মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মদন তাঁতীকে মনে পড়ে? ‘শিল্পী’ গল্পের সেই একাকী নায়ক! ঋত্বিক ঘটক তাঁর শেষ ছবিতে মদনের গল্প বলতে বলতে লেন্সে মদ ঢেলে দেন। বারীন সাহা তা করেননি কিন্তু তাকিয়ে ছিলেন ইতিহাসের দিকে, দীর্ঘদিন মৌনতায়।

মদন ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে নিতে পারে না। সে অনাবাসী ভারতীয় থেকে শুরু করে নির্মল দম্পতি – কাউকেই খুশি করতে পারে না। নিজের মুদ্রাদোষে শুধু একা হয়ে যায়। বিশেষত চলচ্চিত্রের মত নরকে, যেখানে টাকার ঋতু, টাকার আকাশ, টাকার সমুদ্র। সেখানে রূপসীর স্তনোচ্ছ্বাস, সেখানে নির্বোধ কন্দর্পকুমার, সেখানে শিল্পের সম্ভ্রম কতটুকু? সিনেমা তো রাজসভায় বিবসনা দ্রৌপদী। এই সত্য, আশ্চর্য, ১৯২৫ সালে যে ভারতীয় চলচ্চিত্রকাররা জন্মেছিলেন, তাঁরা তিনজনই জানতেন। প্রথমজন ঋত্বিক, দ্বিতীয়জন গুরু দত্ত, তৃতীয়জন বারীন সাহা। কেউ আত্মহনন করেন, কেউ নৈঃশব্দ্যকেই আত্মার স্বরলিপি ভাবেন, কেউ উন্মাদ হয়ে যান।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই যে কোলাহলে মত্ত কলকাতা, এই যে প্রখর রাজনীতির দূষণ, এই যে সভাকবির বাকবিভূতি, এ যুগে যে বারীনের তের নদীর পারে কলকাতায় রূপকথা হয়ে এল তা আমি মনে করি সুসংবাদ। একথা ঠিকই যে ছবিটি নিয়ে তত আলোচনা এবারেও হল না। হয়ত এ ছবি পুরনো লাগছে অনেকের। হয়ত বারীনকে বোঝা যাচ্ছে না বা তিনি যা বলতে চাইছিলেন সেই কথাটাই পুরনো হয়ে গেছে। তবু বারীনকে দেখা, উদয়শঙ্করের কল্পনা (১৯৪৮) দেখা – এসব আমাদের অস্তিত্বকে নিম্নরেখ করে।

বারীন
বারীন সাহা। ছবি সোশাল মিডিয়া থেকে

এখানে সৃষ্টির একাকিত্ব অনেক দূরে, রূপকথার মত সুদূর। সে জন্যই আজ মনে হয়, বারীনের তের নদীর পারে (১৯৬১) বোধহয় চলচ্ছবির একটি অবিস্মরণীয় এপিটাফ। আর কী আশ্চর্য! প্রায় একই সময়ে ঋত্বিক নির্মাণ করছিলেন সুবর্ণরেখা। তা মুক্তি পায় পাঁচ বছর বাদে। বারীনের ছবি আরও পরে ১৯৬৯ সালে। ব্যর্থতার সঞ্চারপথে আসলে বৈচিত্র্য থাকে না। সুবর্ণরেখা ও তের নদীর পারে দুই-ই ‘পরিত্যক্তদের কক্ষ’-এর সম্পদ। প্রত্যাখ্যান – এই শব্দটির মধ্যে যে ঐশ্বর্য তা ছয়ের দশকে যন্ত্রণা আর নিষ্ঠুরতার মধ্যে মথিত হতে হতে জেনেছিলেন ঋত্বিক ও তাঁর বন্ধু বারীন। ইতিহাসের অপার কৌতুক যে দুজনে জন্মেছিলেন যে বছরে, সেই ১৯২৫ সালেই সের্গেই আইজেনস্টাইন তাঁর কারুবাসনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন যুদ্ধজাহাজ পটেমকিনের সম্পাদনায়। ঋত্বিক, বারীন উভয়েই তাহলে পটেমকিনের সমবয়স্ক। আর তাই হয়ত তাঁদের জীবন বৃত্তান্ত ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নিয়মের থেকে দূরে সরে যায়। হায়! বারীনও তো ভেবেছিলেন রক্ত আর স্বপ্নের মৈথুন ছলনা করে যাবে মৃত্যুকে।

আজ আমাদের রক্তে হিম পড়ে যায় বিজ্ঞাপনের অবিনশ্বর হোর্ডিং দেখে। যে যায় হারিয়ে যায় শূন্যে মায়াসারসের মত। বারীনও হারিয়ে গেছেন। আর একটিমাত্র ছবির জন্য আমরা তাঁকে মনে রাখবই বা কেন? এখন তো বাংলা ছবি ১৪ দিনে হয়ে যায়।

একদা স্পেনিয় চিত্রকর ভিলাস্কেত একটি ছবি আঁকেন ‘লাস মেনিনাস’ নামে। আজ থেকে সাড়ে চারশো বছর আগে (১৬৫৬) রাজঅন্তঃপুরিকাদের সেই বিধুর প্রতিকৃতি আমাদের পক্ষে নিত্যস্মরণীয় হয়ে আছে। তার কারণ শিল্পী ওই পটে নিজেকে শুধু অন্তর্ভুক্ত করেন না, অবলোকনের বিষয়ও করে তোলেন। এই অবিরল আত্মদর্শন ও আত্মপরীক্ষা আধুনিকতার ইতিহাসে প্রথম বিবেকের সম্প্রচার। সেই সূত্রে বলা যায় মাধ্যমের সঙ্গে সহবাসকালীন শিল্পী যে স্বীকারোক্তি করেন, তা প্রবন্ধের রূপ নিলে রচিত হয় জঁ জেনে-কৃত ‘লে ফু নঁ বুল’। চলচ্চিত্রে তার উপমারহিত দৃষ্টান্ত ইঙ্গমার বার্গম্যানের সডাস্ট অ্যান্ড টিনসেল (১৯৫৩); আমাদের ভাষায় অবশ্যই তের নদীর পারে।

কিন্তু ফেদেরিকো ফেলিনির লা স্ত্রাদা (১৯৫৪) নয়। ফেলিনিতে সার্কাস উপলক্ষ। তিনি জানাতে চান প্রেমের বিহনে মুক্তি নেই। রূপকাশ্রিত এই আখ্যান বলে ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়/করুণাধারায় এসো’। কিন্তু বার্গম্যান ও বারীন শিল্পকেই করে তোলেন অন্তর্তদন্তের উদ্দেশ্য ও বিধেয়। যেমন জেনের রচনাটি। তিনি ‘মাদারি’-র মাধ্যমে আমাদের উপদেশ দেন, কীভাবে শিল্পের সামান্যতা থেকে সৃষ্টির অসামান্যতায় পৌঁছতে হবে। তিনি বলেন ‘সার্কাসে একটা বেশ্যাকে আমরা দেখতে আসিনি, দেখতে এসেছি এক নিঃসঙ্গ প্রেমিককে, যে তার নিজের ভাবমূর্তিকে পেতে চায়, যে ভাবমূর্তি একটা লোহার তালের উপর মিলিয়ে গিয়ে পালিয়ে যায় এবং সর্বদাই তা এক নারকীয় দেশে, তাহলেই এই নৈঃসঙ্গ্য আমাদের হতচকিত করবে।’ বারীনের ছবিতেও সেই মারাত্মক নৈঃসঙ্গ্য, সেই কর্কশ ও উজ্জ্বল প্রদেশ, যেখানে শিল্পী বিবস্ত্র হন। এই খেলা কবিতায় বা চিত্রকলায় সম্পন্ন করা যায়, কিন্তু চলমান চিত্রকলা মূলত বিনোদনপ্রবাহ। সেখানে বারীনের এই প্রয়াসকে অগ্নিপরীক্ষার তুল্য মনে করা যায়। আসলে দেবদাসীদের মতই মন্দিরের দরকার ছিল বারীনের আর তা চলচ্চিত্র। এই ভারসাম্যের খেলা, ট্র্যাপিজ বিপজ্জনক; তা দেবতাকে নিবেদন করা যায়। দর্শক তাকে হত্যা করেছিল। কিন্তু কেন? ভেবে দেখলে জবাব পাব, আসলে বিশ্বকে ছলনা করতে চেয়ে তিনি শিল্পের চরিত্র বিষয়ে এক সন্দর্ভ রচনা করে ফেলেছিলেন। বাণিজ্য বিপণীতে কাঞ্চী বিদিশার মুখশ্রী কীভাবে মাছির মত ঝরে, কী করে সৌন্দর্য বাজারপ্রতিমা হয়ে যায় – বারীন সে প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেন। একে লক্ষ্মী, সরস্বতীর প্রথাস্বীকৃত দ্বন্দ্বের মধ্যে স্থান দিলে চলবে না। লুই বুনুয়েল যেমন আঁ শিয়ে আঁদালু (১৯২৯)-তে অক্ষিগোলকটিকেই চিরে দেন, বারীনও আমাদের দেখার চোখ পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন।

বার্গম্যান সডাস্ট ও টিনসেলে নাটক ও সার্কাস দলের মধ্যে হতমান, অবমানিত শিল্পীকে দেখেছিলেন। স্ত্রীশরীরের কদর্যতা ও অসঙ্গতি প্রমাণ করে বার্গম্যান ক্রুদ্ধ। কিন্তু একইসঙ্গে বার্গম্যান লিপ্ত। আর বারীনের ভঙ্গিটিই বাস্তববাদের চেনা ছকের বাইরে, তাঁর অভিনয় স্টাইলাইজড, তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে চলচ্চিত্রের জনপদবধূটিকে নিরীক্ষণ করেছেন। লোকেশন শুটিং এখানে বড় কথা নয়। হে দর্শক, স্মৃতিকে প্রশ্ন করলে দেখতে পাবেন বাজারে নর্তকীর আগমন দৃশ্য। এই যে দীর্ঘ সাবজেকটিভ দৃষ্টিপাত – তা শুধু বারীনকে অতি শিক্ষিত হিসাবে পরিচিত করে না, নদীটির পাড় জুড়ে তাঁর জিপ প্যান প্রায় দৈববাণীর মত বলে এই পথ যুদ্ধক্ষেত্র; রাত্রির যে তুলনাবিহীন চিত্রকল্প তিনি উদ্ধার করে আনেন তা প্রকৃতই নৈশবিগ্রহ।

যা শুরু হয়েছিল ভ্রাম্যমাণ মেলার উপকরণ হিসাবে, যা একান্তভাবেই অনভিজাতদের জন্য সময়বিলাস, তা যদি আত্মার অভিব্যক্তি ধারণ করে, তবে একটি সংকট শুরু হবেই। নিম্নবর্গীয় যে একলব্যটি নর্তকী বা নর্তককে প্রতিরোধ করে, সে জানে ও বিশ্বাস করে রক্তের অঞ্জলি ফুলমালার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় না। এখানে বারীনের অবস্থান নৈতিক, যে নৈতিকতাকে বাজার ক্ষমা করে না – কিন্তু এতদিন পরে পুতুল রমণী ও মডেল যুবকদের কোলাহলে যাকে মনে হয় আধ্যাত্মিক। যাঁরা এই ছবি সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁদের সাধুবাদ জানাই বারবার।

আরো পড়ুন অবিস্মরণীয় চুনীবালা: আমাদের আত্মার প্রতিমা

ছয়ের দশকে কোনো সরকারি অভয়ারণ্যের প্রত্যাশা না করেই, পুরস্কার ও কলমচিদের থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি রেখে গেলেন সৃষ্টির অভিমান বিষয়ে একটি রূপক। কী আশ্চর্য! বারীন সাহা তো বাঙালিই ছিলেন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.