এরকম ঘটনা খুব কমই দেখেছে মানুষ। টিভিতে লাইভ করতে করতে সাংবাদিক গ্রেফতার হচ্ছেন পুলিসের হাতে – এ ছবি স্বাভাবিকভাবেই চমকে দেওয়ার মত। রিপাবলিক বাংলার সাংবাদিক সন্তু পান ফেরিঘাটে নৌকায় দাঁড়িয়ে পুলিস অফিসারকে বলছেন, “আমি বাড়ি যাব। আমি অফিসে যাব”, আর পুলিস অফিসাররা তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়ে টোটোতে তুলে থানায় চালান করছেন। পুরোটাই লাইভ সম্প্রচার করেছে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলটি। পরে সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে সোশাল মিডিয়ায়।
সন্তুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সন্দেশখালির কোনো একটি বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের সাউন্ড বাইট বা সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে তাঁদের সম্মানহানি করেছেন। হাইকোর্টের বিচারপতি সেই ঘটনার ভিডিও দেখে এই অভিযোগের আপাত গুরুত্ব নেই দেখে সেই এফআইআরের উপর স্থগিতাদেশ দিয়ে সন্তুকে জামিন দিয়েছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এ তো চোখে দেখা ছবি। তা নিয়ে চারিদিকে শোরগোল পড়ে গেছে। বলা হচ্ছে সাংবাদিকদের অধিকার হরণ করা হয়েছে, খবর সংগ্রহ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, ভয় দেখানো হচ্ছে। সন্দেশখালিতে সাংবাদিকের গ্রেফতার নিয়ে বিবৃতি এসেছে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনসহ বহু রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনের। পাল্টা বিবৃতি এসেছে – এই ঘটনা কি শুধুমাত্র তৃণমূল পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গের? হাথরসের ধর্ষণ কভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের গ্রেফতারের ঘটনা ভুলে গেলেন? সেখানে তো সিদ্দিক কাপ্পানের মত সাংবাদিককে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করে দিনের পর দিন জেলে ভরে রাখা হয়েছিল।
একটি ভুল থেকে বাঁচতে আরেকটি ভুলকে হাতিয়ার করা ছেলেমানুষি ছাড়া কিছুই নয়। চোখে দেখা ছবি যদি শিহরণ জাগায়, তার পিছনে ঘটে চলা ঘটনাপ্রবাহ, যা সাধারণ মানুষ দেখতে পান না, তা আরও বিপজ্জনক। অনেকেই সন্তুর চ্যানেল রিপাবলিক বাংলাকে বিজেপির চ্যানেল বলে চিহ্নিত করে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গে চ্যানেলটির তীব্র শাসকবিরোধী অবস্থান এবং জাতীয় স্তরে বিজেপির প্রতি প্রবল সমর্থন এবং বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান দেখে এই সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনাকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
সন্তুকে গ্রেফতার করে আসলে সন্দেশখালিতে খবর করতে যাওয়া সমস্ত সাংবাদিককে পরোক্ষ হুমকি দেওয়া হয়েছে – আজ সন্তুর এই পরিণতি হয়েছে, কাল তোমারও হতে পারে। সুতরাং রয়ে সয়ে খবর করো। রিপাবলিক বাংলার পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতার কথা ভেবে খুব একটা কেউ উচ্চবাচ্য করবেন না বলেই হয়ত শাসক-প্রশাসন-পুলিস তাঁকে সহজ চাঁদমারি হিসাবে বেছে নিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এতটাই ঠুনকো ছিল আদালতে ধোপে টিকল না।
তবে ততক্ষণে কানাঘুষো বা ফোনে ফোনে বার্তা পৌঁছে গেছে – কোন কোন সাংবাদিক সরকারবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, কে ‘পাল্টি খেয়ে’ সরকারবিরোধী হয়ে গেছে, কে এতদিন সরকারকে সমর্থন করেও সন্দেশখালি নিয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছে, তার হিসাবনিকাশ কলকাতায় বসেই চলেছে সাংবাদিক মহলেও এবং শাসক মহলে। কারা কারা ‘পশ্চিমবঙ্গকে কালিমালিপ্ত করা’-র চেষ্টা করছে, চিহ্নিত হয়েছে সেইসব সাংবাদিকও।
তার দিনদুয়েক আগেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিস সোশাল মিডিয়া এক্সে বার্তা দিয়েছিল – তাদের কাছে সন্দেশখালির কোনো মহিলা যৌন নিগ্রহের অভিযোগ করেননি। কিন্তু তাহলে সংবাদমাধ্যমের কাছে সন্দেশখালির বেতাজ বাদশাদের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের ভুরি ভুরি অভিযোগ মহিলারা কী করে জানাচ্ছেন! সব নিশ্চয় ‘সাজানো’। সুতরাং মিথ্যা, ভুয়ো খবর ছড়ালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সন্দেশখালি নিয়ে ভুয়ো খবর যে একেবারেই ছড়ায়নি তা অবশ্য নয়। বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং সাইটে ঘুরলেই দেখা যাবে পুরনো সিনেমার ছবি বা পুরনো টিভি চ্যানেলের ফুটেজ তুলে এনে সন্দেশখালিতে মহিলাদের উপর অত্যাচারের ছবি বলে চালানো হয়েছে। তবে তা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে নয়, সোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু যখন একজন মহিলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে শেখ শাহজাহান, শিবু সর্দার, উত্তম হাজরাদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গোপন জবানবন্দি দিয়ে এলেন, তখন যেন পুলিসের অবস্থান খানিকটা বদলাল। শাসক দলের নেতারা অবশ্য তখনো গলা ফাটাচ্ছেন এগুলো সাজানো ঘটনা, এতদিন কেন অভিযোগ করা হয়নি ইত্যাদি বলে।
একথা ঠিক যে সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের অভিযোগ এলে প্রথমেই যে মাপকাঠিতে তথ্য খবর কিনা তা হিসাব করার রীতি চালু ছিল তা হল, পুলিসে অভিযোগ জানানো হয়েছে কিনা তা দেখা। পুলিসে অভিযোগ জানানো হলেই তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে খবর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হত। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার থেকেও প্রতিক্রিয়া নেওয়ার রীতি ছিল। এখন সাংবাদিকতা যেভাবে এগিয়েছে (বা পিছিয়েছে) তাতে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো অভিযোগ এলেই তা নিয়ে খবর হয়ে যায়। যাচাই করার আগেই শিরোনাম হয় সেই খবর। কখনো কখনো অভিযুক্তের বক্তব্য উল্লেখ করা দূরস্থান, তার অজ্ঞাতেই খাপ পঞ্চায়েত বসে যায় টিভি চ্যানেলে চ্যানেলে। কিন্তু সন্দেশখালিতে দলে দলে মহিলারা বলেছেন যে পুলিস তাঁদের অভিযোগ নেয় না। শাসক দলের নেতাদের কাছেই পাঠিয়ে দেয়। উপরন্তু জোর করে জমি নিয়ে নেওয়ার বহু অভিযোগও এসেছে সংবাদমাধ্যমের কাছে।
এক্ষেত্রে যদি পুলিস বা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিস্থিতির বিচারে একদল মানুষের অভিযোগ সামনে নিয়ে আসাই উচিত সাংবাদিকতা। এমন নয় যে একজন মহিলা এই অভিযোগ করছেন বা কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বসে এই অভিযোগ করা হচ্ছে। দলে দলে মহিলা একই অভিযোগ করছেন। সাংবাদিকরা গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, গ্রামবাসীদের বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন এবং তা দেখিয়েছেন দর্শকদের। পুলিস প্রশাসন এবং শাসক দলের নেতা, কর্মীরাও সেই দর্শকদের মধ্যে পড়েন।
এটা ঠিক যে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যাওয়া জোরালো ভাষায় এবং উচ্চস্বরে এই খবর প্রচারিত হয়েছে চ্যানেলে চ্যানেলে। উচ্চকণ্ঠে চ্যানেলে বিতর্কসভা করা শুধুই অ্যাঙ্কর-সাংবাদিক নয়, রাজনৈতিক নেতাদেরও স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নিজের বদনাম শুনতে কারোর ভাল লাগে না, আর সেটা যখন উচ্চস্বরে রাজ্য থেকে জাতীয় স্তরে সম্প্রচারিত হচ্ছে, সেই ভিডিও ফুটেজ সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে দেখলে ধৈর্য ধরে সংবাদমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করার মন্ত্র উচ্চারণ করা শাসক দলের পক্ষে খুব কঠিন কাজ।
কিন্তু সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন বলে সেই অভিযোগের তদন্ত করা যাবে না – এমন তো কোথাও লেখা নেই। অথবা সংবাদিকরা এই অভিযোগ দেখাচ্ছেন বলে সাংবাদিকরা দোষী হয়ে যাবেন – তাও তো ঠিক নয়। জনপ্রতিনিধি বা সরকার বা প্রশাসন, এমনকি বিরোধীরাও তাদের কাজ না করলে সংবাদমাধ্যমের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে। তাই তো মিডিয়াকে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ধামাধারী মিডিয়া এতই কালিমালিপ্ত হয়েছে গত এক দশক ধরে যে, সরকার (এবং হয়ত সাধারণ মানুষও) আর মিডিয়াকে পাত্তা দিতে চায় না বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
রাজ্য পুলিসের বর্তমান ডিরেক্টর জেনারেল রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে অতীতে যে অভিযোগই উঠে থাকুক না কেন, তিনি অত্যন্ত দক্ষ একজন অফিসার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং তদন্ত করা – পুলিসের এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ কাজেই তিনি পারদর্শী। তিনি যখন মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন, তখন সন্দেশখালিতে সাংবাদিকরা যে নির্জলা মিথ্যা আওড়াচ্ছেন তা নয়। রাজীবও নির্ঘাত বুঝেছেন পুলিস প্রশাসন এতদিন সন্দেশখালিতে নিষ্ক্রিয় ছিল। তাই তাঁকে নামতে হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের ভয় দেখানো তাতে বন্ধ হয়নি। এবিপি আনন্দের সুমন দে-কেও ভুল খবর দেখানোর অভিযোগে সমন পাঠানো হয়েছে জবানবন্দি রেকর্ড করতে।
আসলে ‘ফ্রি প্রেস’ বা মুক্ত সংবাদমাধ্যমের ধারণাতেই গলদ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতেই সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনতা দেওয়া রয়েছে। তবুও সেখানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প কথায় কথায় মিডিয়াকে ভুয়ো খবর ছড়ানোর অভিযোগে ‘ফেক মিডিয়া’ বলতে ছাড়েন না। ভারতের সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলাদা কোনো অনুচ্ছেদ বা ধারা নেই। একজন সাধারণ নাগরিক যেমন সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে বাকস্বাধীনতা বা মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা পান, একজন সাংবাদিকও তা পান। তাই সাংবাদিকরা সরকারের চোখে সাধারণ নাগরিকের থেকে বেশি কিছু নন। বরং ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে সাংবাদিকদের হাত-পা বাঁধা আরও জোরদার হয়েছে বিভিন্ন আইন ও তার নিয়মাবলী তৈরি করার মধ্যে দিয়ে।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের মালিকদের টিকিটা অধিকাংশ সময়েই বাঁধা থাকে শাসক দলের কাছে। কারণ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের মালিকদের খবরের কাগজ বা চ্যানেল ছাড়াও আরও অনেক ব্যবসা থাকে। আসলে দেশের সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগটাই এখন ভারতের সবচেয়ে ধনী শিল্পপতিদের হাতে। রাজনৈতিক নেতাদের পুঁজিও সংবাদমাধ্যমে ঢুকে পড়েছে বহুলাংশে। কাজেই নিজেদের ব্যবসা জলাঞ্জলি দিয়ে সরকারকে চটানোর মত কাজ তাঁরা করবেন কেন? তাই সরকারি মুখপাত্রের মত কাজ করাই তাঁরা শ্রেয় মনে করেন।
আরো পড়ুন সাংবাদিকতাকে বন্দি করেছে বিজ্ঞাপন
এঁদের মধ্যে অনেকে আছেন যাঁরা কেন্দ্র আর রাজ্য – দুই শাসক দলের পক্ষ নিয়েই খবর করতে বদ্ধপরিকর। আলাদা আলাদা দল সরকার চালালেও। তাই একটি মিডিয়া গোষ্ঠীর বাংলা চ্যানেল রাজ্যের শাসক দলকে তুষ্ট রাখতে বদ্ধ পরিকর হলেও, তাদেরই হিন্দি বা ইংরিজি চ্যানেল কেন্দ্রের শাসক দলের পক্ষ নিয়ে রাজ্যের শাসক দলের বিপক্ষে কথা বলতে দ্বিধা করে না। ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে খবর করার মূল উদ্দেশ্যই বানের জলে ভেসে যায়। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার ক্ষমতাই হারিয়ে যায় সেই সংবাদমাধ্যমগুলোর।
সংবাদমাধ্যমের মালিক-সম্পাদকরা শাসক দলের তামাক খেতে থাকলেও, তখন বিপদে পড়েন সন্তুর মত মাঠেঘাটে ঘুরে খবর করা সাধারণ সাংবাদিকরা। তাঁদের মালিক-সম্পাদকের সুরই ধরতে হয়, চ্যানেল বা কাগজের সম্পাদকরা যা চাইছেন তাই বলতে হয়। একটু এদিকওদিক হলেই সম্পাদকের ফোন চলে আসে মাঠেঘাটে কাজ করা সাংবাদিকদের কাছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল সেই সাংবাদিকের কোনো খবরকে সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল করলেই রাজরোষে পড়তে হয় সাংবাদিককে। কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধ মতের খবর করলেও সোশাল মিডিয়ায় চলতে থাকে প্রকাশ্য তিরস্কার। অনবরত হুমকি বা ‘ভালবাসার’ ফোন আসতে থাকে শাসক বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছ থেকেও।
আর বেশি বেগড়বাই করলেই (যেমন অনেক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে) লেলিয়ে দেওয়া হবে তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে। গ্রেফতার হবেন সম্পাদক-সাংবাদিকরা। বিবিসি থেকে নিউজক্লিক – একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ইতিমধ্যেই এক্সের পক্ষ থেকে বিবৃতি জারি করে অভিযোগ করা হয়েছে, ভারত সরকার সরকারবিরোধী টুইট মুছে দিতে বলছে, বেশকিছু হ্যান্ডেলকে ব্লক করে দিতে আদেশ দিচ্ছে।
এই জাঁতাকলে পড়ে খবর করার মূল নীতি ভুলে গিয়ে কোনো একটা পক্ষ নিতে বাধ্য হয় সাংবাদিকরা। শুধুই দুপক্ষের কথা তুলে ধরব এবং কোনো অবস্থান নেব না, বাকিটা মানুষ নিজে ঠিক করে নেবেন – এই সাংবাদিকতার দিন শেষ। মেরুকরণের বাজারে সাংবাদিকদের মেরুকরণও তীব্র হয়েছে। আগে বিভিন্ন মতের সমর্থনকারী সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা এবং যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক করতে পারতেন। সাংবাদিকরা নিজেরা কেউ কারোর দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতেন না বা কেউ কারোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দাদা-দিদিদের কান ভাঙাতে যেতেন না। মালিক-সম্পাদকদের মধ্যে যত মতভেদই থাকুক না কেন, মাঠেঘাটে কাজ করা সাংবাদিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল।
বাম আমলে সিপিএমের গুন্ডাদের হাতে মার খাওয়ার পর সিপিএমের পক্ষ নেওয়া সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা আহত সাংবাদিকদের শাসক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র লিখতে সাহায্য করছে বা নিজেদের গাড়ি করে আহত সহকর্মীদের হোটেলে পৌঁছে দিচ্ছে – এ ঘটনা অস্বাভাবিক লাগত না। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। এটা ঠিক যে আজকের মেরুকরণের মধ্যে পড়ে কোনো এক পক্ষের দিকে থাকতেই হবে সাংবাদিককেও। তবে সে অবস্থান হতে হবে সঠিক পক্ষের দিকে বা মানুষের ভালর দিকে। শুধুই দুপক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা নয়, কোন পক্ষ সঠিক কথা বলছে বা কোন পক্ষ সঠিক কথা বলছে না — তাও প্রমাণসহ ধরিয়ে দিতে হবে সাংবাদিকদের। মানুষের স্বার্থে কে ঠিক কাজ করছে বা ভুল, তাও দেখিয়ে দেওয়া সাংবাদিকের কাজ। তবে তার জন্য দুপক্ষের বক্তব্যই মন দিয়ে শোনা বা সেই বক্তব্য রেকর্ড করাই নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। তারপর তো সাংবাদিক পক্ষ নিতে বাধ্য।
অথচ ভারতের সাংবাদিকতায় এসব প্রায় উঠে গেছে। হয় মাঠেঘাটে সাংবাদিকতা করা সংবাদকর্মী তাঁর মালিক-সম্পাদকের থেকেও বেশি করে রাজনৈতিক নেতার ধামাধারী হয়ে উঠছেন, নয়ত এখনো সঠিক পক্ষ (যা অবশ্যই ঘটনা বা ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল) নিতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতা বা মালিক-সম্পাদকের চক্ষুশূল হয়ে উঠছেন।
প্রথম দলের সাংবাদিকরা যখন সাংবাদিকতাটাই ঠিক মত করছেন না, তখন দ্বিতীয় দলের সাংবাদিকদের হয় নিউজরুমে কোণঠাসা হতে হচ্ছে বা বদলি হতে হচ্ছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন কোনো কাজে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরি ছেড়ে দিতেও বাধ্য করা হচ্ছে। মালিক-সম্পাদকরা নিজেদের ‘সেটিং’ করে নিলেও সন্তু পানরা সফট টার্গেট হয়ে যাচ্ছেন।
ছবির বাইরে এরকম বহু ধূসর ঘটনা ঘটে চলেছে যা ছবির বাইরেই থেকে যায়। সন্দেশখালি বা হাথরস – সব এক। সংবাদমাধ্যমের চরিত্রও এক, শাসক দলের চরিত্রও এক। ভারত মিডিয়া স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে এমনি এমনি ১৬১ নম্বরে গিয়ে ঠেকেনি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।






