দেশে শুরু হয়েছে ভোট উৎসব। পৃথিবীর সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক দেশের ভোট মানে সাজো সাজো রব। সমস্ত সংবাদমাধ্যমে এখন রাজনৈতিক খবরের প্রাধান্য। শুধু দেশের নয়, বিদেশের সংবাদমাধ্যমও এখন ভারতবর্ষের রাজনীতি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এরই মধ্যে প্রোজ্জ্বল রেবন্ন, যিনি কর্ণাটকে হাসান কেন্দ্রে জেডিএস দলের সাংসদ এবং এবারের লোকসভা নির্বাচনেও প্রার্থী, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যাঁর হয়ে প্রচার করেছেন, তিনি শিরোনামে উঠে এসেছেন। কারণ তিনি কয়েকশো মহিলাকে যৌন নির্যাতন করে হাজার দুয়েক ভিডিও বানিয়েছেন বেশ কয়েকবছর ধরে। সেইসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় কর্ণাটক পুলিস তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে, গ্রেফতার করার জন্যে খুঁজছে, প্রোজ্জ্বল দল থেকে বহিষ্কৃত। তার আগেই অবশ্য তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

কোন দলের সহায়তায় পালিয়েছেন, কেন তাঁর দল এবং জোটসঙ্গী বিজেপি সব জেনেও তাঁকে সমর্থন জানিয়েছে, কেন জাতীয় মহিলা কমিশন প্রথম দিকে চুপচাপ ছিল – সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠছে, ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রোজ্জ্বলের যত কুকীর্তির অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছে তত মনে হচ্ছে, আমরা সমাজ হিসাবেই নারী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নারীদের উপর যৌন অত্যাচার চালানো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কম নয়। খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে তারা কোনোরকম শাস্তি ভোগ করেছে। ভারতবর্ষে সাম্প্রতিককালে আমরা সকলেই ব্রিজভূষণ সিংয়ের কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থা করার কথা জেনেছি। তাঁকে এবার লোকসভার টিকিট দেওয়া হয়নি, তার বদলে দেওয়া হয়েছে তাঁর পুত্রকে। পিতৃতান্ত্রিক ভোটব্যবস্থার এমন নজির আমরা অনবরত দেখছি। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধেও শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু ওই পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় কোনোরকম তদন্ত সম্ভব হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গের সন্দেশখালিতে দিনের পর দিন তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসে মহিলাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে এর আগেই অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচন পর্বে তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। এখন আবার অভিযোগ উঠছে, তেমন কিছু নাকি আদৌ ঘটেনি। সবটাই বিজেপির চক্রান্ত। ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বিজেপির এক স্থানীয় নেতা তেমনটাই বলছেন। ভিডিওর সত্যাসত্য যা-ই হোক, মেয়েদের সম্মানকে যে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে সব পক্ষই, তাতে সন্দেহ নেই।

প্রোজ্জ্বল কাণ্ডে সবথেকে বেশি চিন্তার বিষয় হল, এই লোকটা তার সমস্ত যৌন অত্যাচারের ঘটনা ভিডিও করে রেখেছে এবং সেই ভিডিওগুলো এখন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কখনো মেসেজের মাধ্যমে, কখনো পেনড্রাইভে বিলি করা হচ্ছে। ফলে যে মহিলারা নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তাঁদের নিগ্রহ এখনো চলছে। বলা বাহুল্য, এই ভিডিওগুলো জনতার আমোদের উৎস হয়ে উঠছে। বিনা পয়সায় বিলি করা এই ভিডিওগুলোতে নিজের মায়ের উপর ধর্ষণের ঘটনা দেখে কোনো ছেলের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে, তা নিয়ে অবশ্যই এখনো আমরা আলোচনা শুরু করিনি। ইতিমধ্যে কর্ণাটকের মহিলা কমিশন এই ভিডিওগুলো না ছড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। দেশের বিভিন্ন নারী সংগঠন একজোট হয়ে কীভাবে, কোন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এগুলো পুরোপুরি মুছে দেওয়া যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। প্রোজ্জ্বলের ঘটনায় একটা জিনিস খুব পরিষ্কার – প্রযুক্তি কীভাবে নারী নিগ্রহের এক নতুন উপায় হয়ে উঠতে পারে।

প্রশ্ন করা দরকার সংবাদমাধ্যমগুলোকে। এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা বারবার ‘সেক্স স্ক্যান্ডাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করছে। অথচ প্রোজ্জ্বল যা করেছেন তাকে ‘মাস রেপ’ বা গণধর্ষণ বলাই সমীচীন।

প্রথমদিকে আমরা দেখছিলাম খবরের কাগজগুলো এই খবর ভিতরের পাতায় প্রকাশ করছিল। পরে যখন এই ঘটনা নিয়ে নানা মহল থেকে প্রতিবাদের ঢেউ উঠল, তখন এই খবর প্রথম পাতায় আসে। কতজন মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই, ভিডিও রয়েছে হাজার দুয়েক। এমন সাংসদকে গণধর্ষক বলা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে? সোশাল মিডিয়ায় এ নিয়ে অনেক পুরুষের প্রতিক্রিয়া চমকপ্রদ বললেও কম বলা হয়। একজন ৬৮ বছরের পরিচারিকা প্রোজ্জ্বলকে অনুরোধ করেছিলেন, আমাকে ছেড়ে দাও। এই খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তা শেয়ার করলে তথাকথিত শিক্ষিত লোকেদের হা হা হাসির প্রতিক্রিয়া দিতেও দেখা যাচ্ছে। বাংলা কাগজের অনলাইন সংস্করণে এই খবরের তলায় কিছু পুরুষ মন্তব্য করেছেন – তাঁরা ভিডিওগুলো দেখতে চান।

নির্বাচনে কোন দল জয়ী হবে তা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, এবারের নির্বাচনে বোধ হয় পুরুষতন্ত্র এখনই জিতে গেছে। যে কারণে মেয়েদের মঙ্গলসূত্র বড় খবর হয়ে ওঠে আর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে মেয়েদের নিজের পরিবারে অবৈতনিক শ্রমের কথা উল্লেখ করলেও প্রায় কোনো কাগজেই সে খবর দেখতে পাওয়া যায় না, ঠিক সেই কারণেই প্রোজ্জ্বলের ধর্ষণের ঘটনা আলোচিত হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণা থেকে। সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশিত মতগুলো একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, মেয়েদের আমাদের দেশের মানুষ কী চোখে দেখছে।

আরো পড়ুন বারাণসীর ঘটনা প্রশ্ন তুলে দিল, দেশের মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়?

এবছর নির্বাচনের এক বহু আলোচিত বিষয় হল, বিজেপি ভোটে জিতলে সংবিধান বদলে দেবে। এখানে মনে রাখা দরকার, ভারতের সংবিধানে প্রথম থেকেই নারী, পুরুষকে সমানাধিকার দেওয়া হয়েছে। যে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে যেমন স্পষ্ট হয় পরিবারে নারী-পুরুষের ভূমিকা, তেমন এই ভোট উৎসবেও কিন্তু বোঝা যাচ্ছে দেশে মেয়েদের অবস্থান ঠিক কোথায়। হয়ত প্রোজ্জ্বলকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, হয়ত তাকে শাস্তিও দেওয়া হবে। কিন্তু মেয়েদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করার কাজ এদেশে কে দায়িত্ব নিয়ে করবে – সে প্রশ্ন এই নির্বাচন আবার আমাদের সামনে এনে দিল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.