উত্তমকুমারের জন্মের একশো বছরে, বলা ভাল তার আগের দিন (২ সেপ্টেম্বর), ভবানীপুর পাড়াটা একটু দেখতে গেছিলাম। কেমন ছিলেন উত্তমকুমার? যে বাসস্টপে নামলাম তাকে ‘পূর্ণ’ বলা হয়। বাঁদিকে তাকিয়েই মনখারাপ হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে রয়েছে, চুন বালি খসে গেছে। কোল্যাপসিবল গেটের অন্তরালে সেই বিখ্যাত সিঁড়িটিকে দেখলাম যা দিয়ে উত্তমকুমার, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ওঠানামা করতেন। এখানে সত্যজিৎকে কতবার সিগারেট ধরাতে হয়েছে পাশের দোকানে। এখানে উত্তমকুমার নেমে ভিড় এড়িয়ে চট করে উঠে পড়েছেন উলটোদিকের কোনো গাড়িতে। এখানে নিজের ছবি দেখতে কত নায়ক নায়িকা এসেছেন। সেই হল আজ মৃত পুরীর মত। আমার হঠাৎ গুরুদত্তের কাগজ কে ফুল (১৯৫৯) ছবিটির কথা মনে পড়ল। সেই একইরকম স্তব্ধ স্টুডিও। স্টুডিও যুগ শেষ হচ্ছে, পূর্ণ সিনেমাকে দেখে মনে হল – আমাদের সিঙ্গল স্ক্রিন বোধহয় শেষ হয়ে গেল।

এই পূর্ণই তো ছিল দক্ষিণ কলকাতার প্রথম প্রেক্ষাগৃহ। ‘রসা থিয়েটার’ ছিল তার নাম, পরে হল পূর্ণ। ‘ভারতী’ উঠে গেল। ‘উজ্জ্বলা’ তার বিখ্যাত চানাচুর ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে টিমটিম করে জ্বলছে, কিন্তু মূল প্রেক্ষাগৃহটি এখন বোধহয় বিউটি পার্লার। ‘রুপালি’ শেষ হয়ে গেছে কবে! ‘কালিকা’ আর নেই, ‘রূপায়ণ’ আর নেই। এই নেই সংবাদের তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই। আসলে আমাদের হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দিন সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে!

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিভূতিভূষণের অপু কলকাতা শহরে এসে, মেসে আশ্রয়দাতা অখিলবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিল – বায়োস্কোপ যেখানে হয়, এখান থেকে কতদূর? গ্রাম থেকে শহরে আসার এই গল্পে, এই নাগরিকতার সূচনায় সারা পৃথিবীতে সিনেমা যে আধুনিকতার হস্তক্ষেপ, এ নিয়ে তাত্ত্বিকরা ওয়াল্টার বেঞ্জামিন প্রমুখ মহাজনদের শরণ নিতেই পারেন। কিন্তু যা কৌতূহল জাগায়, তা হল অপুর দেওয়ানপুর স্কুলের ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র, কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে ঠাঁই পাওয়া শুরু করল বিশ শতকের গোড়া থেকেই। তখন, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাচ্ছেন, বাংলা ছবির আদি পর্বে যাদের সবচেয়ে বেশি রমরমা সেই ম্যাডানরা তৈরি করলেন ‘এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস’।

বাঙালি বিদ্দ্বজ্জনদের কাছে মধ্য কলকাতার সাহেবপাড়াই হয়ে উঠল ছবির ঠিকানা। উত্তরে অবশ্য কিছু ‘ছবিঘর’ ছিল। যেমন, মেছুয়াবাজারের ‘নিউ ইলেকট্রিক থিয়েটার’ বা অধুনা বিধান সরণীর ‘কর্নওয়ালিশ’। যেমন একবার সেখানে দেখানো হল সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র। আরেকবার আট রিলের নির্বাক মহাভারত। কিন্তু এইসব চিত্রমালা গৃহস্থ বাবুদের লঘু পথ্য, শহুরে লোকনাট্য। যাঁরা সিনেমার জাত দর্শক তাঁরা সাহেবপাড়ার আশপাশের প্রেক্ষাগৃহে আগত বিদেশি ছবিই পছন্দ করতেন। উচ্চবর্গীয় সাংস্কৃতিক প্রতিভারা – কালিদাস নাগ বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় – কখনো দেশি ছবিতে আগ্রহী ছিলেন না। কালিদাস পছন্দ করতেন ‘এম্পায়ার থিয়েটার’ আর শরদিন্দু পছন্দ করতেন ‘বিজু’। এম্পায়ার পরে সাজসজ্জা বদলে ‘নিউ এম্পায়ার’ হয়ে যায়, আর বিজুর নাম পালটে হয়ে যায় ‘গ্লোব’। শরদিন্দুর সময়ে অবশ্য বিজু লিন্ডসে স্ট্রিটে ছিল না, ছিল কর্পোরেশন স্ট্রিটে; সম্ভবত ‘রক্সি’-র পাশে। কবিরা সিনেমাকে তেমন পাত্তাই দিতেন না। সুধীন্দ্রনাথের সিনেমা-য় বা বিষ্ণু দে-র জন্মাষ্টমী-তে যে ‘জনাকীর্ণ রঙ্গালয়’ বা ‘বিদেশিনী মহাশ্বেতা’-র কথা বলা হয়েছে, তাঁরা তেমন সমীহ উদ্রেক করেন না। শুধু বুদ্ধদেব বসু ছিলেন ‘মেট্রো’-র উচ্ছ্বসিত ভক্ত। তিথিডোর উপন্যাসে স্বাতী পল মুনির ছবি দেখতে দেখতে ভাবে – ‘যা দেখছে তা তো ভালোই, যেখানে বসে দেখছে তা-ও ভালো লাগল। মেট্রোর দোতলায় আগে আর আসেনি সে। এতক্ষণে বুঝল চেয়ারটা কত আরামের, পিঠে কত নরম, হাঁটু রাখার জায়গা কত, কার্পেট-মোড়া গলি, সোনালি সিলিং, দেয়ালে ছবি। লোকে ছবি দেখবে অন্ধকারে বসে তো। তবে আর ওসব কেন? ওসবের জন্য, স্বাতীকে মানতেই হল, ছবিটা ভালো লাগে আরো…।’

আরো পড়ুন আয়নায় মধ্যবিত্ত: তপন সিংহ

আরও অনেক পরে আমাদেরও মুগ্ধ করেছিল ওই সুন্দর ষড়যন্ত্র। লবিতে ডগলাস ফেয়ারব্যাংকস, মেরলিন দিয়েত্রিচের ছবি – ‘এলিট’, ‘মেট্রো’, ‘গ্লোব’, ‘নিউ এম্পায়ার’ বা ‘লাইট হাউস’-এ ছোট কিন্তু পরিচ্ছন্ন পান-পরিসর। তখনো কলকাতার চোখ এত দুঃস্থ হয়ে যায়নি। আমরা মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনির ব্লো আপ (১৯৬৬) দেখেছিলাম মেট্রোতে, এলিটে লুচিনো ভিসকন্তির আউটসাইডার (১৯৬৭)। নিউ এম্পায়ারে ছিল ‘মজা’ – ৭৫ পয়সার সবচেয়ে কম দামি টিকিটে সাতের দশকে দৌড়ে চারতলায় ওঠা। সেখানে অলিখিতভাবে ধূমপানের অনুমতি ছিল। ডেথ ইন ভেনিস (১৯৭১) দেখতে দেখতে সিগারেট আমরা ঠোঁটছাড়া করিনি। সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত ছিল ‘টাইগার’। আজ দোকান। তারাও ক্লোদ ল্যলুশের নারী-পুরুষ দেখাত। আসলে কলকাতা সত্যিই ভিতর থেকে বিলাসী ছিল।

অবশ্য যারা শেকলে বাঁধা, যেমন ‘উজ্জ্বলা’, ‘পূরবী’ বা ‘শ্রী’, ‘প্রাচী’, ‘ইন্দিরা’, সেসব ছবিঘর ছিল আপামর বাঙালির। সত্যজিৎকে আমরা ভবানীপুরে ‘বিজলী’ বা ইন্দিরায় বহুদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি নিজের ছবির শো চলছে বলে। পয়লা বৈশাখ ঋত্বিকের মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) মুক্তি পেল ইন্দিরায়। এ তো নিয়মই ছিল, যে বিয়ের পরে দ্বিরাগমনে গিয়ে নতুন জামাই নতুন পাঞ্জাবি পরে বাচাল শালা শালীদের নিয়ে ছবিঘরে যাবেন এবং তারপর হাজরা মোড় কি শোভাবাজারে কবিরাজি কাটলেট খেয়ে ফিরবেন। আর, তখনো চলচ্চিত্রিত বিনোদনের তো একটা সার্বজনীনতা ছিল। দল বেঁধে ছবি দেখতে যাওয়া যেত। সেই ভিড় উত্তম-সুচিত্রা, ভানু-জহর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ভালবাসত। কে ছিল না তাতে? ছাত্র ও কেরানি, প্রেমিক যুগল, প্রৌঢ় দম্পতি ও থানপরা বৃদ্ধা। নির্জন সৈকতে (১৯৬৩) নাইট শোতে দেখার পরে রাসবিহারীর নির্জন ট্রামলাইন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবা-মা ফিরে এল – মনে হয় সেদিনের ঘটনা। পাড়ার হল, যেমন চেতলার রূপায়ণ বা কালীঘাটের কালিকায় মেয়েদের জন্য পাঁচ আনার টিকিটে বসার জায়গা ছিল স্বতন্ত্র। ছিল স্বতন্ত্র স্তন্যদানের জায়গাও।

তারপর হিন্দি সিনেমা সরিয়ে দিতে শুরু করল বাংলা ছবিকে। ‘বসুশ্রী’-র মেঝে ঝনঝন করে ওঠে মহম্মদ রফির ‘কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা’ গানের পরে ছুড়ে দেওয়া সিকি আধুলিতে। রবিবারে মর্নিং শো, বিলিতি ছবি, বাড়ি ফিরে আলু-পাঁঠার মাংসের ঝোল। ওই বসুশ্রীতেই একদা মুক্তি পেয়েছিল পথের পাঁচালী (১৯৫৫)ওখানেই মুক্তি পায় অযান্ত্রিক (১৯৫৮)। এই বসুশ্রীতেই দো অনজানে (১৯৭৬) ছবির শুটিং উপলক্ষে এসেছিলেন অমিতাভ বচ্চন আর রেখা। এই হলটি এখনো টিমটিম করে টিকে আছে।

আরেক ধরনের হল ছিল, যেমন ‘মুনলাইট’ বা ‘তসবীর মহল’। বিস্তর আয়না, কলকা করা নীল-সবুজ নকশার দেওয়াল। রিকশা থেকে নেমে বোরখা পরে কেউ ঢুকে পড়ত। অনস্বীকার্য যে আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানের ভেদাভেদই তাঁবু থেকে হল, আর মেট্রো থেকে পূরবীকে আলাদা করেছিল। হলে ছবি দেখা তবু অনেকটাই যৌথ অভিজ্ঞতা। প্রায় জাদুবিদ্যা। অন্ধকার-স্তব্ধতা-গর্ভগৃহ যেন, মাঝে মাঝে শ্বাস প্রশ্বাসের ধ্বনি, একটু ফিসফাস: ‘আঃ! দাদা, কী হচ্ছে?’ সব মিলিয়ে দেখার অভিজ্ঞতাটাই, ফিস্তাঁ মেৎজ প্রমুখ তাত্ত্বিকদের প্ররোচনা ছাড়াই বুঝেছিলাম, মূলত যৌন। আর ‘ইন্টারভ্যাল’ ছিল রতিবিরতি, চানাচুর ও চিপস – বাথরুমে যাওয়া, পর্দা সরে গেলে স্বপ্নহীন কলকাতা।

দিন, ঋতু, ক্ষণ থমকে আছে সিন্থেটিক আবহাওয়ায়। আজকের মাল্টিপ্লেক্স হয়ত প্রাচুর্যকে সংরক্ষিত রেখেছে, কিন্তু ‘দেখা’-কে? হল ছিল মনোযোগের জায়গা আর মাল্টিপ্লেক্স তো সংগঠিত অন্যমনস্কতা। আসনের নিচে বাতি, আসনের হাতলে পানীয়, আসনে আসনে জ্বলতে থাকা মোবাইল পর্দা, চঞ্চল দর্শককুল চাপা গুঞ্জনে। এখানে ছায়াছবি গৌণ। ভ্রমণ ও দোকানবিলাসের অন্তর্বর্তী স্তর এই মাল্টিপ্লেক্স, রোলাঁ বার্থের কথায় ‘পরিবাহিত অচলতা’ – এক ধরনের উইন্ডো শপিং। অন্দরে ফ্যান্টাসমাগোরিয়া, সিঁড়ি ওঠানামায় চলমান অশরীরী।

অপু আর অপর্ণা এই শপিং মলে সিনেমা দেখতে আসবে তো আর?

মতামত ব্যক্তিগত

দেখুন বাংলা সিনেমা নিয়ে আমাদের পডকাস্ট

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.