লোগান তুলছেন – তাঁরা অন্য একটি মেয়ের ক্ষেত্রে এমন সংবেদনশীলতাহীন কেন? তাহলে কি তাঁরা শুধুমাত্র দলদাস? বা, আরও এক ধাপ এগিয়ে, সম্ভাব্য যৌন অপরাধী অথবা যৌন অপরাধের সঙ্গী? প্রশ্নগুলো যতটা সহজ, উত্তরগুলো বোধহয় ততখানি সহজ নয়। উত্তর জানা কিন্তু সহজলভ্য নয় বললে বোধহয় ভাল বোঝা যাবে।
আসলে সচেতনতা দীর্ঘ চর্চার ফল। এই চর্চার ধৈর্যেরই বোধহয় অভাব হচ্ছে আমাদের। এই সমাজের রীতিই এই। যখনই কোনো মেয়ে নিজের যৌন হেনস্থার কথা প্রকাশ্যে আনে, তখন যে কথাটি তাকে সবচেয়ে বেশি শুনতে হয় তা হল ‘তোমার সঙ্গেই কেন এমন হল?’ অর্থাৎ সমাজে, সংসারে, স্কুলে, কলেজে, টিউশন ক্লাসে, নাটকের দলে, অফিসে এত মেয়ে তো রয়েছে। তুমিই কেন হেনস্থার শিকার হলে? তাহলে দোষ নিশ্চয়ই তোমারই। তোমার ছোট জামার, তোমার স্বভাবের, তোমার রাত করে ফেরার ইত্যাদি। যাঁরা লিঙ্গ সচেতনতা নিয়ে কাজ করেন তাঁরা বলবেন একেই বলে ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ এবং এটা অন্যায়। কিন্তু সমস্যা হল, আমাদের সমাজ ইউটোপিয়া নয়। যদি তা হত, তাহলে সকলে অভিযোগকারীর বদলে একযোগে আঙুল তুলত অভিযুক্তের দিকে বা দোষী ব্যক্তির দিকে। কোনো যৌন হেনস্থার ঘটনায় বারংবার অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের মুখে ক্ষত বিক্ষত হতে হত না অভিযোগকারীকে। কী ভালই না হত তাহলে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। কারণ ক্ষমতার বিন্যাসে যে নিচে, তার দিকেই আঙুল তোলা সোজা। যৌন হেনস্থার অভিযোগের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়ে থাকে। আর তাই যৌন হেনস্থার শিকার একটি মেয়ের দিকেই আঙুল তোলা হয়। সামাজিক কাঠামোর উপর আঘাত হানা যে সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টকর কাজ। দ্বিতীয়টির সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবার আমাদের নিজেদের স্বার্থও জড়িত থাকে।
তাহলে প্রশ্ন উঠবে – কী করিতে হইবে? মাথায় রাখতে হবে, এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ টিকে আছে কয়েক হাজার বছর ধরে। একে বদলানো সহজ নয়। কীভাবেই বা বদলানো যাবে? সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, সংবেদনশীলতার মাধ্যমে? সে কাজ কীভাবে হবে? সম্প্রতি ২০১৩ সালের PoSH Act সংশোধিত হয়েছে। তার ফলে এখন প্রত্যেক স্কুল, কলেজ, অফিস, এমনকি রাজনৈতিক দলেও একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মহিলা কর্মী থাকলে সেখানে আভ্যন্তরীণ অভিযোগের কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ওই আইন কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের মধ্যেই বা কতজন বিশাখা গাইডলাইন পড়েছেন বা বিষয়টিকে আত্মস্থ করেছেন? অনেকসময় দেখা যায়, শিক্ষিত তথাকথিত ভদ্র মহলেও এ প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে, যে শুধুই মহিলার মুখের কথায় পুরুষ অভিযুক্ত হয়ে গেলে তো যে কোনোদিন যে কোনো পুরুষকে যে কোনো মহিলা ফাঁসিয়ে দিতে পারেন। এ কথাও খানিক সচেতনতার অভাব এবং ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকেই আসে বলে মনে হয়। এই যদি শিক্ষিত লোকেদের অবস্থান হয়, তাহলে যে সমাজে শিক্ষা বা তথাকথিত প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা সেভাবে পৌঁছয়নি সেখানে তো সচেতনতা কম থাকাই স্বাভাবিক। সুতরাং আভ্যন্তরীণ অভিযোগের কমিটি গঠিত হল কিনা, হলেও কাজ করার মত, দোষী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার মত যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারল কিনা, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
আরো পড়ুন শ্রদ্ধার হত্যায় প্রকাশ হয়ে পড়ল সমাজের ব্যাধিসমূহ
তবে একটি আশার কথা এই, যে যতদিন যাচ্ছে ততই যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ জাতীয় অপরাধের শিকার মেয়েরা বেশি বেশি করে মুখ খুলছে। এটি অবশ্যই সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষণ। সাম্প্রতিককালে কুলতলি বা মালদার ধর্ষিত এবং মৃত মেয়েদের পরিবার অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার জন্য। এইটুকুই হয়ত রুপোলি রেখা। একে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষণ বলে মনে করা যেতেই পারে। তবে সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং পরিশ্রমসাপেক্ষ। আক্রান্তকেই দোষী ঠাওরানোর ব্যবস্থা রাতারাতি উবে যাবে না। হতাশাজনক হলেও এটিই সত্য। নিরন্তর প্রচেষ্টা না চালালে সমাজের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন করা অসম্ভব। সেখানেই নারীবাদী বা বামপন্থী সংগঠনগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত প্রথাগত চিন্তাধারা একথাই বলে যে সমাজে যে যৌন সচেতনতার অভাব রয়েছে, সেই অভাব পূরণ করার দায় এসে পড়ে এই তথাকথিত প্রগতিশীল শক্তিগুলির উপর।
যে তেতো কথা লেখার ভূমিকা এই লেখার প্রথমেই করেছিলাম, তা হল আমাদের সমাজে সচেতনতার অভাব রয়েছে এবং কোনো অলৌকিক ঘটনা না ঘটলে এই সমাজ কাল-পরশুই বদলে যাবে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায় – সমাজ গতিশীল, তবে এই গতি অতি ধীর। দীর্ঘ সময় পরে হয়ত কোনো বড় পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়তে পারে। এই দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তাধারা বাড়লেও যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে আক্রান্তকেই দোষী ঠাওরানো সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যাবে না। তা বলে লড়াই থামানো যাবে না। বরং প্রতিটি শহরে, জেলায়, গ্রামে, পাড়ায়, স্কুলে, কলেজে, যৌন সচেতনতার লড়াই ছড়িয়ে দিতে হবে। তবেই ক্রমশ আক্রান্তকে দোষী করার ঘটনা সাধারণ থেকে ব্যতিক্রমে পরিণত হতে পারে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








