৯ জানুয়ারি ২০২৪, দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিলকিস বানো গণধর্ষণ মামলায় অপরাধী ১১ জনের শাস্তি মকুবের সিদ্ধান্তকে খারিজ করে দোষীদের দুই সপ্তাহের মধ্যে কারাগারে ফিরে যাওয়ার আদেশ দেয়। এক জনশুনানির পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি বিভি নাগরত্ন ও বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার বেঞ্চ বহু প্রতীক্ষিত এই রায় দান করে। সাজা মকুবের সিদ্ধান্ত রদ করে দুই বিচারপতি গুজরাট সরকারের তুমুল সমালোচনা করেন এবং ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে দোষীদের সাথে মিলিতভাবে কাজ করা তথা অপরাধের গুরুত্ব অবহেলা করার’ জন্য রাজ্য সরকারকে ভর্ৎসনা করেন। পরোক্ষভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকেও এই ভর্ৎসনা আঘাত করে, কারণ সাজা মকুবের সুপারিশে কেন্দ্রই সিলমোহর দিয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায় যে মহারাষ্ট্রের আদালতের বিচারে সাজাপ্রাপ্তদের শাস্তি মকুব করার এক্তিয়ারই নেই গুজরাট সরকারের। এছাড়াও দোষীদের একজনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্ত করার কথাও রায়ে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয় যে সাজা মকুবের যে কোনো প্রার্থনা একমাত্র মহারাষ্ট্রের আদালতেই করা যেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পরে দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ খানিক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন আর বিলকিস তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন “ন্যায়বিচার এইরকম হয়। আমাকে, আমার সন্তানদের আর সব জায়গার মহিলাদের ঠিক প্রমাণ করার জন্যে এবং সকলের জন্যে ন্যায়বিচারের আশার আলো দেখানোর জন্যে ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টকে ধন্যবাদ জানাই।”

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিন্তু ঘটনা পরম্পরা বিবেচনা করলে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই স্বস্তি কতদিনের? সত্যিই কি দোষীরা কারাগারে ফিরে যাবে? মহারাষ্ট্রের আদালতে এই সাজা মকুবের আবেদন উত্থিত হলে, সত্যিই কি রাজনৈতিক প্রভাবহীন এক সিদ্ধান্ত দেশবাসী পাবে? একমাত্র সময়ই এর উত্তর দিতে পারে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসন ও বিচারবিভাগের স্বতন্ত্র তথা স্বাধীন ভূমিকা থাকে, যা দেশের ন্যায়বিধান ব্যবস্থা ও মানবাধিকারকে দৃঢ় করে। সেই কাঠামোই বিগত দশকগুলোতে আমাদের দেশে ক্রমশ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সর্বান্তকরণে স্বাগত জানিয়েও আজ আমরা নির্ভার হতে পারি না।

বিলকিস বানোর গণধর্ষণ ও তার পরিবারের অন্যদের খুনের অপরাধে আজীবন কারাদণ্ডের সাজা পাওয়া অপরাধীদের স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের অছিলায় আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে যখন শাস্তি লাঘব করে মুক্ত করা হচ্ছিল, ঠিক সেদিনই লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণে দেশের প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার কথা। নারী সুরক্ষার অঙ্গীকার করতে আহ্বান জানাচ্ছিলেন দেশকে। এই দ্বিচারিতাই যেন আজকের ভারতের রাজনীতি। তা না হলে গুজরাট সরকারের সাজা মকুবের আবেদনে কেন্দ্র কী করে সম্মত হয়? আরও বিপজ্জনক বিষয় হল, এই ভেদাভেদ, ঘৃণা, আইনের পরোয়া না করা বা আইনকে নিজের মতন ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ক্রমশ সামাজিক স্বীকৃতি পাচ্ছে। বিলকিস মামলার ১১ জন অপরাধী, যারা আসলে সমগ্র মানবজাতির কাছে অপরাধী; তাদের ফুল মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নিতে এসেছিল এই সমাজেরই কিছু মানুষ। তাদের মধ্যে মহিলারাও ছিলেন। সোশাল মিডিয়ার এক অংশে এদের ‘ব্রাহ্মণ ও সংস্কারী’ বলে প্রচার করা হয়েছিল অসংকোচে। শাস্তি মাফ হলেই যে হাড় হিম করা জঘন্য অপরাধ মাফ হয়ে যায় না, সেকথা তখন অল্প কিছু মানুষই বলেছিলেন। বিলকিসও নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন সেদিন সেই আইনের নামে করা প্রহসন দেখে। ধর্মের নামে ভাগাভাগির রাজনীতিতে যে নীতির কোন স্থান নেই, এ তো জানাই ছিল। কিন্তু এক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশে ভেদাভেদের রাজনীতির সামনে যে আইনের শাসনেরও কোনো মূল্য থাকে না; আজ থেকে প্রায় দুবছর আগে বিলকিস মামলার দোষীদের শাস্তি মকুব সেটাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল।

এমনকি এই মুহূর্তেও ওই ১১ জনকে নানাভাবে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবার পরদিনই জানা গিয়েছিল, ১১ অপরাধীর নজনকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল দ্য প্রিন্ট ওয়েবসাইট এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই অপরাধীদের পরিবারগুলো বলছে এরা নিরুদ্দেশ নয়। এরা নাকি ‘গভীর আত্মসমীক্ষা’ (deep introspection) করতে ব্যস্ত।

বিলকিস কী ধরনের বর্বরতা ও নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সে সম্পর্কে অবহিত। বরং স্মরণ করা উচিত কতখানি কঠিন ছিল তাঁর আইনের পথে ন্যায়ের জন্য লড়াই। শুধুমাত্র সময়ের দৈর্ঘ্যেই তা ২০ বছরের বেশি – এক আদালত থেকে অন্য আদালতে, গুজরাট থেকে মহারাষ্ট্রে এবং পরিশেষে সুপ্রিম কোর্টে। কোর্ট কাছারি চালানোর সীমিত আর্থিক সামর্থ, বিভেদকামী সমাজের বৃহদংশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মানসিক লড়াই চালানো, নিজের পরিবারের সঙ্গে এক মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সংগ্রাম; ন্যায় পাওয়ার যাত্রাপথে বিলকিসের সামনে ছিল এসব পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। অবশ্য সেই প্রতিবন্ধকতা বিলকিস ও তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে। এই প্রতিবন্ধকতা তো একা বিলকিসের নয়; এদেশের হাজারো শোষিত, নির্যাতিত, ধর্ষিত মেয়েকে এই একই সংগ্রাম করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো সুষ্ঠু নিষ্পত্তি এই পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মান্ধ, জাতপাতে বিভাজিত, অজ্ঞতায় নিমগ্ন সমাজে আমরা দেখি না। তাই একক লড়াইয়েও বিলকিস হয়ে উঠেছেন সারা দেশের নির্যাতিতাদের প্রতিনিধি। ঠিক এইজন্যেই সুপ্রিম কোর্টে বিলকিসের এই জয় শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়, এদেশের প্রতিটি মহিলা ও পুরুষের জয় যাঁরা মানবাধিকার তথা নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী, যাঁরা ধর্মের নামে নিপীড়নকে প্রত্যাখ্যান করেন, যাঁরা সরকারের কাছে আইনের শাসন প্রত্যাশা করেন, রাজনৈতিক সমীকরণ নয়।

আরো পড়ুন বিলকিস বানো: ছাত্রীর সঙ্গে অসমাপ্ত আলোচনা

বিলকিস মামলায় যেমন রাজ্য সরকার তথা প্রশাসনের কালো দিকটি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়, ঠিক তেমনি স্পষ্ট হয় আশার রেখাগুলি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই লড়াই যতখানি বিলকিসের ততখানিই তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের। এঁদের মধ্যে তাঁর উকিল শোভা গুপ্তা থেকে শুরু করে সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও সামিল। বিলকিসের পাশাপাশি সাজা মকুবের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সিপিএম নেত্রী সুভাষিনী আলি, সাংবাদিক রেবতী লাউল, লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য রূপরেখা বর্মা এবং তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র। পাশে ছিলেন দেশের হাজার হাজার মানুষ, যাঁরা বিলকিসের পক্ষ নিয়ে সরকারকে চিঠি লেখা থেকে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ করেছেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। এইসব মানুষই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, সত্যের পথ কঠিন হলেও সেই পথে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে আরেকটি কথা না বললেই নয়। যে কদর্য রাজনীতির ফলে বিলকিস গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, যার পাকেচক্রে আরও হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, এখনো যাচ্ছে; সেই সর্বগ্রাসী ভেদাভেদের রাজনীতিকে, সেই পুরুষতান্ত্রিকতার রাজনীতিকে যদি আমরা পরাস্ত করতে না পারি তাহলে বিলকিসের ন্যায়বিচার একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। আজকে মনে হচ্ছে সেই লড়াইয়ে আমরা খানিক পিছিয়েই রয়েছি। বিলকিসের পরেও আমরা হাথরাস থেকে কাঠুয়া কাণ্ড দেখেছি। এই সেদিন ঘটে যাওয়া বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির কাণ্ডই বা বাদ যায় কেন?

আইনের লড়াই তো থাকবেই, তাতে উত্থানপতনও থাকবে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য চাই পরিণত রাজনৈতিক ও সামাজিক মনন। দিনবদলের পালা শুরু হওয়া উচিত আমাদের নিজেদের ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, আমাদের সামাজিক পরিসরে। দরকার এক সুস্থ, গঠনমূলক গণতান্ত্রিক চর্চা, যার শিকড় প্রোথিত থাকবে মানবাধিকার তথা আমাদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকারে। তবেই আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব। বিলকিসের অপরাধীদের সাজা মকুব খারিজ করে খানিক এরকম কথাই বলেছেন বিচারপতি নাগরত্ন – “একমাত্র আইনের শাসন জয়ী হলেই আমাদের সংবিধানে বর্ণিত স্বাধীনতা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলির জয় হতে পারে… আইনের শাসন মানে মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানের সুরক্ষা নয়।”

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.