অ্যান্ডি শারমিন নামে একজন ফুটবলার ছিলেন। তাঁর বাবা জার্মান, মা সুরিনাম-জাত ওলন্দাজ। অ্যান্ডি খেলতেন লেফট ব্যাকে, এফ সি তোয়েন্তে ক্লাবে। সেটা আটের দশকের শেষের দিক। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের পুরুষদের দলের এখন যিনি কোচ, সেই এরিক তেন হ্যাগের খুব কাছের বন্ধু ছিলেন অ্যান্ডি। দুজনেই এফ সি তোয়েন্তের খেলোয়াড়। অ্যান্ডি অসম্ভব প্রতিশ্রুতিমান খেলোয়াড় ছিলেন বলে জানা যায়, নেদারল্যান্ডসের অনূর্ধ্ব-২১ দলটার অধিনায়কও নির্বাচিত হন। তবে সহখেলোয়াড় বা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে তাঁর বেশি জনপ্রিয়তা ছিল নানারকম দুষ্টুমির জন্যে।

একবার নেদারল্যান্ডস বনাম জার্মানি অনূর্ধ্ব-২১ দলের খেলা হচ্ছে। সে ম্যাচের পরেই ছিল দুই দেশের সিনিয়র দলের খেলা। অ্যান্ডি নিজেদের ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে সাজঘরে গিয়ে দেখেন, একজন স্টেডিয়াম কর্মীর ইউনিফর্ম পড়ে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু বুদ্ধি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, সেই ইউনিফর্ম পরে চলে যান স্টেডিয়ামের গেটে। শুনেছেন একজন বিশিষ্ট জার্মান আসছেন খেলা দেখতে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সিনিয়র দলের খেলা শুরুর আগে তিনি যথারীতি এসে পৌঁছলেন, গেটে দাঁড়ানো অ্যান্ডি ঝরঝরে জার্মান ভাষায় তাঁকে বললেন টিকিট দেখাতে। তাঁর কাছে ম্যাচ দেখার সাধারণ টিকিট ছিল না, হয়ত তিনি ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথি। কিন্তু অ্যান্ডি দুষ্টুমি করে বলেন, টিকিট না থাকলে তাঁকে ঢুকতে দেওয়া অসম্ভব, যতই তিনি কেউকেটা হোন না কেন। বেশ কিছুক্ষণ বাদানুবাদ চলে। পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম, তখন অ্যান্ডি নিজের পরিচয় দিয়ে মেঘ সরিয়ে দেন। শেষ অবধি ঘটনাটা হালকাভাবেই শেষ হয়। নইলে অ্যান্ডি বিপদে পড়তে পারতেন, কারণ বিশিষ্ট জার্মানটি বস্তুত একজন কিংবদন্তি। ফুটবলে তাঁকে বলা হয় ‘কাইজার’, অর্থাৎ জার্মানির সম্রাট। সম্রাটকে চটানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

এই সম্রাটের জন্ম কিন্তু নিম্নবিত্ত পরিবারে। বেড়ে ওঠা মিউনিখের গেইসিংয়ের শ্রমিক পাড়ায়। ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডাককর্মী ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সিনিয়র আর তাঁর স্ত্রী আন্তোনির দ্বিতীয় পুত্র যখন জন্মাচ্ছে, জার্মানি তখন এক রক্তাক্ত খণ্ডহর। ছবছরের যুদ্ধ শেষে মাত্র চারমাস আগেই পতন ঘটেছে নাজি সরকারের। রাষ্ট্রের কয়েক বছরের আত্মধ্বংসী ফ্যাসিবাদী নীতি আর বিজয়ী মিত্রশক্তির জয়োল্লাসের ঘাত-প্রতিঘাতে চরম কষ্টে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দেশে খাদ্যাভাব, মহামারী, পুরুষ মানুষদের বিরাট অংশ হয় যুদ্ধে বা বন্দিশিবিরে অত্যাচারে মৃত, নইলে যুদ্ধবন্দি।

আরও চারবছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙা হবে দেশটাকে, মার্কিন-ইউরোপীয় পুঁজিবাদ প্রভাবিত পশ্চিম অংশের নাম হবে ফেডেরাল রিপাবলিক অফ জার্মানি, পূর্বের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট শক্তির হাতে, তার নাম হবে জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক। তৈরি হবে দুই দেশের দুটো আলাদা ফুটবল দল। পশ্চিম জার্মানি উত্তরোত্তর উন্নতি করবে, ১৯৫৪ সালে সুইটজারল্যান্ডের বার্নের ওয়্যাঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামে ‘মির‍্যাকল অফ বার্ন’ ঘটিয়ে, ফেরেঙ্ক পুসকাসকে কাঁদিয়ে, জিতে নেবে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ। অন্যদিকে পূর্ব জার্মানির ফুটবল দল সম্ভাবনা জাগিয়েও বড় মঞ্চে বারবার ব্যর্থ হবে।

দু গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষমেশ ৩-২ ফলাফলে ১৯৫৪ সালের ফাইনাল জিতে নিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। বৃষ্টির কারণে ওয়্যাঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামের মাঠ ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল, নাজি পার্টির একসময়ের একনিষ্ঠ সদস্য অ্যাডলফ ড্যাসলারের ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক সংস্থা অ্যাডিডাসের বানানো বিশেষ স্ক্রু লাগানো জুতো পরে পশ্চিম জার্মানরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান। কোচ সেপ হেরবের্জার (ইনিও প্রাক্তন নাজি) ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বন্ধু ‘অ্যাডি’র অবদান সর্বসমক্ষে স্বীকার করেন। ওই সময়েই ফুটবলকে আঁকড়ে ধরা বাঁচা শুরু নয় বছরের ফ্রাঞ্জের, বাবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে। এস সি ১৯০৬ মিউনিখে হয়েছিল তাঁর ফুটবলে হাতেখড়ি।

পশ্চিম জার্মানি বা জার্মানির বিশ্বকাপ জেতার ধারায় একটি সাধারণ সূত্র বেশ লক্ষ করা যায়। যখনই তারা বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের প্রতিপক্ষে ছিলেন এমন কোনো ফুটবলার, যাঁর খেলা বদলে দিয়েছে ফুটবলের দৃষ্টিভঙ্গি, জিতে নিয়েছে বিশ্বময় ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়। ১৯৫৪ সালে পুসকাসের হাঙ্গেরির হার দিয়ে সেই ধারা শুরু। ১৯৭৪ সালে তেমন ফুটবলার ছিলেন জোহান ক্রুয়েফ, ১৯৯০ সালে দিয়েগো মারাদোনা (যদিও, ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলেন সেই মারাদোনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপের মারাদোনার ছায়ামাত্র), ২০১৪ সালে লিওনেল মেসি। শেষোক্ত দুজন তবু ওই হারের আগে পরে বিশ্বকাপ জিতেছেন, পুসকাস আর ক্রুয়েফের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। একক প্রতিভার উপর নির্ভর করে ফুটবলের মত দলগত খেলায় জেতা যে কোনো দলের পক্ষেই খুব কঠিন। কিন্তু জার্মানি এসব ব্যাপারে যেন আরও বেশি নির্দয়, প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পেশাদার। তাদের ফুটবলে ব্যক্তির প্রাধান্য প্রায় অনুপস্থিত। আমরা পুসকাসের হার যতটা মনে রেখেছি, ততটা কি মনে রেখেছি সেদিনের জয়ী জার্মান অধিনায়ক ফ্রিৎজ ওয়াল্টারকে? ক্রুয়েফ যতখানি বন্দিত হন তাঁর ফুটবল দর্শন বা আপোসহীন ফুটবল আদর্শের কারণে, ততখানি কি আলোচিত হন গার্ড মুলার? মেসির হার নিয়ে যত কাব্যি করা হয়েছে সোশাল মিডিয়ায়, গোলের নিচে ম্যানুয়েল নয়্যারের প্রবল উপস্থিতি নিয়ে তার সিকিভাগও হয়েছে কিনা সন্দেহ। ১৯৯০ সালে যখন সোভিয়েত পতন মোটামুটি নিশ্চিত, দুই জার্মানি আবার মিলে যাচ্ছে, ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ট্রফিটা ফিফা পশ্চিম জার্মানিকে একরকম উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল – এই ক্ষোভ মারাদোনাপ্রেমীদের আজও, এতবছর পরেও কুরে কুরে খায়। লোথার ম্যাথেউসের কড়া ট্যাকল সত্ত্বেও রেফারির কার্ড না দেখানোকে কাঠগড়ায় তোলা হয়, পশ্চিম জার্মানিকে পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনো বিতর্ক চলে।

এখানেই ফ্রাঞ্জ আন্তন বেকেনবাওয়ার অনন্য। তাঁর মাহাত্ম্য বাদ দিয়ে জার্মান ফুটবলকে ভাবা যায় না। তাঁর দেশের অন্য কিংবদন্তিদের চেয়ে এক্ষেত্রে কয়েক গুণ এগিয়ে রয়েছেন তিনি।

১৯৫৪ বিশ্বকাপের মতোই ১৯৭৪ সালের ফাইনালেও পিছিয়ে পড়েছিলেন জার্মানরা। ডি-তে ক্রুয়েফকে ফাউল করেন উলরিখ হোয়েনেস, পেনাল্টি থেকে গোল করেন জোহানেস নিস্কেন্স। এসব ঘটে যায় খেলা শুরুর মাত্র দু মিনিটের মধ্যে, যখন কোনো জার্মান বল স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেননি। কিন্তু তারপর চাপ কাটিয়ে খেলা ধরে ফেলে পশ্চিম জার্মানি, বিরতির আগেই দুটো গোল করে এগিয়ে যায় তারা। রেনাস মিশেল-জোহান ক্রুয়েফের যুগান্তকারী ‘টোটাল ফুটবল’-কে হার মানতে হয় লড়াকু জার্মানদের কাছে। এর নেপথ্যে মিউনিখের ওই পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির কমনীয় শরীরের ফ্রাঞ্জ, যাঁর নেতৃত্বে দুবছর আগে ইউরোপ জয় করেছিল পশ্চিম জার্মানি। বায়ার্ন মিউনিখের ট্রফি ক্যাবিনেটে পরপর তিনবার ইউরোপিয়ান কাপও ঢুকেছিল তাঁর নেতৃত্বেই।

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের মহিমার শিকড় খুঁজতে গেলে আরও পিছিয়ে যেতে হবে। বিজয়ী শক্তির হাতে ভাগ হয়ে যাওয়া এক রাষ্ট্রে তাঁর জন্ম, বাবার আপত্তি অগ্রাহ্য করে ফুটবলে আসা। তারপর মাত্র ১৪ বছর বয়সে দ্বিতীয় ডিভিশনের ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের যুব দলে যোগ দেওয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এক অপমানের আখ্যান। মিউনিখ শহরের সফল ক্লাব তখন ১৮৬০ মিউনিখ – ফ্রাঞ্জের স্বপ্নের ক্লাব। এস সি ছেড়ে সেখানেই যাওয়া একরকম স্থির। এরই মধ্যে নিউবাইবার্গ গ্রামে বসল একটা অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল টুর্নামেন্ট। এস সি মিউনিখের বিরুদ্ধে ম্যাচ পড়ে ১৮৬০ মিউনিখের। সেই ম্যাচেই কিশোর ফ্রাঞ্জকে চড় মারে বিপক্ষ দলের সেন্টার ব্যাক। সে অপমান হজম করেনি অভিমানী কিশোর, বদলে ফেলেছিল গন্তব্য। ঠিক এক দশকের মধ্যে সে পেয়ে যায় অধিনায়কের আর্মব্যান্ড, বায়ার্নকে জেতায় বুন্দেশলিগা। ইউরোপিয়ান কাপে হ্যাটট্রিকের পাশাপাশি লিগজয়ের হ্যাটট্রিকও উপহার দেয় ক্লাবকে। সেন্টার ফরোয়ার্ড ফ্রিৎজ ওয়াল্টার ছিলেন ফ্রাঞ্জের আদর্শ। মাঝমাঠ ছিল তাঁর স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্র, কিন্তু তিনি জায়গা বদলে হয়ে উঠলেন লিবেরো বা সুইপার। পরিবর্তন, পরিবর্তন, আর পরিবর্তন – কখনো ক্লাব, কখনো ক্লাবের ইতিহাস, কখনো নিজের খেলার জায়গা। এর পায়ে পায়ে মিশে আছে দলের স্বার্থে সর্বস্ব পণ করার মনোভাব।

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল দেখেছিল এরকমই এক ফ্রাঞ্জকে। ইতালির বিরুদ্ধে খেলা মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেক স্টেডিয়ামে। সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। এই মাঠে বারবার অতিমানব হয়ে উঠেছেন খেলোয়াড়রা। ১৯৮৬ সালের যখন মেক্সিকো দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়, এই অ্যাজটেকেই ঘটেছিল দিয়েগো মারাদোনার ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’, ন্যক্কারজনক ‘দ্য হ্যান্ড অফ গড’ গোলও। ওই মাঠে অতিমানব হয়ে ওঠার ধারা শুরু করেছিলেন কিন্তু বেকেনবাওয়ারই। সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকে, পশ্চিম জার্মানি তখনো এক গোলে পিছিয়ে, বল নিয়ে এগোবার সময়ে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের একটু বাইরে ইতালির পিয়েরলুইগি শেরার কড়া ফাউলে বেকেনবাওয়ার ছিটকে পড়েন বক্সের ভিতর, যন্ত্রণার চোটে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন ঘাসেই। পরে দেখা যায়, ভেঙে গিয়েছে কলার বোন। এদিকে ততক্ষণে দলের খেলোয়াড় বদল করার আর উপায় নেই। বেকেনবাওয়ার মাঠ ছাড়লেন না। ডান হাত স্লিংয়ে ঝুলিয়েই বাকি ম্যাচ খেললেন। ইন্টারনেটে এই দৃশ্য সহজেই দেখা যায়। সেই ম্যাচ ১২০ মিনিট চলেছিল। ফলাফল ইতালির পক্ষে ৪-৩। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় ওই ম্যাচকে পরে অনেকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ম্যাচ অফ দ্য সেঞ্চুরি’। আর হেরে গিয়েও শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম ম্যাচের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে আছেন বেকেনবাওয়ার।

১৯৬৬ বিশ্বকাপে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসাবে সবচেয়ে বেশি গোল করেছিলেন (৪ গোল) তিনিই। তারপরেও শেষ ধাপ পার হতে ব্যর্থ হয় দল। ১৯৭০ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হয়। সুদে আসলে পুষিয়ে নিলেন ১৯৭৪ বিশ্বকাপে। এই বিশ্বকাপের একটা ম্যাচের কথাও এখানে না বললেই নয়। সেটা ফাইনাল নয়, গ্রুপ পর্বের ম্যাচ এবং সে ম্যাচেও জার্মানি পরাজিত হয়।

একই গ্রুপে ছিল আয়োজক পশ্চিম জার্মানি আর পূর্ব জার্মানি। সেই গ্রুপে ছিল চিলিও। চিলিতে ১৯৭৩ সালে ঘটেছিল মার্কিন মদতপুষ্ট সেনা অভ্যুত্থান, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সোশাল ডেমোক্র্যাট সালভাদোর আয়েন্দের সরকারকে। আয়েন্দে সরকারের সমর্থক সোভিয়েত ইউনিয়ন সান্তিয়াগোর ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে যোগ্যতার্জন পর্বের ম্যাচ খেলতে অস্বীকার করে, কারণ জেনারেল অগাস্তো পিনোশের নেতৃত্বে হত্যালীলা চলেছিল ওই স্টেডিয়ামেই। স্টেডিয়াম বদলানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন দল নামায়নি। মস্কোতে প্রথম লেগের খেলা ছিল গোলশূন্য। দ্বিতীয় লেগে সোভিয়েত ইউনিয়ন খেলতে না আসায় চিলিকে দুই লেগ মিলিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফলে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানি, মার্কিন মদতপুষ্ট পশ্চিম জার্মানি আর চিলির বিরুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করতে ছিল মরিয়া।

প্রথম ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি চিলিকে ১-০ হারায়, গোল করেন পল ব্রেইটনার। পূর্ব জার্মানির সঙ্গে চিলির ম্যাচ ড্র হয় (১-১)। গ্রুপের শেষ ম্যাচে, ২২ জুন ১৯৭৪, হ্যামবার্গের ভোক্স পার্ক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় দুই জার্মানি। দুই প্রতিবেশীই ততদিনে দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছে গিয়েছে, ওই ম্যাচ থেকে ঠিক হবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন কারা। এ ধরনের ম্যাচকে সাধারণত বাংলা সংবাদমাধ্যমে নিয়মরক্ষার ম্যাচ আর ইংরিজিতে ‘ডেড রাবার’ বলা হয়। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়মরক্ষা সম্মানরক্ষার সমার্থক হয়ে ওঠে।

ভোক্স পার্কের ৬২,০০০ দর্শকের মধ্যে বড়জোর হাজার দেড়েক পূর্ব জার্মান সমর্থক ছিলেন। দুই প্রতিবেশীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈরিতার কাহিনি তখন লোকের মুখে মুখে ঘোরে। ঠান্ডা যুদ্ধের শুরু থেকেই পশ্চিমি দুনিয়া সুনিপুণভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে কমিউনিস্ট ভীতি। কমিউনিস্ট শাসনে মানুষ কতখানি অত্যাচারিত তা ফলাও করে বলা হয়। চিলির বিরুদ্ধে পশ্চিম জার্মানির গোলদাতা ব্রেইটনার মাও সে তুংয়ের লিটল রেড বুক নিয়ে অনুশীলনে যান। তাই সমর্থকরা তাঁকে কমিউনিস্ট বলে আওয়াজ দেয়। দুই জার্মানির ম্যাচের আগে বলে দেওয়া হয়েছিল, কোনো সৌজন্যমূলক জার্সি-বদল চলবে না। জার্মানির নতুন আইকন, অধিনায়ক ‘দের কাইজার’ তা মেনে চলবেন এটাই প্রত্যাশিত। বাভারিয়ার রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান সোশাল পার্টি কিংবা দক্ষিণপন্থী ট্যাবলয়েড বিল্ড জেইতুং-য়ের সঙ্গে তাঁর সখ্যের কথা সকলেই জানে।

পশ্চিম জার্মানিই জিতবে, এ ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত ছিল জার্মান সংবাদমাধ্যম। যদিও খেলায় দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য। ধারে ভারে এগিয়ে থাকা পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়ে গেল পূর্ব। অবশেষে ৭৮ মিনিটের মাথায় ঘটে গেল অকল্পনীয় অঘটন। পশ্চিম জার্মানির গোলের দিকে এগিয়ে আসা মিডফিল্ডার এরিক হামানকে বেকেনবাওয়ার ট্যাকল করতে চেয়েছিলেন। তিনি ব্যর্থ হন, এরিক বলটা ভাসিয়ে দেন সুযোগসন্ধানী জুরগেন স্পারওয়্যাসারের দিকে। অসাধারণ দক্ষতায় বলটাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন স্পারওয়্যাসার, ছন্নছাড়া ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে একরকম বিনা বাধায় ঢুকে পড়েন বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। তিন ডিফেন্ডারকে নাস্তানাবুদ করে, বসে পড়ে এগিয়ে আসা গোলরক্ষক শেপ মায়ারের মাথার উপর দিয়ে জোরালো, নিখুঁত শট মারেন, গোলের উপরের জালে জড়িয়ে যায় বল।

আরো পড়ুন পেলে: যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই

রাতারাতি পূর্ব জার্মানির জাতীয় নায়ক হয়ে যান স্পারওয়্যাসার। নিষেধ সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে লুকিয়ে জার্সি বদল করেছিলেন মার্কসবাদী বলে নিজের দেশে কুখ্যাত ব্রেইটনার, যা জানা যায় অনেক পরে। ১৯৬৩ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির হত্যার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপে চালু হয়েছিল এক জনপ্রিয় প্রশ্ন “Where were you when Kennedy was shot?” ১৯৭৪ সালের ২২ জুনের পর পূর্ব জার্মানিতেও নাকি শুরু হয়ে যায় অনুরূপ অভ্যাস “Where were you when Sparwasser scored?” জুরগেন স্বয়ং পরে বলেছিলেন “আমার সমাধিক্ষেত্রে যদি শুধুই ‘হ্যামবার্গ ৭৪’ লেখা থাকে, সেক্ষেত্রেও লোকে সহজেই বুঝে যাবে, সমাধিটা কার।”

পরাজিত শিবিরের দৃশ্যটা ঠিক কেমন ছিল? কোচ হেলমুট শ্যেন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। কোচ তথা গোটা দলকে চাঙ্গা করতে এগিয়ে এলেন কাইজার স্বয়ং। গ্রুপে রানার্স হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে অপেক্ষাকৃত সহজ গ্রুপেই পড়েন তাঁরা। পোল্যান্ড, সুইডেন, যুগোশ্লাভিয়াকে সহজেই হারিয়ে সরাসরি ফাইনালে উঠে যায় পশ্চিম জার্মানি (সেবারের টুর্নামেন্টে কোনো সেমিফাইনাল ছিল না)। ওদিকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পূর্ব জার্মানির সামনে পড়ল বিশ্বকাপ জুড়ে যুগান্তকারী ফুটবল খেলা নেদারল্যান্ডস। পরে পশ্চিম জার্মানির অধিনায়ক বলেছিলেন “স্পারওয়্যাসারের গোলটা আমাদের চাগিয়ে দিয়েছিল। ওটা না হলে আমরা বিশ্বজয়ী হতে পারতাম না।” স্পারওয়্যাসারের গোল, নাকি আগের দুই বিশ্বকাপের অপ্রাপ্তি – বিশ্বজয়ে কার ভূমিকা বেশি ছিল, সে তর্ক চলতেই থাকবে। তবে বেকেনবাওয়ারের কীর্তি তো সেখানেই শেষ নয়। ব্রাজিলের মারিও জাগালোর (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) পর ১৯৯০ সালে তিনিই প্রথম খেলোয়াড় এবং কোচ – দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতার কৃতিত্ব অর্জন করেন। পরে সেই রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেন ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশঁও (১৯৯৮, ২০১৮)।

সেই কাইজার চলে গেলেন ডিমেনশিয়ায় ভুগে চলে গেলেন ৭৮ বছর বয়সে। তাঁর সঙ্গে রসিকতা করা অ্যান্ডি শারমিন সুরিনামে খেলতে যাওয়ার পথে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৯৮৯ সালেই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.