শাওন
আজ থেকে নয়া ফৌজদারি আইন বলবৎ হতে চলেছে। ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়ান পেনাল কোড, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর এবং ইন্ডিয়ান এভিডেন্স অ্যাক্টকে বাতিল করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস), ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস) এবং ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (বিএসএ) সংসদে পাস করানো হয়েছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কেমন হবে মূলত তার একটি দিক ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয়। নতুন আইনগুলিতে অযথা ধারা অদলবদল করা ছাড়া পুরনো আইন প্রায় ৮৫% অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে, তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শুধুমাত্র জরুরি অবস্থার সময়ে পুলিস ও সরকারের দ্বারা নাগরিকের সবরকম বাকস্বাধীনতা হরণ করার যে বল্গাহীন ক্ষমতা দেওয়া থাকত, সেই ক্ষমতা সাধারণ অবস্থাতেই সরকার ও পুলিসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনিতেই ক্ষমতার ভারসাম্যের নিরিখে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিপুল অসাম্য ছিল। নতুন ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে সেই অসাম্য এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যে ক্ষমতার বিরুদ্ধতায় যে কোনো অহিংস গণসক্রিয়তাকেও পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া যায়। এক কথায় এই নতুন ফৌজদারি আইনগুলি ঔপনিবেশিক আইন থেকে মুক্তি দেওয়ার নামে ভারতকে সমস্তরকম বিরোধী কন্ঠস্বরশূন্য গণউদ্যোগবিহীন পুলিস রাষ্ট্র বানানোর যন্ত্র। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে নতুন আইনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গোড়ায় আঘাত
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মূলত পাঁচটি পক্ষ জড়িত থাকে। (১) বাদী (prosecution) – অর্থাৎ পুলিস বা তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ, যারা অভিযোগ প্রমাণ করবে; (২) প্রতিবাদী (defence) – অর্থাৎ অভিযুক্তের পক্ষ; (৩) অপরাধের শিকার (victim); (৪) সাক্ষী (witness), যা বাদী ও প্রতিবাদী – দুই তরফেরই থাকতে পারে এবং (৫) বৃহত্তর সমাজ। ন্যায়শাস্ত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বুনিয়াদি নীতিগুলি বলে – (১) অভিযোগ প্রমাণ না করে কাউকে সাজা দেওয়া যাবে না; (২) অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য অধিকার আছে; (৩) যতক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সে নির্দোষ এবং অভিযোগ প্রমাণ করার দায় প্রসিকিউশনের; (৪) জামিনই নিয়ম, আটক রাখা ব্যতিক্রম।
বাদী যেহেতু রাষ্ট্রের অংশ, তার ক্ষমতা বাকিদের চেয়ে যেহেতু বহুগুণ বেশি, তাই তার উপর বেশি দায়িত্ব চাপানো থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই কারণে ন্যায়শাস্ত্রের গোড়ার কথা হল, ফৌজদারি আইনের ধারাগুলিতে অপরাধকে সুনির্দিষ্ট ভাষায় সংজ্ঞায়িত করতে হবে। তার মধ্যে যেন কোনো অস্বচ্ছতা না থাকে। কোনো একটি ধারায় অপরাধের সংজ্ঞায় অস্বচ্ছতা থাকলে, অপরাধ না করলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে অহেতুক তাকে ওই নির্দিষ্ট ধারায় অভিযুক্ত করতে পারে পুলিস, যেহেতু মামলা করার ক্ষমতা পুলিসের হাতে। একথা এতই সুপরিচিত যে যদি ফৌজদারি আইনের ধারায় অপরাধের সংজ্ঞার ভাষায় অস্বচ্ছতা থাকে, তাহলে স্পষ্ট বুঝতে হবে ওই কাণ্ডটি নির্দিষ্টভাবে পুলিসকে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দেওয়ার জন্যই করা হয়েছে।
নতুন ফৌজদারি আইনগুলি এই প্রত্যেকটি বুনিয়াদি নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। বিএনএসের ১১১ নম্বর ধারায় ‘সংগঠিত অপরাধ’-কে (organised crime) এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যাতে প্রায় যে কোনো সরকারবিরোধী কণ্ঠস্বরকেই এই ধারার আওতায় ফেলে দেওয়া যাবে। এর মধ্যে যার বিরুদ্ধে কোনো কোর্টে একাধিক চার্জশিট জমা পড়বে তাকেই ‘ধারাবাহিক বেআইনি কাজকর্ম’ (continuing unlawful activity)-এর সঙ্গে যুক্ত বলে গণ্য করা যাবে। অর্থাৎ দোষী প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই, একাধিক অভিযোগ আনলেই হল। এর সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১১২ নম্বর ধারায় ‘petty organised crime’-এর সংজ্ঞায় বিভিন্ন অপরাধের তালিকা দেওয়ার পর শেষ লাইনে বলা হয়েছে ‘অথবা এরকম যে কোনো অপরাধমূলক কাজকর্মকে পেটি অর্গানাইজড ক্রাইম বলা হবে।’ অর্থাৎ পুলিস ইচ্ছামত এই লাইনটিকে ব্যবহার করতে পারে। বোঝা শক্ত নয়, যে এই ধারাটির লক্ষ্যবস্তু একেবারে গরিব প্রান্তিক মানুষ।
বহু সময় যখন প্রতিবাদের অন্য কোনো উপায় থাকে না, তখন মানুষ অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জারি রাখতে বাধ্য হন। অর্থাৎ এই ধারাটি অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ করাকেও অপরাধের আওতায় আনতে চাইছে।
২২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি যে কোনো সরকারি কর্মচারিকে তাঁর কাজে বাধা দেওয়ার জন্য বা তাঁকে দিয়ে কোনো কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তাহলে তার একবছর পর্যন্ত জেল অথবা জরিমানা অথবা দুটিই হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে অহিংস প্রতিবাদ জানানোর পদ্ধতি হল অনশন করা। বহু সময় যখন প্রতিবাদের অন্য কোনো উপায় থাকে না, তখন মানুষ অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জারি রাখতে বাধ্য হন। অর্থাৎ এই ধারাটি অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ করাকেও অপরাধের আওতায় আনতে চাইছে।
বিএনএসএসের ১৭২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নাগরিক যে কোনো পুলিস অফিসারের ‘আইনি’ (lawful) আদেশ শুনতে বাধ্য থাকবে। কথা না শুনলে পুলিস তাকে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত আটক রাখতে পারে। অর্থাৎ কোনো পুলিস অফিসার যদি কাউকে বলেন, রাস্তার এদিকে দাঁড়ান এবং সেই ব্যক্তি যদি তা না শোনেন, তাঁকে আটক করে রাখার ক্ষমতা পুলিসকে দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় আছে, যেখানে বলা হয়েছে কোনো সভ্য সমাজে হাতকড়ার ব্যবহার চলতে পারে না। অথচ বিএনএসএসের ৪৩(৩) ধারায় বলা হয়েছে, পুলিস চাইলে গ্রেফতার করার সময়ে হাতকড়া পরাতে পারে। এই ধারা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এবং পুলিস রাষ্ট্রের সহযোগীই নয়, স্পষ্ট বোঝা যায়, এর কারণে শুধু হাতকড়া এড়ানোর জন্যই বড় আকারে ঘুষ নেওয়ার ধারা তৈরি হবে।
আরো পড়ুন প্রতিবাদীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: যোগীর পথে দিদি
ললিতা কুমারী ভার্সাস স্টেট অব উত্তরপ্রদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী পুলিস এফআইআর করতে বাধ্য ছিল। এখন বিএনএসএসের ১৭৩(৩) ধারা অনুযায়ী প্রাথমিক তদন্তের আগে পুলিস চাইলে এফআইআর না-ও করতে পারে। আমরা জানি, অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাশালী এবং অভিযোগকারী অসহায় হলে এমনিতেই পুলিসকে দিয়ে এফআইআর করানো কঠিন। এখন আর পুলিশের এফআইআর করার কোনো বাধ্যবাধকতাই রইল না।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দেশদ্রোহবিরোধী আইন বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। বাতিল করাও হয়েছে। কিন্তু তার বদলে যা নিয়ে আসা হয়েছে, তাকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রফেসর মোহন গোপাল সঠিকভাবেই ‘sedition plus’ বলে চিহ্নিত করেছেন। বিএনএসের ১৫২ নম্বর ধারা বলছে যে কোনো কাজ, লেখা, বক্তব্য বা সংকেতের মাধ্যমে যদি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘নাশকতামূলক কাজ’, ‘ভারতের সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করবে এমন কাজ’ করার জন্য মানুষকে ‘উত্তেজিত’ করা হয় বা উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তার শাস্তি হিসাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া বিএনএসের ১১৩ নম্বর ধারায় ‘সন্ত্রাসবাদী কাজ’-এর সংজ্ঞা যেভাবে দেওয়া হয়েছে তাতে যে কোনো শান্তিপূর্ণ বক্তব্য, যা বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করবে, তাকেও অনায়াসে সন্ত্রাসবাদী কাজের আওতায় ফেলে দেওয়া যাবে। দানবীয় ইউএপিএ আইনেও সন্ত্রাসের সংজ্ঞা এত বিস্তৃত নয়। অতএব সিডিশন নামটা তুলে দিয়ে যা করা হয়েছে তা সিডিশন আইনের চেয়েও দানবীয়।
অতীত ও বর্তমান
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার যে মূল নীতিগুলি রয়েছে তার প্রত্যেকটি লঙ্ঘন করা হচ্ছে নতুন আইনে। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই আইনের মূল লক্ষ্যবস্তু হল সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, বিশেষত ১৯(১), ১৯(২) এবং ১৯(৩)। অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ জমায়েত এবং সংগঠিত হওয়ার যে মৌলিক অধিকার – এই আইন তার উপরই পরিকল্পিত কেন্দ্রীভূত আক্রমণ শানিয়েছে। একথা কি ঠিক যে আগের ঔপনিবেশিক আইনগুলি ন্যায়বিচার দিতে পেরেছে বা অন্তত খাতায় কলমে ন্যায়শাস্ত্রের মূল নীতিগুলি মেনে চলেছে? কখনোই নয়। আগের ব্যবস্থাই ৮৪ বছরের বৃদ্ধ ফাদার স্ট্যান স্বামীকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে, যিনি অন্যের অধিকারের জন্য কথা বলা ছাড়া কিচ্ছু করেননি। বস্তুত, দেশজুড়ে জেলগুলি যেভাবে বিচারাধীন বন্দিদের ভিড়ে ভারাক্রান্ত, শত শত বন্দি বছরের পর বছর জামিন না পেয়ে বিনা বিচারে জেল খাটছেন এবং পরে বেকসুর খালাস পাচ্ছেন, তাতে পরিষ্কার বলা চলে যে বাদী পক্ষ বিচার প্রক্রিয়াকেই শাস্তিতে রূপান্তরিত করেছে। খাতায় কলমে দেখতে গেলেও যেভাবে নিবর্তনমূলক আটক করার আইন সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে, যেভাবে ইউএপিএ বা দেশদ্রোহবিরোধী আইন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অংশ হয়ে ছিল, তাতে ন্যায়শাস্ত্রের মূল নীতিগুলির স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। পৃথিবীর কোনো সভ্য গণতন্ত্রে নিবর্তনমূলক আটক আইন নেই, গণতন্ত্রে তার কোনো জায়গাই নেই।
কিন্তু এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই ঔপনিবেশিক আইনগুলিতে ন্যায়বিচারের অন্তত কিছু উপাদান ছিল। নতুন আইনের সঙ্গে আর যা-ই হোক, ন্যায়বিচারের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এ আসলে ক্ষমতাশালী সুবিধাভোগী অভিজাতদের একচেটিয়া শাসন চালাতে দেওয়ার ছাড়পত্র, বিচারালয়কে পরিবর্তন করে যে কোনো বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নির্মমভাবে দমন করার ব্যবস্থা। এমনিতেই আগের ব্যবস্থায় একমাত্র বাদী পক্ষ ছাড়া বাকি সমস্ত অংশ প্রতিকূল অবস্থায় থাকত, এখন তাদের প্রায় কোনো অধিকারই থাকবে না। ধীর বিচার প্রক্রিয়া আরও ধীর হবে। নতুন আইনে এমন একটি ধারাও নেই যা নিয়ে ভাল কিছু বলা যায়। অথচ সাক্ষী এবং অপরাধের শিকারের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার মত শুভ উদ্যোগ নিলে লক্ষ লক্ষ মানুষের অসহনীয় যন্ত্রণা কমতে পারত। উল্টে এমন তিন আইন নিয়ে আসা হল যাতে মানুষ ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে যাওয়ার আগে দশবার ভাবে। প্রত্যাশিতভাবেই অমিত শাহের ‘ঔপনিবেশিক আইন সরিয়ে জনগণকে অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়ার আইন’-এর ভাষণ আসলে একটি নিষ্ঠুর চুটকি। বস্তুত, একটি আইন ঔপনিবেশিক কিনা তা আইন তৈরির সময় দিয়ে নির্ধারিত হয় না। আইনটি রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের কী সূত্রায়ন করছে তা দিয়ে নির্ধারিত হয়। নয়া ফৌজদারি আইন ঔপনিবেশিকতার নৃশংসতাকেও অবলীলায় অতিক্রম করেছে।
গণপরিষদে বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁর শেষ বক্তব্যে বলেছিলেন যে সংবিধানের সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায় ও সৌভ্রাতৃত্ব আলঙ্কারিক। আসলে আমরা একটা চরম অসমান, দমনমূলক, পরাধীন সমাজে বাস করছি। আম্বেদকরের মাহাড় সত্যাগ্রহ বা বর্ণবাদের বিলুপ্তির জন্য সংগ্রামের ডাক আজকের ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হিসাবে গণ্য হবে। কোনো গোষ্ঠী, যেমন আরএসএস, সংবিধানবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে গেলে যদি পুলিস ব্যবস্থা না নেয় তাহলে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিসর চলতি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নেই। সংবিধানের মূল নির্যাসটুকু রক্ষায় গণসক্রিয়তা এবং গণআন্দোলনের যেটুকু পরিসর ছিল তার ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট না রাখাই নয়া ফৌজদারি আইনের উদ্দেশ্য।
আম্বেদকরের মাহাড় সত্যাগ্রহ বা বর্ণবাদের বিলুপ্তির জন্য সংগ্রামের ডাক আজকের ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হিসাবে গণ্য হবে।
তবে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক পুঁততে না দেওয়ার লড়াই জারি আছে। একদিকে ভারতের জনগণ এবারের লোকসভা নির্বাচনে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর প্রকল্পকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সঙ্গে আইনবিভাগের বড় অংশ লড়াই করছে এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে। বাদী পক্ষের একাংশ, যেমন প্রাক্তন অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল ইন্দিরা জয়সিং পর্যন্ত এই আইনগুলির তীব্র সমালোচনা করেছেন। যাঁরা সুবিধাভোগী অংশের মধ্যে পড়েন, গা বাঁচিয়ে চলেন, তাঁদের অবশ্য এ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার কিছু নেই। কিন্তু যাঁরা সুযোগবঞ্চিত মানুষের হয়ে লড়ছেন, তাঁদের একত্রে সোচ্চার না হয়ে উপায় নেই। একত্রে জড়ো হওয়ার যে মৌলিক অধিকার এই সরকার কেড়ে নিতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে এখনই জেহাদ ঘোষণা করার সময়। সাংবিধানিক পরিসর থেকে আইন বিভাগ, বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে নাগরিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন থেকে শুরু করে ছাত্র-যুব-নারী সংগঠন – সবাইকে এক হয়ে এই আইনকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
যতই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে এই আইনের গুণগান করুন, যতই নাগপুর বিচারালয়ে মাথা গলানোর চেষ্টা চালিয়ে যাক, ভারতের জনগণ হিন্দুরাষ্ট্রের ঘৃণ্য প্রকল্পকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং করবেন। এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হবেই। প্রধান বিচারপতিকেই তা শুনতে হবে। আর নির্বাচনের জনাদেশ যাতে বিফলে না যায় তার উদ্যোগ এই আইনকে বাতিল করার সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে থাকা সেই অংশকেই নিতে হবে, গণতন্ত্র বাঁচলে সত্যিই যাদের কিছু এসে যায়।
নিবন্ধকার রাজনৈতিক সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







