দিগন্ত ছোঁয়া পরমান্নশালী ধানের ক্ষেত। ভাগীরথীর পাড়ের ফলন্ত আমবাগান। এক কানায় কানায় ভরা, সুখ-সমৃদ্ধি-সম্পন্নতার ছবি। অথচ নদীর সঙ্গে বসত করে যে জনা, সে জানে, কখনো কখনো নদী হয় ভয়াল, সংহাররূপা। এক পথ ধরে যেতে যেতে যেন সামান্য পাশ ফিরে শুতে চায়। নদীর পাড়ে তলে তলে ভাঙন ধরে, তারপর একদিন আচমকা ঝুপ করে তলিয়ে যায় বিশাল ভূখণ্ড। করালবদনী নদী গিলে নেয় গৃহস্থের স্বাচ্ছল্যের শেষ খড়কুটো। অনিবার্য ধ্বংসই ভবিতব্য।

সেই ভয়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বাঁচেন চতুষ্কোনার বলাই মন্ডল। একাধারে তিনি কৃষক, কবি, প্রকৃতিপ্রেমী স্বল্পতুষ্ট মানুষ। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-ভাই-ভাইবউ নিয়ে তাঁর ভরা সংসার। তিনি কিন্তু জানেন, একা নদীই ভাঙে না, ভাঙে মানুষও। সংস্কার, বিশ্বাস, বোধের অভিযোজন ঘটে। সে ভাঙনের পূর্বাভাস পাওয়া যায় না সবসময়। তবু সে রচিত হতে থাকে মানুষকে ঘিরে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

“প্রবাহপথের রূপ অনুসারে নদী তিনভাগে চিহ্নিত। সরল। সর্পিল। বেণীবদ্ধ। তবে, নদীবিজ্ঞানীরা বলেন কোনও নদীই সমগ্র প্রবাহপথ জুড়ে সরল হতে পারে না। এমনকী আপাতরূপে সে সরল হলেও তার ভেতরের জলধারা প্রবাহিত হয় এঁকেবেঁকে। এবং এ-ও যেন এক মানবিক উপসংহার। শৈশব ও কৈশোরের সারল্য যেমন বাঁকা, সর্পিল অথবা জটিল আকার নেয় প্রাজ্ঞ ও পরিণত জীবনের অভিঘাতে।” নদীর জীবন আর মানুষের জীবন যেন সমান্তরালে বয়ে যায়।

তবু ভাঙনই কি শেষ কথা হয়? এক পাড় ভাঙে যখন তখন অন্য পাড় গড়ে। নতুন জমিতে নতুন আশায় মানুষ নতুন করে জীবন বাঁধে। নদীর সঙ্গে সমান্তরালে বয়ে চলে জীবন। এই ভাঙাগড়ার অনন্ত বহমানতার এক টুকরো ছবি ধরে রেখেছেন তিলোত্তমা মজুমদার, তাঁর রাজপাট উপন্যাসে। এক বহুমাত্রিক, প্রশস্ত ক্যানভাসে একটু একটু করে মমতা-ভালবাসা-স্নেহ-ঈর্ষা-ক্ষমতালিপ্সা-স্বার্থপরতার রং মিশিয়ে তৈরি করেছেন অজস্র চরিত্রে ভরা এক নিখুঁত ঘটমান জীবনের ছবি। পুরাণ, ইতিহাস, লোকসংস্কৃতির বিশদ অনায়াস বুনোটে অসামান্য এক পটভূমিকাও তৈরি হয়। এই কাহিনীর নায়ক প্রকৃত অর্থে মানবজীবন।

স্থান ব্যাঘ্রতটি। আজকের নাম বাগড়ি, ভাগীরথীর পূর্ব পাড়। এ জায়গা রাঢ়ের গা ঘেঁষা, তবু চরিত্রে আলাদা। সেখানে ভৈরবের পাড়ে তেকোনা গ্রাম, ভাগীরথীর পাড়ে চতুষ্কোনা গ্রাম আর ভাগীরথীর মধ্যের পেতনির চর। পেতনির চরের হারাধন, রেজাউলের সঙ্গে বহরমপুরের সিদ্ধার্থ আর তেকোনার চাটুজ্যেদের নাতি মোহনলালের বন্ধুত্ব কলেজজীবনে। সেই সুতো ধরেই তারা চারজন আসে তেকোনা গ্রামে।

বাগড়িতে হিন্দু-মুসলমান, বাউল-বৈষ্ণবের পাশাপাশি মিলেমিশে বাস। সেখানে সম্পন্ন গৃহস্থের পাশাপাশি থাকে নিতান্ত হতদরিদ্র মানুষ, দুবেলা ভাতের জীবন আজও যাদের অধরা। দারিদ্র্যের ফাঁকফোকর দিয়ে অন্ধকার ঢোকে, হাত বাড়ায় সবচেয়ে সহজলভ্য পণ্যটির দিকে, নারীশরীরের মালিকানা বদল হয়। সিদ্ধার্থ এই ঘটনা জানতে পারে ময়না বৈষ্ণবীর থেকে। সে ময়নার মুখের কথা হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করে। ময়না অবশ্য একা সিদ্ধার্থকেই জানায়নি, গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেয় এই দুঃসংবাদ। মানুষকে সচেতন করতে চায়। বিনিময়ে তার কপালে জোটে অপমান, অসীম লাঞ্ছনার শেষে মৃত্যু। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণবিবেকের বিস্ফোরণ ঘটে, যার শেষ হয় রাষ্ট্রশক্তির হাতে একাধিক মৃত্যুতে।

১৯৬৩ সালের জাতক সিদ্ধার্থ জেলা শহর বহরমপুরের উদীয়মান যুব নেতা। বিশ্বাসের দিক দিয়ে সে বামপন্থী, কিন্তু এলাকার প্রাচীন কংগ্রেসি নেতার ভাবনার সঙ্গে নিজের ভাবনার মিল পায় সে। সিদ্ধার্থ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলায় বিশ্বাসী। সে একদিকে ভাল সংগঠক হয়ে উঠতে চায়, অন্যদিকে নেতা হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাও তীব্র। সেইসঙ্গে দেশ সম্পর্কে সে খুবই আবেগপ্রবণ। আবেগবর্জিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার পথ তার নয়। তার বিশ্বাস, প্রগতিশীল জনকল্যাণের ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি, সেই রাজনীতি আবেগহীন হতে পারে না।

সিদ্ধার্থ কিন্তু প্রচলিত অর্থে সাদা চরিত্র নয়। সে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে জানে। এও জানে, রাজনীতি সবসময় অসৎ শক্তিকে এড়িয়ে চলতে পারে না। তাই তার বিশ্বাস, সৎ-অসৎ সামঞ্জস্য বিধান করাই নেতৃত্বের কাজ। তবু দলের স্থানীয় কর্তাদের অন্যতম মিহির রক্ষিতকে তার অন্যায় কাজকর্মের জন্যে সে সহ্য করতে পারে না। অথচ বিভিন্ন সমীকরণের জেরে তার মনের কথা মনেই থেকে যায়, প্রকাশের স্বাধীনতা পায় না। তার ভাবনা অবশ্য চালু থাকে – “সাধারণ মানুষকে লাঞ্ছিত করার মতো দল যারা গড়ে তোলে, প্রকৃত সমাজবিরোধী কি তারাই নয়?”

বহুমাত্রিক এই উপন্যাসের অজস্র তল রয়েছে। তেকোনা গ্রামে লোকায়ত জীবন-বিশ্বাসের গান গায় তেকোনার দুলু ক্ষ্যাপা। অন্যদিকে মোহনলাল তেকোনা গ্রামের জমিতে ছড়ায় ক্ষমতা দখলের নামে লোভ আর স্বার্থপরতার বীজ। চতুষ্কোনার নদীর পাড়ের ভাঙন ছায়া ফেলে এলাকার জোতদার সুকুমার পোদ্দারের ছেলে অনির্বাণ আর সহদেব দাসের মেয়ে তুলতুলির জীবনেও। শিখারানী আর অলকের জীবনেও ভাঙন আসে। পেতনির চরের হারাধন এক বিচিত্র সম্পর্কের জালে জড়িয়ে পড়ে নিজেরই বিনাশ ডেকে আনে। সেইসঙ্গে গ্রামীণ প্রান্তিকতার রাজনীতির স্বার্থপর, ক্ষমতা দখলের বিচিত্র কুটিল আবর্তের সঙ্গে শহরের রাজনীতির পেশিশক্তির দর্পিত ধারার মিশেলে এক নিখাদ ছবি তুলে ধরেন তিলোত্তমা। অজস্র ধারায়, উপধারায় ভিন্ন ভিন্ন আখ্যানকে ঘিরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলে কাহিনি। বিচিত্র জীবন আর বিচিত্রতর ঘটনাক্রম উপন্যাসটিকে পুনর্পাঠেও ক্লান্তিহীন রাখে।

আরো পড়ুন সুখেন মুর্মুর চদরবদর: অচেনার আনন্দ, অজানার সংকট

তবু ২০২৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই উপন্যাসটি হাতে ধরে এক বিভ্রম জাগে। ২০০৬ সালের এই বই কি আদতে এক ছুটকো নেতার গণনায়ক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার বিবরণী নয়? সিদ্ধার্থ বিশ্বাস করে, “মানুষই মানুষের শক্তি। কল্যাণবিধানই মানুষকে জয় করার পথ। প্রেম-প্রেম, ভালবাসা। মানুষের প্রতি মানুষের। সহমর্মিতা।” তার দল চেয়েছিল নির্বাচনী ইস্যু হিসাবে ভাঙন প্রতিরোধের জন্য আন্দোলন করতে। “হিতের অছিলায় ক্ষমতার আগ্রহ” হিসাবে। সিদ্ধার্থ এই ভাবনার সঙ্গে একমত নয়। সে বুঝতে পেরেছে, এই এলাকার মানুষের কাছে নদীর ভাঙন এক অস্তিত্বের সংকট। সে চায় সমস্যার সত্যিকারের সমাধান। যান্ত্রিক লোকদেখানো সমাবেশ মারফত প্রতিপক্ষকে শক্তি প্রদর্শন নয়, দলমতনির্বিশেষে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সাড়াই তার কাম্য। নিছক নির্বাচনী ইস্যু হিসাবেই একে রেখে দিতে সিদ্ধার্থের মন সায় দেয় না। নিজের মনের অন্দরে পথ খুঁজে বেড়ায় সে।

ঘটনার পারম্পর্যে সিদ্ধার্থকে একসময় অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয়। সে ভাবে, “উদ্যত অস্ত্রের মুখ নমিত করতে গেলে অস্ত্রই কি একমাত্র পথ নয়? অপশক্তি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে কল্যাণকে হতে হবে আরও বেশি ক্ষমতাবান। ক্ষমতাকে ক্ষমতা দিয়েই পরাজিত করা সম্ভব।” বিবিধ দ্বন্দ্বে দীর্ণ হতে থাকে সে। এই আত্মমন্থন পর্বেই শুদ্ধচিত্ত প্রতিবাদী ময়না বৈষ্ণবীর আশ্চর্য প্রেমময় চরিত্রটি তার কাছে একটা প্রতীক হয়ে ওঠে – ব্যক্তির অরাজনৈতিক শুদ্ধতার প্রতীক। যা সে হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু হয়ে উঠতে পারবে কি কোনদিন? “রাজনীতি যার ধর্ম সে সম্পূর্ণ শুদ্ধ থাকে কী করে?” ব্যক্তির ঊর্ধ্বে সমষ্টিকেই জীবনের সারাৎসার বলে চিনতে শিখেছে সে, অথচ সেই গোষ্ঠীর সীমার বাইরে তার নিজের কী এমন পরিচয়?

এই দ্বন্দ্বের সমাধান সিদ্ধার্থ নিজের নীতিবোধে বিশ্বাসের মাধ্যমে করে। দলের পথ ত্যাগ না করলেও দলত্যাগ করে সে। অথচ অন্য দলেও নাম লেখায় না। তাঁর দাদু তাঁকে শেখান, মানুষ তোমার উপর আস্থা রাখবে কেন, যদি তোমার শক্তি না থাকে? নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য, নিজের রক্ষার জন্য আক্রমণাত্মক হও। সিদ্ধার্থ শুনতে থাকে দাদুর গলার স্বর। “নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করো।… ধর্মের দ্বারা, বাণিজ্যের দ্বারা, রাজনীতির দ্বারা।” সাম্রাজ্য? শক্তি? তাহলে কি ক্ষমতার আধিপত্যকামী সাধারণ রূপটিই প্রধান হবে তার কাছে? নাকি অন্য কোনো প্রতিস্পর্ধী রূপ তার চোখে ধরা পড়বে? ভিন্নতর মডেলে, ভিন্ন ধাঁচের কাজের প্রয়োজনে শূন্য থেকে সংগঠন গড়ে তোলার দম কি তার থাকবে?

সিদ্ধার্থ জীবনের পথে এগিয়ে চলে, ভাঙন রোধে মুর্শিদাবাদ জুড়ে এক পদযাত্রার ব্যবস্থা করে। সেই মিছিলে বহু মানুষের ভিড় হয়, তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সিদ্ধার্থের পথে আসেন। তার স্বপ্ন সফল হয়। তারপরেও সে থেমে থাকে না। সক্রিয়তাই সজীবতার লক্ষণ। সিদ্ধার্থ হয়ে ওঠে সার্থক নায়ক। উপন্যাসও গড়িয়ে চলে তার অন্তিম পরিণতির দিকে। পাঠকের মনে শুধু থেকে যায় এক অনাগতের আকাঙ্ক্ষা। গণনায়কের উত্থান স্বপ্ন।

রাজপাট
লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার
প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স
প্রচ্ছদ: সুব্রত চৌধুরী
দাম: ১০০০/-

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.