ডঃ ইশতিয়াক হুসেন
বহত সমঝে থে হম ইস দওর কি ফরকা পরস্তী কো
জুবাঁ ভি আজ শেখ-ও-ব্রাহ্মণ হ্যায় হম নহি সমঝে
একালের ছুঁতমার্গ দিব্যি টের পেয়েছিলাম, কিন্তু ভাষাতেও যে শেখ আর ব্রাহ্মণ ভেদ হয়েছে তা বুঝিনি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
(রশীদ বনারসী)
প্রায় ২২৫ বছর আগে কলকাতাতেই উর্দু আর হিন্দি ভাষার ভেদাভেদের বীজ বপন করা হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ভাষাগুলোর জন্যে আলাদা আলাদা প্রাথমিক পাঠের বই চালু করে এবং ফারসী আর সংস্কৃত পাঠ্যকে উর্দু আর হিন্দিতে অনুবাদ করায়। সেগুলোর তফাত মূলত লিপিতে – আরবি আর দেবনাগরী। এইভাবে আলাদা করাই পরে ভাষার রাজনীতিকরণের মধ্যে দিয়ে আরও গভীর এক বিভাজনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, যার ফলে উর্দুর সঙ্গে ইসলাম ধর্মের আবশ্যিক সম্পর্ক আছে – শেষপর্যন্ত এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভাগ্যের এমন পরিহাস যে আজ উর্দু ভাষার উন্নয়ন এবং প্রচারের কাজে নিযুক্ত সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম – ওয়েস্ট বেঙ্গল উর্দু অ্যাকাডেমি – একই প্রবণতা দেখিয়েছে জাভেদ আখতারের বক্তৃতা বাতিল করে। ৩১ অগাস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ‘উর্দু ইন হিন্দি সিনেমা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করার কথা ছিল অ্যাকাডেমির। ওই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল এমন এক প্রাণবন্ত ও প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক পরিসরের উদযাপন যেখানে উর্দু পল্লবিত হয়েছে। হিন্দি সিনেমার মাধ্যমে বহুকাল ধরে ভারতের সমস্ত জাতি, ধর্মের মানুষ উর্দুকে আপন করে নিতে পেরেছেন; উর্দু ভাষার সৌন্দর্য, কথনরীতি এবং কাব্যগুণ সমস্ত ভাষাগত এবং ধর্মীয় সীমা অতিক্রম করতে পেরেছে। কিন্তু সেই অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়েছে দুটি মুসলমান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চাপে। তাদের আপত্তির কারণ প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার জাভেদের বক্তা হিসাবে ডাক পাওয়া, যেহেতু ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তিনি বেশ কয়েকবার আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য রেখেছেন।
দুটি সংগঠনের আপত্তির ভিত্তিতে এই অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া নানাদিক থেকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, উর্দু সাংস্কৃতিক পরিসরকে সাহিত্য জগতের কিছু ব্যক্তিত্ব যেভাবে ব্যবহার করেন তা উর্দু ভাষার অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সহিষ্ণু প্রকৃতির উপর কুপ্রভাব ফেলে কিনা এবং এই ভাষার সুরুচিপূর্ণ সাহিত্যিক প্রকাশের ধারার ক্ষতি করে কিনা। দ্বিতীয়ত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠল। তৃতীয়ত, এতে উর্দু ভাষার সংরক্ষণে নিয়োজিত সংগঠনটির স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ল। শেষত, উর্দুর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ এসে গেল।
একথা উল্লেখ করা জরুরি যে যেসব মতামত কোনো ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে আক্রমণাত্মক, তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার অধিকার ধর্মীয় সংগঠনগুলির আছে। তবে তা প্রকাশ করা উচিত যাঁরা বিশ্বাসী নন তাঁদের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গঠনমূলক সংলাপের ভিত্তিতে। নিজেদের ইচ্ছা মত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এই ধরনের আপত্তি করা চলে না। গণতন্ত্রে সংলাপ, মতপার্থক্য এবং সমালোচনা হল নাগরিক অপরিহার্য অঙ্গ। একইভাবে জাভেদের মত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদেরও প্রকাশ্যে বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে বিশ্বাসীদের সঙ্গে সংলাপ চালানোর ক্ষেত্রে শ্রদ্ধাশীল থাকার দায়িত্ব রয়েছে। উদ্দেশ্য যা-ই থাক, অসংবেদনশীল মন্তব্য শ্রোতাদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং গঠনমূলক সংলাপের মেজাজ নষ্ট করে দিতে পারে। আজকের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পরিবেশে অনেক সময় সম্পূর্ণ অন্য উদ্দেশ্যে, অন্য প্রসঙ্গে করা তেমন মন্তব্যকে হাতিয়ার করে তোলে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি – কেবল কোনো ব্যক্তিকে খলনায়ক সাজাতে নয়, গোটা সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করতে।
জনমানসে পরিচিতি বুদ্ধিজীবী হিসাবে এই দিকগুলি মাথায় রাখা প্রয়োজন এবং গুরুতর সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক বয়ানে ধর্মবিশ্বাসের অপ্রয়োজনীয় উপহাস না করাই ভাল। উর্দুর পরিসর এমনিতেই ছোট হয়ে আসছে। সেখানে বর্তমান বিতর্কের মত ব্যাপার বৌদ্ধিক আলাপ আলোচনা চালানোর কার্যকারিতা আরও কমিয়ে দেওয়ার বিপদ সৃষ্টি করে।
তবে কোনো অবস্থাতেই একথা অস্বীকার করে চলে না যে কোনো ধর্মীয় সংগঠনের উর্দু অ্যাকাডেমিকে নিজেদের আপত্তি তোলার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক। এতে এই ভাষা এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব ও বৃদ্ধি বিপন্ন হয়। আরবির সঙ্গে ধর্মীয় পবিত্রতার আবশ্যিক সম্বন্ধ আছে, উর্দুর নেই। বরং পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে যখন ভাষাটি এর প্রাথমিক চেহারায়, অর্থাৎ হিন্দভি, বা দখনীর মত আঞ্চলিক চেহারায় ছিল, তখন ভাষাটিকে ধর্মীয় লেখালিখির অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হত। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে এসে উর্দু ধর্মীয় বয়ানের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
উর্দুর সঙ্গে ইসলামকে জুড়ে দেওয়ার কাজটা আরও মজবুত করা হয় ঔপনিবেশিক যুগে, যখন ভাষাটি মুসলমান পরিচিতির অভিজ্ঞান হিসাবে উঠে আসে। কিন্তু উর্দুকে এই চোখে দেখা মুসলমান সমাজের মধ্যেকার বৈচিত্র্যকেও অগ্রাহ্য করে। মুসলমানদের মধ্যে আলাদা আলাদা বিশ্বাসের, শ্রেণির, জাতির এবং ভাষার মানুষ আছেন। উর্দু মোটেই তাঁদের সকলের ভাষা নয়। উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে উর্দুর ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে এই সমস্ত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার দ্বারা। পাকিস্তানে উর্দু দশ শতাংশেরও কম মানুষের মাতৃভাষা। কিন্তু পাঞ্জাব প্রদেশের অভিজাতরা পশতু, সিন্ধি, বালোচি, সরাইকি এবং বাংলার মত ভাষাগুলোকে দমন করতে উর্দুকে ব্যবহার করেছে। ভারতে উর্দু সংগঠিত অবহেলার শিকার হয়েছে মূলত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সঙ্গে এই ভাষার যোগ থাকায় এবং অনেকেই একে ইসলামের ভাষা বলে দেগে দেওয়ায়। তবে বিদ্যায়তনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উর্দুর এই সাম্প্রদায়িক অধিগ্রহণকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়াস অনবরত চলেছে।
আরো পড়ুন ভাষা কার? হিন্দি-উর্দু দ্বৈরথ সম্পর্কে দু-এক কথা
কোনো সন্দেহ নেই যে ধর্মীয় সংগঠনগুলি এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু ভূমিকা পালন করেছে। তা বলে ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের হস্তক্ষেপ, যেমনটা জাভেদের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, মেনে নেওয়া যায় না। এমন ঘটলে উর্দুর প্রাসঙ্গিকতা ধর্মতাত্ত্বিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। তাতে শেষমেশ যা হবে তা হল, উর্দুর ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক দিক চাপা পড়ে গিয়ে ধর্মীয় পরিচিতিই প্রধান হয়ে দাঁড়াবে। তাতে তাদেরই সুবিধা, যারা উর্দুকে মূলগতভাবে ইসলামিয় ভাষা বলে দেগে দিতে চায়। ফলে অমুসলমান উর্দুভাষী বা তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা দূরে সরে যাবেন।
উপরন্তু এতে উর্দুর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতু হিসাবে কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে যেখানে আমাদের দেশে নানা সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্রগুলি এমনিতেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সবচেয়ে বড় কথা, উর্দু অ্যাকাডেমির এই ঘটনা, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বয়ানকে ধর্মতাত্ত্বিক নজরদারির অধীন করার এক মারাত্মক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
সুতরাং ধর্মীয় চাপে ওয়েস্ট বেঙ্গল উর্দু অ্যাকাডেমির অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে অ্যাকাডেমির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ঘোষিত উদ্দেশ্য – উর্দু ভাষার প্রচার ও সংরক্ষণ – নষ্ট হল। ধর্মীয় সংগঠনগুলির কাছে এই আত্মসমর্পণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, যা আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল উর্দু অ্যাকাডেমি বহুরকম পৃষ্ঠপোষকতা ভোগ করে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থানের নাগাল পায়। ভারতে আজও রাষ্ট্রের মদতপ্রাপ্ত উর্দুর জন্যে নিবেদিত হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি হল এই সংস্থা। সুতরাং এর দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ একে যেমন উর্দু ভাষাকে রাজনৈতিক অবজ্ঞার হাত থেকে বাঁচাতে হবে, তেমন সাম্প্রদায়িক শক্তির কবলে পড়াও আটকাতে হবে। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন উর্দুর অভূতপূর্ব রাজনীতিকরণ হচ্ছে এবং ভাষাটি ঘৃণার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় এই ভাষার অন্যতম প্রধান এক প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রদায়িক স্বার্থের কাছে মাথা নোয়ানো অত্যন্ত চিন্তার। যাঁরা ভারতের বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক পরিচিতি বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসের অঙ্গ হিসাবে উর্দুর সংরক্ষণকে দেখেন, তাঁদের সবার উপর এ এক আঘাত।
সুতরাং ভাষার ব্যাপারে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ-সাংস্কৃতিক পরিসরগুলিকে আলাদা রাখা জরুরি। ঐতিহাসিক সত্য হল, ধর্মীয় পরিচিতির চিহ্ন হিসাবে অধিগৃহীত হওয়ার আগে পর্যন্ত উর্দু প্রবলভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, সমন্বয়বাদী এবং মানবতাবাদী ধারার অঙ্গ ছিল। এর ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় দিকগুলি স্বীকার করে নিয়ে দুটিরই সংরক্ষণ প্রয়োজন, নিজেদের মতাদর্শের স্বার্থে এর অপব্যবহার অনভিপ্রেত।
উর্দুর পরিসরকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুত্ববাদী রাখার জন্যে লড়াই করা দরকার। পাশাপাশি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা পরিসরে সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতাকে লালন করতে ‘তহজীব’ (সংস্কৃতি) ধরে রাখার দিকেও নজর দিতে হবে। উর্দু কেবল একটি ভাষা নয়, এ এক সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার যা ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত ভারতীয়ের সম্পত্তি। উর্দু প্রতিষ্ঠানগুলি এবং বৃহত্তর উর্দুপ্রেমী মানুষকে সজাগ ও সরব থাকতে হবে। বিরূপ প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য বাসর এবং শিক্ষামূলক উদ্যোগ জারি রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, উর্দুকে আবার ভারতের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ধারার মধ্যে স্থাপন করতে হবে। একে সাম্প্রদায়িক স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে উদযাপন করা উচিত নয়; বরং জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষা হিসাবে উদযাপন করা উচিত।
ইনিউজরুমে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধ থেকে অনূদিত। নিবন্ধকার আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির প্রাক্তনী, বর্তমানে কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।






