কী যে হয়েছিল স্বাধীনতার পরে প্রথম ২৫ বছরে! হয়ত সুচিত্রা সেন এসেছিলেন বা কানন দেবী চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এত বড় সত্য, যে চাঁদ আসে একলাটি আর নক্ষত্রেরা দল বেঁধে আসে, আমাদেরই চোখের সামনে দেখা যাচ্ছিল – আমরা সহসা ঠাহর করে উঠতে পারিনি। একদিকে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখের নব রুচি সৃজনের চেষ্টা, যাকে ফিল্ম সোসাইটি এবং শিক্ষিত জনসমাজ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল। অন্যদিকে উত্তম-সুচিত্রা বা উত্তম-সুপ্রিয়ার সূত্রে বাংলা সিনেমার স্টার সিস্টেম তুঙ্গে উঠেছিল। কিন্তু আমরা একথা অনেক সময় খেয়াল করি না যে কিছু অভিনেতা, অভিনেত্রী স্বগুণে অনেকটা রূপসী বাংলার লাবণ্যময়ী কিশোরীর মত বাংলা ছবিকে টেনে নিয়ে যেতেন। ফলে অভিনয় শব্দটার সব ধরনের ছবিতেই একটা অর্থ ছিল। সেই নটনটীরা শুধুই সেটে প্রপসের মত ব্যবহৃত হতেন না। এরকমই একজন, হয়ত অনেকের মধ্যে একজন – সন্ধ্যা রায়।

সন্ধ্যা সে অর্থে বাংলা ছবিকে বিপুল বাণিজ্যসফলতা দেননি। কিন্তু আজ যদি হিসাবনিকাশ করা যায় তাহলে দেখা যাবে, তিনি অনেক ছবিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন এক, দুই বা পাঁচ বছরের জন্য নয়। এক যুগ ধরে। যে অর্থে আনা কারিনা জঁ লুক গোদারের অভিনেত্রী বা মনিকা ভেত্তি মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনির, সে অর্থেই সন্ধ্যা বাংলা বাণিজ্যিক আটপৌরে সিনেমায় রাজেন তরফদার ও তরুণ মজুমদারের অভিনেত্রী। রাজেন সন্ধ্যাকে অন্তরীক্ষ (১৯৫৭) ছবিতে সুযোগ দিলেন। সেই সুযোগ থেকে একটি কারুচিত্র নির্মাণ করতে সন্ধ্যা ভুল করেননি। তবু তাঁকে জনারণ্যে প্রকট হতে আরও তিনবছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যখন পারলেন, তখনকার প্রেক্ষিতে তুলনা করলে অবাক হতে হয়। কারণ ১৯৬০ সালেই পরপর মুক্তি পায় সত্যজিতের দেবী, ঋত্বিকের মেঘে ঢাকা তারা, মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ এবং রাজেনের গঙ্গা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ছবিতে সন্ধ্যা, মৃণালের ছবিতে মাধবী মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিকের ছবিতে সুপ্রিয়া চৌধুরী এবং সত্যজিতের ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর যে অভিনয় রীতির প্রবর্তন করেন এবং বাকি তিনজনের সাপেক্ষে যেভাবে সন্ধ্যাকে আমাদের সাধারণ গেরস্থ বাড়ির সামান্য নারী বলে মনে হয়; তাতে বোঝা যায় যে তিনি ওরই মধ্যে একটি আলাদা পরিসর করে নিতে পেরেছিলেন। সেখানে হয়ত অভিনয়ের নানা ঐশ্বর্য আর দীপ্তি ছড়িয়ে নেই, কিন্তু অভিনেত্রীর উপস্থিতিটুকুই অনেককিছু ব্যক্ত করে দেয়। সেবছরই যখন সন্ধ্যা রোম্যান্টিক মায়ামৃগ ছবিতে অভিনয় করেন বা যখন পলাতক (১৯৬৩) ছবিতে কাজ করেন, তখন বোঝা যায় যে যাকে ‘গ্ল্যামার’ বলে বা স্টার সিস্টেমের যে বৈশিষ্ট্যগুলো, সেসব বাদ দিয়ে সন্ধ্যা আমাদেরই একজন হয়ে উঠছেন এবং বাঙালি তাঁকে মনোযোগ দিয়ে দেখছে। এই যে দেখা রাজেনের হাত ধরে অন্তরীক্ষ থেকে পালঙ্ক (১৯৭৫) অবধি চলল, বা যা তরুণের পলাতক থেকে শুরু হয়ে শ্রীমান পৃথ্বীরাজ (১৯৭২) পেরিয়ে দাদার কীর্তি (১৯৮০) অবধি চলেছে, তাতে আমরা বুঝেছি যে কেবল অভিনয় একটা ছবিকে কতখানি প্রভাবিত করতে পারে কাহিনিনিরপেক্ষ হয়ে। সন্ধ্যার বিশেষত্ব হল, তিনি সে অর্থে শারীরিক আবেদন বা আর্য সৌন্দর্যের পরোয়া না করে জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘বাসমতী চালে ভেজা শাদা হাতখান/রাখো বুকে, হে কিশোরী, গোরচনারূপে আমি করিব যে স্নান –’ বলার মত নারী হিসাবে প্রতীয়মান হন।

বাঘিনী (১৯৬৮) ছবিতে তিনি যে দর্পিতা গ্রাম্য রমণীর অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে, তা যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনই আশ্চর্য মণিহার (১৯৬৬)-এর মত একটি আপাদমস্তক বাণিজ্যিক ছবিরও সন্ধ্যার গুণে হলে ৭০ সপ্তাহ পার করে যাওয়া। এসব খেয়াল করলে বুঝতে পারি সন্ধ্যা আসলে কত গুরুত্বপূর্ণ। না বললে অন্যায় হবে যে সন্ধ্যা সাতের দশকে প্রায় আইকন হয়ে ওঠেন বাবা তারকনাথ (১৯৭৭) মুক্তি পাওয়ার পরে। তাঁর শাড়ি পরা, কাঁধে বাঁক নিয়ে তারকেশ্বর যাওয়ার ভঙ্গি লক্ষ লক্ষ নিম্নবর্গীয় বাঙালি মহিলাকে এক বিশেষ ধরনের জীবনচর্যায় প্ররোচিত করে। অথচ আমরা সন্ধ্যা, কাবেরী বসু, এমনকি অরুন্ধতী দেবীর মত অভিনেত্রীকে নিয়েও বিশেষ আলোচনা করিনি। একটুকু বাসা (১৯৬৫) ছবিতে সন্ধ্যা নববধূ হিসাবে যে অসামান্য পরিহাসপ্রবণ মাধুরীর অবতারণা করেছিলেন, তাকে নিয়ে কোনো কথা হয় না।

আরো পড়ুন অবিস্মরণীয় চুনীবালা: আমাদের আত্মার প্রতিমা

আজ আমাদের সিনেমায় নারীর ভূমিকা, নারী স্বাধীনতা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে অনেক কথা হয়। কিন্তু তৎসত্ত্বেও নারী যতটা পণ্য হিসাবে পরিবেশিত হয়, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, বালিকা বধূ (১৯৬৭), আরোগ্য নিকেতন (১৯৬৯) বা নিমন্ত্রণ (১৯৭১)-এ সন্ধ্যা কিন্তু মোটেই তেমন ছিলেন না। তিনি ছিলেন বলেই আমাদের মনে হত যে আমাদের একটি আঙিনা আছে, তাতে একটি তুলসী গাছ আছে। আমাদের উদার প্রান্তর আছে, সেখানে ফুলেশ্বরী (১৯৭৪)-র মত অভিমান নিয়ে সন্ধ্যাও আছেন।

এই স্বাক্ষর, এই লিরিকাল পয়ারের মত দক্ষতার আজ অবসান হয়েছে। আজ বয়স্ক সন্ধ্যা অনেকের কাছে রাজনীতির মানুষ হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা খেয়াল করি না যে সুচিত্রা, মাধবী, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী চ্যাটার্জি বা অপর্ণা সেনের বাইরে যেসব বাঙালি নটনটী অভিনয় করতেন তাঁরা সামান্য সুযোগেও কী অসামান্য অভিনয় করতেন। ইচ্ছে করেই এই আলোচনায় অশনি সংকেত (১৯৭৩) আনছি না, কারণ ওই সিঁদুর লেপ্টে যাওয়া সন্ধ্যা এক বিশেষ প্রতীক। কিন্তু তা সত্যজিতের সৃষ্টি। আমি বলতে চাইছি যে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণালের মহাভোজের বাইরে দাঁড়িয়েও এক দল শিল্পী অনেক সময় সাধারণ পরিচালকের হাতে পড়েও স্বাদু ডাল, তরকারি রান্না করতে পারতেন। সেগুলো আমাদের আদর্শ হিন্দু হোটেলে তৃপ্তি করে খাওয়া হত। আমাদের রান্নাঘরে লাউখোসার ছেঁচকি বা মোচার ঘন্টও সাজানো থাকত। তার নির্বিকল্প রাঁধুনি যাঁরা, তাঁদের অন্যতমা সন্ধ্যা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.