মহাশ্বেতা দেবীর বাড়িতে তখন খুব যেতাম। কলেজে পড়ি, মহাশ্বেতাদি তখন আগুনে লেখক। কত কত বিষয়ে লিখছেন যা নিয়ে আগে কিছুই জানতাম না। শুধু কি লেখা? নতুন নতুন কত কথা শুনতে ছুটে যেতাম বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে ওঁর এক চিলতে ফ্ল্যাটে। একদিন কথায় কথায় বদরুদ্দীন উমরের কথা উঠল। ওঁর লেখা পড়ে তখনই আমি মস্ত ভক্ত। মহাশ্বেতাদি বললেন, উমরের লেখালিখি করাই ঠিক ছিল। রাজনীতিতে আসা ঠিক হয়নি। অনেকদিন বাদে যখন বদরুদ্দীন উমর আমার কাছে উমর ভাই হয়ে গেছেন, তখন কোনো একটা লেখায় লিখেছিলামও সেকথা। উমর ভাই ভাল পাঠক জানতাম, কিন্তু তিনি যে আমার লেখাও পড়ে ফেলবেন তা কে জানত! ঢাকায় গেছি জানতে পেরে ডেকে পাঠালেন। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন ‘মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন আমার রাজনীতি করা ঠিক হয়নি? তা আমি তো অধ্যাপনা ছেড়েছিই রাজনীতি করব বলে।’ তারপর হাসতে হাসতে বললেন ‘আমি তো না হয় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু বামপন্থা তো কখনো কোনো অবস্থাতেই বিসর্জন দিইনি। আর তিনি তো সব কিছু ভুলে চরম দক্ষিণপন্থী মমতা ব্যানার্জির মধ্যে লেনিনকে খুঁজে পেলেন।’
উমর ভাইয়ের বড় গর্ব ছিল কমিউনিজম নিয়ে। কখনো ওই ব্যাপারে আপোস করতে চাননি। একশোর বেশি বই লিখেছেন। তার মধ্যে অন্যতম সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ। এমন এক সময়ে বইটা লিখেছিলেন, যখন আমরা অনেকেই বামপন্থা নিয়ে হতাশায় ভুগছিলাম। উমর ভাই বললেন ‘মুশকিল হচ্ছে তোমরা সবসময় পুঁজিবাদকে বড় করে দেখো। অথচ পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংকট বাড়ছে বলেই দ্রুত বদলে যাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির পরিভাষা, তা তোমরা বুঝতে চাও না। পুজিঁবাদের বিকল্প নিশ্চিত সমাজতন্ত্র।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
চলে যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে অনেক লেখালিখি হচ্ছে, আরও হবে। আমার মনে হয় যে বিশেষণই দিই না কেন, আসলে উমর ভাই ছিলেন আপাদমস্তক মার্কসবাদে বিশ্বাসী, অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে একজন যোদ্ধা। এমন সময়ে এ লেখা লিখছি, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার, নেপালের ছবিও মোটের উপর একই। খটকা লাগছে – তাহলে বামপন্থা কি আর তরুণদের টানছে না? আমাদের মত ১৯৬০-৭০ দশকে বড় হওয়া লোকেদের কাছে প্রবল ঘৃণার ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দগুলো কি এখন স্রেফ আভিধানিক? নতুন সমাজ, নতুন শব্দ, নতুন ভাষা, নতুন নতুন প্রযুক্তি নির্মাণ করছে নতুন সমাজ – যা আমরা চিনিই না?
উমর পারতেন এই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির স্বরূপ উন্মোচন করতে। তিরানব্বই বছর বয়সে চলে গেলেন, মৃত্যুর কয়েকমাস আগেও দেখা হয়েছে। একটুও ক্লান্তি বা হতাশা দেখিনি। কখনো কখনো ওঁকে কিঞ্চিৎ নাক উঁচু আর্মচেয়ার বুদ্ধিজীবী মনে হয়েছে। একটু যেন অসহিষ্ণু, অন্যের মত মেনে নিতে আপত্তি। এসব দু একবার বলেছিও মৃদু গলায়। তিনি সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। নাম করে যাদের তিনি একদা পছন্দ করতেন, এখন কেন করেন না তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে ভিন্ন মত যে তিনি একেবারেই গ্রহণ করতেন না তাও নয়।
ঢাকায় আমার এক প্রিয় দাদা ছিলেন মনোহরুল হক। অসম্ভব বর্ণময় চরিত্র। পেশায় ব্যবসায়ী, নেশা নানান বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তর্ক করা। সাধারণভাবে তর্ক করলেও তিনি যা বলতেন, মোটের উপর তাই-ই অন্যদের মেনে নিতে হত। ভদ্রলোক বেশ হুজুগে ছিলেন। একবার ঠিক করলেন বাড়ি থেকে রান্না করে উমর ভাইয়ের বাসায় গিয়ে আড্ডা মারা, খাওয়াদাওয়া হবে। হক ভাইয়ের গাড়িতে তোলা হল শলিমুল্লা খান ও আরও দু-একজনকে। শর্ত ছিল, কোনো ছবি-টবি তোলা বা কিছু রেকর্ড করা যাবে না। সেই রাতে বলা উমর ভাইয়ের কথাগুলো ভুলব না। আমি নীরব দর্শক। হক ভাই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উমর ভাইকে উস্কে দিচ্ছেন আর তিনি প্রবন্ধ লেখার মত গুরুত্বপূর্ণ সব কথা বলছেন, সঙ্গে শলিমুল্লা খান। এখন ভাবি, সেদিন কোনো শর্ত না মেনে যদি পুরো আড্ডাটা রেকর্ড করে রাখতাম, তা নিয়েই নিঃসন্দেহে এমন একটা বই ছাপা যেত যা থেকে যেত ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে।
আমি বোধহয় সেই বিরল তথ্যচিত্র নির্মাতাদের একজন, যে বিভিন্ন তথ্যচিত্রের জন্য একাধিকবার উমরের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
দেশভাগ নিয়ে একটা সিরিজ করব ঠিক করি। প্রথম পর্ব সীমান্ত আখ্যানের জন্য প্রথমবার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিই। তিনি সবসময় খোলামেলা কথা বলতেন। রেখে ঢেকে কাউকে খুশি করে চলা উমর ভাইয়ের স্বভাব ছিল না। দেশভাগের জন্য তিনি জিন্নাহকে নয়, মূলত দোষ দিয়েছিলেন ভারতের জাতীয় নেতৃত্বকে। বলেছিলেন, জিন্নাহ সাহেব তো ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব মেনে নিতে চেয়েছিলেন। সে প্রস্তাব মানলে তো ভারত একটা ফেডারেল রাষ্ট্র হত। ভাগ হত না। কিন্তু জওহরলাল নেহরু তো ক্যাবিনেট মিশনকে নাকচ করে দিলেন। মৃত্যুর পরেও দেখছি উমর ভাইকে নিয়ে অজস্র কুকথা বলা হচ্ছে। সেসবে সুর মেলাচ্ছে কিছু তথাকথিত বাম দলও। মজা হল, এদেরই প্রথম উমরভাইকে ‘বদ উমর’ বলতে শুনি। বস্তুত, ওদের হেলাছেদ্দাই আমার আর উমর ভাইয়ের সম্পর্ক আরও বেশি ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
আরো পড়ুন শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন নেই, ভুগছেন বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিক
আমি নিজেও গবেষণা করতে করতে বুঝেছিলাম, আওয়ামী লিগের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান পুরোপুরি একতরফা। অনেককিছু অতিরঞ্জিত, মিথ্যে। উমর ভাই যুক্তিতর্ক, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ দিয়ে আওয়ামীর বয়ান ভেঙে দিতেন বলেই মৃত্যুর পরেও লিগ অত্যন্ত কুৎসিত ভাষায় তাঁকে আক্রমণ করে যাচ্ছে। লিগের প্রোপাগান্ডা এত তীব্র ছিল যে কলকাতার অনেকেই তাতে বিশ্বাস করে বলতে শুরু করেছিলেন – উমর মুক্তিযুদ্ধকে ভুয়ো বলে মনে করতেন। আমি সবিনয়ে যতজনকে পেরেছি বোঝাতে চেষ্টা করেছি – কখনোই তিনি তা বলেননি। তিনি মনে করতেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো একটি দলের বা নেতার নয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ (‘পিপলস ওয়ার’)। উমর ভাই বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগের বয়ানের ৯০% মিথ্যে। শেষবার উমর ভাইয়ের সাক্ষাৎকার নিই আমার ৩৬ জুলাই: স্টেট ভার্সেস পিপল তথ্যচিত্রের জন্য। সেখানেও উমর শেখ হাসিনার পাশাপাশি মুজিবুর রহমানের স্বৈরাচারী শাসনের কথা সোচ্চারে বলেছেন। মনে রাখতে হবে, ১৯৭২- ৭৩ সালে মুজিবের গেস্টাপো, ফৌজ ও রক্ষী বাহিনির হাতে যখন হাজার হাজার কমিউনিস্ট কর্মী সমর্থক খুন এবং নিগৃহীত হচ্ছেন, তখন সাহস করে যে কজন বুদ্ধিজীবী ঢাকার রাস্তায় নেমেছিলেন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন উমর। নকশালপন্থী নেতা শান্তি সেনের পরিবারের উপর মুজিবশাহীর নৃশংস অত্যাচার নিয়েও সোচ্চার ছিলেন তিনি।
সবাই জানেন, তবুও বলি, উমর জন্মেছিলেন বর্ধমানে। মঙ্গলকোট থানার কাশেমনগরে ছিল আদি নিবাস। দেশভাগ নিয়ে কথা উঠলে সাধারণভাবে আমরা ওপার থেকে ছিন্নমূল হয়ে আসা লোকজনের কথাই বলি। অথচ এপার থেকে বাধ্য হয়ে যাঁরা ওপারে গেলেন, তাঁদের ব্যাপারে আমরা নীরব। ১৯৪৫ সালে বর্ধমান শহরের টাউন হলের কাছে বড় সাধ করে বাড়ি বানিয়েছিলেন উমর ভাইয়ের বাবা, তৎকালীন মুসলিম লিগ নেতা আবুল হাশেম। ১৯৫০ সালে পুড়িয়ে দেওয়া হয় সে বাড়ি। তারপর বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয় উমর পরিবারকে। সাধের সেই বাড়ি, বর্ধমানের স্মৃতি কোনোদিনই ভোলেননি উমর ভাই। বর্ধমানের অনেকেও ভোলেননি তাঁকে। যেদিন তিনি মারা গেলেন, সেদিন ফোনে ফোনে বর্ধমানের রসুল, ত্রিনাথের বাড়ির সবাই, উমর ভাইয়ের ভাই আশিস – আমরা সবাই একে অন্যের শোক ভাগ করে নিচ্ছিলাম।
কত সাধারণ একটা ফ্ল্যাটে তিনি থাকতেন! কী সহজ, সাদাসিধে জীবনযাপন! মানুষটা বাইরে গম্ভীর হলেও ভিতরে ছিলেন নরম, হয়ত সামান্য অভিমানীও। মহাশ্বেতা দেবীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। একবার কলকাতায় ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে মহাশ্বেতা দেবীর বাসায় বসে আছেন। সময় বয়ে যাচ্ছে – এক ঘন্টা, দু ঘন্টা, তারও বেশি। হঠাৎ ঝড়ের গতিতে মহাশ্বেতা দেবী এলেন এবং সটান বলে দিলেন ‘আজ কথা বলার টাইম নেই। পরে এসো।’ মাথা নিচু করে ফিরে গেছিলেন উমর ভাই। পরে খুব ঘনিষ্ঠজনকে বলেছিলেন, ম্যাগসাসে পুরস্কার হয়ত হাজার চুরাশির মাকে বদলে দিয়েছে। লোক চিনতে উমর ভাইয়েরও তাহলে ভুল হত!
ভুল তো ছিলই। তিনি সবসময় বলতেন যে ঢাকা নয়, কলকাতাই তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করে। অথচ মৃত্যুর পরে বাংলাদেশ শোকে বিহ্বল হল; ফুল, গান, স্লোগান আর লাল পতাকায় হৃদয় উজাড় করে ঢাকা তাঁকে বিদায় দিল; কলকাতার আমরা অনেক পিছিয়ে রইলাম। খবরের কাগজ ও অন্যান্য মাধ্যমে সেভাবে কোনো আবেগ নেই। হয়ত কোনো শোকসভা হবে। জানি না। বিলক্ষণ বয়স হয়েছিল। তবু কোনো কোনো মৃত্যু নিঃসন্দেহে পাথরের মত ভারি। ‘সব মরণ নয় সমান।’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







