আমার ভয় করে। আমি এড়িয়ে যাই রাকিফের মেসেজ। আমার ইনবক্স জুড়ে কাশ্মীর তার হৃদয় উপড়ে ফেলে। তার বিদীর্ণ হৃদয়ে আমি উঁকি মেরে দেখি না আর। ভয় হয়, বড্ড ভয় হয়। একসময় ইনবক্স চুপ করে যায়, আর কোনো শব্দ আসে না। শুধুই নীরবতা। নিস্তব্ধতার অর্থও আমি খুঁজতে যাই না। ভয়ে কুঁকড়ে থাকি। কোনোদিন জানতে চাই না, রাকিফ এখন কোথায়? ২০১৯ সালের পর মাত্র একটি পোস্ট করে জেলে যাওয়া রাকিফ, আমার একদা বন্ধু রাকিফ, অরুন্ধতী রায়ের সব লেখা পড়ে ফেলা রাকিফ। সে কোথায়?

আমি প্রশ্ন করি না। আমার ভয় হয়। রাকিফের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সাধারণ শব্দে কথা আর আসে না, আমি তির্যক ভাষায় কথা বলি। কেমন আছ না বলে বলি ‘কী সুন্দর ছবি তোমার ডিপিতে!’ আমি তাকে ছুঁতে চাই না আর। দুটো ভিন্ন ভাষা গোলার্ধে আমরা বাস করি। রাকিফের ভাষা গোলার্ধ কাশ্মীর। ২০২০ সালে সরকার সেখানে জারি করেছে ৫৩ পাতার নতুন মিডিয়া নীতি। সংবাদপত্রগুলোকে মৌখিক নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, কিছু শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। লেখা যাবে না ‘মিলিট্যান্ট’, লিখতে হবে ‘টেররিস্ট’। ভাষার উপরও অতন্দ্র প্রহরীর চোখরাঙানি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মানবাধিকার রক্ষাকারী উকিল হতে চাওয়া রাকিফ আর আমি কি সত্যিই বন্ধু ছিলাম? বন্ধু হতে পারি কখনো? রাকিফ প্রত্যেকবার আইডেন্টিটি কার্ড নিয়ে বাইরে বেরোয় এইটুকু আশা নিয়ে, যে মরে গেলে শনাক্তকরণে সুবিধা হবে। সেই মুক্ত কারাগারে একইসঙ্গে মুক্ত ও বন্দি মানুষের বন্ধু হতে গেলে আমার বন্ধু রাকিফের ভাষায় ‘মেইনল্যান্ড ইন্ডিয়ান’-কে যে ভয়হীন পথ পেরোতে হয়, তা পেরনো এক সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই রাকিফের জেলের দিনগুলোর খবর আমার দশটা-পাঁচটার জীবনে পৌঁছয় না। আমি দিব্যি ভুলে থাকি।

তবে এই অপার ভয়ের অন্ধকার থেকে মাথা তুলে কিছু স্বর বারবার জানতে চায় – রাকিফরা কোথায়, তারা কেমন আছে বা কেমন আছে কাশ্মীর? যে স্বরগুলো বারবার চ্যালেঞ্জ জানায় চাপিয়ে দেওয়া শান্তির ধারণাকে, তার অন্যতম অরুন্ধতী রায়। নির্ভীক উচ্চস্বরে দেশে বিদেশে তিনি বারবার বলেছেন কাশ্মীরের কথা। তাই আজ যখন ২০১০ সালে কাশ্মীর নিয়ে করা একটি মন্তব্যের জন্য দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর অনুমতি দিয়েছেন, তখন অরুন্ধতীর পাশে দাঁড়ানো ভীষণ জরুরি। কারণ রাকিফরা এক অদ্ভুত নৈঃশব্দে ঢাকা পড়ে গেছে। সেই নৈঃশব্দকে শান্তি ভেবে নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকি আমরা ‘মূল ভূখণ্ডের ভারতীয়রা’। এই নৈঃশব্দ সম্পর্কে কবি আথার জিয়া বলেছেন, ‘If someone considers the quiet streets as a sign of normalcy, do they even know Kashmir?’ (Outlook, June 11, 2024)

আরো পড়ুন যে সরকার সংবিধানের আত্মার বিরুদ্ধে যায়, তার বিরুদ্ধে বলবই: মল্লিকা

যদি শান্ত রাস্তা দেখে কেউ ভাবে যে সব স্বাভাবিক, তবে তারা কি আদৌ কাশ্মীরকে চেনে? সত্যিই তো। আমরা কি কাশ্মীরকে চিনি?

আব্বার মৃত্যুর পর শেষবারের মত একবার ছুঁয়ে দেখতে না পারা আথারের শূন্যতাকে আমরা কী নাম দেব? স্বাভাবিকতা, শান্তি নাকি অতন্দ্র প্রহরীর চব্বিশ ঘন্টার বেয়নেটের ভয়?

রাকিফ, আথারের মত মানুষগুলোর নৈঃশব্দের শব্দ বুঝতে গেলে দরদি মন আর চোখা কলম ছাড়া উপায় নেই। এতটাই চোখা কলম দরকার যে কলম দাঁড়াতে পারে এ কে ৪৭-এর মুখোমুখি। অরুন্ধতী বারবার দেখিয়েছেন সেই জোর। তাই বারবার রাষ্ট্রের রোষানলে পড়েছেন তিনি। আজ তিনি যে কোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে আশঙ্কা যে অমূলক নয় তা ভীমা কোরেগাঁওয়ের ঘটনায় অভিযুক্তদের ঘটনা থেকে শার্জিল ইমাম, গুলফিশা ফতিমা, উমর খালিদ সহ সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদের কারাবাসই প্রমাণ করে।

৪ জুন ভোটের ফল বেরোবার পর যাঁরা ভেবেছিলেন, যাক, এবার নিশ্চিন্ত হওয়া গেল; তাঁদের নতুন করে ভাবতে হবে – সত্যিই কি ফ্যাসিবাদকে ভোটে হারানো যায়? যদি আমরা অরুন্ধতীর পাশে না দাঁড়াই, তবে আমরা বাকস্বাধীনতার দাবি থেকেও বিচ্যুত হব। আরও একবার ব্যর্থ হব কাশ্মীরের পাশে দাঁড়াতে। কাশ্মীর শুধুই জাফরান,শাল, থিসিস আর ‘ট্র্যাভেল ডেস্টিনেশন’ হিসাবেই থেকে যাবে। হয়তো এই লেখা পড়তে গিয়ে কোনো বোদ্ধা পাঠক সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তুলবেন, বারবার অরুন্ধতীর কথা বলছি হয়ত নিরাপদ থাকতে। বললে ভুল কিছু বলবেন না। অরুন্ধতীর সঙ্গেই তো দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর কাশ্মীর সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের প্রাক্তন অধ্যাপক শেখ শওকত হোসেনের বিরুদ্ধেও ইউএপিএ আইনে অধীনে বিচারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে তার কথা কই?

শেখ শওকত একজন কাশ্মীরী, তাই তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গেলে আশ্রয় নিতে হয় তির্যক ভাষার। আমি এক মুসলমান আর তিনি কাশ্মীরী। তাই তাঁর সম্পর্কে আমার কিছু লেখা অলিখিতভাবেই বারণ। না হলেই ধেয়ে আসবে তকমা – সন্ত্রাসবাদী।

৪ জুনের পর গোমাংস পাওয়া গেছে সন্দেহে ১১ খানা বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মধ্যপ্রদেশে। এখন অবধি অন্তত চারজন বা তারও বেশি মুসলমানকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। তাই আশা করি শওকত সাহেব ঠিক পড়ে নেবেন তাঁকে নিয়ে আমার নিস্তব্ধতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অসহায়তা।

ধর্মনিরপেক্ষতা, নির্ভয়ে কথা বলার মৌলিক অধিকার যাঁরা বাঁচাতে চান, তাঁদের কাছে আরও একবার সুযোগ একথা প্রমাণ করার, যে তাঁদের হৃদয়ে ঝিলামের জন্য জায়গা আছে। কাশ্মীরের নিস্তব্ধতা চিনে নিতে তাঁদের ভুল হয় না। রাকিফ, আথারের বন্ধু হয়ে ওঠার এও আরেক সুযোগ, যে সুযোগ বারবার হারিয়েছি আমরা। অরুন্ধতী আর শেখ শওকতের পাশে দাঁড়ালে আমরা নিশ্চিতভাবে রাকিফদের পাশেও দাঁড়াতে পারব। হোক না তা অলঙ্কারে বা উপমায়। রাকিফরা ঠিক বুঝে নেবে আমরা তাদের পাশে আছি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.