গত কয়েকবছর ধরে দাবি উঠেছে, ইউরোপীয় ফুটবলের ধাঁচা অনুসরণ করে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা (ফিনানশিয়াল ফেয়ার প্লে) চালু করা হোক। অর্থাৎ ফুটবল ক্লাবগুলি মূলত ফুটবলার কেনাবেচায় এবং ক্লাবের অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যয়ে একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এতে ক্লাবগুলির আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, ক্লাবগুলির মধ্যে গুণগত সামঞ্জস্য বজায় থাকবে এবং লিগের প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য থাকবে। কিন্তু এআইএফএফ বা এফএসডিএল এখন পর্যন্ত তেমন কোনো নিয়ম চালু করেনি। ফলে দুটি বিশেষ কর্পোরেট সংস্থা যথেচ্ছ অর্থ বিনিয়োগ করে বিদেশি ফুটবলার আমদানি করছে। নাম কা ওয়াস্তে যে বেতনসীমা (স্যালারি ক্যাপ) ফুটবল সংস্থার নিয়মে রয়েছে, তাকে কাঁচকলা দেখানোর অভিযোগ উঠছে প্রতি মরসুমেই। ওই দুটি কর্পোরেট মালিকানাধীন ক্লাবের সাফল্যে তাদের সমর্থকরা খুশি, ক্লাব মালিকের অহংও তাতে তুষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এতে ভারতীয় ফুটবল লিগের প্রকৃত উন্নতি হচ্ছে কি? বা ভারতীয় ফুটবলারদের? আইএসএল ২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল ক্রিকেটের আইপিএলের প্রতিরূপ হিসাবে। ফ্র্যাঞ্চাইজ, মালিকানা, শহরভিত্তিক দলগঠন ইত্যাদি প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু আইপিএলের জনপ্রিয়তার ধারে কাছেও পৌঁছতে পারেনি আইএসএল। ফলে ক্রীড়াক্ষেত্রে অভিযোজিত হতে কিছু নিয়ম বদল করতে হয় এফএসডিএলকে। আইএসএলের সঙ্গে আইপিএলের অনেক পার্থক্যের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য ছিল – আইপিএলে খেলোয়াড় নিলাম হয়। প্রত্যেক ফ্র্যাঞ্চাইজের সমান সুযোগ থাকে প্রয়োজন মত ক্রিকেটার খরিদ বা বিক্রি করার। ফলে প্রত্যেকটি শহরভিত্তিক দলের গুণগত মানে আপাত ভারসাম্য বজায় থাকে।

কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজ-প্রধান লিগ হওয়া সত্ত্বেও আইএসএলে এই খেলোয়াড় নিলামের সুবিধা নেই। ফলে দলগুলির মধ্যে ভারসাম্য নেই। আর গত কয়েক বছরে শহরভিত্তিক দলগঠনের ধাঁচা থেকেও বাধ্যত এফএসডিএলকে সরতে হয়েছে কারণ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ফুটবলে নেই। কলকাতার দুই শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাবকে আইএসএলে অন্তর্ভুক্ত করাতে চাওয়ার কারণ বাংলার টিকে থাকা ফুটবল সমর্থকদের সমর্থনভিত্তিকে আইএসএলের মুনাফায় রূপান্তরিত করা। দুই দলের একটি এটিকে ফ্র্যাঞ্চাইজের (ওই বিশেষ দুটি কর্পোরেটের একটির মালিকানাধীন) সঙ্গে সংযুক্তির মাধ্যমে আইএসএলে খেলছে। ইতিমধ্যে তিনবার সেই কর্পোরেট দলের নাম বদল হয়ে গেছে। প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক শ্যামসুন্দর ঘোষের লেখা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কলকাতার আরেকটি শতাব্দীপ্রাচীন দল ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি দিয়ে একাধিক বিনিয়োগকারী সংস্থার কাছে পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন করছে। গত মরসুম থেকে এফএসডিএল আবার নিয়ম বদলেছে – আই লিগের সেরা দল সরাসরি আইএসএলে খেলতে পারবে। ফুটবল এই মুহূর্তে ভারতে খুব অর্থকরী খেলা নয়। অন্তত ফুটবল ম্যাচের টিকিট বেচে আর সম্প্রচারের স্বত্ব বেচে এফএসডিএল বা ক্লাব, কেউই খুব লাভবান হয় না। আইএসএলের একাধিক ক্লাবের মালিক ফুটবলে বিনিয়োগ করতে আর আগ্রহী নন। আইএসএলের প্রথম মরসুমে ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে দলের মালিক হিসাবে একজন করে চিত্রতারকা বা ক্রিকেট তারকার নাম শোনা গেছিল। যেমন কেরালা ব্লাস্টার্সে শচীন তেন্ডুলকর, এটিকে কলকাতায় সৌরভ গাঙ্গুলি, চেন্নাই সিটি এফসিতে অভিষেক বচ্চন, নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড এফসিতে জন আব্রাহাম, এফসি পুনে সিটিতে অর্জুন কাপুর প্রমুখ। ধীরে ধীরে সেই তারকারা নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। গত মরসুমে হায়দরাবাদ এফসির আর্থিক দুরবস্থা কমবেশি সকলেরই জানা। এফসি পুনে সিটি ২০১৪ থেকে আইএসএলে খেলা শুরু করে, ২০১৯ সালে ওয়াধওয়ান গ্রুপ আর্থিক দুরবস্থার কথা জানিয়ে দলটি তুলে নেয়। ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর মালিকরা বিনিয়োগ করে কিছু স্বার্থসিদ্ধি না হলে আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে দেশের ফুটবলের স্বার্থে দল টিকিয়ে রাখার দায়বদ্ধতা মোটেই দেখাবেন না। অন্তত চার্চিল আলেমাও, ধীরেন দে, অজয় শ্রীমানী, সুপ্রকাশ গড়গড়ি, ডেম্পো সু’জা, লালা দ্বারকা দাসের মতো ফুটবল অন্তপ্রাণ এবং দায়বদ্ধ ক্লাব মালিক হওয়ার যোগ্যতা বা গুণ, কোনোটাই আইএসএল ফ্র্যাঞ্চাইজ মালিকদের নেই। অথচ এঁদের হাতেই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা লিগটাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইগর দুবছর আগে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন যে আইএসএলে যে যার নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে এসেছে। এভাবে ভারতের ফুটবল আরও দশবছর পিছিয়ে যাচ্ছে।

এফএসডিএল তৈরি হয়েছে ২০১৩ সালে। রিলায়েন্স গ্রুপ এই সংস্থার ৬৫% মালিকানা নিয়ে রেখেছে। ২০১০ সালে তৎকালীন এআইএফএফ সভাপতি কুশল দাসের উদ্যোগে ৭০০ কোটি টাকার বিনিময়ে ১৫ বছরের চুক্তি হয় রিলায়েন্স এবং ফেডারেশনের। হিরো মোটোকর্প ২০২২-২০২৩ মরসুমের পরেই আইএসএলের টাইটেল স্পনসরশিপ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। ভারতীয় ফুটবল সংস্থা আয়োজিত অন্যান্য প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষকতা থেকেও তারা সরে গেছে। উল্লেখ্য, এখনো আইএসএলের নতুন টাইটেল স্পনসর খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত মরসুম শুরুর আগে পর্যন্ত সম্প্রচার স্বত্ব নিয়েও বেশ জটিলতা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ৫৫০ কোটি টাকার ভিত্তিমূল্যে ভায়াকম১৮ ২০২৪-২৫ মরসুম অবধি আইএসএলের সম্প্রচার স্বত্ব কেনে। তাৎপর্যপূর্ণ এই যে, ভায়াকম১৮-এর ৫৭.৪% মালিকানা রিলায়েন্সের। তার মানে কি অন্যান্য সম্প্রচারমাধ্যমগুলি আইএসএলে আগ্রহ হারিয়েছে বলেই ‘হাতের পাঁচ’ ভায়াকম১৮ এবং জিও সিনেমা সম্প্রচারের দায়িত্ব পেল? ২০২৬ সালে এফএসডিএলের সঙ্গে এআইএফএফের চুক্তি শেষ হচ্ছে। তারপর? কর্পোরেটখচিত এবং মুষ্টিমেয় শিল্পপতির নিয়ন্ত্রণাধীন আইএসএলের গ্যাসবেলুন কি আর উড়বে, নাকি আবার সর্বভারতীয় ফুটবল লিগের কাঠামোয় বদল আনতে হবে?

আরো পড়ুন শুনশান বড় ম্যাচ শাক দিয়ে মাছ ঢাকা বন্ধ করে দিল

এতদিনে দ্বিতীয় স্তরের প্রতিযোগিতা হয়ে গেছে আই লিগ। অথচ সেই লিগ নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত। আই লিগের একাধিক ফুটবলারের কাছে ম্যাচ গড়াপেটার প্রস্তাব গিয়েছিল, একথা স্বয়ং ফেডারেশন সভাপতি স্বীকার করে নিয়েছিলেন এবং তদন্ত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। রাজ্যস্তরের বিভিন্ন লিগের খেলায় গড়াপেটা হয়েছে – এই অভিযোগ বহুবার প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৮ সালে তৎকালীন নামী দল মিনার্ভা পাঞ্জাব অভিযুক্ত হয়েছিল। দিল্লির লিগ ম্যাচে আহবাব এফসি, রেঞ্জার্স এফসি ইত্যাদি ক্লাবের নাম জড়িয়ে পড়েছে গড়াপেটায়। এমনকি নেরোকা এফসির মত ফুটবল ক্লাবের প্রধানের দিকেও অভিযোগের আঙুল উঠেছে। দেশের ক্রীড়াব্যবস্থার ভিত রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতা, আই লিগের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। সেখানে বারবার গড়াপেটার অভিযোগ, দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে, অথচ কর্তারা দ্রুত যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছেন না – এটা দুর্ভাগ্যজনক। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল ভুগতে হচ্ছে ভারতীয় ফুটবলকে। ভারতীয় ফুটবলের কর্পোরেটায়ন করায় কর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যতটা আগ্রহী, ততটা আন্তরিকতা বোধহয় তৃণমূল স্তরের লিগ ও প্রতিযোগিতা পরিচালনায় নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সক্রিয় ভূমিকাও চোখে পড়ে না। বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থায় নিজেদের দলীয় প্রার্থী বা প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে বসিয়ে রাখতে শাসক দল যতটা সক্রিয়, তার সিকি ভাগ সক্রিয়তা যদি পরিকাঠামো উন্নয়নে আর অসাধু বিতাড়নে দেখাত, তাহলে ভারতের জাতীয় পুরুষ ফুটবল দল হয়ত এশিয়া স্তরে কহতব্য ফলাফল করত।

#

ইগর বিদায় হলেন। ভারতীয় ফুটবলের বিশেষ উন্নতি তিনি করতে পারেননি। বরং অনেকক্ষেত্রে তাঁর বাগাড়ম্বর আর পশ্চাৎপদ মানসিকতা ফুটবলের ক্ষতি করেছে। কিন্তু ইগরকে বরখাস্ত করে ভারতীয় ফুটবলকর্তারা ভারতীয় ফুটবলকে স্বস্তি দিতে পারলেন কি? তাঁর অভিযোগের প্রতিযুক্তি সাজিয়ে প্রাণপণে শীর্ষকর্তাদের অপাপবিদ্ধ প্রমাণ করতে চাইল এআইএফএফ। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের গভীর অসুখ তাতে কিছুমাত্র সারল কি? কর্তাদের রাজনৈতিক যোগ, তাঁদের দুর্নীতি, অগ্রজ ফুটবলারদের লবিবাজি এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আখের গোছানো ভারতীয় ফুটবলের পুরনো ধারা। আমরা ফুটবলপ্রেমীরা সব জেনে বুঝেও মেনে নিই অথবা প্রিয় ক্লাবের জয়-পরাজয়ে সন্তুষ্ট থাকি, ভারতীয় ফুটবল পিছিয়ে যায়। বিশ্বকাপে খেলার প্রত্যাশা আরও অন্ধকারে চলে যায়। আর কতদিন পরে আলো দেখা যাবে ভারতের পুরুষদের জাতীয় দলে?

প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.