দৃশ্য এক

এক বোতল জল নিয়ে কাজিয়া। দুজন পুরুষের মধ্যে। কেউ বলছে বিসলেরি ভাল, কেউ বলছে কিনলে। সাধারণ কথা কাটাকাটি থেকে বিশ্রী গালিগালাজ। প্রথম গালি যেটা দুজনেই দিল সেটা মা আর বোন নিয়ে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দৃশ্য দুই

মুর্শিদাবাদের এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এক মাস্টারমশাই একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন/করেন। পত্রিকায় তিনি এক বিশেষ ধর্মে নারীদের স্থান নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠানের কিছু লোকজনের তা আপত্তিকর মনে হয়। খাপ পঞ্চায়েতের মত এক সালিশি সভায় মাস্টারমশাইকে বাধ্য করা হয় ক্ষমা চাইতে এবং সিদ্ধান্ত হয় ওই পত্রিকার সমস্ত কপি পুড়িয়ে ফেলা হবে। মাস্টারমশাইয়ের ছোট্ট শিশুকন্যার মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হবে, ধর্ষণ করা হবে বলে হুমকি আসতে থাকে। মাস্টারমশাই বাধ্য হয়ে যে বাড়িতে থাকতেন সেখান থেকে দূরে অন্য বাড়িতে চলে যান। সেই ট্রমা নিয়েই বেঁচে আছেন এখনো।

দৃশ্য তিন

খবরে প্রকাশ, ছত্তিসগড়ের মহিলা সোনি সোরির যৌনাঙ্গে পাথর ঢুকিয়ে দিয়েছিল পুলিস। এ নিয়ে কোথাও কোনো মোমবাতি মিছিল হয়েছিল কিনা তা অবশ্য জানা নেই।

উপরের ঘটনা তিনটে আলাদা হলেও মিলে যায় এক জায়গায় এসে – নারীকে ধর্ষণ করে ঝগড়ায় জেতার মানসিকতায়, শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে তার বাবাকে শাস্তি দেওয়ার (পড়ুন ধর্ম শিক্ষা) বাসনায় আর এক চরম নৃশংস দৃষ্টান্ত স্থাপন করায়, যাতে আর কেউ সোনি সোরি হওয়ার দুঃসাহস না দেখায়।

আজ যখন মণিপুরের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখি দুজন বিবস্ত্র মহিলাকে গোটা গ্রাম ঘোরানো হচ্ছে, তখন অবাক লাগে না। শুধু দিনের পর দিন নারীদের উপর হওয়া অত্যাচার, অবিচার, পাশবিক যন্ত্রণার ইতিহাসের যে পাথর বুকে চেপে থাকে, সেটা আরও ভারি হয়ে চেপে বসে আর নিজেই নিজেকে জিগ্যেস করি, আর কত? যাঁরা অবাক হয়ে, পরম বিস্ময়ে পোস্ট করেন সোশাল মিডিয়ায়, তাঁদের ‘সিলেক্টিভ আউটরেজ’-এর ঘৃণা, না করুণা, না উদাসীনতা – কোনটা প্রাপ্য তা গুলিয়ে যায়।

যে কোনো যুদ্ধরত এলাকায় সবথেকে বেশি নৃশংসতার শিকার হয় শিশু ও নারী। সোমালিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া, প্যালেস্তাইন তার সাক্ষী। এক হিটলারের হলোকস্টেই ১.১ মিলিয়ন শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। সোমালিয়ার মোগাদিসু ক্যাম্পে ২৩ বছর বয়সী এবং নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক মহিলাকে ধর্ষণ করেছিল তিনজন উর্দিধারী পুলিস।

এগুলো সবই ভারতের বাইরের ঘটনা হওয়ায় পাঠকরা নিশ্চিন্ত হতে পারেন। এসবে কী-ই বা এসে যায়? এখানে সব চাঙ্গা সি!

কিন্তু মনে করে দেখুন বিলকিস বানোর কথা। ২০০২ গুজরাট দাঙ্গার সময় অন্তঃসত্ত্বা বিলকিসকে ধর্ষণ করা হয়, খুন করা হয় তাঁর পরিবারের আরও ১৪ জনকে। গতবছর ঠিক এই সময় তাঁর ১১ জন ধর্ষক ছাড়া পান, তাদের মালা দিয়ে বরণ করা হয় আর তাদের মধ্যে একজন আবার ভোটেও দাঁড়ায়। সত্যিই পাঠক, বিচিত্র পিতৃতন্ত্র! এত পোস্টে তখন ছয়লাপ ছিল না সোশাল মিডিয়া।

এই ভারতের মণিপুরেই থাংজাম মনোরমা যোনিতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে ছিলেন ঝোপঝাড়ের ভিতরে। মনে পড়ে ২০০৬ সালের খৈরলানজি হত্যাকাণ্ডের কথা? যেখানে সুরেখা ভাইয়ালাল ভূতমাঙ্গে ও তার মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়? সুরেখার দুই পুত্রসন্তানের পুরুষাঙ্গ থেঁতলে দেওয়া হয়। সোমালিয়ার বর্বরতা আর সুরেখা, বিলকিস, মনোরমার প্রতি সংগঠিত অপরাধ কি এক নয়?

কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারতে কোন যুদ্ধ চলছে?

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ২০২১ সালেই ৩১,৬৭৭টি ধর্ষণের কেস নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২০ সালের থেকে ১৯.৩৪% বেশি। প্রতিদিন ভারতে ৮৬টি নতুন ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশের কাছে। যেখানে সামাজিক ট্যাবুর জন্য পুলিশের কাছে যেতেই চান না এক বড় অংশের মানুষ। তার পরে আছে পুলিস নামক রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ঘা, যা এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন বিরাট অংশের মানুষ। তাই ২০১৭ সালে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৭৫% মানুষ ভারতীয় পুলিসের অভব্যতার জন্য রিপোর্ট লেখান না!

আসলে ভারত রাষ্ট্রে সবসময় যুদ্ধ চলছে মহিলাদের বিরুদ্ধে। কখনো রাষ্ট্রের দ্বারা কখনও রাষ্ট্রীয় মদতে সমাজের দ্বারা। কখনো জাতিভিত্তিক গণহত্যার উদ্দেশ্যে, কখনো মাওবাদী দমনের নামে, কখনো ধর্ম ‘খতরে মে হ্যায়’ অজুহাতে, কখনো ‘কাশ্মীর হামারা হ্যায়’ ধুয়ো তুলে। কখনো বা লাভ জিহাদ বা অনার কিলিংয়ের নামে। এ বছরেই মে মাসে যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশের সীতাপুরে নিজের ভাইঝির গলা চিরে হত্যা করেন এক ব্যক্তি। মেয়েটির অপরাধ ছিল সে অন্য বর্ণের নিজের পছন্দমত ছেলেকে বিয়ে করেছিল।

মে মাসেই পাঞ্জাবে মনপ্রীত কাউর ও তার প্রেমিককে মেরে ফেলা হয়। অপরাধ তারা একে অপরকে ভালবেসেছিল। একইভাবে শুধু ভালবাসার অপরাধে নিজের পরিবারের লোকেদের হাতে খুন হয় মধ্যপ্রদেশের রত্নাবাসী গ্রামের শিবানী তোমর ও তার প্রেমিক। তাদের মেরে কুমিরে ভর্তি চম্বল নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একই অপরাধে বাবার হাতে খুন হয় অন্ধপ্রদেশের প্রসন্না রেড্ডি।

এ ধরনের হত্যার তালিকা অন্তহীন।

এক পুরুষ রাষ্ট্র, যেখানে ভাষা থেকে সংসদ – সবক্ষেত্রেই পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য, সেখানে মহিলাদের উপর সংগঠিত অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে না। বরং এ হল প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ঘটে চলা একটি প্রক্রিয়া, মণিপুরে হওয়া কুকি মহিলাদের উপর নৃশংস, বর্বরোচিত অত্যাচার যার উপস্থিতি আমাদের কান ধরে টের পাইয়ে দেয়।

ইতিহাস এবং রাষ্ট্রের মজ্জায় যখন নারীবিদ্বেষী হিংসার বীজ, তখন তা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং চাওয়া বড্ড কঠিন। তাই বিলকিসের ধর্ষকরা মালায় ভূষিত হন, দেড়-দু মাস আগে ঘটে যাওয়া কুকি মহিলাদের উপর নির্যাতনের কোনো সুরাহা রাষ্ট্র করতে পারে না। ভাষা, যা জন্ম থেকেই নারীদের প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেয়, সেই ভাষা আজও ভীষণভাবে পুরুষালি।

আরো পড়ুন বিলকিস বানো: ছাত্রীর সঙ্গে অসমাপ্ত আলোচনা

তাই বাড়ির বিবাদ থেকে জমি নিয়ে ঝামেলা, জলের বোতল থেকে মাস্টারমশাইকে ধর্ম শিক্ষা দেওয়ার বাসনা – সবকিছুতেই মা-বোন-বউকে ধর্ষণ করার গালি বহুল প্রচলিত। তাই কোহরা-র মত হিন্দি জনপ্রিয় সিরিজের (যা কারো কারো মতে অন্য ধারার ওয়েব সিরিজ) প্রথম তিন পর্বেই বোনকে ধর্ষণ করার প্রচলিত গালি কম করে ৩০ বার বা তারও বেশিবার দেওয়া হয়। নারীর প্রতি এই বিদ্বেষেই কি লুকোনো নেই ধর্ষণের মত বর্বরতার বীজ?

মণিপুরে কুকি মহিলাদের উপর আজ যা হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক, কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং অতি যুদ্ধরত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত স্বাভাবিক। ভারত নামক রাষ্ট্রে ক্ষমতা নামক পুঁজি ভীষণভাবে পুরুষদের দখলে। আর সেই পুরুষরা সবসময় যুদ্ধে জিততে চাইছে, জিতে চলছে এই রাষ্ট্রের নারীদের বিরুদ্ধে। নারীকে তাই উলঙ্গ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেটা জোর করে শোবার ঘরেই হোক অথবা মণিপুর কি মালদার রাস্তায়। প্রেক্ষাপট যাই হোক, বলি কিন্তু নারীরাই।

তাই অত্যুক্তি হয় না, কবি যখন বলেন

আমার শরীর যুদ্ধক্ষেত্র
আমার স্তন হলো বিজয় পদক।
এই পুরুষ রাষ্ট্রে আমি শুধুই এক মাংসপিন্ড।
ধিক্কার পুরুষ তোমায়
তুমি আমার শরীরে শুধু যোনি দেখতে পাও।”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.