এ লেখা যখন শুরু করেছিলাম, তখন উপমহাদেশে রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি কী হবে তা নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছিল। বেশিরভাগ বুথফেরত সমীক্ষা বলে দিয়েছিল, আবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ের হ্যাটট্রিক করতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী। ভাবছিলাম লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে ভারতীয় গণতন্ত্রের চিত্রটা কীরকম হবে। ‘এক দেশ এক ভোট’-এর নাম করে কি স্বৈরতন্ত্র কায়েম হবে? আর কখনো কি নির্বাচন হবে? এমনকি ভারতীয় সংবিধান অক্ষত থাকবে কিনা। আর সরকারবিরোধী ছোট, বড়, মেজো, সেজো কোনোরকম লেখাই আর লেখা যাবে কিনা।

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার পর থেকে প্রায় তিনমাস ধরে বিশ্বের বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলল। কুৎসিত প্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটদানে অনীহা দেখে শাসক দলের ভ্রূকুঞ্চন, ভোটের দিন দাদাগিরি-গুণ্ডামি – খামতি ছিল না কিছুতেই। এর মাঝে যে অনেক বিষয় হারিয়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য। এরই মধ্যে কিছুটা ভাল খবর মে মাসে ভারতের ‘কান’-প্রাপ্তি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ষষ্ঠ দফার নির্বাচন যেদিন হল, অর্থাৎ ২৫ মে, সেদিনই এবছরের মত শেষ হল বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জমায়েত – কান চলচ্চিত্র উৎসব। ৭৭তম কান উৎসবে, ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের ঝুলিতে এসেছে অন্তত পাঁচটি পুরস্কার – প্রথম ভারতীয় হিসাবে পরিচালক পায়েল কাপাডিয়া তাঁর অল উই ইম্যাজিন অ্যাজ লাইট ছবির জন্য পেয়েছেন গ্রাঁ প্রি (পাম ডি’ওর-এর পর কান-প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার), সঙ্গে ফ্রেঞ্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ আর্টহাউস সিনেমাজ – স্পেশ্যাল মেনশন পুরস্কার, পরিচালক চিদানন্দ নায়েক তাঁর সানফ্লাওয়ার্স ওয়্যার দ্য ফার্স্ট ওয়ানস টু নো… ছবির জন্য পেয়েছেন ল্য সিনেফ পুরস্কার, কনস্ট্যান্টিন বজানভের দ্য শেমলেস ছবিতে যৌনকর্মীর ভূমিকায় অভিনয় অনসূয়া সেনগুপ্তকে এনে দিয়েছে ‘উন সার্টেন রিগার্ড’ বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার, চিত্রগ্রাহক সন্তোষ শিবন তাঁর কাজের জন্য পেয়েছেন পিয়ের অ্যাঞ্জেনিউ সম্মান। এছাড়াও অবশ্য উল্লেখ্য, কানের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম ডি’ওর-এর জন্য পায়েলের মনোনয়ন এবং মানসী মাহেশ্বরীর ছবি বানিহুড ছবির ল্য সিনেফ বিভাগে তৃতীয় স্থান লাভ।

এই ফাঁকে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতীয় ছবির অর্জনের ইতিহাসের দিকে একবার তাকানো যাক। ১৯৪৬ সালে প্রথম কান চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজিত হয়। যদিও পরিকল্পনা ছিল ১৯৩৯ সালেই, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। সেখানে এগারোটি ছবির সঙ্গে গ্রাঁ প্রি (পাম ডি’ওর-এর আগে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পুরস্কার) জিতেছিল চেতন আনন্দের ছবি নীচা নগর। পরবর্তী সময়ে বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন পেয়েছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার (১৯৫৪), সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী নিয়ে এসেছে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ (১৯৫৬), মৃণাল সেনের খারিজ পেয়েছে জুরি পুরস্কার (১৯৮৩), অস্কার মনোনীত মীরা নায়ারের সালাম বম্বে ১৯৮৮ সালে পেয়েছিল ক্যামেরা ডি’ওর, মণিপুরি ছবির কিংবদন্তি পরিচালক অরিবাম শ্যাম শর্মার ইশান্যু পেয়েছে ‘উন সার্টেন রিগার্ড’ পুরস্কার (১৯৯১)। হালে উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে নীরজ ঘেঁওয়ারের মাসান ছবির জন্য ফিপরেসি পুরস্কার লাভ (২০১৫) এবং সৌনক সেনের তথ্যচিত্র অল দ্যাট ব্রিদস ছবির (২০২২) ‘সোনালী চোখ’ লাভ। এমনকি সৌনকের আগের বছরেই ওই পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন এবছর গ্রাঁ প্রি পাওয়া পায়েল, তাঁর আ নাইট অফ নোয়িং নাথিং তথ্যচিত্রের জন্য। এর বাইরে নামী-অনামী নানা পরিচালকের নানা স্বাদের ছবি নানা বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ফলে কান ফিল্মোৎসবের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে ফি বছর পুরস্কারের ঝুলি উপচে পড়ার মত নজির না থাকলেও কানে ভারতীয় ছবির যাত্রাপথ মোটের উপর উজ্জ্বল। ২০২৪ সালটা সেই ঔজ্জ্বল্যের ছটা আরও বাড়িয়ে দিল সন্দেহ নেই।

লক্ষণীয়, যাঁরা পুরস্কার পেলেন তাঁদের বেশিরভাগের নাম (যদি আমাদের পূর্বসূরিদের সঙ্গে তুলনা করা যায়) আমরা অনেকে জানতামই না, এখনো অনেকে জানেন না। অথচ এমন নয় যে এঁরা খুব সম্প্রতি কাজ করা শুরু করেছেন। পায়েলেরই আরও একটি ছবি, স্বল্পদৈর্ঘ্যের আফটারনুন ক্লাউডস ২০১৭ সালে কানে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু মূলধারার বড় বড় নামের পাশে পায়েল বা তাঁর মত আরও বহু চলচ্চিত্রজীবী, যাঁদের মাথার উপর রাজানুগ্রহ বা বৃহৎ পুঁজির হাত নেই, তাঁরা তেমন প্রচার পাননি। শিল্পের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, একরকম একক লড়াই লড়েন – সারা দেশে এমন চলচ্চিত্র নির্মাতার সংখ্যা নেহাত কম নয়।

পায়েলের পুরস্কার জয়ের পর অভিনেতা অনুপম খের তো এক্স হ্যান্ডেলে লিখেই দিয়েছেন – ‘কানে কী হল দেখুন – পুরস্কারের মঞ্চে উঠে এলেন দুই অপরিচিত মুখ (কাপাডিয়া ও সেনগুপ্ত)। এটা অবিশ্বাস্য।’ স্লামডগ মিলিয়নেয়ার ছবিতে কাজের জন্য ২০০৯ সালে সেরা শব্দ মিশ্রণে অস্কার জেতা রেসুল পুকুট্টি আবার স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, এই জয় নিয়ে মূলধারার চলচ্চিত্র জগতের এত মাতামাতি করার কিছু নেই।

এক্স হ্যান্ডেলে প্রশংসাসূচক পোস্ট অবশ্য নামী লোকজনদের অনেকেই করেছেন, সেখানে আলিয়া ভাটের মত মূলধারার জনপ্রিয় অভিনেত্রী যেমন আছেন, তেমন খোদ নরেন্দ্র মোদীও আছেন। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আলোচনায় এসে পড়েছে সংবাদমাধ্যমের কাছে গজেন্দ্র চৌহানের মন্তব্য – ‘ওঁকে অভিনন্দন। আমার গর্ব হচ্ছে এই ভেবে যে, উনি [পায়েল] যখন ছাত্রী, আমি তখন সেই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর ছিলাম।’

প্রসঙ্গত, আটের দশকের জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক মহাভারত-এ যুধিষ্ঠিরের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য জনপ্রিয় এবং বিজেপি-ঘনিষ্ঠ অভিনেতা গজেন্দ্র চৌহানকে ২০১৫ সালে পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা করা হলে ছাত্রছাত্রীদের এক বিরাট অংশ প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তাঁদের অন্যতম ছিলেন পায়েল। গজেন্দ্রের নিয়োগকে সেইসময় সমর্থন জানিয়েছিলেন নামকরা বিজেপি সমর্থক ও নেতারা। যেমন অভিনেতা মুকেশ খান্না, পরেশ রাওয়াল ও হেমা মালিনী, এথেন্স অলিম্পিকে রূপো জয়ী শুটার রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর। অন্যদিকে বিরোধিতাও করেছিল একটি বড় অংশ, যাঁদের মধ্যে ছিলেন আনন্দ পটবর্ধন, অমল পালেকর, বা কিরণ রাওয়ের মত বিজেপিবিরোধী মুখ। আবার ছিলেন মোটের উপর সাতে-পাঁচে না থাকা রণবীর কাপুর, সলমন খানরাও। রাহুল গান্ধী বা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি সেই দলে ছিলেন বিজেপি-ঘনিষ্ঠ অনুপম খেরও, যাঁর বিরোধিতার কারণ অবশ্যই গজেন্দ্রের বিজেপি-ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং ‘অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন’।

এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক বছর হয়েছে তখন, দেশজুড়ে বাড়ছে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘পাকিস্তানে চলে যাও’-এর মত স্লোগান। সেসব স্লোগান শুনতে হয়েছিল পায়েলদেরও। সেসবের সঙ্গে যুঝেই ১৩৯ দিন ধরে তাঁরা ধর্মঘট করেছিলেন। সেটা ওই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে দীর্ঘতম শিক্ষার্থীদের দীর্ঘতম ধর্মঘট। ফল কী? পায়েল সহ ৩৫ জন ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হল, যার মধ্যে বেশ কয়েকটা জামিন-অযোগ্য। পরের বছর তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়, সে মামলা এখনো চলছে। পায়েলের ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছিল। প্রতিশ্রুতিমান ছাত্রী হিসাবে ফরেন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় বিদেশ যাওয়ার সুযোগ ছিল, কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ে সেই সুযোগ নষ্ট হয়। মোটা টাকার স্কলারশিপের সুবিধা থেকেও তিনি বঞ্চিত হন।

কানের মঞ্চে পুরস্কার পাওয়ার পর এফটিআইআইয়ের তরফেও তাঁকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তা দেখে অভিনেতা আলি ফজল ব্যঙ্গ করে লিখেছেন ‘উঁহু… দয়া করে করবেন না। একেবারেই এমনটি করবেন না।’

গজেন্দ্রের বক্তব্য, তারপর প্রতিষ্ঠানের তরফে এমন বিবৃতি দেখে স্বভাবতই বিজেপিবিরোধী মানুষজন কৌতুকে ফেটে পড়ছেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে, বিরোধী স্বরের স্বীকৃতিকে অভিবাদন জানিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি বজায় রাখার এই প্রবণতা কি আদৌ হাসির বস্তু? নাকি এখানে লুকিয়ে আছে কোনো গুপ্ত উদ্দেশ্য?

আবার ইতিহাসের দিকে একবার তাকানো যাক। যা চিরায়ত বা জনপ্রিয় তেমন কিছু জিনিসকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহারে করে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষ ছড়ানো ফ্যাসিবাদী শক্তির অন্যতম কাজ। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে বিজেপির অস্ত্র হয়েছে রামায়ণ মহাকাব্যের মূল চরিত্র। বিজেপির সঙ্গে যে দলের আকছার তুলনা চলে আসে, সেই জার্মান নাজি পার্টির কথাও এখানে বলা যেতে পারে।

গত শতকের তিনের দশকে নাজিরা ক্ষমতায় আসার সময়ে দেশজুড়ে এক অত্যাশ্চর্য বই বহ্ন্যুৎসব শুরু হয়েছিল। বামপন্থী, প্রগতিশীল, যুদ্ধবিরোধী চিন্তাধারার পোড়া বইয়ের গন্ধে ভরে গিয়েছিল নাজি জার্মানির আকাশ বাতাস। অন্যদিকে ভীষণ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল উইলহেলম কার্ল গ্রিম ও জেকব লুডউইগ কার্ল গ্রিমের সংগৃহীত ও সংকলিত জার্মান রূপকথা ও লোককথার সংকলন, যা সারা বিশ্বে গ্রিমভাইদের রূপকথা নামে অবাধ পরিচিতি পেয়েছিল। কারণ? গ্রিমভাইদের সংকলিত এমন বহু গল্প ছিল, যেমন ‘দ্য জু অ্যামাং থর্নস’, ‘দ্য গুড বার্গেন’, ‘দ্য জুজ’স স্টোন’ বা ‘দ্য গার্ল হু ওয়জ কিলড বাই দ্য জুজ’ – যার কেন্দ্রে আছে ইহুদিবিদ্বেষ। এই কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে যাওয়ার পরে মিত্রশক্তি অধিকৃত ইউরোপে গ্রিমভাইদের রূপকথা প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

তবে গ্রিমভাইদের গল্প সংকলনে ইহুদিবিদ্বেষ ছিল বলে তাঁরা নিজেরাও সেই মনোভাবই লালন করতেন – এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাইনি। প্রথমত, ইউরোপের ইহুদিবিদ্বেষের ইতিহাস শতাব্দীপ্রাচীন। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথা, কিংবদন্তিতে সে ভাবনার প্রতিফলন ঘটা স্বাভাবিক। গ্রিম ভাইদের রাজনৈতিক ইতিহাস বরং অন্য কথাই বলে। নাজিরা ক্ষমতায় আসার পর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববন্দিত ইহুদি অধ্যাপকদের অপসারণ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, উনিশ শতকে সেই গোটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াতেন উইলহেলম ও জেকব। কাকতালীয় হলেও সত্যি, নাজি উৎপাতের ঠিক একশো বছর আগে, অদ্ভুতভাবে এই দুই ভাই এবং আরও পাঁচজন অধ্যাপক গোটিনজেন থেকে অপসারিত হয়েছিলেন হ্যানোভারের নব-অভিষিক্ত রাজা আর্নেস্ট অগাস্টাসের দাবি মানতে অস্বীকার করায়। সেইসময় গোটা জার্মানি জুড়েই রাজনৈতিক অস্থিরতা। জায়গায় জায়গায় ঘটছে কৃষক বিদ্রোহ, গণতন্ত্রকামী একদল তরুণ লেখক-শিল্পী গড়ে তুলেছেন ইয়াং জার্মানি আন্দোলন, যে আন্দোলন ইহুদিদেরও সমানাধিকার দাবী করছে। আর্নেস্ট অগাস্টাস হ্যানোভারের সংসদ ভেঙে দেন, বাতিল হয় সংবিধানও। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে চাকরি খোয়ান অধ্যাপকরা। তারই মধ্যে ছিলেন গ্রিম ভাইরা। যদিও ইয়াং জার্মানদের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগ ছিল না বলেই জানা যায়।

এহেন যাঁদের ইতিহাস, তাঁদের কাজকে কেবলমাত্র ওই একটা কারণে দক্ষিণপন্থী প্রচারযন্ত্রের ধ্বজা হিসাবে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা যে কোনো দেশের গণতন্ত্রের পক্ষেই ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।

এদেশে বিজেপির রাষ্ট্রপ্রধানও যখন রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুবর ট্যাগোর’ বানিয়ে তোলেন, তারপর অত্যন্ত বিকৃত উচ্চারণে তাঁর কবিতা আউড়ে নিজেকে বাঙালিপ্রেমী সংস্কৃতিমনস্ক বলে প্রমাণ করতে চান, তখনো ঠিক একইভাবে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। নইলে যে রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজম লিখে যুদ্ধবাজদের কাছে খলনায়ক হয়ে গেছেন, বাল্যবয়সে হিন্দুমেলা মার্কা উদ্যোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকেও পরবর্তী সময়ে স্বদেশি আন্দোলনের হিন্দুকরণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ধরেছেন, শেষজীবনে এসে লিখেছেন ‘এ যুগে তারাই জন্ম নিয়েছে আজি,/মন্দিরে তারা এসেছে ভক্ত সাজি’-র মত দুটো লাইন, যে মন্তব্য আজকের শাসকদের ব্যাপারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়, সেই রবীন্দ্রনাথকে আপন করে নেওয়ার পিছনে গূঢ় অভিসন্ধি অবশ্যই আছে।

গত লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই যে রবীন্দ্রনাথকে দখল করে নেওয়ার চেষ্টা চলছে তা এখন দুয়ে দুয়ে চার করে বেশ বোঝা যায়। সকলের মনে থাকার কথা নয়, তবু নিশ্চয়ই অনেকের মনে পড়বে – ২০১৯ সালের রবীন্দ্রজয়ন্তীর আশেপাশে একটা পোস্ট হঠাৎ ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু সংহতি পরিষদ বলে কোনো সংগঠন রবীন্দ্রনাথের কিছু প্রবন্ধের অংশবিশেষ তুলে তিনি কতখানি হিন্দুপ্রেমী ছিলেন এবং কীভাবে মুসলমানদের সমালোচনা করেছেন, তা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। তার দুবছর আগে, ২০১৭ সালে, আরএসএসের শিক্ষা সংগঠনের প্রধান দীননাথ বাত্রা এনসিইআরটির পাঠ্য বই থেকে রবীন্দ্রনাথকে সরাতে চেয়েছিলেন। তা নিয়ে আবার পরদিনই প্রকাশ জাওড়েকরকে সাফাই দিতে হয়েছিল – এমন কিছু হচ্ছে না। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দুত্ববাদী বলে প্রমাণ করার এই চেষ্টা কীসের ইঙ্গিত, তা বুঝতে খুব বড় বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। এর বিরুদ্ধে সেইসময় কিছু লেখালিখি হয়েছিল। তার মধ্যে এই অধমেরও একটা লেখা ছিল। কিন্তু বিজেপি সপ্তদশ লোকসভায় একাই ৩০৩ আসন পেয়ে যাওয়ায় করোনাকালে ‘চোলায় চোলায় বাজবে জোয়ের ভেড়ি’-র ধাক্কায় আমাদের সেসব ছুটকো ছাটকা প্রতিবাদ খড়কুটোর মত উড়ে গিয়েছিল।

অনুরূপ আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে শঙ্খ ঘোষকে ঘিরে। ২০১৭ সালে শঙ্খ ঘোষ জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির হাত থেকে সেই পুরস্কার নেওয়ার পর মঞ্চে দাঁড়িয়েই তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন – ‘আমরা একটা অসহিষ্ণু সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনার উপর সমানে উদ্দেশ্যমূলক আঘাত করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর হতে পারে। সব লেখক, নাগরিককে প্রতিবাদে নামতে হবে। না হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।” যে কোনো প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার যিনি কলম ধরেছেন, রাস্তায় নেমে মিছিলে হেঁটেছেন, তিনি সর্বভারতীয় পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়েও শাসকের বিরুদ্ধে এই কটা কথা বলে এসেছিলেন। আমাদের রাজ্যের শেষ বিধানসভা নির্বাচনের আগে কোভিডের ঢেউ যখন তাঁকেও কেড়ে নিল, অগুনতি শোকবার্তার মধ্যে একটি শোকবার্তা এসেছিল প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে।

নিজস্ব ভাবনা প্রকাশের অধিকার সকলের আছে আর রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বিরুদ্ধ মতের কারোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলে সে মন্তব্যকে এমনিতে বাঁকা চোখে দেখা উচিত নয়। সৌজন্যের খাতিরে তা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু গত এক দশকে বিজেপির একাধিক কীর্তিকলাপ দেশের প্রত্যেক ক্ষেত্রে এমন জঘন্য সংকট সৃষ্টি করেছে, ক্রমাগত মানুষ এত অশান্তি ভোগ করেছেন, যে এই ধরনের শোকজ্ঞাপনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছাড়া আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না। বরং এর পিছনেও যে আসল উদ্দেশ্য দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে নিজেদের আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলা – এমন কথাই বলতে ইচ্ছে করে।

নাজিদের সঙ্গে এই এক জায়গায় আবার বেশ তফাত রয়েছে বিজেপির। স্বয়ং অ্যাডলফ হিটলার শুরু থেকেই বিরুদ্ধ রাজনীতি, সংখ্যালঘু ধর্মমত, সংখ্যালঘু জাতি, সকলের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছিলেন। শুরু থেকেই নাজিরা বলে গিয়েছে, ইহুদিরা দেশের শত্রু। এদের শেষ করে দিলে জার্মানদের থাকার জায়গা বাড়বে। সেই ধারাবাহিকতাতেই কমিউনিস্ট-নিধন, ন্যুরেমবার্গ আইন, ঘেটো, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বার ইত্যাদির ব্যবস্থা। বই পোড়ানোর যে উৎসব হত, সেখানে কার বই থাকত না? কার্ল মার্ক্স, লিও তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, রোমাঁ রোলাঁ, ম্যাক্সিম গোর্কি, টমাস মান, এরিক মারিয়া রেমার্ক, জেমস জয়েস, জোসেফ কনরাড, হেলেন কেলার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আপটন সিনক্লেয়ার, এমনকি রবীন্দ্রনাথও। গোটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পত্রপাঠ ইহুদি অধ্যাপকদের সরানোর নিদান এসে গেল। নোবেল পুরস্কার প্রাপকদেরও ছাড়া হল না। মূল উদ্দেশ্য ‘আর্য পদার্থবিদ্যা’-র প্রচার। তাদের সেই ঘৃণায় কোনো ভেজাল ছিল না। আজকের পরিবর্তিত ‘লিবারাল’ দুনিয়ায় বিজেপি কিছুটা হলেও ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে। আখলাক আহমেদ বা তবরেজ আনসারি হত্যার মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটলেও প্রধানমন্ত্রী নিজে একটা সময় পর্যন্ত সরাসরি মুসলমানদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলতেন না। যে মহম্মদ শামির উদ্দেশে সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণা ছড়ান বিজেপি সমর্থকরা, যাঁকে শুনিয়ে আমেদাবাদের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়, সেই শামিকে নিয়ে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘ভাই মহম্মদ শামি’ বলে সম্বোধন করেছেন। বাংলায় ভোট পাওয়ার জন্য কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে মেকি আদেখলাপনা করেছেন, কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মোদী তাঁকে খাতির করে ডেকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু যেই বিজেপি বুঝেছে যে মানুষ আর চিরাচরিত আফিম গিলতে রাজি নয়, অমনি সে মুখোশ খসে গিয়েছে। সর্বময় প্রধান ঘৃণাভাষণের রাস্তায় চলে গেছেন, নাজিদের সঙ্গে আর কোনো তফাত থাকেনি। তাই পায়েল কাপাডিয়াকে নিয়ে গজেন্দ্রের গদগদ হওয়া বিজেপির ব্যাকফুটে যাওয়া ভেবে খিল্লি করা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

আরো পড়ুন রবীশ কুমারকে নিয়ে তথ্যচিত্র: কেউ কেউ জেগে আছে বলে

এ লেখা যখন শেষ করছি, ততক্ষণে নির্বাচনের ফল বেরিয়ে গিয়েছে। আমাদের মত অনেক শৌখিন মানুষের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে খেটে খাওয়া, প্রান্তিক, পদদলিত মানুষ প্রমাণ করেছেন, গণতন্ত্রে তাঁরাই শেষ কথা বলেন। এত হাজার কোটি টাকা ছড়িয়ে, সমস্ত প্রতিষ্ঠান কবজা করেও বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হতে ব্যর্থ হয়েছে, ‘৪০০ পার’-এর বেলুন ফুটো হয়েছে। আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছি। বিশেষ কিছু কেন্দ্রে বিজেপির মুখ থুবড়ে পড়া আমাদের পৈশাচিক আনন্দ দিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সংঘ পরিবার এখনো পরাজিত নয়। বিজেপি এখনো ক্ষমতায়।

জানুয়ারি মাসের ঘটনা। রামমন্দির উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে, এফটিআইআইয়ের ক্যাম্পাসে স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তরফে পোস্টার লাগানো হয়েছিল – Remember Babri. Death of Constitution. দুপুর নাগাদ সমস্ত হিন্দু বান্ধব সামাজিক সংস্থা নামের এক সংগঠনের কয়েকজন ক্যাম্পাসে এসে গুণ্ডামি শুরু করে। চারজন আহত হন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টও। স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করেছিল, পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উলটে তাঁদেরই তিনজনের বিরুদ্ধে ১৫৩বি ও ২৯৫এ ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়। হিন্দু বান্ধব সংস্থার রবীন্দ্র পড়ওয়ালের নামেও অবশ্য পরে একাধিক ধারায় মামলা করা হয়। প্রজাতন্ত্র দিবসে কলকাতায় পিপলস ফিল্ম কালেক্টিভের চলচ্চিত্র উৎসবে লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের বক্তব্যের পর এই ঘটনার কথা তাঁকে জানান এফটিআইআইয়ের এক ছাত্রী, বাকি দর্শকরাও তখন জানতে পারেন।

এফটিআইআইয়ের প্রাক্তনী পায়েল গতমাসে পুরস্কার পেয়ে এমাসে আদালতে যাবেন শুনানির জন্য। রেসুল পুকুট্টি তা নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। মনে রাখা দরকার, ফ্যাসিবাদীরা শত্রু চিনতে ভুল করে না, এমনকি তাকে সহজে ভুলে যাওয়ার চেষ্টাও করে না। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন (৫ জুন) যাঁর ১২৬তম জন্মদিন চলে গেল, স্পেনের সেই কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে চিনতে যেমন ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর জাতীয়তাবাদী শক্তি ভুল করেনি। সমালোচকরা তাঁকে যেখানে ‘অবাস্তব তীব্র আকাঙ্ক্ষার কবি’ বলে ভেবেছেন, লোরকার রাজনীতি নিয়ে তর্ক উঠেছে, সেখানে ফ্যাসিবাদীরা তাঁকে ‘বিপজ্জনক শত্রু’ ছাড়া অন্য কিছু ভাবেনি, পত্রপাঠ ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এমনকি তাঁর সমাধিও খুঁজে পেতে দেয়নি।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পাওয়া পায়েল অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ বা লোরকা নন। কিন্তু তাঁর নিজস্ব কাজ, নিজস্ব রাজনীতি, সবটুকু নিয়েই তিনি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাই দক্ষিণপন্থী শক্তির কাছে তিনি বিপজ্জনক বলেই চিহ্নিত হবেন। সেই কারণেই আজ বেকায়দায় পড়ে তাঁর নামে ধন্য ধন্য করছে বলেই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে হেলাফেলা করার কোনো অবকাশ নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.