সম্প্রীতি চক্রবর্তী

গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে আফগানিস্তানের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তকীর এক সাংবাদিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রভূত সমালোচনা ও তর্কবিতর্ক হচ্ছে। এই সাংবাদিক সম্মেলন ছিল দিল্লির আফগান দূতাবাসে এবং মহিলা সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ভারতের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সাংবাদিকতা, ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং – নতুন পেশা হিসাবে উঠে আসার পর সেখানে মহিলাদের অনুপস্থিতির লম্বা ইতিহাস আছে। কিন্তু ২০২৫ সালে মোটামুটি সব ক্ষেত্রেই যেখানে মহিলা প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলক হারে বেড়েছে, সেখানে কেবলমাত্র পুরুষ সাংবাদিকদের জন্যে সাংবাদিক সম্মেলন করা যে শুধু দৃষ্টিকটু তা নয়, বরং ভারতের সংবিধান বা সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত কিছু জরুরি প্রশ্ন এখানে উঠে আসে। বিগত কয়েক বছর ধরে বিজেপি পরিচালিত সরকার ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-এর মত স্লোগান প্রচারে মত্ত। সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনা বা রাস্তার মোড়ে মোড়ে হোর্ডিং, যেখানে গ্রামীণ মহিলারা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি গ্যাস পেয়ে – এই সমস্ত ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে প্রগতিশীলতার ছবি তুলে ধরে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ যাদের দেশীয় রাজনীতির অন্যতম প্রচার কৌশল, তারা কী করে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যে মদত দেয়?

আজ ২০২৫ সালে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর। কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারে সেই পদে ছিলেন সুষমা স্বরাজ। তারও বহুবছর আগে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে বিদেশ মন্ত্রক নিজের হাতে রেখেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তেমনভাবে আজও যদি ওই পদে কোনো মহিলা থাকতেন, সেক্ষেত্রে কি ভারত সরকার তালিবানি নীতিকে সম্মান জানিয়ে মন্ত্রী বাদে অন্য কাউকে মুত্তকীর সঙ্গে বৈঠক করতে পাঠাত?

মহিলা সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করা নিয়ে প্রবল বিতর্ক হওয়ার ১১ অক্টোবর ভারতের বিদেশ দফতর বিবৃতি দেয় –আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রীতিনীতি অনুযায়ী আফগান দূতাবাস চত্বরে ভারত সরকারের আইন কার্যকর নয়, তাই দূতাবাসে আয়োজিত সম্মেলনের শর্ত ভারত সরকারের পক্ষে নির্ধারণ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতীয় সংবিধানের যে মৌলিক কাঠামো, যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান, তা ভারতে বসে কোনো দেশের সরকার লঙ্ঘন করতে চাইলে তার উপর কূটনৈতিক চাপ দেওয়া কি ভারত সরকারের কর্তব্য নয়? আফগানিস্তানের মত ছোট দেশকে এইটুকু চাপ দেওয়ার ক্ষমতাও কি বিশ্বগুরুর সরকারের নেই?

সরকারের বিবৃতি দেখে মনে হতে পারে, ব্যাপারটা সরকারি সমর্থনে হয়নি, বরং আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনোক্রমে ঘটে গেছে। কিন্তু যতই আইনের মারপ্যাঁচ দেখিয়ে নরেন্দ্র মোদীর সরকার নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলুক, ভারত সরকারের এই লিঙ্গবৈষম্যকে নিঃশব্দে সমর্থন জানানো আসলে একটা আদর্শগত মিলেরই নিদর্শন।

বিজেপি আর তার জন্মদাতা সংঘ পরিবারের হ্যান্ডবুকে ভারতীয় নারীর অবস্থান নিয়ে যাবতীয় আলোচনা যে হিন্দু মৌলবাদকে তুলে ধরে, তার সঙ্গে ইসলামিয় মৌলবাদের লিঙ্গবৈষম্যের অনেকাংশে মিল আছে। প্রথমেই তালিবান সরকারের অধীনে মহিলা সাংবাদিকদের কী অবস্থা সে বিষয়ে কিছু পরিসংখ্যান দিই। ২০২২ সালে, অর্থাৎ তালিবান শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়ার একবছর পরেই, আফগান ন্যাশনাল জার্নালিস্ট ইউনিয়ন (এএনজেইউ) যে সমীক্ষা করে, তাতে দেখা যায় দেশের ৮৭% মহিলা সাংবাদিক কর্মরত অবস্থায় লিঙ্গবৈষম্যের শিকার, ৬০% শতাংশ মহিলা সাংবাদিক ততদিনে কাজ হারিয়েছেন, ৯১% মহিলা সাংবাদিক জানান, তাঁরাই তাঁদের পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। আফগানিস্তানে ক্ষমতা পুনর্দখলের পর মহিলাদের সাংবাদিকতা করা নিয়ে তালিবানরা বেশ কয়েকটা নির্দেশ দিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে ছিল – মহিলারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন না, মহিলা সাংবাদিকরা কোনোরকম সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারবেন না, এমনকি সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে কোনো ঘটনার প্রতিবেদন দিতে বা সাক্ষাৎকার নিতে পারবেন না। যে গুটিকতক মহিলা সাংবাদিক তখনো সংবাদমাধ্যমগুলোতে কর্মরত, যাঁরা অফিসে বসে কাজ করবেন, তাঁদেরও সম্পূর্ণ পর্দাপ্রথা মেনে চলতে হবে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তালিবান শাসনাধীন আফগানিস্তানে কর্মরত মহিলা সাংবাদিকের জবানবন্দি তুলে ধরা হয়। তিনি বলেছেন, প্রথম একবছর তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন। এমনকি লুকিয়ে চলে গেছেন মেয়েদের স্কুলে, যেখানে শিক্ষিকারা সর্বদাই সন্ত্রস্ত এই ভেবে যে এমন আইনবিরুদ্ধ কাজের (মেয়েদের পড়ানো) জন্য যে কোনো সময়ে তাঁরা কারারুদ্ধ হতে পারেন। শিক্ষিকা এবং ছাত্রীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে, সেগুলোর প্রতিবেদন তৈরি করে, ছদ্মনামে, ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে নিজের প্রতিবেদন তিনি পাঠিয়ে দিতেন কানাডা বা অন্য কোনো দেশে।

তালিবানের এই রূপ অতি প্রসিদ্ধ, সকলেই এ বিষয়ে কমবেশি জানেন এবং নিজেদের দেশে মহিলাদের সাংবাদিক সম্মেলনে ঢুকতে না দেওয়ার নিয়মই তারা ভারতে নিজেদের দূতাবাসে এসেও লাগু করতে সচেষ্ট হয়েছিল। এটাই প্রত্যাশিত আচরণ। কিন্তু এর পাশাপাশি যদি বিজেপি শাসনে ভারতের মহিলা সাংবাদিকদের অবস্থাও দেখি, তাহলে কিছু কথা পরিষ্কার হবে।

২০২৫ সালের মে মাসে দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উত্তরপ্রদেশের হরলীন কাপুর (এই নাম তাঁর নিজের নয়, ছদ্মনাম, এবং লক্ষ করুন, আল জাজিরা বর্ণিত আফগান সাংবাদিকও ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন) জানাচ্ছেন, আপাতদৃষ্টিতে ভারতের সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয় না। প্রায় কুড়ি হাজারের বেশি খবরের কাগজ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেপে বেরোয় প্রতিদিন, সাড়ে চারশো বেসরকারি সংবাদমাধ্যম রয়েছে এদেশে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ বা আরও অনেক রাজ্যে সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ, মহিলা সাংবাদিকদের শ্লীলতাহানি বা হত্যা করার হুমকি দেওয়া ক্রমশ বাড়ছে, তাই সর্বদাই এখানে ভয়ের পরিবেশ। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে হরলীনের এই বক্তব্য যে একেবারেই অবিশ্বাস্য নয় তার বড় প্রমাণ ২০১৭ সালে বেঙ্গালুরুতে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে যারা হত্যা করেছিল, সেই হত্যাকারীদের একজনের হাড় হিম করা বিবৃতি ‘আমাকে বলা হয়েছিল, নিজের ধর্মকে বাঁচানোর জন্য একজনকে খুন করতে হবে। আমি জানতাম না কাকে, কিন্তু (ধর্মকে বাঁচানোর তাগিদে) আমি রাজি হয়ে যাই।’

এই স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, ভারতে সরাসরি সরকারি মদতে হিংসার প্রচার হয়ত কম হয়, কিন্তু হিন্দুত্ববাদকে কাজে লাগিয়েই যে ২০১৭ সালে গৌরীকে হত্যা করা হয়েছিল তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। সেই হত্যার পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পক্ষ থেকেও নিন্দা করা হয়েছিল, কিন্তু আমরা কি জানি না যে এদেশে হিন্দুত্ববাদের ধ্বজা কাদের হাতে?

এখন অবশ্য আরএসএসের অনেক মন্তব্যে খানিক অন্য সুর শোনা যাচ্ছে। এবছরের জুলাই মাসেই যেমন। মোহন ভাগবত মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে এক অধিবেশনে বলেন ‘ভারতীয় মহিলাদের রক্ষণশীল ঐতিহ্য ও আচার বিচারের কবল থেকে মুক্ত করা আবশ্যিক।’ এছাড়া ‘নারীশক্তি’ নিয়ে বর্তমান সরকারের নানা প্রকল্প বা প্রচার দেখে মনে হতেই পারে, আফগানিস্তানের মত একটা একনায়কতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে এখানকার কোনো তুলনা চলে না। সেক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, যে বছর এএনজেইউয়ের আফগান মহিলা সাংবাদিকদের পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়, সেবছরেরই (২০২২) সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল ১৫০ (এবছর তা হয়েছে ১৫১) এবং এমন একটা দেশে মহিলা সাংবাদিকদের অবস্থা কোথায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২২ সালের সমীক্ষাতেই উঠে এসেছিল, মহিলা সাংবাদিকদের জেলবন্দি হওয়ার ঘটনাও ভারতে বেড়ে গিয়েছে ৩৫%

স্ক্রল ডট ইনের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সুপ্রিয়া শর্মার বিরুদ্ধে কয়েক বছর আগেই এফআইআর করা হয়, কারণ তিনি বারাণসীতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্রে গিয়ে দলিত মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এসে করোনা অতিমারীর সময়ে লকডাউনের প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন। পরে যে মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তাঁদেরই একজন এফআইআর করেন তাঁর বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে অভিযোগ করে। এই মর্মে দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সুজাতা মাধোক এক বিবৃতিতে বলেছিলেন ‘একথা সত্য যে বর্তমানে ভারতে নানা ধারার সংবাদমাধ্যমে মহিলা সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়ছে, সংবাদপত্র থেকে শুরু করে অনলাইন পত্রিকা, ইউটিউব, টেলিভিশন, সর্বত্রই মহিলারা নানা বাধা ভেঙে এগিয়ে আসছেন। আবার একইসঙ্গে এটাও ঠিক যে এই সাফল্য তাঁদের খুব সহজ লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে।’ এই ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’-র কথা হরলীন কাপুরও বলেছিলেন।

আরো পড়ুন সর্বদা ধর্ষকদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায় বিজেপি

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের বক্তব্য অনুযায়ী, মহিলা সাংবাদিকরা সর্বদাই ‘দ্বিমুখী আক্রমণ’-এর শিকার। সাংবাদিকতার নিজস্ব ঝুঁকি তো আছেই। যে কোনো খবর সন্ধান বা তা প্রচার করায় নানা বিপদ লুকিয়ে থাকে। মেয়েদের ক্ষেত্রে যোগ হয় ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি বা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি। কয়েক বছর আগেই একটা ঘটনা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। সুল্লি ডিলস আর বুল্লি বাই নামে দুটো অ্যাপে মুসলমান মহিলাদের ছবি দিয়ে তাঁদের অনলাইন নিলামের বাজার খুলেছিল। তাদের তালিকায় বেশকিছু মহিলা সাংবাদিকও ছিলেন। এও আমাদের অজানা নয় যে গুজরাটে মোদী সরকারের কাজকর্ম নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন এবং তাঁর প্রতিবেদনের কারণে একদা অমিত শাহ গ্রেফতার হয়েছিলেন বলে কেমন ধারাবাহিকভাবে অনলাইন নিগ্রহের শিকার হয়ে চলেছেন সাংবাদিক রানা আয়ুব।

আবার ফিরে যাই ১০ অক্টোবরের সাংবাদিক বৈঠকে। তালিবান শাসনে মহিলাদের শুধুমাত্র বংশবৃদ্ধির যন্ত্র হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয়। সেহেতু তাদের কর্মক্ষেত্রে উন্নতি বা উচ্চশিক্ষা নেওয়ার দরকার নেই, কারণ ঘরের ভিতরে শিশু প্রতিপালন করাই নারীর সর্বোত্তম দায়িত্ব। এবার আসি বিজেপির আদর্শগত আধার আরএসএসের ভাবধারায় (কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, গত লোকসভা ভোটের পরে আরএসএস ও বিজেপির মধ্যে খানিক মনোমালিন্য দেখা দিয়েছে। তা বলে বিজেপি আর আরএসএসকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আদর্শের দিক থেকে আলাদা মনে করার কোনো কারণ নেই)। আরএসএসের সবথেকে বড় নারী বাহিনির নাম রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি। সেই বাহিনি তিনটে নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে – মাতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব। অর্থাৎ নারী একজন স্নেহশীলা এবং রক্ষাকর্ত্রী মা, যিনি সকলকে আগলে রাখবেন। এক্ষেত্রে শিবাজীর মা জিজাবাঈকে দেবীর আসনে বসানো হয়। দ্বিতীয়টা কর্তৃত্ব, যে নীতি অনুযায়ী মহিলারা অবশ্যই সামাজিক কাজ করবেন। এক্ষেত্রে পূজনীয় অহল্যাবাঈ হোলকারের মত মারাঠা রানি। তৃতীয়টা হল সামাজিক নেতৃত্ব। সেখানে আদর্শ হিসাবে তুলে ধরা হয় ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈকে।

একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, এই কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব আসলে মাতৃত্বের উপর নির্ভরশীল। আরএসএসের আদর্শ অনুযায়ী মহিলারা মুখ ঢেকে বা না ঢেকে বাড়ির বাইরে বেরোবেন, সামাজিক কাজেও লিপ্ত হবেন, কিন্তু সবক্ষেত্রেই তাঁদের মাতৃত্বের পরিচয় সবার ঊর্ধ্বে। মনে রাখতে হবে, ঝাঁসির রানিও কিন্তু পুত্রের মা ছিলেন, তাই তিনি আরএসএসের কাছে এক আদর্শ উদাহরণ।

একটু আগেই ভাগবতের সাম্প্রতিক ভাষণের কথা বলছিলাম, যেখানে তিনি রক্ষণশীল রীতি থেকে মহিলাদের বেরিয়ে আসার কথা বলেছেন। এই ভাগবতই কিন্তু বিজেপি সরকার গঠনের একবছর আগে সোজাসুজি বলেছিলেন, মহিলাদের শুধুমাত্র বাড়ির কাজই করা উচিত। কারণ এটা সামাজিক চুক্তির অংশ, যেখানে মহিলারা পুরুষদের দেখাশোনা করে এবং অন্যান্য চাহিদা মেটায় আর পুরুষ তাদের থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়। এখানেই পরিষ্কার, মাতৃত্ব আর ঘরে আবদ্ধ থাকা নিয়ে তালিবানরা যা মনে করে, তার সঙ্গে আরএসএসের ভাবনার বিশেষ তফাত নেই। মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করার প্রয়াসে তো অবশ্যই দুই পক্ষের সুর এক।

কিন্তু তালিবান সরকার যে হারে নারী স্বাধীনতা হরণ করে চলেছে, বিজেপির পক্ষে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে সেটা করা সম্ভব ছিল না। উপরন্তু ২০২৫ সালে এসে আরএসএস প্রধানকেও কিছু প্রগতিশীল কথা বলতেই হচ্ছে একটা বড় অংশের সমর্থন পেতে। যতই লিঙ্গসাম্যের পক্ষে দাঁড়ানোর ভান করা হোক, বাঞ্চ অফ থটস লেখক এম এস গোলওয়ালকরের অনুসরণকারীরা মেয়েদের অধিকারকে যে বিভাজনমূলক (divisive) ভাবে, তা তো জানাই আছে।

এবার আসি ভূরাজনীতির প্রশ্নে। তালিবান সরকারকে ভারত সরকারের সমর্থন জোগানো অনেকটা ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ তত্ত্ব অনুযায়ী। খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভারত-পাক সংঘর্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতকে সমর্থন করেছিল আফগানিস্তান। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা ডুরান্ড লাইন বরাবর অস্থিরতা বা বেলুচিস্তানের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে নানা দ্বন্দ্ব রয়েছে দুই দেশের মধ্যে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের বিরোধিতায় আফগানিস্তানকে পাশে পেলে ভারত সরকারের বিদেশনীতি খানিকটা শক্তপোক্ত হবে। সেখানে আফগান সরকার কতটা জনবিরোধী বা মেয়েদের কী নিকৃষ্ট উপায়ে দমিয়ে রাখে, তা নিয়ে ভাববার অবকাশ বিজেপি সরকারের নেই। কিন্তু প্রথমে আন্তর্জাতিক আইনকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করার পর নারীবর্জিত সাংবাদিক সম্মেলনের ঠিক ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আফগানদের দ্বিতীয় সাংবাদিক সম্মেলনে মহিলাদের দেখা গেল একেবারে সামনের সারিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জানানো হয়েছে, প্রথমবার মহিলাদের বাদ দেওয়া ‘টেকনিক্যাল ইস্যু’ ছিল। অল্প সময়ের মধ্যে সাংবাদিকদের নাম ঠিক করার সময়ে মহিলারা নাকি কাকতালীয়ভাবে বাদ পড়ে গিয়েছিলেন।

শুনে মনে হয়, ভারত সরকার হয়ত প্রথম দফায় আঁচ করতে পারেনি যে মহিলাদের বাদ দিলে তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হবে। আগেও বলেছি, আফগান বিদেশমন্ত্রীর মহিলাদের বাদ দেওয়া প্রত্যাশিত। কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে মহিলাদের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারতের জবুথবু সংবাদমাধ্যমও যে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠবে, তা বিজেপি সরকার বোধহয় আশা করতে পারেনি।

অনেকেই বলছেন, নারীবর্জিত প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন পুরুষরা বয়কট করলেন না কেন? তাঁদের কি নৈতিক দায়িত্ব নয় এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করা? এখানে বলার, ভারতে শুধু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই নয়, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, বিনোদন শিল্প বা আরও নানা পেশায় কর্মক্ষেত্রে অসুবিধার কথা বললে, ঋতুকালীন ছুটি বা বেতন-বৈষম্য নিয়ে আন্দোলন করলে পুরুষ সহকর্মীদের মহিলারা খুব একটা পাশে পান না। তাই মহিলাদের যেখানে বাদ দেওয়া হয়েছে সেখানে পুরুষরা কেন গেল? এই প্রশ্ন করাটাই একটা অদ্ভুত কৌতুক। আজকের সংবাদমাধ্যমগুলো শুধুমাত্র গৈরিকীকরণের প্রশ্নে নয়, লিঙ্গবৈষম্যের ক্ষেত্রেও যে বিষাক্ত, তা কয়েক বছর আগে ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়েই দেখা গিয়েছিল। বহু বিশিষ্ট সাংবাদিকই যৌন শিকারী বলে অভিযোগ উঠেছিল। অতএব ১০ অক্টোবরের ঘটনা কেবল দুই দেশের মৌলবাদী সরকারের স্বরূপই চেনাল না, এদেশের সংবাদমাধ্যমে মহিলা ও পুরুষ সাংবাদিকরা যে সমান নন, তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

নিবন্ধকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.