বার্ধক্য থেকে আবার যৌবন ফিরে পাওয়া, সৌন্দর্য যেমনটা কুড়িতে ছিল তেমনটা পঞ্চাশেও অটুট থাকা, দেহপট অক্ষয় করে রাখা – এসব কেবল নব্য উদারবাদী চাহিদা নয়, এ মানুষের আদিম চাওয়া। আমাদের পুরাণেই বহু উল্লেখ আছে। যযাতি তার বার্ধক্যের ভার নিতে বলেছিল নিজের সন্তানদের। শর্মিষ্ঠার ছেলে পুরু, সম্ভবত মহত্ত্বের আকাঙ্ক্ষাবশতই, সে ভার নিজের ঘাড়ে নিয়ে বাবা যযাতির যৌবনকে দীর্ঘায়িত করে দিয়েছিল। এর বাস্তবসম্মত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী হবে তা অন্য আলোচনা। পুরাণমাত্রেই বহুলাংশে রূপকনির্ভর, আর যে ছবির আলোচনায় এই উপক্রমণিকা, তাও রূপক ও প্রতীকে সাজানো। পরিচালক কোহালি ফাহজা যে জিনিস দেখাতে চেয়েছেন সেই বীভৎসতাকে রূপকের বাইরে গিয়ে সমাজ-বাস্তবের পটভূমিতে নেহাত ঘ্যানঘেনে লাগত বলে মনে হয়। দ্য সাবস্ট্যান্স (২০২৪) ছবিতে যে অগাধ সাবস্ট্যান্স লুকিয়ে আছে তা এই অভিব্যক্তিবাদী মোড়কে চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালে আমাদের কারোর চোখে পড়ার কথা নয়। এই সাবস্ট্যানসে হলিউডের ‘হল অফ ফেম’ থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার ছোটপিসিরা সবাই এমন মজে আছি, যে মজার আড়ালে কী আছে তা দেখতে গেলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বিষয়টি এত ব্যাপ্ত বলে দাবি করার দায় নিয়েই একথা বলছি। ব্যাখ্যাও দেব, তার আগে দ্য সাবস্ট্যান্স আসলে কী তা একটু নেড়ে চেড়ে দেখা যাক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ডেমি মুর অভিনীত চরিত্র এলিজাবেথ স্পার্কল ডেমির নিজের মতই একদা ডাকসাইটে সুন্দরী ও সফল হলিউড অভিনেত্রী। চল্লিশ পেরোবার পর তার কেরিয়ারে নতুন মোড় আসে ফিটনেস শো হোস্ট হয়ে। রোজ সকালে ‘পাম্প ইট আপ’ নামক এয়ারোবিক শোতে এলিজাবেথ তার উচ্চাঙ্গের শরীরী বিভঙ্গ নিয়ে হাজির হয়। জোরদার শরীরচর্চা দেখিয়ে দর্শকদের চাঙ্গা করে তোলে। এই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা টের পাওয়া যায় পেল্লায় বিলবোর্ডে এলিজাবেথের ‘পাম্প ইট আপ’ লেখা পোস্টার দেখে। তবে শুরুতেই আমরা জানতে পারি যে এলিজাবেথের ৫০ বছরের জন্মদিন উপস্থিত। স্টুডিও করিডোরের বিভিন্ন বাঁকে সবাই তাকে শুভেচ্ছা জানায়। পরমুহূর্তেই ঘটনাচক্রে সে শুনতে পেয়ে যায়, শোয়ের প্রযোজক হার্ভে ফোনে বলছে নতুন তরুণী ‘হট মডেল’ চাই এখুনি। কারণ মেয়েদের যৌবন নাকি আসলে পঁচিশের পর থেকেই পশ্চিমে ঢলতে শুরু করে। এলিজাবেথকে লাঞ্চে ডেকে সে জানায় নতুন মুখ চাই, তার দিন গেছে। কারণ ৫০ হয়ে গেলে ‘ইট স্টপস’। এলিজাবেথ দেখতে পায় হার্ভে একটার পর একটা বাগদা চিংড়ি তুলছে, মেয়োনিজে ডোবাচ্ছে, তারপর কচকচ করে খেয়ে চলেছে। এলিজাবেথ যখন জিগ্যেস করে যে ৫০ হয়ে গেলে কী বন্ধ হয়ে যায়, হার্ভে তখন নির্লজ্জ কিন্তু অমায়িক ভাবধারী প্রযোজকরা যেমন হয়, তেমন মুখ করে এড়িয়ে যায়। এই চিংড়ি খাওয়ার দৃশ্য সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম গা ঘিনঘিনে ঘটনা, যা ঘটে যাওয়ার পর এলিজাবেথ তার ওয়াইন গ্লাসে ভাসতে থাকা মাছিটার দিকে তাকিয়ে থাকে যেটা একটু আগে হার্ভের ঘাড়ে গিয়ে বসেছিল।
এবার বাতিল হতে চলেছে বুঝতে পেরে এলিজাবেথ যেই খানিক বিষাদে আচ্ছন্ন হবে হবে করছে, অমনি তার গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে আর ডাক্তারখানায় এক পুরুষ নার্স তাকে গোপনে একটা পেন ড্রাইভ দিয়ে পালায়। সেই পেন ড্রাইভে লুকনো আছে যৌবন ধরে রাখার ফিকির। সেই ফিকির অনুযায়ী এলিজাবেথ এক গোপন আস্তানা থেকে নিয়ে আসে ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ – ছোট্ট কাচের শিশিতে রাখা এক সবুজ তরল, যা সিরিঞ্জের মাধ্যমে শরীরে ঢোকালেই জীবন পাল্টে যাবে। এই সবুজ তরল ইনজেক্ট করার আগে ঝকঝকে সাদা বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলিজাবেথ নিজের নগ্ন শরীরটা দেখতে থাকে। আর পাঁচজন সাধারণ ৫০ বছরের মহিলার মত সে মোটেই নয়। তার মুখে বলিরেখা নেই, বোটক্স করে তা মুছে দেওয়া হয়েছে। স্তন, জঘনের আকার আকৃতি সুঠাম ও নির্মেদ। এই এলিজাবেথ তরুণী এলিজাবেথেরই নতুন সংস্করণ। সেও তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের নানা জায়গায় প্লাস্টিক সার্জারির কেরামতি করে নিজের বিভিন্ন সংস্কার করেছে। কারণ পুরুষতন্ত্র যে রূপের হাটে কেনাকাটা করে তাকে তো সেই বাজারেই ভোগ্য হয়ে উঠতে হবে। কিন্তু এত করেও হচ্ছে না। সবাই জানে তার ৫০ হয়ে গেছে, আর পঞ্চাশ পূর্ণ হলে, হার্ভে যা বলল তাই – ‘ইট স্টপস’।
সে ইনজেকশন ফুটিয়ে দিল, সবুজ স্বচ্ছ তরল শরীরে চালান হয়ে গেল। তারপরেই ঘটে গেল জাদু। এই জাদুই ছবিটার ভয়াবহ রূপকথা হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। ছবির প্রথম দৃশ্যে যেমন একটা ডিমের কুসুম ভেঙে অবিকল আরেকটা ডিম তৈরি হওয়া দেখানো হয়েছিল, সেভাবেই এলিজাবেথের চোখের মণি থেকে তৈরি হল আরেকটা মণি। তারপর বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। শেষমেষ এলিজাবেথের শিরদাঁড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এল একটা গোটা মেয়ে। ঠিক হার্ভে যেমনটা চেয়েছিল – তারুণ্যে টইটম্বুর এবং ‘হট’। মার্গারেট কোয়ালে অভিনীত এই মেয়ে নিজের পরিচয় দিল স্যু নামে। এলিজাবেথকে যে ফিটনেস শো থেকে বাতিল করা হয়েছিল, তারই নতুন অ্যাংকরের ভূমিকায় হার্ভের কোম্পানি বেছে নিল স্যুকে। এলিজাবেথের অচেতন দেহ পড়ে রইল ওই সাদা টাইলসের বাথরুমে। সে আবার জেগে উঠবে সাতদিন পর। সেই সাতদিন স্যু অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকবে বাথরুমে।
এরপরের ঘটনা বলব না, ছবিটি দেখার ইচ্ছে হলে দেখতে পাবেন। তবে এটুকু বলে রাখি, দু ঘন্টা ২০ মিনিটের এই ছবি দেখা খুব সুখের অভিজ্ঞতা হবে না। ভাললাগা, স্মৃতিমেদুর হয়ে চোখে জল এসে যাওয়া বা মধ্যবিত্তের আরও নানা আগলে রাখা আবেগ জড়ো করে উঠতে পারা মুশকিল। এই ছবি নারীদেহের পণ্যায়নের রাজনীতির বিরূদ্ধে এক বীভৎস প্রতিক্রিয়া। পুরুষের চোখে সুন্দর হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাতে চালাতে নারী হৃদয়ে যে ক্লান্তি জড়ো হয়েছে তার প্রতিক্রিয়া নীরবে, সুকোমলভাবে তো নয়ই, এমনকি অহিংসভাবেও ব্যক্ত করা চলে না। দেশে কি বিদেশে, ‘শো বিজনেস’-এর মহিলাদের দেখলে মনে হয়, তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হল সময় আর প্রকৃতি। কারোর নিজের ঠোঁট পছন্দ নয়, ফিলার দিয়ে ফুলিয়ে তুলতে হবে। কারোর চোখের কোলে ভাঁজ পড়লে চলবে না, বোটক্স করে সব বলিরেখা মুছে ফেলতে হবে।
এখানে বোটক্স ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে একটা প্রশ্ন খোঁচা মারছে মাথায়। যেকোনো উপায়ে নিজের বাড়তে থাকা বয়সের চিহ্ন লুকোতে চাওয়াই কি গোলমেলে? এই যে আমার প্রায় অর্ধেক মাথা সাদা হয়ে গেছে, আমি রং করে কালো দেখিয়ে বেড়াই, সেটাও কি আপত্তিকর? হতেও পারে। তাই শুরুতেই এই গোলমালের ব্যাপ্তির কথা বলে নিয়েছিলাম। হলিউড থেকে হলদিয়া – সাদা চুল কালো করা বহু প্রাচীন অভ্যাস। সেটা হয়ত বোটক্সের মত প্রকৃতির কাজে বিপুল হস্তক্ষেপ নয়, তবু দুয়েরই মূলে যে সুপ্ত বাসনা তা কিন্তু একই। এ বাসনা মানবিক, তবে যে কোনো মূল্যে তা চরিতার্থ করার পথ ভুলে ভরা আর আত্মঘাতীও। ‘সাবস্ট্যান্স’ যে বা যারা জোগান দিচ্ছে তারা কিন্তু এলিজাবেথকে চরম সর্বনাশের দিকে পরিচালিত করছে না। এলিজাবেথ নিজেই নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ‘সাবস্ট্যান্স’-ও এলিজাবেথের মত এই সৌন্দর্যের বাজারের একটা পণ্য মাত্র। এলিজাবেথ আর ‘সাবস্ট্যান্স’ – দুজনেই দুজনকে ব্যবহার করে আর ব্যবহৃত হয়। এলিজাবেথ তো সেই বিরাট নকশার এক অংশ, যেখানে কোনো স্বাধীন ইচ্ছা থাকে না। এলিজাবেথ জানেও না সেকথা।
আরো পড়ুন দহাড়: চিৎকার কর মেয়ে, দেখ কতদূর গলা যায়
সুতরাং নারীর যৌবন ধরে রাখার বাসনাও তার স্বাধীন ইচ্ছা নয়, পুরুষের কামনায় সম্পৃক্ত। পুরুষ তাকে যেমনটা দেখতে চায় তেমন করে নিজেকে সাজাতে গিয়ে নারী ভুলেই গেছে সে নিজের কেমন দেখতে চায়? তাই এলিজাবেথরূপী ডেমি সাবস্ট্যান্স ইনজেকশন নেওয়ার আগে যখন নিজেকে আয়নায় দেখে, তখন সে নিজের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণ দেখে। কারণ তার প্রথম সংস্করণ তো সেই ইনডিসেন্ট প্রোপোজাল (১৯৯৩) ছবির পর থেকেই আস্তে আস্তে নানা ফিলারের আড়ালে লুকোতে শুরু করেছে। এই প্লাস্টিক সার্জারি আর ফিলারে পুষ্ট সৌন্দর্যের বাজারে জিনবাহিত বা বংশানুক্রমিক সৌন্দর্যের অধিকারের বিরূদ্ধে একরকমের জেহাদ আছে বটে। আর এখানেই ধনতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে।
ফাহজার নির্মাণশৈলীতে নয়া অভিব্যক্তিবাদের (neo-expressionism) প্রয়োগ নজর কাড়ার মত। এই একশো বছরের পুরনো শৈলীতে তাঁর কোনো আপত্তিও নেই। তাঁর সাক্ষাৎকার শুনলে বোঝা যায়, আসন্ন অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া একমাত্র মহিলা পরিচালক ফাহজা ৪০ পেরোবার পর থেকে নিজের পাল্টে যেতে থাকা চেহারা নিয়ে নানা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। পুরুষতন্ত্র শ্রেণিবিশেষে বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। উচ্চবিত্ত নারী আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় আমরণ, যাতে পুরুষতন্ত্রের চোখে সে সুন্দর অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য থাকতে পারে। তার জন্যে নিজের উপরেই সে হিংস্র হস্তক্ষেপ করে চলে। এই হিংসার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ফাহজার ছবিও তাই হিংস্র, কিম্ভূত কিমাকার ‘বডি হরর’। নারীর কাছে যে অতুলনীয় সৌন্দর্যের দাবি পুরুষতন্ত্র করে আসছে যুগ যুগ ধরে, সেই শরীরকে ভয়াল ভয়ঙ্কর বীভৎস করে তুলে নতুন বছরের আগের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে পুরুষের সামনে তুলে ধরা – এ আরেক তুলনারহিত প্রতিশোধ। পরিচালক ফাহজা প্রতিশোধের ছবি ভালবেসেই নাকি বড় হয়েছেন। কিল বিল (২০০৩), র্যাম্বো (১৯৮২-২০১৯) ইত্যাদি ‘রিভেঞ্জ ফিল্ম’ ওঁর বিশেষ পছন্দ। ২০১৭ সালে বানানো প্রথম ছবির নামও রিভেঞ্জ – তিন পুরুষ ধর্ষকের বিরুদ্ধে এক তরুণীর প্রতিশোধ। কিন্তু এ ধরনের প্রতিশোধ দেখলে অন্যায়ের প্রতিকার হল গোছের আমেজ তৈরি হয়। দ্য সাবস্ট্যান্স দেখলে অত সহজ বা চেনা অনুভূতি হবে না। নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে ওঠা এক তীব্র ভাব তৈরি হবে। মনে হবে কখন শেষ হবে, অথচ মাঝখান থেকে ছেড়ে দিতে পারবেন না।
এই অনুভূতি সেই ক্ষণজীবী কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবসম্পন্ন জার্মান অভিব্যক্তিবাদী ছবিগুলো দেখলে যা হত তার দ্বিগুণ। ডাক্তার ক্যালিগরির ক্যাবিনেট (১৯২০), নসফেরাতু (২০২৪) কিংবা মেট্রোপলিস (১৯২৭) দেখলে ভয়ের আভাস পাওয়া যায়, কারণ আর যা-ই হোক, তা অতীত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ঘা খাওয়া ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা জার্মানি। কিন্তু দ্য সাবস্ট্যান্স তো আজকের দুনিয়া। তাই এখন আর ভয়ের আভাস নয়, আতঙ্কে ডুবে যেতে হয়। ওয়াইড অ্যাঙ্গলে স্টুডিওর করিডোর থেকে এলিজাবেথ আর স্যুয়ের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের টাইট ক্লোজআপ মাথায় হাতুড়ি মারতে থাকে। না শুনতে চাওয়া কিছু শব্দ – হার্ভের চিংড়ি মাছ চিবানোর কচকচ থেকে স্যুয়ের ডায়েট কোকে চুমুক দেবার ঢকঢক, ‘ক্লস্ট্রোফোবিয়া’-কে আরও তীব্র করে তোলে। এভাবেই নয়া অভিব্যক্তিবাদী দৃশ্য-বয়ানে ‘বডি হরর’ যেন রূপকথা হয়ে ওঠে ফাহজার ছবিতে। আধুনিক রূপকথায় মাঝবয়সী রানি আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে পুরনো হয়ে যেতে দেখে। তার নতুন সংস্করণ স্যুয়ের ছবি বিলবোর্ডে ঝুলতে দেখে তার বিষণ্ণতা নয়, হতাশা, যন্ত্রণা নয় – অপ্রতিরোধ্য রাগের উদ্গিরণ হয়। এই রাগ মস্তিষ্কের, তথাপি শরীরজাত, যা নিজের শরীর দেখে ও শরীরকে দেখতে দেখে তৈরি হয়। অথচ এলিজাবেথ কি হার্ভে কিংবা হার্ভেদের তৈরি গোটা ব্যবস্থার উপর একটুও রেগে ওঠে না? এই যে এত ছুঁচ ফোটানো, শরীর থেকে এত রস বেরিয়ে যেতে দেওয়া, এত রক্ত, এত মাংস, এত কৃত্রিমতা পুরে দিয়ে শরীরকে ক্ষত বিক্ষত হতে দেওয়া শুধুমাত্র যৌবন ধরে রাখার জন্য – এসব আয়োজন কি আত্মপ্রেম? যে নাছোড় আত্মপ্রেম তাড়িত করে এমন ‘হরর’-এর দিকে? এভাবেই ফাহজা এলিজাবেথের প্রতিশোধের আবহ তৈরি করে দেন। এই বহুচর্চিত আত্মপ্রেমের শেষ ধাপে যখন আর নিজেকে ভালবেসে কুল পাওয়া যাচ্ছে না, কিছুতেই নিজের চেহারা মনের মত হচ্ছে না – তখন নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করাই একমাত্র প্রতিশোধ।
এই প্রতিশোধও এক তামাশায় পরিণত হয় শেষে। ছবিটি শেষ অবধি দেখলে টের পাবেন। এত রাগ, ঘৃণা, হিংসা থেকে প্রতিহিংসা পার হয়ে শেষে পড়ে থাকে এক প্রাচীন বল্কল। ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’-এর এই ভয়াবহতা আমার মাথায় কোন অনুভূতি জারিত করে দেয় তা ঠাহর করতে পারি না। শুধু মনে পড়ে যায়, ওদের অমনভাবে দেখায় আমি কোনোদিন আপত্তি করিনি। শরীরের মত এক সার্বজনীন বস্তু আর তা থেকে তৈরি হওয়া ভয়ের মত এক আদিম অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে যেন বোমকে দিয়ে যায়। কারণ আমি তো জানি না কার উপর রাগ করব, আর প্রতিশোধই বা কার উপর নেব?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।




