এই ভয়ঙ্কর তাপপ্রবাহের মধ্যে মহারাষ্ট্রের পুনে শহর যেখানে ভয়ে কাঁপছে, তাড়াতাড়ি বৃষ্টি না এলে কখন বাঁধ দিয়ে ধরে রাখা জল শেষ হয়ে যাবে আর পুণেবাসীর খাবার জলটুকুও ফুরিয়ে যাবে, তখন এখানকার মানুষ ফুরফুরে মেজাজে। কারণ এখানকার খাল বিল আর বড় বড় কুয়োগুলো কানায় কানায় ভর্তি! নীরা নদীর জল পৌঁছে যাচ্ছে বারামতীর গ্রামে গ্রামে। এখানে জলের দরকার তো হবেই। কারণ আখ চাষ, চিনির কারখানা, মদের কারখানার জন্য তো জলের প্রচুর জোগান দরকার। আখ চাষের জন্য উর্বর জমি, চিনির কারখানা, ডিস্টিলারি, আরও নানা ধরনের কৃষিজাত দ্রব্যের কারখানা, কৃষি সমবায় বা সমবায় ব্যাঙ্ক, স্কুল, কলেজ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, ঝকঝকে রাস্তাঘাট – কোনোকিছুরই অভাব রাখেননি ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাতা শরদ পওয়ার। তাঁর খাসতালুক বারামতী সদা শস্যশ্যামলা, কর্মচঞ্চল এবং উন্নয়নের ধ্বজাধারী। বারামতী ঘিরে এনসিপির বকলমে পওয়ার পরিবারের যে একচ্ছত্র আধিপত্য তা অনেকটা আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরীর মালদাকে মনে করিয়ে দেয়।
পরিষেবা ও উন্নয়নে সহজে ত্রুটি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু বারামতীর ভোটারদের এবার বেশ মুশকিলে ফেলেছেন পওয়ার পরিবারের দুই কর্তা – কাকা শরদ ও ভাইপো অজিত। এনসিপি দলের দুই মাথা দল দুই টুকরো করে এখন সম্মুখসমরে। এবারের লোকসভা নির্বাচনে বারামতী কেন্দ্রে মুখোমুখি ননদ ও বৌদি – শরদের মেয়ে সুপ্রিয়া সুলে আর অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই দ্বন্দ্ব এতটাই বিপাকে ফেলেছে দলের কর্মী ও সমর্থকদের যে বারামতীর চৌধরবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের সরপঞ্চ বাড়ির উঠোনে বসিয়ে অতিথি সাংবাদিককে আমরস খাওয়ালেন বটে, কিন্তু কাকা না ভাইপো, কার জন্য গ্রামে ভোট চাইতে যাচ্ছেন সে নিয়ে ‘অন রেকর্ড’ কিচ্ছুটি বলতে চাইলেন না। যাঁরা ‘অন রেকর্ড’ কথা বললেন সেই মহেশ কৃষ্ণ পওয়ার, ফোফট নারায়ণ পওয়ার বা বাবুরাম রঘুরাম পওয়ারের মত প্রবীণ গ্রামবাসীরা শরদ ও অজিত – দুজনের প্রশংসাতেই পঞ্চমুখ। কিন্তু বলতে চাইলেন না কার পক্ষে পাল্লা ভারি। বরং এই চৌধরবাড়িই যে শরদের শ্বশুরবাড়ির পাড়া, তা নিয়ে খানিক গল্প করলেন।
কেউই যে একেবারে কথা বলছেন না তা নয়। সোমেশ্বরনগরের রাজেন্দ্র বাপু জগতাপ সকালবেলাই দলবল নিয়ে তুতারি বা ভেঁপু বাজিয়ে সুপ্রিয়ার জন্য প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন। তুতারি হচ্ছে শরদের এনসিপির নির্বাচনী প্রতীক। সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন ও বিধানসভার স্পিকারের সঙ্গে লড়ে মূল এনসিপির চাবিটি নিজের পকেটে পুরেছেন অজিত। তাই অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা এনসিপির পুরনো প্রতীক ঘড়ি চিহ্নেই লড়তে পারছেন। কাজেই নতুন দলীয় প্রতীক চেনানোর জন্য শরদের দলের কর্মীদের একটু বেশিই ঘাম ঝরাতে হচ্ছে।
প্রচারের ফাঁকে রাজেন্দ্র বলছেন, এসব হল কেন্দ্রীয় সরকারের চাল। শরদকে রাজনৈতিকভাবে শেষ করে দিতেই অজিতকে ইডি-সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে দল ভাঙিয়ে নিজেদের দিকে নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদীরা। অজিতের বিরুদ্ধে তো দুর্নীতির তদন্ত চলছিলই। এখন কেন বন্ধ হয়ে গেল? একই সঙ্গে রাজেন্দ্র বা এলাকার এনসিপি (শরদচন্দ্র পওয়ার)-এর যুব নেতা কেতন ভোঁসলে গড়গড় করে বলে গেলেন গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে শরদ পওয়ার কী কী করেছেন বারামতীর জন্য। তাঁদের বিশ্বাস, শরদের প্রতি আবেগেই এখানকার ভোটাররা ভোট দেবেন তাঁর মেয়ে সুপ্রিয়াকে। বাড়ির মেয়েরাও শরদের সঙ্গে আছে বলেই তাঁর দাবি।
তাহলে অজিতের সঙ্গে কারা? বারামতী শহর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে বড় বা ছোট পোস্টার, ব্যানার বা ফেস্টুন বিশেষ চোখে পড়ল না। মাঝে মাঝে দু-একটা প্রচার গাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে সুনেত্রা বা সুপ্রিয়ার সমর্থনে। এনসিপির দুই গোষ্ঠীর প্রার্থীর থেকে বরং নির্দল প্রার্থীদের বিশাল বিশাল ব্যানার বেশি দেখা গেল আনাচে কানাচে। বরং সোমেশ্বরনগর বাজারে গিয়ে দেখা পাওয়া গেল বিক্রম ভোঁসলেদের। তাঁরা বোঝালেন, অজিত হলেন বারামতির ‘বিকাশ পুরুষ’। ‘সাহেব’-এর বয়স হয়েছে, এখানে কাজকর্ম তো ‘দাদা’-ই দেখেন। তিনি দিনরাত পরিশ্রম করছেন।
বিক্রম তাঁর সঙ্গীসাথীদের সামনেই জোর গলায় বললেন, ‘বিজেপি কী করছে জানি না। আমরা ওসব খেয়ালও রাখছি না। আমরা দাদার (অজিত) সঙ্গে আছি বারামতীর মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে। অজিত দাদার মত পরিশ্রমী মানুষ খুব কম দেখেছি আমরা।’
আরো পড়ুন অভিষেকের নব তৃণমূলে মমতার জোয়ার কই?
এই কথার জোর বোঝা গেল বারামতী শহরে ঢুকে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এনসিপির জেলা অফিস (যার দখল অজিত গোষ্ঠীর হাতে) থেকে ঢিল ছোড়া দুরত্বে নটরাজ নাট্য মন্দিরে অজিত সভা করলেন দলের শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে। তিনি মঞ্চে পৌঁছনোর পর মিনিট ১৫ শুধু কর্মীদের দরখাস্ত দেওয়ার পালা চলল। একটুও বিরক্ত না হয়ে অজিত সব দরখাস্ত দ্রুত পড়লেন, দরকার হলে সই করে নিজের নিরাপত্তারক্ষীর হাতে তুলে দিলেন। কর্মীরা আশ্বস্ত হয়ে মঞ্চ খালি করতেই সভা শুরু।
পাক্কা ৪০ মিনিটের ভাষণে নিজের কাকা সম্বন্ধে একটিও শব্দ উচ্চারণ করলেন না, চার মিনিট সময় ব্যয় করলেন নাম না করে বোন সুপ্রিয়াকে কীভাবে বিদায় জানানো উচিত তা নিয়ে। বাকি ৩৫ মিনিট শুধু নিজের কাজের ফিরিস্তি শোনালেন। শেষে বলে গেলেন, যাঁরা তাঁর স্ত্রীকে হারাতে চাইছেন তাঁদের তিনি ৭ তারিখের পরে (ভোটের দিন) দেখে নেবেন। প্রচ্ছন্ন হুমকি। অত্যন্ত ঠাণ্ডা কিন্তু গম্ভীর গলায়। ব্যাস!
বারামতীর বিধায়ক এবং রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নিজের ক্ষমতার সদ্ব্যবহার তিনি করছেন ভোটের প্রচারে। অন্য দিকে সুপ্রিয়া বাবার জন্য আবেগকে কাজে লাগিয়ে বাজিমাত করতে চাইছেন। ভোটারদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন বাবার সম্মানরক্ষা করতে। সুপ্রিয়া মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন কীভাবে কেন্দ্রের কৃষিমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন শরদ সারা মহারাষ্ট্রের জন্য কাজ করেছেন, শিল্প এনেছেন। তিনিও সেই ধারা বজায় রাখতে চান। ১৯৮৪-২০০৯ শরদ সংসদে বারামতীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মাঝে কয়েক বছরের জন্য ১৯৯১ সালে অজিতও সাংসদ হয়েছিলেন। ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত ১৫ বছর এখানকার সাংসদ রয়েছেন সুপ্রিয়া।
তিনি জাতীয় স্তরে রাজনীতি করবেন এবং অজিত রাজ্য স্তরে – এমনটাই অঘোষিত নীতি ছিল এনসিপিতে। কিন্তু যেই শরদ তাঁর মেয়ের হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দিতে গেলেন, তখনই গোঁসা হল ভাইপো অজিতের। বিজেপিও সেই সুযোগে তাঁকে তাতিয়ে এনসিপি দলটাকেই ভেঙে দু টুকরো করে দিল।
সুপ্রিয়ার উল্টো দিকে অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা নির্বাচনী রাজনীতিতে নবাগতা। কিন্তু পওয়ার সাম্রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দেখভাল করেন তিনিই। তাঁর নিজের এনজিও কাজ করে পরিবেশ নিয়ে। এবার তাঁকে রাজনীতির ময়দানে আনতে বাধ্য হয়েছেন অজিত। সুনেত্রাও পায়ে হেঁটে প্রচার করছেন। বলছেন, তিনি কীভাবে বারামতীর উন্নয়নের ধারা বজায় রাখবেন। অজিতও তাঁর প্রচারে বলার চেষ্টা করছেন, মোদী কেন্দ্রে ফের ক্ষমতায় আসবেন এবং তিনি মোদীজির সাহায্য নিয়ে বারামতীকে আরও প্রকল্প এনে দেবেন। উন্নয়নের গাড়ি গড়গড় করে এগিয়ে দেবেন। কিন্তু বারামতীর ভোটাররা মোদী বা রাহুল গান্ধীকে নিয়ে চিন্তিতই নন।
বন্ধু-অধ্যাপক ময়ূরা বারামতী যাওয়ার আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, ‘বারামতীতে গিয়ে বিজেপির নামই উচ্চরণ কোরো না।’ কারণ করার দরকারই পড়বে না। সত্যিই দরকার পড়েনি। কারণ বিজেপি-কংগ্রেসের লড়াই, মোদী-রাহুলের রাজনীতি – এসব বারামতিতে অস্তিত্বহীন। তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তাই নেই কারোর মনে। বরং শরদ-অজিতের সমর্থক নির্বিশেষে সবার মনেই চিন্তা অন্য। কাকে শেষমেশ ভোটটি দেবেন – ননদকে না বৌদিকে?
তবে বারামতীর প্রবীণ এক ভোটার ভরা বাজারের মধ্যে দাঁড়িয়েই, নাম না লেখার অনুরোধ করে বলে ফেললেন, ‘পওয়ার পরিবারের যুদ্ধ আমাদের বিপাকে ফেলেছে ঠিকই। মনে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদী সাহেবকে (শরদকে) রাজনৈতিকভাবে খতম করতে চান। কিন্তু ভোট মিটে গেলে যে কাকা-ভাইপো আবার এক হয়ে যাবেন না বা শরদই যে মোদীর হাত ধরে বসবেন না, তার কিন্তু কোনো গ্যারান্টি নেই।’
মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লোকসভা কেন্দ্রটি ঘুরে কিন্তু হাতে রইল সেই পেনসিল। রুমাল সত্যিই বিড়াল হবে কিনা বোঝা যাবে ৪ জুনের পর।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







