বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাইদের আজ বড় মুশকিল। কোনো উপপাদ্যেরই আর সমাধান হয় না, সবকিছু কেমন গোলমেলে হয়ে গেল। সিনেমাকে আজ আর বাঙালি সিনেফিল কীভাবে বুঝবে? ধরা যাক অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট-এর মত ছবি কীভাবে নেব? ছবিটা বাঙালির তৈরি নয়। অতএব বাঙালির আর কী দেওয়ার থাকতে পারে, দলবদ্ধ ঈর্ষাপ্রসূত নিন্দা ছাড়া? বাঙালি বুঝতেই পারল না যে ছবিটা ভাল হোক আর মন্দ হোক, অন্তত একজন অবাঙালি যুবতী ঋত্বিক ঘটককে চূড়ান্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, ঋণ স্বীকার করেছেন, চেপে যাননি বেমালুম। ঋত্বিকের শতবর্ষ এসে গেল, বাঙালি বাবুরা তো আজও ঠিক করতে পারছেন না ঋত্বিককে ভাল বলবেন না খারাপ বলবেন। কোনো ম্যানুয়াল তো হাতে নেই! এদিকে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন অবাঙালির ছবি ঋত্বিককে এতখানি দাম দিল! ব্যাপারটা আমাদের গায়ে ছ্যাঁকা লাগাবেই। ঋত্বিকের ছবি খোদ কলকাতার বুকে নাকতলায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল। তাতে আমরা ঠিক বুঝেই উঠতে পারছি না কী করব। যে ঋত্বিক কেবল উদ্বাস্তুদের জন্যই নাকি জীবনপাত করেছেন, তাঁদের ঘাঁটি এলাকাতেই তিনি এমন প্রতিদান পেলেন। আমাদের কিন্তু কোনো হেলদোল নেই।
কলকাতায় উইম ওয়েন্ডার্সের মত পরিচালক এলেন, ঘুরলেন, বেশ কয়েকদিন থাকলেন। সচরাচর এমন ঘটে না। অথচ আপনি কি শুনেছেন যে কোনো নামকরা বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন, সিনেমা নিয়ে কথা বলেছেন? ফিল্ম সোসাইটির বোদ্ধারা কী করছিলেন? প্রবীণ ওয়েন্ডার্স কিন্তু প্রবল পরিশ্রম করে মাস্টারক্লাস নিলেন, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলেন। এতগুলো দিন কি বাঙালি পরিচালকরা সকলেই কলকাতার বাইরে ছিলেন? আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বোধগম্য হয়নি। যখন কোনো বলিউডি ছবি কৌশলে বা বুক ফুলিয়ে আমাদের ইতিহাসের ভুল পাঠ দিতে চায়, তখন আমরা মিনমিন করে হোয়াটস্যাপে আর ফেসবুকে কিছু কথা বলি। সেকথা জনতার তোড়ে স্বভাবতই ভেসে যায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আসলে এখন দক্ষিণপন্থা, বামপন্থা – এসব শব্দের কোনো মানে আর পশ্চিমবাংলায় অন্তত নেই। তার কারণ মতাদর্শগত সংগ্রামে রামমোহন রায় থেকে সত্যজিৎ রায়, কেশবচন্দ্র সেন থেকে মৃণাল সেন – সকলেই পরাস্ত হয়েছেন। এখন শুধু ফ্যাসিবাদ যে মাঠে খেলতে বলবে সে মাঠেই খেলতে হবে। সে মাঠের দুটো প্রান্ত – এক পক্ষ পূর্ব প্রান্তে থাকবে, অন্য পক্ষ পশ্চিম প্রান্তে। হাফটাইমের পর তারা দিক বদল করবে। ব্যাপারটা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কেউ বলেন তিনি দিনে তিনবার পুজো করেন; কেউ আবার বলেন তাঁরা হিন্দু, হিন্দুস্তানে জন্মেছেন, গঙ্গার জল তাঁদের মৌল পানীয় ইত্যাদি। আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি, ভোটাররা কি তাঁদের সংসদ বা বিধানসভা ভবনে ধর্মমহাসভা করতে পাঠিয়েছেন? এই জাতীয় বিতর্ক আবার খবরের কাগজ থেকে আরম্ভ করে সকলে মেনেও নিচ্ছে। লেনিন কিন্তু খুব একটা বাড়াবাড়ি করেননি যখন তাঁর মনে হয়েছিল পার্লামেন্ট আসলে শুয়োরের খোঁয়াড়। আজ আর সংবিধানের প্রথম পাতার কোনো দাম নেই। এ এক ধর্মযুদ্ধ চলছে আর ধর্মের বকলমে দন কিহোতে আর শাংকো পাঞ্জারা নিজস্ব মশকরা চালিয়ে যাচ্ছে। এই দেশে আমরা জন্মেছিলাম? আমরা কি কখনো ভেবেছিলাম যে রাজনৈতিক লড়াইয়ের বিষয় হবে কে দীঘায় জগন্নাথের মন্দির গড়ে দিতে পারে আর কে অযোধ্যায় রামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে? আজ প্রমাণিত হয়ে গেছে যে তর্কের একমাত্র বিষয় হল ধর্ম। একটা জাতির জীবনে অনশন নেই, ক্ষুধা নেই, লাঞ্ছনা নেই, বাসস্থানের অভাব নেই। আছে কেবল ওষুধের অভাব। আছে কেবল ধর্মযুদ্ধ। এই বাঙালিকে চিনতে পারি না। এই জাতি অন্তত পঞ্চাশ বছর আগেও কিঞ্চিৎ ভাবনাচিন্তা করত। আজ দেখা যাচ্ছে মাথা ঘামানোর জগৎ থেকে তারা বহুদূরে। তারা এমন খেলায় নেমেছে যার নিয়ম ঠিক করে দিচ্ছে অন্য লোক আর বাঙালি মহানন্দে খেলছে।
কেউ কেউ হয়ত বলবেন, খেলার নিয়ম যে অন্য লোক ঠিক করে দিচ্ছে তা তো একদা ফরাসিরাও বুঝতে পারেনি। অন্তত এই নামের একটি ছবি – ল্য রেগলে দ্য জু (১৯৩৯) – জঁ রেনোয়া করেছিলেন এবং সেই ছবি দেখতে গিয়ে লোকে দিব্যি হেসেছিল। তার কারণ তাতে বড়লোকের ব্যভিচার দেখানো হয়েছে। ১৯৪৫ সালের পর তারা বুঝতে পারে আসলে ওই ছবিতে কী দেখানো ছিল। আমাদের সে গৌরবও নেই। আমাদের এখন এমন কোনো নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, কবিকুল নেই যাঁরা জনগণের দিকে অন্তত কোনো দৈববাণী ছুড়ে দিতে পারেন। একটা মায়ানগর (২০২১) বা মায়ার জঞ্জাল (২০২০) এই অভিসম্পাত কাটাতে পারবে কি?
সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখি, আজকাল হঠাৎ আমাদের অনুবাদে উৎসাহ বেড়েছে। আমি বলতে চাইছি না অনুবাদ খারাপ অথবা অনুবাদ ছিল না। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বুদ্ধদেব বসু বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের সম্পদ। শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায় দান্তের অনুবাদে বিশ বছর নিয়েছিলেন। কিন্তু তাহলেও বাঙালির অনুবাদে তেমন রুচি ছিল না। না ইংরিজি থেকে বাংলায়, না বাংলা থেকে অন্য ভাষায়। সে হঠাৎ অনুবাদে পারঙ্গম হয়ে উঠেছে। এমন জাদুবলে অনুবাদক প্রসব করা যে গুগল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেবা সদনে তা অনুমান করতে বুদ্ধির দরকার হয় না। অলৌকিক ক্ষমতায় সাংসদ বা সাংবাদিক প্রসব করা একুশ শতকের এত বিরাট অবদান যা আমাকে বিহ্বল ও উদ্বেল করে তোলে। মাঝখান থেকে বেচারি জীবনানন্দকে সকলেই উদ্ধৃত করছে। এদিকে ‘ঘরের ভিতর কেউ খোঁয়ারি ভাঙছে বলে কপাটের জং/নিরস্ত হয় না তার নিজের ক্ষয়ের ব্যবসায়ে,/আগাগোড়া গৃহকেই চৌচির করেছে বরং…’। এই যে আমাদের ঘর ভেঙে গেল, পথে বসলাম, সত্যিই যে আমাদের কোনো শিকড় নেই – তা যে এত নির্মমভাবে একুশ শতকের মাত্র ২৫ বছরের মধ্যেই অনুভব করতে হবে তা ভাবিনি। একশো বছর আগে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা গেছেন। মাত্র একশো বছর আগে! এর মধ্যেই বাঙালির লীলা সাঙ্গ হতে চলেছে। বিধানসভা থেকে ফুটবল মাঠ – এখন ঝলমল করে চিত্ত।
আগে তবু ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ছিল। সেখানে বাঙালি ছেলেরা খেলত বা খেলার চেষ্টা করত। এমনকি অবাঙালি মহম্মদ হাবিব বা তুলসীদাস বলরামকেও জ্যোতিষ গুহ বা ধীরেন দে-র মত বাঙালি কর্মকর্তারা পরখ করে তুলে আনতেন। এখন কিছুই করতে হয় না। এখন কেবল কর্পোরেট কালোয়াতি। তারা বাঁশি বাজায়, আমরা টিভিতে দেখি। একটা আস্ত জাতি উঠে দাঁড়াতে ভুলে গেল। তারা সকাল, দুপুর, সন্ধে, রাতে সোফায় বসে ওটিটি সিরিজ দেখে। উঠে দাঁড়ানো বলতে মাঝে মাঝে বইমেলায় যাওয়া। বইমেলা থেকে এত বই বাঙালি কী করে কেনে তাও আমার কাছে বিস্ময়কর। কারণ থাকা তো ৮৫০-১২৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে। সেখানে এত বই আঁটে কী করে? পড়ে কখন? এদিকে বাঙালি নিজেদের মধ্যে হোয়াটস্যাপ করে ইংরিজিতে। এমনটা কার স্বার্থে? এর কিছুই আমি বুঝে উঠতে পারছি না। ক্রমশই হতবুদ্ধি হয়ে যাচ্ছি এবং বুঝতে পারছি নির্বুদ্ধিতার ক্রমাগত স্তন্যপান করতে করতে নির্বোধ হয়ে যাওয়াই আমারও নিশ্চিত বিধিলিপি।
বাঙালি একসময় কবিতা লিখত, এখন কেবল ছড়ায় অন্ত্যমিল দেয়। একসময় গল্প লিখত, এখন পাশের বাড়ির কূটকচালি অথবা মদ্যপান নিয়ে নিবন্ধ লেখে। প্রত্যেকেই ফেসবুকে নানাবিধ বাণী বিতরণ করে। প্রত্যেক বিখ্যাত মানুষের জন্মদিনে ও মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধা নিবেদনের অছিলায় সন্দর্ভ বিতরণ চলে, ভাবার সময় থাকে না। সম্প্রতি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হল। তিনি যে গুণী গায়ক তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আলোচনা করার সময়ে প্রাক্তন নকশালপন্থীরা বুঝতেই পারছেন না যে তাঁর মৃত্যুতে তিনি যতটা রাষ্ট্রীয় সম্মান পেলেন ততটা যে আজীবন সহযোদ্ধাদের অভিবাদন পেলেন না তা অনিবার্য ছিল। কারণ কলকাতায় বারবার অভিনীত মেফিস্টো নাটকের মেফিস্টো তো প্রতুল মুখোপাধ্যায় নিজেই। তিনি অত্যুত্তম গায়ক শুধু নয়, তাঁর গানের অমরত্বও প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যে শিল্পীরা বা বিজ্ঞানীরা ফ্যাসিবাদীদের সমর্থন করেছিলেন তাঁরাও তো সকলে প্রতিভাহীন ছিলেন না। সেখানে মার্টিন হাইডেগার বা এজরা পাউন্ড ছিলেন। আসলে প্রতুলবাবুর পরিণতি প্রমাণ করে যে আমরা – সক্ষম বা অক্ষম – সকলেই এক অন্ধকার টানেলে প্রবেশ করেছি এবং সেখানে জড়বুদ্ধি জীবনযাপনই আমাদের নিয়তি। আমাদের মধ্যে আর কেউ নেই যে বলবে ‘জীবন এত ছোট কেনে’?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








