হকাররা কখনোই শহরকেন্দ্রিক মিডিয়া জগতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন না। গত ১২ জুন শিয়ালদহ-জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেস থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে রাকেশ ঘোষাল নামে এক রেল হকারের। রেল পুলিসের (আরপিএফ) বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাকে ধাক্কা মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার। এর আগেও এরকম একাধিক ঘটনায় মৃত্যু, অঙ্গহানি ঘটেছে রেল হকারদের। কমেনি রেল প্রতিরক্ষা বাহিনীর হকারদের উপর জুলুম, তোলাবাজির ঘটনা। রাকেশ দীর্ঘদিন ধরে রেল হকারদের অধিকারের দাবিতে লড়াই করা সংগঠন বঙ্গীয় হকার সম্মেলনের সদস্য ছিলেন। গত সোমবার, তাঁদেরই ডাকে, দোষী রেলরক্ষী বাহিনীর শাস্তির দাবিতে কয়েক হাজার রেল হকারের এক মিছিল হাওড়া স্টেশন থেকে ধর্মতলায় যায়। এই সময় কাগজ তাদের প্রতিবেদনে লেখে, ‘জাতীয় বাংলা সম্মেলনের আহ্বানে এই মিছিলের জেরে অফিস টাইমে প্রায় দশ মিনিট হাওড়া ব্রিজ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অফিস যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।’ এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, যে কর্পোরেট মিডিয়ার কাছে দিল্লির হিন্দি-হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীর হাতে বাংলার শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু ততটা জরুরি খবর নয়, যতটা অফিস ফেরত মধ্যবিত্তের হয়রানি। অথচ এই সপ্তাহে সারাদিনই শহর জুড়ে পথ হকার উচ্ছেদের পক্ষে বিবিধ যুক্তি সাজিয়ে সরগরম আলোচনার আসর বসাতে দেখা গেল এই সংবাদমাধ্যমগুলিকেই। যদিও এর বিপ্রতীপে দীপক ব্যাপারীর মত কিছু সাধারণ ইউটিউবার প্রতিদিনের রেলযাত্রীদের সঙ্গে হকারদের যে প্রাত্যহিক সহাবস্থানের সম্পর্ক তাকে তুলে ধরছেন। সেই ভিডিও থেকেই জানা যাচ্ছে, রেলের কামরা থেকে আরপিএফ হকারদের নামাতে এলে রুখে দাঁড়াচ্ছেন নিত্যযাত্রীরাই। বিধাননগরের হকারদের উপর যে পুলিসি আক্রমণ চলছে, তার গ্রাউন্ড রিপোর্টও রয়েছে দীপকের ইউটিউব চ্যানেলেই।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সপ্তাহের শুরুতে নিজের প্রশাসনিক বৈঠকে ফুটপাথ দখল করে অস্থায়ী দোকান বসানো নিয়ে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গড়িয়াহাটে হকার বসিয়েছেন। সে দিন ওয়েবেলের সামনের (বিধাননগর) রাস্তা দিয়ে আসছিলাম। দেখলাম একের পর এক দোকান বসিয়ে দিয়েছে। দেখতে ভাল লাগছে?’ মন্ত্রী সুজিত বসুকে বলেন, ‘রাজারহাটে সুজিত লোক বসাচ্ছে কম্পিটিশন করে।’ পুলিশকেও ভর্ৎসনা করেন মমতা। বলেন, ‘সবাই চোখে ঠুলি পরে আছে! কারও চোখে কিচ্ছু পড়ছে না। অবৈধভাবে তলার পর তলা উঠছে। দু-এক জনকে অ্যারেস্ট তো করুন! বেআইনি যদি হয়, স্টার্ট ফ্রম মাই হাউস। কেন বাইরের লোক বসবেন এখানে? একটা করে ত্রিপল লাগাচ্ছে, এক জন করে বসে পড়ছে।’ মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন, ‘এবার কি আমাকে রাস্তা ঝাঁট দিতে বেরোতে হবে? শুধু উপর দেখলে হবে? নিচে দেখতে হবে না?’ এরপরেই শুরু হয় পৌরসভা ও পুলিসের যৌথ অতিসক্রিয়তায় ‘অবৈধ’ দোকান ভাংচুর অভিযান। লাগাতার দুদিন ধরে কলকাতা, সল্টলেক ও নিউটাউনসহ রাজ্য জুড়ে হকারদের বিরুদ্ধে প্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করে পুলিস ও সংবাদমাধ্যমগুলি। কয়েকজন পথ হকারকে গ্রেফতারও করা রয়েছে। বিধাননগরে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আইনি স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও সল্টলেক ১৬ নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে বুলডোজার ব্যবহার করে হকারদের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নিউটাউন ডিএলএফ-১ পাঁচ নম্বর গেটের কাছে ১১ জন হকারকে উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদের বিরোধিতা করবার জন্য হকার সংগ্রাম কমিটির নেতা ভবতোষ সরকারকে বেআইনিভাবে পুলিস দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখে। রাত আটটার পর তাঁকে ছাড়া হয়। এছাড়াও পিজি হাসপাতালের সামনে ফুটপাথের খাবারের দোকানে গ্যাস না জ্বালানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
হকার সংগ্রাম কমিটি তথা ন্যাশনাল হকার ফেডারেশনের শক্তিমান ঘোষের অভিযোগ – এই অতিসক্রিয়তা পুলিস, আমলাতন্ত্র এবং স্থানীয় তোলাবাজদের এক ত্রিমুখী কাঠামোর মদতে হচ্ছে, যারা বছরে ২৬৫ কোটি টাকা তোলা তোলে গরীব হকারদের থেকে। তাঁর মতে, এই আকস্মিক আতঙ্ক নির্মাণের পিছনে ভারতীয় জনতা পার্টি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সমর্থনপুষ্ট কিছু আমলা ও পুলিস অধিকর্তার হাত রয়েছে। ‘প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং, ২০১৪’ অনুযায়ী জনপ্রতিনিধি, আমলা ও হকার প্রতিনিধিত্বের দ্বারা সম্মিলিতভাবে গঠিত টাউন ভেন্ডিং কমিটি ছাড়া আর কারোর কোনো পৌরসভা এলাকায় হকার বসানো বা হকার উচ্ছেদের অধিকার নেই। কিন্তু গত কয়েকদিনে সেই বিধি বলবৎ করার প্রচেষ্টা কম, বরং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা বেশি দেখা গেছে। যে প্রশ্নটি বেশি করে ওঠা প্রয়োজন তা হল, কেন প্রতিটি পৌরসভায় এখনো স্বচ্ছভাবে টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠিত হয়নি, কেন অন্যায্যভাবে ভারতীয় সংবিধানে দেওয়া মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত জীবন-জীবিকার অধিকার হনন করে হকারদের উপর বর্বর পুলিসি অত্যাচার চলবে? অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপের সময়ে (২০১৭) বিধাননগর অঞ্চলে রাজ্য সরকার কর্তৃক যে বিপুল হকার উচ্ছেদ হয়, তার বিরুদ্ধে হকার ইউনিয়নের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। সেই মামলার রায়ে ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ তারিখে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সুব্রত তালুকদার বলেছিলেন ‘till framing of the Rules by the State under the 2014 Act, the prohibition/imposition/the action impugned of the Respondent/Bidhan Nagar Municipality/State Respondents cannot/does not have the effect of bringing within its purview hawking/vending activity which is purely temporary/provisional and not by way of a permanent structure… This Court, having recorded and noticed the above factual/legal position on date, permits the Respondents Municipal/Police Authorities of Bidhan Nagar jurisdiction to treat the same as interim direction pending further/other orders.’ এরপরেও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল কেন? হকারদের দৈনন্দিন জীবনের দুর্বিষহতাকে আরও ত্বরান্বিত করার অধিকার কে দিল প্রশাসনকে?
পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার, বিশেষত সুভাষ চক্রবর্তী, প্রণীত বিশ্বায়নের পদানুসারী, শহরের চাকচিক্য বাড়ানো হকার উচ্ছেদ প্রকল্প অপারেশন সানশাইন ছিল নয়ের দশকের একটি ‘সাফাই’ প্রক্রিয়ার সূচনা, যা কলকাতাকে শ্রেণিভিত্তিক জনমুখী রাজনীতির ‘পতন’ থেকে পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন কলকাতায় ‘রাজনৈতিক গ্রাফিত্তি, ব্যানার, পোস্টার এবং দলীয় প্রতীকের রঙিন ছবি’ নিষিদ্ধ করে। একটি পুরনো পৌর আইন ব্যবহার করে, যা সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৌকর্য রক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে এক উত্তর সম্পাদকীয় প্রবন্ধে সমাজতাত্ত্বিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, রাজনৈতিক গ্রাফিত্তির উপর এই যে নিষেধাজ্ঞা, যা অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ ছিল, তাকে মুছে ফেলা আসলে আদালতের উচ্চপদস্থ একাংশ, আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি অংশ এবং ব্যবসায়িক অভিজাতদের মিলিত উদ্যোগ। যারা চায় এতদিন ধরে সর্বজনীন বলে চিহ্নিত রাজনৈতিক অঙ্গনকে ‘স্যানিটাইজ’ করার জন্য নাগরিকতার চিহ্নবাহী স্থানগুলিকে সমস্ত কোলাহল, দুর্গন্ধ এবং সংগঠিত ‘প্লেবিয়ান’ সংস্কৃতি থেকে মুক্তি দিতে। ওসব বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হতে চাওয়া ভারতের কাছে প্রতিবন্ধকতা হিসাবে দেখা দিয়েছে। তার ফলশ্রুতিতেই অপারেশন সানসাইন, শাইনিং ইন্ডিয়া প্রভৃতি শহুরে উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক কর্পোরেট অবধারণাগুলির জন্ম হয়।
আরো পড়ুন যানজট বাড়ায় প্রাইভেট গাড়ি, রাস্তা কারও একার নয়
সেই রেশ এখনো চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ বানাতে চান। তাঁরই প্রকল্প জি-২০ সম্মেলনের কথা মাথায় রেখে শহরে শহরে বস্তি উচ্ছেদ চলে। একথা স্মরণীয় যে আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ছিলেন অপারেশন সানশাইনের সময়ে বিরোধী দলনেত্রী। হকার সংগ্রাম কমিটির উত্থান ও সংগঠক হিসাবে শক্তিমানবাবুর ভূমিকা যেমন অপারেশন সানশাইনবিরোধী লড়াইয়ে লিপিবদ্ধ আছে, তেমনই আছে সেইসময় মমতার রাতের পর রাত গড়িয়াহাটের হকারদের পাশে দাঁড়ানোর আখ্যান। ক্ষমতার মায়াজাল কি তাঁকে এতটাই আবিষ্ট করেছে যে তিনি বিস্মৃত হয়েছেন, অপারেশন সানশাইন পরবর্তী সময়ে শিয়ালদহ স্টেশনের চেহারা, আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হওয়া হকার বুলু পোদ্দারের কথা, একাধিক জনসভার কথা – যেখানে তিনি অজস্র ফুটপাথবাসীর অধিকারের কথা বলতেন? আসলে হকার নামক শ্রমগোষ্ঠীকে দৃশ্যমান নয়, অদৃশ্য করে দেওয়ার প্রয়াস হচ্ছে। সামাজিক পরিসরগুলিকে জনসাধারণের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার এবং ব্যক্তিগত মালিকানায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। সামাজিক স্থানের ভোক্তা-সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া সরকারি মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানার পার্থক্য ঘুচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ডিজিটাল শপিং-উইন্ডো এবং ছন্নছাড়া গিগ শ্রমিক, ডেলিভারি বয়ে ছেয়ে যাওয়া শহর পুরো কলকাতারই একটি ঝাঁ চকচকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে। মমতা হয়ত আপাতত হকার উচ্ছেদে লাগাম দিলেন, কিন্তু বিপ্রতীপে সমাধান হিসাবে উঠে এল বহুনিন্দিত কর্পোরেটিয় পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেল। সেখানে কতটা ‘পাবলিক’ এবং কতটা ‘প্রাইভেট’ সহাবস্থান থাকবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







