২০২৪ সালের গোড়া থেকেই নানা দেশের নির্বাচনের বিশ্লেষণে ক্রমাগত সরগরম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নির্বাচন দিয়ে বছর শুরু করে পাকিস্তান, ভারত হয়ে লাইনে আছে শ্রীলঙ্কাও। দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন হয়েছে মে মাসের শেষে, বছরের নানা সময়ে নির্বাচন হতে চলেছে আফ্রিকার আরও অনেক ছোট ছোট দেশেও। এদিকে আর দুদিন পরে ৪ জুলাই ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের নির্বাচন, বছর শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই ভরা বাজারে অঘোষিতভাবে দুম করে ঢুকে পড়ল ফ্রান্স।
৬-৯ জুন পর্যন্ত সংঘটিত ইউরোপিয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে ফ্রান্সের মধ্যপন্থী ব্লকের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি আসনে জয়লাভ করে অতি দক্ষিণপন্থী দল রাসেমব্লেম নাশিওনাল (আরএন) বা ন্যাশনাল র্যালি। এই ফলাফলের পর আচমকাই আইনসভা ভেঙে দিয়ে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করে বসেন ফরাসী রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ। মধ্যপন্থী ব্লকের মধ্যে ছিল তাঁর নিজের দল রামধনু পার্টিও।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ফ্রান্সে শেষ সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ২০২২ সালে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দুমাস পরেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের জন্য ম্যাক্রঁ জেতেন বটে তবে আইনসভার নির্বাচনের ফল অন্যরকম হয়। অন্যান্য নির্বাচনী জোটের তুলনায় বেশি আসনে জিতলেও ৫০% আসন জিততে সক্ষম হয়নি ম্যাক্রঁ ও তাঁর সহযোগী শক্তিগুলির এনসেম্বল জোট। ফলে আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁদের ছিল না। ৮৯টি আসনসহ দ্বিতীয় শক্তিশালী দল হিসাবে মূল বিরোধীর জায়গা নেয় মারিন ল্য পেনের নেতৃত্বে ন্যাশনাল র্যালি। প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকার ফলে নতুন আইন প্রণয়ন করার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে ওঠে। তবে ভেঙে দেওয়া আইনসভার মেয়াদ ছিল আরও তিন বছর, ম্যাক্রঁর রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদের মতই।
কিন্তু ইউরোপিয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির কাছে পরাজয়ের পরে তিনি বলেন ‘আজকের পরে আমি এমন ভাব করতে পারি না যেন কিছুই ঘটেনি। স্বচ্ছতা ও সংহতির সঙ্গে রাষ্ট্রচালনার জন্য (আইনসভায়) সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন… একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনতাকে তাদের মতপ্রকাশ করতে দেওয়ার চেয়ে গণতান্ত্রিক কিছু হতে পারে না।’
সেই মত ৩০ জুন, রবিবার, ফ্রান্সে হয়ে গেল প্রথম দফার নির্বাচন। মূল প্রতিযোগীর সংখ্যা তিন – ল্য পেনের ন্যাশনাল র্যালি, ম্যাক্রঁর মধ্যপন্থী এনসেম্বল জোট, এবং অতি বামপন্থী দল লে ফ্রান্স ইনসুমি (এলএফআই)-র প্রতিষ্ঠাতা জঁ লুক মেলঁশোঁর নেতৃত্বে সোশালিস্ট, কমিউনিস্ট, গ্রীন পার্টি ও এলএফআইকে নিয়ে গঠিত বামপন্থী জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট।
দ্বিতীয় দফার নির্বাচন ঠিক সাত দিন পরে, অর্থাৎ ৭ জুলাই। ফরাসী নির্বাচনের প্রথম দফা আর দ্বিতীয় দফা কিন্তু আমাদের ভারতীয় নির্বাচনের বিভিন্ন দফায় বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনের মত একেবারেই নয়। ও দেশে প্রথম দফাতেই ভোট হয় সব কেন্দ্রে। যে কেন্দ্রগুলিতে কোনো একজন প্রার্থী অন্তত ৫০% ভোট পান, সেই কেন্দ্রগুলির ফলাফল ওই এক দফাতেই নির্ধারিত হয়ে যায়। যেসব কেন্দ্রে কোনো প্রার্থীই ৫০% ভোট পান না, সেগুলিতে হয় দ্বিতীয় দফার নির্বাচন। প্রথম দফার ভোটে তালিকাভুক্ত ভোটারদের অন্তত সাড়ে বারো শতাংশ ভোট পাওয়া প্রার্থীরাই লড়তে পারেন দ্বিতীয় দফায়। সেই দফায় সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী বিজয়ী ঘোষিত হন।
অতএব ৩০ জুন ফ্রান্সে ভোট হয়েছে ৫৭৭টি কেন্দ্রের প্রতিটিতেই। ভোট দিয়েছেন ভোটার তালিকাভুক্ত জনগণের ৬৮%। তা সত্ত্বেও ২০ শতাংশেরও কম কেন্দ্রের ভাগ্য নির্ধারিত হতে পেরেছে এই দফায়। ন্যাশনাল র্যালির ৩৯ জন, বামপন্থী নিউ পপুলার ফ্রন্টের ৩২ জন এবং ম্যাক্রঁর মধ্যপন্থী জোটের দুজন মাত্র প্রার্থী বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন।
প্রথম দফায় যথাক্রমে প্রায় ৩৩%, ২৮%, ও ২০% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় দফায় লড়তে চলেছে অতি দক্ষিণপন্থী ন্যাশনাল র্যালি, বামপন্থী নিউ পপুলার ফ্রন্ট ও মধ্যপন্থী এনসেম্বল। প্রথম দফার পরিসংখ্যান থেকে বলা যেতেই পারে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম ফ্রান্সে ক্ষমতায় আসতে চলেছে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তি।
ন্যাশনাল র্যালিকে হারানোর লক্ষ্যে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন ম্যাক্রঁ। অন্তত ৬০টি আসনে তাঁরা বামপন্থী জোটের প্রার্থীকে জেতাবার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় দফায় নিজেদের প্রার্থী তুলে নেওয়ার কথা ভাবছেন। একইভাবে যেখানে এনসেম্বলে প্রার্থী তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেখানে নিজেদের বামপন্থী জোটের প্রার্থী সরিয়ে নেবার কথা বলেছেন মেলঁশোঁ।
কী হতে পারে ৭ জুলাইয়ের পর? ম্যাক্রঁর দল ছাড়া অন্য কোনো দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সেই দল থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে বাধ্য থাকবেন ম্যাক্রঁ। তবে রাষ্ট্রপতি থাকবেন তিনিই। এই রাজনৈতিক সহবাসের ফলে ম্যাক্রঁ সরকারের নীতি বদলে যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে ন্যাশনাল র্যালি কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো – উভয়কে নিয়েই সংশয়ী মনোভাব পোষণ করে। ন্যাশনাল র্যালি জিতলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা জর্ডান বার্ডেলার। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ন্যাশনাল র্যালি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে ইচ্ছুক নন।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ন্যাশনাল র্যালি পাবে কি পাবে না, তা ৭ তারিখের পরেই জানা যাবে। তবে এই কমাস আগেও শ্রমিক আন্দোলনের জেরে কার্যত জনজীবন থমকে যাওয়া দেশটিতে অতি দক্ষিণপন্থার এই জয়জয়কার কেন – সেই প্রশ্নটি হয়ত এই নির্বাচনের ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা বুঝতে হলে অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে ম্যাক্রঁর মধ্যপন্থার ধারাবাহিক ব্যর্থতা। ২০২২ সালের নির্বাচনে ম্যাক্রঁর দলের ভোট কমে অতি দক্ষিণ আর অতি বাম উভয় দলেরই ভোট বেড়েছিল।
ন্যাশনাল র্যালির মুখ্য নির্বাচনী দাবিদাওয়া – নাগরিকদের অগ্রাধিকার, নিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, ইউরোপিয় ইউনিয়নের ক্ষমতা হ্রাস, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কাজের সুযোগ ও সামাজিক নিরাপত্তা – কোনোটাই কিন্তু তথাকথিত ভাবে চরমপন্থী মনোভাবের প্রকাশ বলা চলে না। এর মধ্যে অনেক দাবিই মধ্য-দক্ষিণপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। আবার অনেকগুলি দাবিই – বিশেষত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কাজের সুযোগ ও সামাজিক নিরাপত্তা – সোশালিস্ট বা কমিউনিস্টদের বরাবরের দাবি। আসলে মধ্যপন্থাকে খারিজ করে অতি বামপন্থা বা অতি দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়াটা প্রথমত মানুষের অসহিষ্ণুতার প্রকাশ হিসাবে পড়া দরকার।
আরো পড়ুন বামপন্থীদের ব্যর্থতার উপর উগ্র দক্ষিণপন্থার জয়স্তম্ভ নেদারল্যান্ডসে
ইংল্যান্ডের পার্টি সিপিজিবিএমএল যেমন ফ্রান্সের অবস্থা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শ্রমিকশ্রেণি ও শাসকশ্রেণির দ্বন্দ্বের বিষয়টি টেনে এনেছে। নিকোলাস সারকোজি, ফ্রাঁসোয়া ওলান্দে বা ম্যাক্রঁ – একের পর এক ফরাসি রাষ্ট্রপতি শাসকশ্রেণির স্বার্থকে পুষ্ট করে গিয়েছেন। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থী, অন্যান্য মধ্যপন্থী, মধ্য-বাম ও সংশোধনবাদীদের বরাবরের আক্রমণের লক্ষ্য থেকে গিয়েছে অতি বামপন্থীরা। ফলত, চরমপন্থী সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠছে অতি দক্ষিণপন্থীরা।
দক্ষিণপন্থাকে ঠেকাবার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বাম দলগুলির ঐক্যবদ্ধ হওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু মানুষের মূল অভাব অভিযোগের জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করে দিনের পর দিন অধ্যবসায়ী ধারাবাহিকতায় দক্ষিণপন্থী সমাধানের বিপরীতে বামপন্থী সমাধানের পথটি দেখিয়ে দেওয়া গেলে তা যে কোনো নির্বাচনী কৌশলের চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারবে।
তবে ফ্রান্সে খেলা এখনো অনেক বাকি। ৭ জুলাই দ্বিতীয় রাউন্ডের নির্বাচনে খেলা ঘুরেও যেতে পারে। ইতিমধ্যেই গোটা দেশ জুড়ে ল্য পেন-বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তার প্রভাব ভোটে কতখানি পড়বে তার উপর নির্ভর করবে অনেককিছু। রাজপথ নাকি ভোটবাক্স, নাকি দুটিই ফরাসী অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির প্রতিষেধক – তা জানতে অপেক্ষা আর সপ্তাহখানেকেরও নয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







