অধুনাকালের বাংলা সাহিত্য ভাল নেই। প্রতিষ্ঠানের বজ্র আঁটুনির মধ্যে যেমন ঊষরতা, তার বাইরের পরিসর – যার সদর্প বিস্তার ছিল বিবিধ লিটল ম্যাগাজিনের আত্মপ্রচারবিমুখ নিবিষ্টতার আভিজাত্যে; তার জায়গায় এসেছে সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া উচ্চকিত আত্মপ্রচার। এই ধরনের অভিযোগ বহুআলোচিত। কিন্তু শত আঘাতের পরেও অগ্রসর সূর্যালোকের সন্ধান পাওয়া যায় না ওয়েব পেজের পর ওয়েব পেজে, পূজাসংখ্যার পর পূজাসংখ্যায়। ফেসবুক পেজে তবু নামে প্রি-বুকিং-এর সম্প্রপাত, বইমেলা মাতান বাউন্সার-ঘেরা সেলেব-সাহিত্যিক।
এমন নিদাঘবেলায় হাতে আসে সম্বিৎ চক্রবর্তীর গল্প সংকলন এই দেশ অচেনা আমার। দশটি গল্পের একটি বাদে বাকি সবগুলিই কোনো পত্রিকা বা ওয়েবজিনে পূর্বপ্রকাশিত। ‘পাঠক লেখক খুঁজে নেবেন’ – এই জাতীয় ধ্রুবপদ তামাদি হয়েছে বেশ কিছুদিন। অগত্যা লেখকের অজ্ঞাতবাস দীর্ঘতর হয়, পাঠকের হতাশাও। সম্বিৎ ও তাঁর গল্প তাই শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মহলে প্রায় অপরিচিত হয়ে থাকে। এখানে সম্বিতের একটা আপাত-সংকট নির্মিত হয়। তিনি এই শ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁর প্রশিক্ষণ, পেশা ও সামাজিক অবস্থানে। কাজেই তাঁর রচনায় এই শ্রেণির বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অথচ এই শ্রেণির যাপন, পছন্দ-অপছন্দ, পাঠাভ্যাস (বা তার অনুপস্থিতি) সম্বিৎ যেরকম লেখেন, তার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব রেখে চলেছে বহুদিন। অপরিচিতির বিষাদে অনেকেই গড্ডলিকা বেছে নেন। সম্বিৎ তা করেননি। এতে তাঁর সাহিত্য-সততা যেমন প্রকাশ পেল, গল্প সংকলনটি আদ্যোপান্ত পাঠের পর লেখকের গভীরতর আরেকটি ঋজুতা নজর টানে। মধ্যবিত্ত তাঁর গল্পে সবসময় থাকে। প্রধান বা পার্শ্বচরিত্র হিসাবে তো বটেই, গল্পগুলির মূল দ্বন্দ্ব ও সংকট নির্মাণে মধ্যবিত্তের ভাবনা, চর্চা, বোধ ও ক্ষয় নিয়ত সক্রিয়। কিন্তু তাকে কোনো পেলবতার আচ্ছাদন দিতে লেখক নারাজ। ফলে চলতি বিষাদগাথা ও প্রেমোল্লাস, ব্যালকনির রোদ ও উইন্ডস্ক্রিনের বৃষ্টিধারার মুহ্যমানতার বাইরে তিনি হিঁচড়ে টেনে আনেন মধ্যবিত্ত চেতনকে। সংকলনের প্রথম গল্প থেকেই তার সঙ্গে কঠোর পরিচয় ঘটে পাঠকের। কল্পবিজ্ঞানের পরিসর থেকে পাড়ার রাজনৈতিক গুন্ডার বল্গাহীন দাপাদাপি – সবেতেই লেখক জরিপ করেছেন মূল্যবোধের বিনষ্টি, সৎসাহসের পশ্চাদপসরণ, সাম্প্রদায়িকতার সামাজিকীকরণ ও দুর্নীতিজারিত লুম্পেন অর্থনীতির দাপট। এককথায়, যা কিছু অধুনা বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারায় লজ্জাজনকভাবে অনালোচিত, সভয়ে এড়িয়ে যাওয়া অথবা একান্তভভাবেই প্রমিত সভায় অস্বস্তিকর; তাকেই লেখক তাঁর বিষয় হিসাবে বেছেছেন। এই কালবেলায় উপেক্ষা ছাড়া সেভাবে তাই আম বাঙালির তাঁকে কিছু দেওয়ার থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক।
অপরিকল্পিত লকডাউনের পিছনে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা কীভাবে সমাজ ও পরিবারের সন্নিবদ্ধতাকে বিনষ্ট করার মাধ্যমে নিরালম্ব ব্যক্তিকে মুনাফাযন্ত্রের লাগসই এককে পরিণত করে, সংকলনের প্রথম গল্পই তার রক্তহিম সাক্ষ্য। একে একে সার দিয়ে আসে এই সময়ের অন্ধকারযাত্রার দলিল। ‘মূক’ গল্পে একটি অনাথ-আশ্রমিক আট বছরের ধর্ষিতার শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করতে করতে দায়িত্বশীল আধিকারিক অন্তরা যখন এই ভেবে আতঙ্কিত হয় যে বাড়িতে তার প্রায় সমবয়স্কা কন্যা বাবার সঙ্গে একা আছে – তখন অবক্ষয়ের সন্নিকটস্থতা আমাদের ত্রস্ত করে। একইভাবে আমাদের আশেপাশে ঘাপটি মেরে থাকা পচনের সঙ্গে নির্মম পরিচয় ঘটে ‘ছায়াযুদ্ধের ভাড়াটে সৈন্য’-র মত আখ্যানে। মেধাজীবী মধ্যবিত্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারে না যে একটি ক্যান্সার-আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী মুসলিম যুবক শুধু স্নেহের জন্য মা-মরা এক হিন্দু সন্তানের লেখাপড়ার মোড় ফেরানোর অসম্ভব লড়াই লড়ে যাচ্ছে। আপাত সুভদ্র অথচ হিংস্র ধর্মদ্বেষ আবডালে শিশুটির প্যান্ট খুলে চিনে নিতে চায় ধর্মান্তরণের চিহ্ন। আমাদের শৌখিন ধর্মনিরপেক্ষ ‘তুই মুসলিম না বাঙালি?’ আধোবুলির গালে পড়ে যথাযোগ্য সপাট।
বর্তমান কালখণ্ডের মূলধারার সাহিত্য-সংস্কৃতি তার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিপার্শ্বকে বেমালুম উপেক্ষা করে গেছে – ইতিহাস বোধহয় এই সময়ের বাংলা কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমার কঠোরতম সমালোচনা এইভাবেই রাখবে। কিছু উজ্জ্বল ব্যত্যয় যা মূল প্রতিপাদ্যকে প্রতিষ্ঠাই দেবে, তার মধ্যে এই সংকলন থেকে যাবে আশা করাই যায়। মার্জিন, প্রেক্ষিত বা প্রান্তিক চরিত্র হিসাবে নয়, দুর্নীতিজারিত লুম্পেন পুঁজির প্রত্যক্ষ অভিঘাত এবং সংলগ্ন বিনষ্টিকেই গল্পের প্লট করে তুলতে এখন দুঃসাহস লাগে। ‘এখানে সবকিছু স্বাভাবিক’ বা ‘কৃষ্ণচূড়া’- র মত গল্পে অনায়াসে সম্বিৎ দেখান মূল্যবোধ, মানবিক সম্পর্ক, পরিবেশ ও অস্তিত্বের ভিতরে কীভাবে চারিয়ে যাচ্ছে লুম্পেন পুঁজির অবক্ষয়ী ঘুণ। গাছকাটার প্রতিবাদে চরিত্রহননের কলঙ্ক ভোগ করা মাঝবয়স বা প্রোমোটারির টাকায় ধুয়ে যাওয়া বধূ নির্যাতন, সন্তান নিপীড়নের ক্ষমাহীন পাপ একুশ শতকের বাংলার দুর্মর গ্লানির গুহাচিত্র হয়ে থেকে যাবে আগামীর জন্য।
সম্বিতের আরও বিশেষ অর্জন রয়েছে। মধ্যবিত্ত বৃত্তের নিয়ত বিনষ্টির আখ্যান বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরার কাজটিকেই তিনি তাঁর সংকলনের হাতে দিয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়। কিন্তু তা করতে গিয়ে তিনি পরিবার, সন্ততি, ড্রয়িংরুম, প্রেম ও যৌনতার প্রস্থানবিন্দুগুলিকেই স্বতঃসিদ্ধ মনে করেন না। লেখক হিসাবে নিজেকে নিয়ত পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে নিয়ে যাওয়ার অধুনা দুষ্প্রাপ্য সাহস তিনি দেখিয়েছেন। ফলে ‘গোপী ও দীনবন্ধু’ গল্পে তিনি ভদ্রজনবৃত্তের বাইরের ‘প্রিক্যারিয়েট’ জনগোষ্ঠীর কাছে সফলভাবে পৌঁছন। বয়স্ক বারনারী ও ভাগচাষি থেকে দিনমজুর, দিনমজুর থেকে মালিশওয়ালা, আবার সেখান থেকে পুরুষ যৌনকর্মী হয়ে ওঠা চরিত্রদ্বয়ের হা-ক্লান্ত পরিচলনের নিয়ন্তা হয়ে থাকে নব্য উদার অর্থনীতির বাণিজ্যবায়ু। মেনে নেওয়া, মুখ বুজে মেনে নেওয়ার শান্তিকল্যাণের ছায়া দীর্ঘতর হয়। প্রান্তবাসী দীনবন্ধুর পরিবার যখন সাইক্লোনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, অন্ত্যজচেতনা রাষ্ট্রের কলার ধরে সামাজিক সুরক্ষার হিসাব চায় না।
এই পরীক্ষানিরীক্ষায় সম্বিৎ সফল হন, তার কারণ তিনি তথাকথিত ‘ডি-ক্লাসড’ হওয়ার ভড়ং করেন না। এই গল্পেও বিত্তবান শ্রেণি তার অবক্ষয় নিয়ে আসে। দীনবন্ধুর ক্লায়েন্ট হিসাবে মা ও মেয়ের সঙ্গে তার শরীরী অভিজ্ঞতার বর্ণনার অংশটুকু বেশ খানিকটা আরোপিত ও আড়ষ্টই মনে হয়। এটি গল্পকারের সীমাবদ্ধতা বলে ধরে নিয়েও বলা যায়, প্রিক্যারিয়েট গিগ মজুরদের সামাজিক স্থানাঙ্ক নির্মাণে ভদ্রজনদের কি হিংস্র অবদান আছে – তা এই আখ্যান খানিকটা স্পষ্ট করে।
সীমাবদ্ধতার জায়গা শুধু এটিই নয়। সংকলনের শিরোনামসূচক গল্পটি বাদ দিয়ে যে দুটি কল্পবিজ্ঞান-আশ্রয়ী অণুগল্প রয়েছে, তাদের বহুলাংশেই অ্যাজেন্ডাচালিত বলে মনে হতে পারে। (অবশ্য ব্লার্বে পাঠককে অ্যাক্টিভিস্ট হিসাবে পাওয়ার ঈপ্সা রাখে এই বই) ফলে ‘এই দেশ অচেনা আমার’ গল্পটির মোচড়গুলি ‘পিঁপড়ে’ বা ‘মিউজিয়াম’-এ পাওয়া যায় না। তাদের কথন চকিত, গতিময়, ধারালো; কিন্তু পূর্বনির্দিষ্ট, ফলে খানিক নিষ্প্রাণ।
সম্বিৎ অবশ্য একটি সুকঠিন জায়গায় চোখে পড়ার মত সফল। একজন পুরুষ লেখকের পক্ষে নারীচরিত্র চিত্রণে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সম্বিতের নারীরা তাঁর গল্পে অনারোপিত আন্তরিকতা নিয়ে আসেন প্রায় সবকটি ক্ষেত্রে, এবং সব ক্ষেত্রে সেই নারীরা একই সামাজিক পরিসর থেকে আসেন, এমন নয়ও। ‘ভার্চুয়াল’ গল্পের নিম্নবিত্ত বাড়ি-পালানো বৌ টুকু আর ‘ছায়াযুদ্ধের ভাড়াটে সৈন্যরা’ গল্পের মেখলার শুধু চরিত্র হিসাবে গড়ে ওঠা নয়, তাদের হাঁটাচলা, কথাবার্তা, বিপন্নতার সঙ্গে বোঝাপড়ার একাকিত্ব – সবই তাঁর লেখায় বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। কোথাও পুরুষ চোখের জরিপ বা ‘ম্যানস্প্লেনিং’-এর ফাঁদে পা দেয়নি লেখকের অভিমতনির্দেশক কোনো রচনাংশ। কৃত্রিম পেলবতা আবিষ্ট বা আবছায়াহীন সাদা-কালো নির্মিত যে নারী আজকাল বড় বেশি সামনে আসেন পুরস্কৃত সাহিত্যিকদের আখ্যানে, সম্বিৎ তাকে দিলেন রক্তমাংসের বিশ্বাসযোগ্যতা। ফলে তার ভালবাসা, হিংস্রতা, নিবেদন ও দ্রোহ পাঠককে একরকম নতুন করেই ভাবায় নারীর সামাজিক নির্মাণ, ব্যক্তিগত স্থানাঙ্ক ও সার্বিক বিপন্নতা নিয়ে।
ন্যারেটিভ নির্মাণে গল্পকার ঝরঝরে, প্রাঞ্জল। কাহিনীর মূল সুরটিকে তিনি এতটাই গুরুত্ব দেন যে ‘ভার্চুয়াল’-এর মত গল্পে কি ঘরে, কি বাইরের বর্ণনায়, দমবন্ধ ঊষর উত্তেজনার রাশ তিনি আলগা করেন না কোনোমতেই। পাঠকের কাছে এই ছিলাটানে অভ্যস্ত হওয়ার পরিণমন দাবি করে এই সংকলন। অন্যদিকে ‘কৃষ্ণগহ্বর’ গল্পটি পরিমিতভাবে চর্চায় থাকা পাঠককেও মহাশ্বেতা দেবীর ‘দ্রৌপদী’-র কথা মনে করাবে, যা খানিকটা হতাশার। অমন ঠাসবুনোট গল্পটির ক্লাইম্যাক্স মৌলিকত্ব দাবি করে। আবার এই সম্বিৎ চমকে দেন ‘এখানে সবকিছু স্বাভাবিক’ গল্পে ইন্টারটেক্সচুয়ালিটির ধীমান প্রয়োগে। টুকিমামির প্রান্তিক হতে হতে একরকম মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে অনায়াসে গল্পকার মিশিয়ে দেন উপেন্দ্রকিশোরের শিশুতোষ ‘অথৈজলের রাজপুরী’ গল্পে আখ্যান থেকে হঠাৎ মিলিয়ে যাওয়া রাজকন্যার কথা। রূপকথা ও গার্হস্থ্য হিংসার আপাত-বিপ্রতীপ পরিসরদ্বয়ের স্পর্শক হয়ে থাকে নারীর নীরবকরণ।
আপনপাঠ প্রকাশনা সংস্থার গ্রন্থনির্মাণ রুচিশীল।
কিছু বানান ভুল থেকে গেছে; আশা করাই যায় আগামী প্রকাশে যা সংশোধিত হবে। সুপ্রসন্ন কুণ্ডুর প্রচ্ছদ সংকলনের মর্মযন্ত্রণাকে রূপ দিয়েছে যথাযথভাবে। ব্লার্ব ও লেখক পরিচয়ের অংশটি খানিক প্রগলভ মনে হতে পারে। পাতা উলটে পালটে বই পড়া বা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া পাঠককে টানার জন্য সেগুলিও খানিক সংযত হলে ভালই হবে।
এই দেশ অচেনা আমার
লেখক: সম্বিৎ চক্রবর্তী
প্রকাশক: আপন পাঠ
প্রচ্ছদ: সুপ্রসন্ন কুণ্ডু
দাম: ২০০ টাকা (পেপারব্যাক), ২৫০ টাকা (হার্ডবাউন্ড)
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








