১৯৪২ সালের আশ্বিন। মেদিনীপুর তখন বিদেশী শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উত্তাল। স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? আগুন নেভাতে ইংরেজ প্রশাসনের হিমশিম অবস্থা। বিদ্রোহ দমনে তুমুল অত্যাচার চলছে দিকে দিকে। এমন সময় দুর্গাপুজোর শুরুতে সাইক্লোন আছড়ে পড়ল উপকূলে, বন্যায় ডুবে গেল চারদিক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু মেদিনীপুরেই দশ হাজারের বেশি লোক মৃত। অপরিমেয় ক্ষয়ক্ষতির মুখে সরকারি ঔদাসীন্যের কথা আজও আলোচনা হয় পাঠ্য ইতিহাসে। তবু নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাসের পরিসংখ্যানের পিছনে লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজের গল্প।
পিছাবনির মাতঙ্গিনী ওরফে ফুলা এই গল্পেরই জের নিজের জীবনে বয়ে নিয়ে চলেছেন। তাঁর যখন ১১ বছর বয়স, এক ৩৪ বছরের দোজবরে গ্রামীণ ভূস্বামীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয় পুত্রসন্তান কামনায়। আগের পক্ষের শুধুই কন্যাসন্তান যে! এদিকে সতীনের সংসারে মেয়ে পারে না তিষ্ঠোতে। এগারো বছরের মেয়ের ঘাড়ে গোটা সংসারের ভার। একবার পালিয়ে যায় বাপের বাড়িতে। একই গ্রামে তো তাঁর বাপের ঘর, শ্বশুর ঘর। আবার বাপের বাড়িতেও জোটে আত্মীয়স্বজনের গঞ্জনা, কটূক্তি। ফলে সেখান থেকেও চুপিচুপি পালিয়ে আসতে হয়। এমন ঘটে বারবার। ক্রমে মেয়ে বাধ্য হয় জীবনের বশ্যতা মেনে নিতে। এদিকে যে সন্তানের জন্য বিয়ে, গর্ভে সেই সন্তানও আসে না। প্রায় দশ বছর পরে যখন সন্তান হল, সেও আবার এক মেয়ে। এদিকে তখনই পূর্বপক্ষের ছয় ছয়টি মেয়ের পরে একটি পুত্রের জন্ম হয়। ভাগ্যের এহেন পরিহাসে ফুলার কপালে জমা হয় আরও অবহেলা, গঞ্জনা, অবমাননা। আঘাতের এতেই শেষ নয়। বিষয়বোধহীন বাবুয়ানিতে অভ্যস্ত জমিদারের জমিদারী স্বজনের লালসায় নেই হয়ে যাওয়া, ’৪২-এর সরকারি অত্যাচারে বাড়ি-কাছারি পুড়ে যাওয়া আর সাইক্লোন-বন্যায় সবটুকু ধুয়ে মুছে যাওয়া – এতসব একসঙ্গে সহ্য করার ক্ষমতা এই গ্রাম্য পরিবারের ছিল না। বছরখানেক পরে জমিদারবাবুটি মারা গেলেন, ফুলা হলেন ‘বামুনবাড়ির বিধবা’। ‘মাথার চুল ছোট করে কাটা, হাত খালি, থানধুতিতে এক দুঃখিনী মাতৃমূর্তি।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ফুলার কথা লিখেছেন তাঁর সেই কন্যা – বিশ্বেশ্বরী পঞ্চাধ্যায়ী। লিখছেন, ‘আমার বড়মা ছিলেন খুব সাধারণ গ্রাম্য মহিলা। তাছাড়া রাজবাড়ির পালিত কন্যা এবং জমিদার গিন্নি। জমিদারের সঙ্গে জমিদারি এবং দাসদাসী সব চলে গেল। তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন। বড়মা বাইরের বাস্তব অবস্থা অনুভব করতে পারেননি। ঘরের বাইরে তাঁর পা পড়েনি কোনদিন। আমার মা ছিলেন এই পাড়ারই মেয়ে এবং বৌ। ফলে লোকজন, রাস্তাঘাট সবই ছিল মায়ের নখদর্পণে। তাই মা-ই বড়মার কাছে অবলম্বন হয়ে উঠলেন।’
অবশ্য শুধু পরিবারেই নয়, ফুলা ছিলেন আজকের ভাষায় যাকে বলে সোশাল লিডার। ‘কার বাড়ি গরুর বাচ্চা হতে কষ্ট হচ্ছে, ফুলাকে ডাক। কার বাচ্চা আগুনে পুড়ে গিয়ে পচে পোকা হয়ে গেছে, মা গিয়ে একটি একটি করে পোকা বেছে তাকে পরিষ্কার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।’ অবশ্য তাঁর পারিবারিক কাঠামো অটুট থাকেনি। সতীনের সঙ্গে সম্পর্কে ভাঙন ধরল। এক বিঘা ধান জমি আর ১৫ কাঠা বাস্তুজমির ভরসায় একমাত্র মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ফুলার জীবনতরণী ভাসল এরপর। একই গ্রামে বাপ-দাদার বাড়ি, সেই ভরসাও ছিল। অনেক কাণ্ডের পরে সেই জমিতে ঘর উঠল। খড়ের চালার একটি ঘর, মা মেয়ের ঘর। বইয়ের নামও বিশ্বেশ্বরী দিয়েছেন সেই ঘরের স্মৃতিতেই হয়ত – মা মেয়ের ঘর।
এরপরের গল্প মা-মেয়ের যৌথ সংগ্রামের। একটাই বাঁচোয়া, অর্থনৈতিক অবস্থার পতন ঘটলেও একেবারে সহায়সম্বলহীন হননি ফুলা। ফুলার বাবা-মা তাঁদের ছেলেদের থেকে আলাদা সংসারে থাকতেন, ফলে ফুলা বাবার ভরসা পেয়েছেন। এদিকে মেয়ে ক্লাস সিক্স পাশ করল। ফাইভ, সিক্স পড়া বাড়ি থেকে মিনিট দশেক দূরের এক স্কুলে। কিন্তু আরও পড়তে গেলে যেতে হবে কাঁথি। বিপত্তারণ হলেন ফুলার গুরুদেব। তাঁর কাঁথির আশ্রমে বিশ্বেশ্বরীর জায়গা হল। গুরুবাদ ও তার সুফল-কুফল নিয়ে অনেকরকম আলোচনা হলেও অন্তত উনবিংশ বা বিংশ শতকের সমাজজীবনে গুরুদের ব্যক্তিগত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা খুব একটা চোখে পড়েনি। কিন্তু সেসময়কার কিছু কিছু পারিবারিক ইতিহাসে বিপর্যয়ে এঁদের সাহারা হয়ে ওঠার কথা ধরা থাকে। এই গুরুরাও অনেকেই অতি সাধারণ মানুষ হতেন। তাও গুরুত্বের সুবাদে কীভাবে তাঁরা অনাত্মীয় শিষ্যের পারিবারিক ভালমন্দের সঙ্গে জড়িয়ে যেতেন সেই কাহিনিগুলো আজকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে ভরপুর নাগরিক সমাজের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য। সমাজজীবনে ছোট বড় বিভিন্ন গুরুর বিভিন্ন রকমের ভালমন্দের ভূমিকা নিয়ে গুরু ও শিষ্য উভয়ের দৃষ্টিকোণ থেকেই সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণমূলক বিস্তৃত স্মৃতিকথানির্ভর কাজকর্ম হলে বেশ হয়।
গ্রামীণ ক্ষুদ্র কৃষিনির্ভর বাড়িতে খাওয়া পরার অভাব ছিল না, কিন্তু নগদ জোগানের যে খুবই অভাব হত – একথা সে আমলের অনেক বয়স্ক মানুষের স্মৃতিতেই ধরা আছে। তাই কথা ওঠে, ‘মেয়েকে শহরে পড়তে পাঠালে, খরচের খবরটা নিয়েছ? প্রতিদিন দু পয়সা করে টিফিন খেতে দিলে, মাসে চৌষট্টি পয়সা মানে পাকা একটি টাকা লাগবে, জানো? কোথায় পাবে? পড়াবার কোন দরকার নেই। মেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে দিয়ে দাও। পাগলামি কোরনা।’ ফুলা কিন্তু সেকথা শোনেননি। তিনি মেয়েকে গুরুর আশ্রমে রেখে কাঁথিতে পড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। ফুলার স্বামীর মারা যাওয়াটা ভাল না মন্দ জানা নেই, তবে বিধবা ফুলা কিছুটা নিজেই নিজের অভিভাবক ছিলেন বলেই হয়ত নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে একগুঁয়েমি দেখানোর সাহস পেলেন। বাস্তবে সংসারের জাঁতাকলে, অভিভাবকের দুরমুশে মেয়েদের ইচ্ছে গুঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প তো কম নয়।
তবু গ্রামের পাঠশালে ক্লাস টু অবধি পড়া ফুলার ঐকান্তিক কামনা তাঁর মেয়েকে বলা একটা কথায় প্রকাশিত, ‘আমার জীবন যেমন হয়েছে, তোর যেন তেমন না হয়’। এই না হওয়ানোর উপায় বলতে ফুলা ভেবেছেন মেয়েকে পড়াশোনা করানোর কথা, যার শেষ চাকরি লাভে। মনে হয় ফুলার এই জীবনদর্শন ও বিশ্বেশ্বরীর নিজস্ব ভাবনার গতিপ্রকৃতি এক। তাই বিশ্বেশ্বরী এই ছোট্ট ১২০ পাতার বই শেষ করেন এই কথা বলে, ‘যতোদিন আমি বেঁচে আছি, তার সবটাই আমার মায়ের কথার অংশ।’
আরো পড়ুন একজন হার না মানা তওয়াইফ অথবা মনীশের মা
এই বই স্মৃতি ছেঁচে লেখা কাহিনী। সন্তানের মনের দর্পণে মায়ের প্রতিফলন। পাতায় পাতায় ঝরঝরে ভাষায় মায়ের কথার সঙ্গে তাঁর গ্রামীণ গেরস্থালির বিবরণ এই বইয়ের অন্যতম সম্পদ। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, সন্তোষ রাণার রাজনীতির এক জীবন পড়তে গিয়ে যে অন্দরমহলের অন্তরঙ্গ ছবির অভাব অনুভব করেছি, সেই অভাব যেন কিছুটা মেটে এই প্রায় সমসময়ের কথকতায়, মেয়েদের লেখা বলেই সম্ভবত। বাড়িতে নারকেল তেল তৈরির কথা, বড়ি দেওয়া, ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার বৃত্তান্ত, বিভিন্ন রান্নাবান্নার গল্প এসেছে এই বইতে। যেমন এসেছে ঘরকন্নার আরও নানা কথা। যেমন, ‘ধান ওঠার সময় হলেই বাড়ির মেয়েরা সবাই মিলে গোবরমাটি দিয়ে উঠান লেপার কাজ করে দিতো। তাতে আমিও একটা বড়ো অংশ নিতাম। গোয়াল থেকে গোবর আনতে হতো আর মাঠ থেকে মাটি। মাঠের সেই মাটির রংটা হতো শাদা আর সে খুব মোলায়েম।’ সেই সঙ্গে এসেছে গোটা মাস জুড়ে কার্তিক-মাহাত্ম্য পাঠের কথা, পঞ্চক নামের লৌকিক ব্রত পালনের কথা। ফুলার গরু, বাছুর, বিড়াল ইত্যাদি বিবিধ পোষ্য নিয়ে ঘরসংসারের বিভিন্ন খুঁটিনাটিও ধরা পড়েছে এ বইয়ের ক্ষুদ্র পরিসরে।
অবশ্য শুধু মায়ের কথা নয়, মেয়ের কথাও আছে। বইয়ের শেষ মেয়ের বিয়ে, কলকাতায় চাকরি নিয়ে চলে আসা এবং সন্তান জন্মের পরে। গ্রামের বাড়ি ছেড়ে নাতির টানে কলকাতায় এলেও গ্রামের গোছানো সংসার ছেড়ে এখানে তিনি বেশিদিন টিকতে পারেননি। মেয়েই যাতায়াত করত। বিশ্বেশ্বরী লিখছেন, ‘কোথাও মায়ের যেন কিছু চাইবার ছিল না, নিজের মতো করে দিয়েই গেছেন।’
সব মিলিয়ে সুখপাঠ্য লেখা। ফুলার জীবন যেমন গতিময়, জীবনশক্তিতে ভরপুর, তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই গতিময় তাঁর কন্যার লেখা। পড়তে ভাল লাগে, শুরু করতে না করতেই যখন ফুরিয়ে যায়, তখন একটু যেন আপশোসই হয়। মেয়ে মায়ের কথাই লিখতে বসেছেন। তাই হয়ত সংসারের আর দশজনের কথা এই লেখায় তেমন একটা ফুটে ওঠেনি। তবে মায়ের ভাবনাচিন্তার খুব একটা হদিশ মেলেনি। কেন তিনি বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ির আর দশজনের থেকে আলাদা হয়ে ভাবতে শিখলেন, মেয়েকে অন্যরকম জীবন দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় লড়ে গেলেন, মেয়েই বা কেন ক্লাস সিক্সের পরেও পড়ার জন্য মায়ের কাছে কান্নাকাটি করতে বসেছিল তা পাঠকের অজানাই থাকে। মা মেয়ের চিন্তার দুনিয়াটা অধরা রয়ে যায়। মায়ের কোনো সঙ্গীসাথী, সখী বা সমব্যথীর আসে না। ফুলা ধরা পড়েন একান্ত মাতৃরূপে। তাঁর অন্য রূপগুলোর কথাও জানতে ইচ্ছে করে। তাঁর অন্য পরিজনদের সঙ্গে সম্পর্কগুলো সব সময়ে খুব মসৃণ ছিল না – এমন আভাস দিয়েছেন বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গে বিস্তারিত লেখেননি। তাঁর মত শক্তপোক্ত তেজিয়ান মহিলা কিভাবে এইসব জটিলতার মোকাবিলা করেছিলেন জানার ইচ্ছে হয় বৈকি! আবার মায়ের আদ্যন্ত রামায়ণ, মহাভারত পাঠে পায়ের চেটোর আঁচিল সেরে যাবে – এই ধরণের বিশ্বাসের সঙ্গেই বা তিনি মেয়ে হিসাবে কীভাবে মানিয়ে নিতেন তাও আমাদের অজানা থাকে। তবে বিশ্বেশ্বরী যতটুকু লিখেছেন বড় যত্নে, আর অকপটভাবে।
বিশ্বেশ্বরী যে প্রজন্মের মানুষ, সেই প্রজন্মের অসাহিত্যিক সাধারণ মেয়েদের মধ্যে প্রবীণ বয়সে এসে কলম ধরার ততটা রেওয়াজ এখনো নেই। ভাগ্যিস মেয়ে কলম ধরেছিলেন, তাই আমরা এমন ইতিবাচক মনের মায়ের জীবনের কথা জানলাম। প্রসঙ্গত বিশ্বেশ্বরী কিন্তু নিজের পদবি পঞ্চাধ্যায়ী লিখেছেন, শ্বশুরবাড়ির পদবি নন্দ লেখেননি। এমনকি তাঁর সন্তানও নিজের মাতৃপদবিই গ্রহণ করেছেন। হয়ত বা তিনি স্বয়ং স্বাধীনচেতা বলেই আর দশজনের থেকে অন্যরকমভাবে নিজের পরিচিতি তৈরি করতে পেরেছেন। তাঁর মায়ের প্রভাব এভাবেই হয়ত তাঁর জীবনে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর নিজের কথাও জানতে ইচ্ছে করে। বিশ্বেশ্বরী লিখুন, আরও অনেক অনেক মেয়েরা কলম ধরুন। সাধারণ মেয়েদের সাধারণ কথা আরও অনেক লেখা হোক। উঠে আসুক তাঁদের বিচিত্র পরিস্থিতির কথা, তাঁদের বাইরের জগৎ ও অন্তর্জগতের কথা। মেয়েদের ঘিরে নীরবতার বেড়া ভাঙুক।
মা মেয়ের ঘর
লেখক: বিশ্বেশ্বরী পঞ্চাধ্যায়ী
প্রকাশক: লোকনদী, আসানসোল
প্রচ্ছদ/অলঙ্করণ: শিবাজী বসু/সঞ্জীব চৌধুরী
মূল্য: ১৬০ টাকা
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।





খুব ভালো লাগল। এমন লেখা আরো আসুক নাগরিকে।