অনেকেই ভয়ে ছিলেন। আর একবার নরেন্দ্র মোদী সরকার গড়লে কী হবে! মোদীর সরকারের সমালোচনা করে ভারতবর্ষে আর থাকা যাবে তো? স্বাধীনভাবে কথা বলা যাবে তো? নিজের পছন্দমত জামাকাপড় পরা যাবে তো? নিজের পছন্দের খাবার খাওয়া যাবে তো? অন্য ভয়ও ছিল। আবার মোদী সরকারে এলে তো দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্র বানিয়েই ছাড়বেন। সংবিধান তো বদলে দেবেনই। বিজেপির নেতারাই তো নির্বাচনী প্রচারে এই কথাটা বলে দিয়েছিলেন। আর প্রচারের মাঝেই মোদী স্বয়ং ঘোষণা করে দিয়েছিলেন – দেশের জন্য মুসলমানরা কেন ‘বিপদ’ হিসাবে গণ্য হবেন।
তিনিই আবার সরকার গড়তে যাচ্ছেন, কিন্তু ভয়টা অনেকটাই কম। কারণ ২০১৪ ও ২০১৯ সালে মত তাঁর হাতে, মানে তাঁর দল বিজেপির হাতে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নেই। একবার ২৮২ এবং পরেরবার ৩০৩ আসনে জেতার পরে তিনি ডাক দিয়েছিলেন ৪০০ পার করার। কিন্তু ২০২৪ নির্বাচনে তিনি মুখ থুবড়ে পড়েছেন। ৩০৩ থেকে আসন সংখ্যা ২৪০-এর কাছে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ বিজেপি একক বৃহত্তম দল হলেও, তাদের হাতে ২৭২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। শরিক দলগুলোকে সঙ্গে নিলে তবে এনডিএ জোট হিসাবে তারা ২৯০-এর কাছাকাছি পৌঁছতে পারছেন। গতবার এই সংখ্যাটি ছিল ৩৫২। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট ২৩৪-এ নিয়ে গেছে তাদের আসন সংখ্যা। গতবার বিরোধী জোটের কাছে মাত্র ৯১ আসন ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তার মানে দুই জোটের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নেই। বিজেপি সরকার গড়লেও একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারবে না। যে কোনো সিদ্ধান্ত তাদের শরিক দলগুলোকে পাশে রেখেই নিতে হবে। কারণ জোট হিসাবেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে এনডিএর। একক দল হিসাবে বিজেপির সেই ক্ষমতা নেই।
যে কোনো গণতন্ত্রের নিয়মই হল বিরোধীরা শক্তিশালী হলে তবেই সরকারকে তারা চাপে রাখতে পারে। কোনও ভুল ত্রুটি হলেই সরকারকে বাধ্য করতে পারে তা সংশোধন করার জন্য। দরকার হলেই বিরোধীরা সরকারের রাশ টেনে ধরতে পারে। গত দশবছরে যে ভাবে মোদী সরকার চালিয়েছেন তাতে গণতান্ত্রিক নয়, তাঁর স্বৈরাচারী মনোভাবই প্রকাশ পাচ্ছিল। গত লোকসভার শেষদিকে যেভাবে এক দল বিরোধী সাংসদকে একসঙ্গে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল প্রতিদিন, যেভাবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটি থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়া হল, যেভাবে নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম ও বিবিসির মত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে হেনস্থা এবং সাংবাদিকদের গ্রেফতারির ঘটনা ঘটে গেল, যেভাবে কাউকে না জানিয়ে নোট বাতিলের মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, যেভাবে বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কলেজিয়াম ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার চেষ্টা হল, যেভাবে বেছে বেছে বিরোধীদের পিছনে সিবিআই ও ইডি লেলিয়ে দেওয়া হল, ভারতের ইতিহাসে যেভাবে প্রথম কর্মরত মুখ্যমন্ত্রীদের ধরে ধরে জেলে ভরা হল, যেভাবে বিরোধীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে রাতারাতি সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরকে ত্রিখণ্ডিত করে রাজ্যটাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হল এবং মানুষকে মাসের পর মাস অবরুদ্ধ রাখা হল – তাতে মনে হচ্ছিল মোদী সত্যিই গণতন্ত্রের উপর বুলডোজার চালাচ্ছেন।
আরো পড়ুন ৩৭০ ধারা রদকে বৈধতা দেওয়ার পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিপন্ন করবে
এর সঙ্গে মুখে ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’ বললেও নির্বাচনী প্রচারের সময়ে মুসলমানদের নাম করে ঘৃণ্য আক্রমণ শানালেন মোদী এবং তাঁর দলের নেতা কর্মীরা। যেভাবে গত দশ বছরে ধর্মের নামে বিভাজন করলেন, গোমাংস খাওয়ার সন্দেহে পিটিয়ে মারলেন এই দেশেরই নাগরিকদের, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন পাস করালেন, এক দেশ এক নির্বাচনের হাঁক পাড়লেন, তাতে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয়-বহুত্ববাদী পরিকাঠামোই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দৃঢ় হচ্ছিল।
কিন্তু যখনই কোনো একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার নিজেদের সবকিছুর উর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে, তখনই ভারতবাসী সেই সরকারি দলকে রীতিমত শিক্ষা দিয়ে দেন। তা সে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীকেই হোক বা ১৯৮৯ সালে কংগ্রেসকে অথবা ২০০৪ সালে এনডিএকে।
যে দুই রাজ্যে বিজেপি সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে, সেই দুটো রাজ্যেও বিজেপির স্বৈরাচারী মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক অতীতে। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি গতবার ৮০-র মধ্যে ৬২ আসন জিতলেও, এবার সেখানে তাদের প্রায় ৩০টি আসন কমে গেছে। উত্তরপ্রদেশে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের বড়াই করে বিজেপির যোগী আদিত্যনাথ এক ধরনের স্বৈরাচারী সরকারই চালাচ্ছেন। বিজেপি ৬২ থেকে ৭০-এর ঘরে আসন সংখ্যা নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। এই রাজ্যেই রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করে মোদীরা ভেবেছিলেন হিন্দু ভোটকে একত্রিত করতে পারবেন, আর কাউকে দরকার হবে না। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের দলিত ও পিছিয়ে পড়া জাতির ভোটাররা বুঝিয়ে দিয়েছেন – বিজেপির এই আগ্রাসী মনোভাব তাঁদের না-পসন্দ। গত দুটো নির্বাচনে যে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিজেপি করতে পেরেছিল, তা এবার ব্যর্থ হয়েছে। অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের জোটকেই এই ভোটাররা যোগ্য বলে বেছে নিয়েছেন। ফৈজাবাদ আসন, যেখানে রামমন্দির, সেখানেও বিজেপি পরাজিত হয়েছে সমাজবাদী পার্টির কাছে। অবধেশ প্রসাদ জিতেছেন ৫৪,০০০-এর বেশি ভোটে। এছাড়া পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে কৃষকদের ক্ষোভ ছিলই বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে। তার প্রভাবও পড়েছে ইভিএমে।
হরিয়ানাতেও একই কায়দায় ভোট হয়েছে। মনে করা হচ্ছে বেকারত্ব, সেনাবাহিনীতে স্বল্পমেয়াদের চাকরির ব্যবস্থা করা অগ্নিবীর প্রকল্প নিয়ে সাধারণ যুবক-যুবতীদের মধ্যেও ক্ষোভ ছিল। নিন্দুকেরা বলছেন, যোগীর রাজ্যে এবার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কর্মীরাও সেভাবে মোদীর জন্য গা ঘামাননি। মোদীর নিজের কেন্দ্র বারাণসীতেই তো জয়ের ব্যবধান এক ধাক্কায় প্রায় পাঁচ লাখ থেকে দেড় লাখে নেমে এসেছে।
মহারাষ্ট্রেও আগ্রাসী-স্বৈরাচারী কায়দায় উদ্ধব ঠাকরের সরকার ফেলে দিয়ে শিবসেনাকে দু টুকরো করেছে বিজেপি। তার কয়েকদিনের মধ্যে শরদ পওয়ারের এনসিপিকেও ভেঙেছেন মোদী-অমিত শাহরা। কিন্তু মহারাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ এই আগ্রাসনকে মোটেই ভালভাবে নেননি। উদ্ধব ও শরদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন ভোটাররা। লোকসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করেছেন তাঁরা। যেখানে অবিভক্ত শিবসেনাকে নিয়ে গতবার বিজেপি ৪৮ আসনের মধ্যে ৪১ আসন জিতেছিল, এবার সেই সংখ্যা অর্ধেকেরও কম হয়ে গেছে।
বিজেপি বা তাদের পোষ্য বুথফেরত সমীক্ষা করা কোম্পানিগুলো ভেবেছিল পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর মত পূর্ব উপকূলের রাজ্যগুলোই বিজেপিকে ৪০০ পার করে দেবে। রাজ্য সরকারবিরোধী হাওয়ায় ওড়িশায় এককভাবে এবং অন্ধ্রে জোটসঙ্গী তেলুগু দেশম পার্টি ও জনসেনাকে নিয়ে বিজেপি ভাল ফল করলেও, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে বেকায়দায় ফেলতে পারেনি। তামিলনাড়ুতেও আসন জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। কিন্তু বামেদের গড় কেরালায় এবার খাতা খুলেছে গেরুয়া শিবির।
বিহারে ও দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোট ভাল ফল করতে পারলে আরও বিপাকে পড়ত বিজেপি। কিন্তু নীতীশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর কৃপায় কংগ্রেস ও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের জোটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ভাল ফল করেছে এনডিএ জোট।
এই জয়ের পরে স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একে মোদী ও শাহের নৈতিক পরাজয় বলে ঘোষণা করে তাঁদের ইস্তফা দাবি করেছেন। অন্যদিকে সংবিধান হাতে নিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, লোকসভা নির্বাচনের এই ফলাফলে দেশের সংবিধান রক্ষা পেল।
সবই ঠিক। বিজেপিকে তাদের দুই বড় শরিক জেডিইউ ও টিডিপির কল্যাণে সরকার চালাতে হবে। শুধু এই দুটো দলকে নিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বিজেপির কাছে। অন্যান্য ছোট ছোট দল, যেমন একনাথ শিন্ডের শিবসেনা বা লোকজনশক্তি পার্টির উপরেও ভরসা করতে হবে বিজেপিকে।
কিন্তু মোদী-শাহ জুটির শরিকি সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। গত দশবছর নাম কা ওয়াস্তে এনডিএ থাকলেও, মোদী নিজের নামেই সরকার চালিয়েছেন। আজ ঠেকায় পড়ে বিজেপির সদর দফতরের বক্তৃতায় তাঁকে বারবার এনডিএর নাম নিতে হচ্ছে। তাঁদের দলেও রাজনাথ সিং ছাড়া কেউ অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে পারেন বলে জানা নেই। লোকসভাতেও বিজেপির প্রমোদ মহাজনের মত বা কংগ্রেসের প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী বা কমলনাথের মতো কোনও ফ্লোর ম্যানেজার নেই।
উপরন্তু কয়েকমাসের মধ্যেই মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও ঝাড়খণ্ডে বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিরোধীরা ভাল ফল করলে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের মত শরিকদের ভাঙিয়ে আনা বা ‘পাল্টিকুমার’ নীতীশ বা টিডিপির চন্দ্রবাবু নাইডুকে ইন্ডিয়া জোটের দিকে টেনে আনা খুব কঠিন কাজ হবে না। ইতিমধ্যেই চন্দ্রবাবু আর নীতীশের কাছে বিরোধী জোটের ‘ট্র্যাক টু’ দৌত্য শুরু হয়েছে।

১৯৯৬ সালে বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ীও একক বৃহত্তম দলের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেশিদিন সরকার চালাতে পারেননি। ১৯৯৮ সালেও মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি তাঁর সরকার।
একথা ঠিক যে সংখ্যার বিচারে বিজেপিকে চাপে রাখতে পারে ইন্ডিয়া জোট। কিন্তু ফল প্রকাশের পর বিজেপির সদর দফতর থেকে মোদী যে ভাষণ দিলেন, তাতে মনে হল না যে তিনি খুব সহজে তাঁর আগ্রাসী মনোভাবের বদল ঘটাবেন। তিনি এখনো দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, আসামে বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্যের উপরে ভরসা রাখছেন। কর্মী সমর্থকদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে তিনি এখনো ‘বিশ্বগুরু’।
ফলে বিরোধীদের দায়িত্ব অনেকটা বাড়ল। সুবিধাবাদী রাজনীতি না করে যদি সত্যিই দেশের গণতন্ত্র বাঁচানোর কাজটা তাঁরা করেন, তবে জনগণের মঙ্গল। দেশবাসী একনায়কতন্ত্র থেকে দেশকে রক্ষা করার পক্ষে তাঁদের মতামত প্রকাশ করেছেন। এবার সেই মতামতে যোগ্য সঙ্গত করতে হবে বিরোধী দলগুলোকেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








