সম্প্রতি শ্রীযুক্ত অনুরাগ কাশ্যপের একটি বক্তব্য নিয়ে বঙ্গীয় সুধী সমাজ খুবই বিচলিত। আমি বিচলিত নই। আমি বরং বিচলিত আপামর ভদ্রলোক সমাজ হঠাৎ অনুরাগে চঞ্চল হয়ে উঠলেন দেখে। প্রথম কথা, একজন ভারতীয় নাগরিক হিসাবে অনুরাগ তাঁর মতামত ব্যক্ত করতেই পারেন। তার সঙ্গে আমার আমার একমত বা ভিন্নমত হওয়ার সুযোগ আছে। এত রাগ অকারণ। দ্বিতীয়ত, অনুরাগ এমন কোনো উচ্চতায় পৌঁছননি – তিনি গুরু দত্ত নন – যে তিনি বলেছেন বলেই আমাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। আসলে বাঙালির স্বভাবই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনো ক্রিয়াতেই প্রতিক্রিয়া জানানো। প্রতি মুহূর্তে, সতত।
অনুরাগের অনেক আগেই একজন বাঙালি কবি জানিয়েছিলেন ‘ঘরের ভিতর কেউ খোঁয়ারি ভাঙছে বলে কপাটের জং/নিরস্ত হয় না তার নিজের ক্ষয়ের ব্যবসায়ে,/আগাগোড়া গৃহকেই চৌচির করেছে বরং…’ এই যে জীবনানন্দ দাশের উক্তি, তা শুধু সিনেমায় নয়, বাঙালি জীবনের প্রতিটি ধারাতেই এত বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে তা দেখিয়ে দিতে আরব সাগরের পাড় থেকে কোনো অনুরাগকে এসে আমাদের বীতরাগের পাত্র হতে হবে না, তা স্বতঃপ্রমাণিত। বস্তুত এমন কোনো দায় অনুরাগের বা আর কারোর নেই যে কলকাতায় নেমেই ‘ঠাকুর সাহাব’, কলকাতা এবং রসগোল্লার প্রশংসা করতে হবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আমরা যে বাংলা ছবি দেখি তাতে অভিনেতা অভিনেত্রীরা প্রায়ই অকারণে অর্ধশিক্ষিত ইংরিজিতে ভাব বিনিময়ের চেষ্টা করেন, তাঁদের ঘরে চিত্রকলা (শস্তার), তাঁদের বসন টি-শার্ট, এবং মধ্যবয়সিনীরা অকারণে জানলায় দাঁড়িয়ে রাতের কলকাতা দেখেন। এইসব ছবি যতটা ইন্টেরিয়র ডেকরেশন ততটা স্থান ব্যবহার নয়। আমাদের খারাপই লাগে যে একজন বংশী চন্দ্রগুপ্ত, একজন রবি চট্টোপাধ্যায় থাকা সত্ত্বেও আমরা মোটামুটি ঘর সাজানোর কোর্স করে ফেললাম বাংলা ছবিতে। একথাও ভাবার কোনো যুক্তি নেই যে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল বা তপন সিংহ অস্তমিত হলে তাঁদের উত্তরসূরি হিসাবে আরেকজন সত্যজিৎ, আরেকজন ঋত্বিক, আরেকজন মৃণাল এবং আরেকজন তপন আবির্ভূত হবেন। তা হয়নি। ভাগ্যক্রমে তার উনিশ শতক ছিল বলেই বাঙালির ধারণা হয়ে গেছে যে যেমন কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জীবনানন্দ প্রায় সংলগ্ন হয়ে এসেছিলেন তেমনভাবে প্রতিভারা সবসময়েই দল বেঁধে আসবেন। তা হয় না। একেকটা যুগ সম্পূর্ণ নিষ্ফলা হয়। স্বীকার করা ভাল, বাঙালির এই যুগ – একুশ শতকের শুরুটা – তেমনই। আমাদের তেমনভাবে কাউকেই দেখানোর নেই। অবশ্য বাঙালি ভদ্রলোক খাদের কিনারায় অনেকদিন ধরেই দাঁড়িয়েছিল। তার ন্যাকা নস্ট্যালজিয়ার অতীত আছে, খানিকটা নির্বুদ্ধিতার সফটওয়্যার হিসাবে ভবিষ্যৎও আছে। কিন্তু যা প্রকৃতই অনুপস্থিত তা হল বর্তমান। চাঁদ উঠলে সে ফেসবুকে পোস্ট করে, অসনে পথখাদ্য, বসনে হাফপ্যান্ট, উচ্চারণে টেলি সিরিয়ালের ইংরিজি এবং সোশাল মিডিয়াতেও সে সাধারণত বাংলা কবিতার আলোচনা ম্লেচ্ছ ভাষাতেই করে থাকে। উত্থান বাদ দিলে উনিশ শতকের যে খঞ্জ চেহারাটা পাওয়া যায় কলকাতার গলিতে উপগলিতে; আজ কলকাতার সংস্কৃতি প্রায় তাই। প্রতিমা নেই তবু মণ্ডপ পড়ে আছে। যেন গতযৌবনা রক্ষিতা এ শহর। এই মধ্যবিত্ত, এই ভদ্রলোক একদা অনেক দীপমালা ও ফুল্লকুসুম দেখেছে। রবীন্দ্রনাথকে দেখেছে, বিদ্যাসাগরকে দেখেছে, জগদীশচন্দ্র বসুকেও দেখেছে। ব্যবসা চলে গেছে পশ্চিম ভারতে, লক্ষ্মী পাট তুলেছেন। এদেশে আলামোহন দাস, রামদুলাল সরকার, বীরেন মুখার্জিদের বসত ভিটে আজ বটের ঝুরি। এখন যা হয় তা ফাটকাবাজি। আর সরস্বতী? এত সাধের কেরানি ও মাস্টারনন্দিতা সরস্বতী! সেও তো বাংলার বাইরে উচ্চশিক্ষার মন্দিরে। আজ বাঙালি বাবুদের ছেলেমেয়েরা হয় পুনেতে, নয় নতুন দিল্লিতে, অথবা ক্ষমতা থাকলে – বাপের পয়সাই সম্ভবত – পশ্চিমে গিয়ে ডিজিটাল কেরানি হয়। কলকাতায় তাদের চাকরি নেই। আজ কলকাতার কলতলায় ক্লান্ত গণিকারা কোলাহল করে, আর সেই কোলাহল আমাদের ওটিটি সিরিজ, পেজ থ্রি ভেদ করে সর্বভারতীয় আঙিনায় পৌঁছয় না।
আরো পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না
বস্তুত এইজন্যেই অনুরাগকে নিয়ে এত কথোপকথন, যে অনুরাগের পাশে দাঁড়ানোর মত পরিচালকেরও আজ অভাব। আজ ভাবতেই পারি না যে আমাদের সিনেমায় নির্মল দে, অজয় কর, অসিত সেন, তরুণ মজুমদার, পার্থপ্রতিম চৌধুরী প্রমুখ পরিচালকরাও ছিলেন। বাঙালি ভদ্রলোকদের এই এক মস্ত দোষ যে তাঁরা প্রমথেশ বড়ুয়াকে দেখলেন না, দেবকীকুমার বসুকে, মধু বসুকেও দেখলেন না। প্রমথেশের সাবজেকটিভ ক্যামেরার ব্যবহার উত্তরায়ণ (১৯৪১) ছবিতে কীরকম ছিল তা নিয়ে কোনো আলোচনা না করেই তাঁরা সরাসরি চলে এলেন সত্যজিতে। এমনকি সত্যজিৎকে দেখার সময়েও তাঁরা সত্যজিতের ছবি মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন না। খেয়াল করলেন না তাঁর ভাষা কী করে সাহিত্যের থেকে আলাদা হয়ে গেল। ‘মানবতাবাদী’ ইত্যাদি গোল গোল কথা বলে সত্যজিৎকে বোঝা হল। ঋত্বিক তো চিরন্তন মাতাল হয়ে আমাদের সুযোগ করে দিলেন তাঁর দু-একটি বাক্য মাত্র তুলে নিয়ে তর্পণ করার, যেমন ‘ভাবা প্র্যাকটিস করো’, ‘ঈশ্বর, আমারে কলকাতায় নিয়া যাবা’ ইত্যাদি। ঈশ্বর আমাদের কলকাতায় নিয়ে যাবেন না। ঈশ্বরের সে ক্ষমতা নেই। একসময় যে মধ্যবিত্ত রামমোহন রায় থেকে সত্যজিৎ পর্যন্ত দেখত, এখন সে খোকাবাবুকে দেখে। আর সে দেখে, বাংলা সিনেমার নায়ক নায়িকারা প্রাথমিকভাবে দু-একটি ছবি করলেই সাংসদ পদে উত্তীর্ণ হন। যে সাংসদ কোনোদিন সংবিধান পড়েননি, তিনিও মাঝে মাঝে এসে টিউবওয়েল বসছে না কেন তা নিয়ে কোলাহলমুখর হন। আমাদের অমর্ত্য সেন ছাড়া এমন কোনো বুদ্ধিজীবী এ মুহূর্তে নেই, যাঁকে সর্বভারতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে চেনা যায়। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, কিন্তু তাঁকে শুধু শিক্ষিত লোকেরাই চেনে। আর বাঙালির সম্পদ গড়িয়াহাট মলের শোভা। আসমুদ্রহিমাচলের কথামালার মধ্যবিত্ত সৌরভ চলে গেলেও গ্রাম্য মিডিয়ার সূত্রে তিনি ঘুরে আসেন কোনো সিরিয়াল পরিচালনায়। আগামীদিনে হয়ত ইস্পাত ব্যবসায়ী হিসাবেই একজন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে দেখা যাবে। বাঙালির স্বপ্নে তো কিছু ঘি খাওয়া আছে, তাই ক্রিকেটারকে আর লোহার ব্যবসায়ী বানাতে অসুবিধা হয় না।
কলকাতায় চারুলতার স্বামী ভূপতি যেমন, তেমন ভদ্রলোক এ উপনিবেশে নানা প্রান্তে একদা ছিল। এরা ইংরিজি, ফরাসি বা স্পেনিয় ভাষায় লিখতে পারত। ঈশ্বরের নামে শপথ করে ভার্নাকুলারে কথাও বলত। সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে আমাদের কথা বলার দায় নেই। তবু বলব সেই ভদ্রলোকরা চলচ্ছবিকে সহজে স্বীকৃতি দেয়নি এবং যখন স্বীকৃতি দেওয়া হল, তখন আমরা যে ছবিগুলো দেখেছিলাম সেগুলো নিয়ে পরবর্তীকালে আর আলোচনাই হল না। আমরা নিউ থিয়েটার্সকে ভুলে গেলাম, আমরা ভুলে গেলাম কী করে অপরাধী (১৯৩১) ছবিতে প্রমথেশ ইন্ডোর লাইটিং করেছিলেন। আমাদের মনে হল হঠাৎ কেউ এসে গেছে এবং দু-তিনজন নির্দেশকের মধ্যে আমাদের ঘোরাফেরা চলল। আমাদের ভাবনার জগতে মস্ত ফাঁকি, যে আমরা ধরতেই পারলাম না, নির্মল দে বা তরুণ মজুমদার কত যত্ন করে ছবি করতেন। আজ যাঁরা এত খেপে উঠেছেন তাঁরা নিজেরাও ভাল করে জানেন, এখন ১৭-১৮ দিনে একটা ছবি তৈরি হয়। ওই কদিন পড়াশোনা করে উচ্চমাধ্যমিকের ভূগোল পরীক্ষাতেও পাস করা যায় না। সুতরাং নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য হঠাৎ বাঙালি জাতীয়তাবোধ উদ্দীপ্ত করা আমার কাছে হাস্যকর প্রয়াস বলে মনে হয়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাঙালি গর্ব করত, যে সে আর যা-ই হোক প্রাদেশিক নয়। এখন তাকে গানের সময়ে কোটা খুঁজতে হয়, সিনেমায় কোটা খুঁজতে হয়। কেন একজন বহিরাগত এসে তাদের গোপন ঘা খুঁচিয়ে দেবেন, তাই নিয়ে তোলপাড় হতে হয়। কেউ খেয়ালই করে না যে এর প্রতিক্রিয়ায় যা লেখা হচ্ছে তা আসলে বঞ্চিত বাঙালির জন্যে অ্যাড মেটিরিয়াল।
আজ বাংলার কোনো সাপ্তাহিকীতে বা দৈনিক সংবাদপত্রে সমালোচনা নেই। অথচ একসময় আপাতভাবে যাদের আমরা নিম্নমানের বলে উপেক্ষা করেছি, সেই কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে দেখা যায় তারা এখনকার চেয়ে অনেক উচ্চস্তরে বিচরণ করত। আমি বলব পাঁচ ও ছয় দশকের সময়সীমায় উল্টোরথ, সিনেমা জগৎ ও জলসা; ঈষৎ পরে ঘরোয়া ও প্রসাদ শহর ও মফস্বলে ছড়িয়ে থাকা মধ্যবিত্তের বাসনার আশ্রয়স্থল ছিল। একসময় এদের চটুল বলে তাচ্ছিল্য করার রেওয়াজ ছিল। কথাটা খুব অসত্যও নয়। কিন্তু একুশ শতকের বাঙালির সিনেমাবোধ দেখলে মনে হয়, এরা বিধাতার আশীর্বাদ ছিল। এরাই বাংলা ছবির সুবর্ণযুগকে অস্তগামী হতে দেয়নি। আজকের পেজ থ্রির তুলনায় কলিন পাল ও প্রসাদ সিংহ কতদূর পরিশীলিত ছিলেন তা ‘পতিত’ বাঙালিকে আর বোঝানো যাবে না।
সত্যজিৎ জলসা পত্রিকাটি পড়তেন এবং তার এক শারদ সংখ্যা থেকেই খুঁজে নেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি। বাঙালি মধ্যবিত্ত তখনো অটোগ্রাফ জমাতে শেখেনি, মধ্যবিত্তের পতন এত সুনিশ্চিত হয়নি যে সে প্রশ্ন করবে বাবা কেন চাকর। বরং উল্টোরথ যে সাহিত্য পুরস্কার দিত তা গর্বের ছিল। কারা পেতেন সে পুরস্কার? প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দিনেশ দাস। সিনেমা জগৎ সম্পাদকীয় কলমে অন্তত চারুলতার আলোচনায় সত্যজিৎ ও ইঙ্গমার বার্গম্যানকে বন্ধনীভুক্ত করে শেষোক্তর প্রতি পক্ষপাত দেখাত। উল্টোরথ সাহিত্য পরিচিতিতে ছাপত – জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। কী চমৎকার রসরচনা লিখতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র শ্রীবিরূপাক্ষ ছদ্মনামে! জনপ্রিয়তার নিরিখে উত্তম-সুচিত্রাকে তো বটেই, এমনকি তুলনায় মননশীল সৌমিত্র-অপর্ণা সেনকে সমর্থন করতেও এদের জুড়ি মেলা ভার।
তপন সিংহ ১৯৬৫ সালের গল্প হলেও সত্যি ছবিতে আমাদের অন্দরমহলে সিনেমার রুচি কীভাবে পালটাচ্ছে তা বোঝাতে মধ্যবিত্ত গৃহিণীর বিশ্রম্ভালাপে উত্তমকুমারের পূর্বসূরি হিসাবে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখাতে পারতেন। এও দেখাতে পারতেন যে ফিল্ম সোসাইটির তথাকথিত বোদ্ধা কী বিকৃত উচ্চারণে ‘ত্রুফো’ বলে। সত্যজিৎ বিনা কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০) ছবিতে ফিল্ম সোসাইটিতে নগ্ন মহিলা দেখার অভিলাষে উন্মত্ত বাঙালি যুবককে দেখাননি। তার মধ্যে গভীর কান্না ছিল। আমরা সে কান্নার রহস্য ভেদ করিনি। আজও করতে চাই না। আজও সহজিয়া সাধনায় অনুরাগের উপর রেগে গিয়ে নিজেদের অপরাধ স্খালন করার চেষ্টা করি। তাতে কি ভবি ভুলবে?
বাঙালি ভাবে যে সে এখনো মাঝেমধ্যে সন্দেশ খায়, কিন্তু বোঝে না যে প্লেট খালি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








