বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে শ্যাম বেনেগালের বায়োপিক মুজিব ভারতে, এমনকি বাংলাদেশেও, সেভাবে যে সাড়া ফেলতে পারেনি তা সামান্য খোঁজখবর নিলেই বোঝা যায়। বিপুল প্রচার, হলে হলে প্রদর্শন বা ছবির কর মকুব সত্ত্বেও সিনেমা জনমনে বিরাট প্রভাব ফেলতে না পারার পিছনে সিনেমাশৈলী বা তার নন্দনতত্ত্ব একটা কারণ হতে পারে। গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন তো উঠেছেই, কিন্তু সব ছাপিয়ে আসল কারণ সম্ভবত বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। গোটা দেশ এমনভাবে বিএনপি আর আওয়ামী লীগে ভাগাভাগি হয়ে গেছে যে সিনেমা গৌণ হয়ে গিয়ে বিষয়টির যৌক্তিকতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশে নির্বাচন। ফলে অনেকেরই ধারণা, এ ছবির উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে সামনে রেখে লীগ রাজনীতিকে সুবিধা করে দেওয়া। অনেক জায়গাতেই শিল্পমাধ্যম, বিশেষ করে সিনেমা, হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার। ভারতে যেমন কাশ্মীর ফাইলস বা কেরালা স্টোরি, ঠিক তেমনই শেখ সাহেবকে নিয়ে ছবি স্রেফ আওয়ামী লীগ আর মুজিবুর রহমানের গুণকীর্তন করে ভাসমান বা দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা মাত্র। ফলে ছবির গুণমান যা-ই হোক, নির্বাচনের সময়ে মুক্তি পাওয়া নিয়ে বিতর্ক হবেই।

বাংলাদেশ সম্পর্কে যাঁরা একটু আধটু খোঁজ রাখেন, তাঁরাই এক মত হবেন যে এই মুহূর্তে ওদেশের রাজনৈতিক উত্তাপ এতটাই যে খোলা মনে শ্যাম বেনেগাল বা সত্যজিৎ রায় বা ঋত্বিক ঘটক কিম্বা বিশ্বের যে কোনো মহান চলচ্চিত্র পরিচালক এ ধরনের বায়োপিক করলেই তা নিয়ে জলঘোলা হত। ফলে বিরোধী শিবিরের কাছে, আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকারকে মাইলেজ দেওয়া ছাড়া, এ ছবির কোনো গুরুত্ব নেই। আওয়ামী লীগের বিরোধী দলগুলোর কাছে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ছবি আর এবারে শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিক একই ধারার রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা মাত্র।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিতর্ক যা-ই হোক, আমি বলব শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ভিজুয়াল ডকুমেন্টেশনের দরকার ছিল। অবশ্য শুধু শেখ সাহেব কেন, বাংলাদেশের অন্যান্য জাতীয় নায়কদের নিয়েও ছবি করা জরুরি। আমরা উপমহাদেশের এমন এক সন্ধিক্ষণে বাস করছি, যেখানে ইতিহাস হয়ে পড়ছে শাসকদের হাতের পুতুল। ইচ্ছা মত ইতিহাস নির্মাণ এখন ক্ষমতাসীনদের দস্তুর। এটা যদি নেতিবাচক প্রবণতা হয়, অন্যদিকে কিছু কিছু ইতিবাচক কাজও হচ্ছে। ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ বা বিনির্মাণ হলে লাভ এটুকুই যে তর্কাতর্কির মধ্যে দিয়ে অনেক হারিয়ে বা ভুলে যাওয়া সত্য সামনে আসে। বিভিন্ন দেশে পাঠ প্রবণতা কমছে। ফলে এ ধরনের ডকুমেন্টশনের প্রয়োজন আছে। আমরা কিউবা, ভেনিজুয়েলা বা ভিয়েতনামের সংগ্রামের ইতিহাস জানব, অথচ পড়শি দেশের অনন্যসাধারণ জনযুদ্ধকে ভুলে যাব – এ কোনো কাজের কথা নয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন করে জানতে পারা অবশ্যই এক সদর্থক দিক। তবে বাংলাদেশে একটা প্রবণতা জন্ম নিয়েছে – যার পিছনে দুই বঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সিনেমা পরিচালক, ইতিহাসবিদদের বড় অংশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ – তা হল যেনতেন প্রকারে মুজিব কাল্ট তৈরি করে একপেশে ইতিহাস নির্মাণ।

শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষে শুনেছি তাঁকে নিয়ে প্রায় সাত-আট হাজারের কাছাকাছি বই বেরিয়েছে। বলাই বাহুল্য অধিকাংশই নিছক স্তুতি বা মুজিব ভজনা। একজনকে মহান করতে অন্যান্য অনেককে গুরুত্বহীন করে দেওয়া, আর যা-ই হোক, ইতিহাসসম্মত নয়। ১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত ভাষণের মধ্যে দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা – এ হল অতিসরলীকরণ। দীর্ঘদিন ধরেই তৎকালীন পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল। তার পিছনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিশ্চয়ই ছিল। পাশাপাশি মওলানা ভাসানীর ন্যাপ এবং অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোর ভূমিকা কিছু কম ছিল না। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো এক দলের নয়। একটা গোটা দেশের, আপামর জনসাধারণের লড়াই। সে যুদ্ধ ছিল সর্ব অর্থেই জনযুদ্ধ।

শেখ মুজিবুর রহমানের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে ১৯৭০ সালে স্বেচ্ছায় মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক ব্যাটন পুরোপুরি তাঁর স্নেহের মুজিবের হাতে তুলে দেওয়ার পর থেকে বঙ্গবন্ধুই যে বাংলাদেশের এক ও অদ্বিতীয় মহানায়ক – তা নিয়ে কোথাও কোনো তর্ক নেই। শেখ মুজিব ছিলেন অসাধারণ সংগঠক, অসম্ভব বাগ্মী এবং অকুতোভয়। তাঁর প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দুর্জয় সাহসই যে পরবর্তীকালে তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবুর রহমানকে জোর করে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ করার দরকার ছিল না। বায়োপিক সেই বিরাটকায় ভাবমূর্তির সেলুলয়েড সংস্করণ। ছবিটির সবথেকে বড় ত্রুটি – শেখ মুজিবের রাজনৈতিক হাতেখড়ি যে কলকাতায় এবং বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার মাটি যে পূর্ববাংলা, দুটিই এখানে আবহ হিসাবে প্রায় অনুপস্থিত। ইসলামিয়া কলেজ বা বেকার হোস্টেল আছে, কিন্তু তার উপস্থিতির ইতিহাস ভুল। পূর্ববাংলার নদ, নদী, খালবিল, সহজ সরল জনতার অস্তিত্ব এই ছবিতে আশ্চর্যজনকভাবে অনুপস্থিত।

একশো কোটি টাকার ছবি, শ্যাম বেনেগালের মতো নির্দেশক। তা সত্ত্বেও এসব না থাকলে সিনেমার সামান্য ছাত্র হিসাবে খারাপ লাগে। ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ প্রযোজনায় এ ছবি। ফলে রাষ্ট্রীয় লগ্নি স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালককে কতটা স্বাধীনতা দিতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন থাকেই। তবু কিছু কিছু সময় মনে হয়েছে শ্যাম বেনেগাল চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব থেকে দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হয়ে ওঠা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিবুর রহমানের পরিবর্তিত ছবির দৃশ্যকল্প কিন্তু লক্ষ করলে বোঝা যায়। বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই, অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের এ লিগাসি অব ব্লাড পড়লে বোঝা যায়, মুজিবশাহী ধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল দুই মুজিবুরের সংঘাত।

আরো পড়ুন প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্রের খোঁয়ারি কাটায় ভিদুথালাই

একজন নেতা, অপরজন রাষ্ট্রনায়ক। দুই ব্যক্তির দ্বন্দ্বে জনপ্রিয়তার চুড়ো থেকে বাংলাদেশের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তির ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যাওয়া অপ্রিয় হলেও বাস্তব। ছবিতে সোহরাওয়ার্দী যত গুরুত্ব পেয়েছেন, তার সিকি ভাগ পাননি অন্য জাতীয় নেতারা। ফজলুল হক আছেন। মওলানা ভাসানী খানিকটা বিস্ময়করভাবে এ ছবিতে ইতিবাচকভাবে এসেছেন। তবে তা নিতান্তই ছবির স্বার্থে। তাজউদ্দীন আহমেদের বিরাট ভূমিকা একবারও ছবিতে আসেনি। বামপন্থীদের মরণপণ লড়াই বা ভাষা আন্দোলনের সময় অলি আহাদ, মহম্মদ তোয়াহা বা ভাষা মতিন পুরোপুরি অদৃশ্য। বলতেই পারেন, বিশাল সময়কে তিন ঘন্টার ছবিতে নিয়ে আসা কঠিন। তবুও ইতিহাস নির্ভর ছবিতে যথার্থ ইতিহাস নির্মাণ তরুণ প্রজন্মের স্বার্থে একান্ত জরুরি। অন্যথায় পরিচালক যত বিখ্যাতই হোন বা সরকারের সদিচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণ – এ যদি মেনেও নিই, তাহলেও ছবি নিয়ে বিতর্ক হবে, হচ্ছেও।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.