নির্দেশক ভেট্রিমারান চলচ্চিত্র বানান কম। ২০০৭ সালে পোল্লাধাভান, ২০১১ সালে আদুকালাম, ২০১৬ সালে বিসরণাই, ২০১৯ সালে অসুরান। ভেট্রিমারান যে চলচ্চিত্র বানান, একবার তা দেখে ফেললে, দৃশ্যগুলো তাড়া করে ফেরে। ওই মাথার ভেতরে কোনও এক ‘বোধ’ কাজ করার মতই, কিছুতেই এড়ানো যায় না। আর, এই না এড়াতে পারা বোধ চেতনায় পলির মত জমতে জমতে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ভেট্রিমারানের চলচ্চিত্র রাজনৈতিক। বিসরণাই নিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি ছবিটি বানানোর সময় অনুতাপ ও স্ব-দোষারোপে ভুগতেন। তাই সেটে গিয়ে অভিনেতাদের সঙ্গে সেই স্ব-দোষারোপ ও অনুতাপ ভাগ করে নিতেন। তাঁদের মতামত চাইতেন। ভরদ্বাজ রঙ্গনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই স্ব-দোষারোপ তাঁর চেতনায় ভারি হয়ে থাকে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসরে ঘটে চলা অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সার্বিক নীরবতার জন্য। বিসরণাই, অসুরান ছবিগুলি এই সময়ের অভিজ্ঞান। রাষ্ট্রীয় মদতে তৈরি প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র আর গাদাগাদা ব্রয়লার পরিচালকের তৈরি ব্রয়লার চলচ্চিত্রের খোঁয়ারি কাটিয়ে সময়কে চেনাতে চায় ভেট্রিমারানের চলচ্চিত্ররা। ভিদুথালাই সেই চেষ্টাকে আরেকটু সৎ, একনিষ্ঠ করে।

#

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মক্কাল পদাই তথা পিপলস আর্মির সঙ্গে জমিলুটেরা বনলুটেরা সরকারের বিরোধ আবহস্বরে শোনা যায়। ১৯৮৭। আরুমাপুরি গ্রামে খনি খননের মালিকানা পেল বেসরকারি একটি সংস্থা। পিপলস আর্মি ও জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ। সশস্ত্র প্রতিরোধ। সেনা ক্যাম্প আর ফাঁড়ি জাঁকিয়ে বসে গ্রামে গ্রামে। চলচ্চিত্র শুরু হয়।

ক্যামেরা চলতে শুরু করে। একটা ট্রেন দুর্ঘটনার পরের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। জনৈক ভীত যাত্রী ব্রিজের উপরে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে। মন্ত্রী আর উচ্চপদস্থ আধিকারিক দলবল নিয়ে ঘুরছে। আহতদের আত্মীয়রা কাঁদছে। মৃতদেহ ছড়িয়ে। কিন্তু ছবিটা যে রাষ্ট্রনির্মিত বয়ানের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করবে, তা পরিষ্কার হয়ে যায় শুরুর দৃশ্যেই। মন্ত্রী আর আমলার কথোপকথন। রাষ্ট্রীয় লুঠের প্রতিরোধকারী পিপলস আর্মির উপরে দোষ চাপানোর চেষ্টা চলে – কিন্তু আরেকটা স্বরও উঠে আসে, “একটা পোস্টারে কিছু প্রমাণ হয় না। ওদের নামে ভুয়ো পোস্টারও তো ছড়ানো হতেই পারে!” মন্ত্রীর জবরদস্তি চলতে থাকে দুর্ঘটনার দায় পিপলস আর্মির উপরে চাপানোর ব্যাপারে, যাতে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। সমান্তরাল বয়ানের অন্তর্ঘাত ধরে রাখে ক্যামেরা এবং সংলাপ। আহতদের উদ্ধারকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন পিপলস আর্মির কমরেডরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তাঁরা উদ্ধার করেন এক সদ্যোজাতকে। বাস্তবোচিত আখ্যান বলতে ক্যামেরাকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কোথায় বসাতে হয়, কীরকম শট নিতে হয় ভেট্রিমারান তা জানেন। মন্ত্রী আর পুলিস আধিকারিকের নির্দেশ আসে, পিপলস আর্মিকে দোষী সাব্যস্ত করে ভুয়ো জনমত তৈরি করতে হবে। যে কোনো উপায়ে পিপলস আর্মির প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কয়েক মাস আগে চিন্তন শিবিরে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণের সঙ্গে কী সাদৃশ্য! “নকশালদের পক্ষে যারা কথা বলবে বা লিখবে বা তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতি দেখাবে, তাদেরও নিকেশ করা হবে” – চলচ্চিত্রে এই উচ্চারণ শীর্ষস্থানীয় আমলার।

মায়ের সঙ্গে চিঠিতে কথোপকথন চলে কুমারেসনের। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যেও তেমনই। কুমারেসন যা দেখে, যেভাবে দেখে এবং যা বোঝে তা মাকে চিঠিতে জানায়। স্বগতোক্তির ঢঙে কুমারেসন তার মতামত ব্যক্ত করে চলে। ধারাভাষ্যের মতই শোনায় না? পুলিস ক্যাম্পে তার নিঃসঙ্গতা বাড়ে। ওই ধারাভাষ্যের মত স্বগতোক্তি তার প্রমাণ। আশা থেকে হতাশায় রূপান্তর। পুলিসি জীবনের দমবন্ধ অসহায়তা। কোনোকিছুই সে সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। কুমারেসনের মানবিক প্রবৃত্তি ছিল, অসহায়ের দুঃখে সহমর্মী হওয়ার ‘রোগ’ তার ছিল, জনগণের সেবা করাই পুলিসের দায়িত্ব – এমন কর্তব্যবোধের ‘ভূত’ তার ঘাড়ে চেপে ছিল। রাষ্ট্রের নিষ্ঠ সেপাই হতে গেলে এইসব মানবিক প্রবৃত্তির রোগ আর ভূত ঝেড়ে ফেলতে হয় – কুমারেসন তা বুঝতে চায় না, মানতে চায় না বলেই ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পুলিশের তাত্ত্বিক কর্তব্য আর বাস্তবের অনুশীলনের দ্বন্দ্ব বাধে। মানবিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতির দ্বন্দ্ব প্রকট হয়। চলচ্চিত্র এই দ্বন্দ্বগুলিকেই ধারণ করে গতি পায়। কুমারেসন সরল। আদর্শবান। নীতিবান। মূল্যবোধের পরত তার চেতনায়। রাষ্ট্রের তা নয়। তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং অভিজ্ঞ সহকর্মীদের তা নয়। এখান থেকেই বিরোধাভাসের জন্ম। আধুনিক সময়ের চলমান বিরোধাভাস। শাস্তি পেতে পেতেও সে সত্যবচন থেকে সরে না। পুলিস ক্যাম্পের প্রস্রাবাগার পরিষ্কারের শাস্তিমূলক দায়িত্ব, রাতভর ওয়াচ টাওয়ারে পাহারা দেওয়ার শ্রান্তি, উঠতে বসতে ঊর্ধ্বতনের অপমান ইত্যাদি কিছুই তার মূল্যবোধ ও সৎ অভিব্যক্তিতে বাজে দাগ কাটতে পারে না। তাই সে কিছুতেই বাকি পুলিসদের মত হয়ে যায় না। তাই সিস্টেমের নিয়ন্তারা তাকে পিষতে থাকে নিজেদের মত বানাবে বলে। বানাতে পারে না বলেই কুমারেসন সিস্টেমের অন্তর্ঘাত হয়ে ওঠে। সামান্য জিপ ড্রাইভার কুমারেসন। তার চোখ-কান-মন দিয়ে দর্শক দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের বাস্তবতা দেখতে পায়, শুনতে পায় ও বুঝতে পারে। শিউরে ওঠে না কি? কুমারেসনের পড়া পুলিসি চাকরির ম্যানুয়ালের পাতা খসে পড়তে থাকে – রাঘবেন্দ্র নামক পুলিস আধিকারিক রাষ্ট্রের মুখ হয়ে ওঠে। আজকের ভারত রাষ্ট্রে মানবিকতা আর ন্যায়াদর্শের চেয়ে বড় অন্তর্ঘাতী বিষয় কী-ই বা হতে পারে?

কুমারেসনের ঋজু আদর্শবান সরলতা দেখে মনে হয়, আহা, এমন সৎ পুলিসই আমরা চেয়েছিলুম। এমন সৎ ও কর্তব্যপরায়ণ পুলিসের সাজপোশাকে বলিউড-টলিউড-মলিউডের কত নায়ককে আমরা দেখেছি। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংশোধনের ন্যায়দণ্ড হাতে সিংঘম থেকে বিক্রম রাঠোড় থেকে ওয়েব সিরিজের হাথিরাম বা বর্তিকা চতুর্বেদীর মতো নায়করা অবতীর্ণ হয়েছে। ব্যবস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্বগুলিকে কী সুললিত সমাধান দিয়েছে তারা, অনেক ঝড়ঝাপ্টার পরে গণতন্ত্রে শান্তির হদিশ দিয়েছে। কুমারেসন পারেনি। কুমারেসন নায়ক হতে পারে না। অন্তত দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিনিধিদের মাথায় তুলে রাখা শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্রের মাচো পুলিস-নায়ক কিছুতেই সে নয়। তাকে দিয়ে যে গণতন্ত্র আর পুলিসতন্ত্রের ফাঁকফোকর ও দগদগে ঘাগুলি দেখিয়ে দেওয়া যাচ্ছে। সে ওইসব ঘা সারাবার চেষ্টা করেও পারছে না। হেরে যাচ্ছে। নিজের অজান্তেই সে মূর্তিমান অন্তর্ঘাত হয়ে উঠছে। না চাইতেই সে আর পেরুমল দুটি সমান্তরাল লাইন হয়েও একই সময়রেখা বরাবর রাষ্ট্রনির্মিত বাচনের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। পেরুমল সশস্ত্র গণআন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে প্রশ্নগুলি সমাজে চারিয়ে দিতে চাইছে, কুমারেসন সেই প্রশ্নগুলিই তুলতে থাকে। কখনো অসহায় অভিব্যক্তি, কখনো দৃঢ়স্বর। সে পেরুমলের মত রাষ্ট্রদ্রোহী নয়, সে লুটেরা কর্পোরেট আর সরকারের জোটের পতন চায় না। সে শুধু নিজের বিবেক আর নীতিবোধের সঙ্গে প্রশাসনিক আদেশ মেলাতে চায়। পারে না। কুমারেসনের অসহায় ছুটে আসা আধাসেনা অফিসারের কাছে – নিরীহ গ্রামবাসীদের পুলিস ফাঁড়িতে তুলে এনে অত্যাচার যাতে আটকানো যায়। পারে না। পুলিসসমাজে কুমারেসনের মূল্য বড়ই কম – সুরির অসামান্য অভিনয় সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। পুলিস আর আধাসেনা পেরুমলকে ধরতে গ্রামবাসীদের নির্যাতন শুরু করে; অচিরেই সেই নির্যাতন যৌন নির্যাতনে বদলে যায়। আদিবাসী নারীদের নগ্নতায় পুলিস-সেনার লালা ঝরতে থাকে। পেরুমল তখন গৌণ, পুলিসি কর্তব্যবোধ অবজ্ঞাত। রাঘবেন্দ্র, নটরাজন, ভেলমুরুগানরা যৌন নিপীড়ন আর শ্লীলতাহানি উপভোগ করতে করতে রাষ্ট্রের যথার্থ প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। যথেচ্ছ ভুয়ো সংঘর্ষ, নির্বিচার হত্যা এবং পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনকে কিছুতেই ‘শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদ্ধতি’ বলে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। ছকে বাঁধা বাচনে ভাথিয়ার বা পেরুমল রাক্ষসসম – সে পুলিসের রক্তলোভী, নির্মম, বেপথু রাজনৈতিক, উন্নয়নবিরোধী। দৃশ্যের পরত খুলতে খুলতে এই বাচনবুনোট আলগা হতে থাকে। বাঁধা ছক প্রত্যাখ্যাত হয়। পিপলস আর্মি এবং ভাথিয়ার জনগণের মধ্যে মিশে থাকে যেমন জলের মধ্যে মাছ। ভাথিয়ারকে গ্রেপ্তারের সময় গ্রামবাসীর প্রতিরোধ আর ক্ষোভ-কান্না মেশানো স্বরে তা প্রতীয়মান হয়।

#

বিজয় সেথুপথির পর্দায় উপস্থিতি খুব বেশিক্ষণের নয়। তা হওয়া কাম্যও ছিল না। কারণ, গল্পটা কুমারেসনের চেতনা জুড়ে পড়া অভিঘাত নিয়ে। মহাতারকাকেন্দ্রিক ছবিতে যেমন হয়, সেথুপথির উপস্থিতিও তেমন নয়। এই মুহূর্তে ভারতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠতম বহুমাত্রিক অভিনেতা সেথুপথি। তবে সুরি কুমারেসনকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা অভিনয়ের ক্লাসে পাঠ্য হতে পারে। কুমারেসন-তামিলারাসির প্রেম দানা বাঁধতে বাঁধতে ছড়িয়ে যায়, আবার একটু আশ্বাস পায়, আতঙ্ক আর ভালবাসা যুগপৎ খেলা করে তাদের অভিব্যক্তিতে, আর সবটাকে বেঁধে রাখে আর্থ-রাজনৈতিক সংকট। তামিলারাসির ভীত চাহনি, সাহসী প্রতিবাদ, অপমানে ঝলসে যাওয়া চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন ভবানী শ্রী। রাঘবেন্দ্রর ভূমিকায় চেতন যথাযথ – রাষ্ট্রসেবী ক্ষমতাবান পুলিশের মুখের পেশি ঠিক যতটুকু কাঁপে, অধস্তনকে ধমাকানোর সময় যতটা দাঁতে দাঁত পিষতে হয় এবং ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে চোখের পাতা যতটুকু নড়ে, ততটুকু নিখুঁত দৃশ্যায়িত করেছেন চেতন। গৌতম মেনন অপারেশন গোস্ট হান্টের প্রধান পুলিসকর্তার ভূমিকায় তেমনই বরফশীতল – রাষ্ট্রের মাইনে পাওয়া সেনাপতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। ভাথিয়ারের ভূমিকায় সেথুপথির পলকহীন চোখ আর আত্মবিশ্বাসী সংলাপ শুকনো ‘রেটিং’ দিয়ে মাপা যায় না। ভেলরাজের সিনেমাটোগ্রাফি আরুমাপরির নৈসর্গিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে যেখানে প্রকৃতির বিশালতার সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের সংলাপ চলে কিন্তু বহিরাগত পুলিশের সঙ্গে সংলাপ ভেঙে যায়। একইসঙ্গে মানুষী নিষ্ঠুরতার দৃশ্যগুলি প্রয়োজনীয় বৈপরীত্য তৈরি করে। ভিদুথালাই-এর আরেক বৈশিষ্ট্য দীর্ঘ দৃশ্যায়ন। চলচ্চিত্রের শুরুই হয়েছিল অমন এক ছেদহীন দৃশ্য দিয়ে। আর অন্তিমাংশে পৌঁছে এর ঠিক বিপরীত দৃশ্যায়ন। দ্রুত দৃশ্যান্তর। এক দৃশ্য থেকে অস্থির সংলাপে পরের দৃশ্যে গিয়ে ফের আগের দৃশ্যে ফেরা। দ্বিতীয় পর্বের ইঙ্গিতও এখানেই দেওয়া হয়েছে।

#

যে দৃশ্যগুলি ছাড়া যায় না

১) কুমারেসনের সঙ্গে তামিলারাসির প্রেম। উৎপীড়ক পুলিস সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধির সঙ্গে উৎপীড়িত শ্রেণির এক প্রতিনিধির প্রেম। কিন্তু তা একমাত্রিক গ্যাদগ্যাদে নয়। অবিশ্বাস পেরিয়ে বিশ্বাস জন্মানো, ভয়ের আস্তরণ সরিয়ে সাহসী স্পর্শ, দুজনের সামাজিক ও শ্রেণি অবস্থানের ফারাক মনে রেখেও ভালবাসায় আস্থা, প্রবল রাষ্ট্রীয় হিংসার সমান্তরালে প্রেমের অবসর।

২) পেরুমলের উপস্থিতির অ্যাকশননির্ভর দৃশ্যগুলি আখ্যানে গতি আনে। “মাইনিং কোম্পানিকে ওখানে প্রতিষ্ঠা দিতে পেরুমলকে নিকেশ করা জরুরি। কিন্তু, ওকে দেখতে কেমন তা কেউই জানে না” বলেছিল উচ্চপদস্থ আমলা-পুলিসরা। বাস্তবের কমিউনিস্ট গণপথিকে নিয়েও এমন রটনা ছিল। কুমারেসনের সঙ্গে ভাথিয়ারের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্য চলচ্চিত্রের ক্লাইম্যাক্স নয়, নতুন উন্মোচনের সম্ভাবনা।

৩) কুমারেসন ক্যাম্প ঝাঁট দিচ্ছিল। তখনই দেখে গ্রাম উজাড় করে নারী-পুরুষ সবাইকে তুলে এনেছে পুলিস। পেটাতে পেটাতে ভ্যান থেকে নামাচ্ছে। কুমারেসন ওই কলে-পড়া জন্তুর মত ভ্যানবন্দি গ্রামবাসীদের মধ্যে তামিলারাসিকে আবিষ্কার করে। ওই আবিষ্কারে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়, ভয়, উদ্বেগ। প্রেমিকাকে বাঁচানোর জন্য ঊর্ধ্বতনদের কাছে মরিয়া হয়ে ছুটে যাওয়া।

৪) ই-কোম্পানির পুলিসরা যখন ধরা পড়া তিন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যাচ্ছে, তখন পিপলস আর্মির সশস্ত্র সদস্যরা তাদের পথ রোধ করে। পুলিসের অস্ত্রশস্ত্র লুঠ করে। প্রতিরোধের যুক্তি সঘোষে উচ্চারণ করে। ‘বন্দুকের নল শক্তির উৎস’ বলে এতকালের চলচ্চিত্র-সাহিত্যে সচেতন ভুল উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। এই ছবিতে সেই ভুলের অবকাশ থাকে না। ‘রাজনৈতিক’ শব্দটি যথাস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়।

যে দৃশ্যগুলি না দেখাই ভাল

ক) কুমারেসন একজন অসুস্থ আদিবাসীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাঘবেন্দ্রর কাছে ঝাড় খায় এবং শাস্তি পায়। ক্যাম্পের ভেতরে একের পর এক শাস্তি পাওয়ার দৃশ্য।

খ) চিরুনি তল্লাশি। সিঙ্গল শট। ভারি বুটের শব্দ আর তল্লাশির নামে আদিবাসীদের ঘর থেকে জিনিসিপত্র ছুঁড়ে ফেলার শব্দ হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে থ্রি-নট-থ্রির গুলিতে একটি বাচ্চার ছিটকে পড়ার শব্দে। এরপর বাচ্চাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহী বানানো হবে নাকি ‘হাতির আক্রমণে মৃত’ ঘোষণা করা হবে, সেই বাদানুবাদ শুরু করে পুলিস। কুমারেসন স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি নিয়ে বাচ্চাটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করছে — বাকি পুলিসরা তার আবেদনে কর্ণপাত করছে না – তখনই বাচ্চাটির শোকমথিত প্রায়-উন্মাদিনী মা এসে কুমারেসনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। সন্তানহারা মায়ের অভিশাপ উচ্চারণে হতচকিত পুলিস তার চুলের মুঠি ধরে টানছে। পুলিস ক্যান্টিন থেকে চিনির বস্তা আনা হয় লাশ জ্বালিয়ে লোপাট করতে।

গ) “আমাদের কাপড়গুলো ফেরত দিন স্যার। আমাদের কাপড় পরতে দিন” – এই আর্তনাদ আবহসঙ্গীতের মত ফিরে ফিরে আসে ছবিতে। ‘গলা-পুলিস, কড়া-পুলিস’ (Good Cop, Bad Cop) নামক পরিচিত খেলার এক গলা-পুলিস এক ‘সন্দেহভাজন’ গ্রামবাসীর আঙুলের নখ প্লাস দিয়ে টেনে টেনে উপড়ায়।

এই দৃশ্যগুলি মাথায় গেঁথে গেলে ভাথিয়ারের যুক্তি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে। মক্কাল পদাই তথা পিপলস আর্মির প্রতিরোধকে সমর্থন না করে পারা যাবে না। ভারতের সশস্ত্র কমিউনিস্টদের মতাদর্শকে দেখার জন্য রাষ্ট্রের দেওয়া চশমা খুলে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের এথিক্স আর মর‍্যালিটি দেখে ভেতরে ভেতরে চাপা গনগনে রাগ হলেও, আদতে যে আমরা দর্শকরা ঠুঁটো জগন্নাথ ভোটার, সে কথা তো ভোলা যাবে না। চলচ্চিত্রে দেখানো বাস্তবের শিরীষ কাগজ ঘষতে ঘষতে আদুরে গণতন্ত্রের ছালবাকল উঠে যায়, উঠতেই থাকে, রাষ্ট্রের ত্যানা খসে পড়ে একাধিক দৃশ্যের বীভৎসতায়। উপর্যুক্ত দৃশ্যগুলি গণতন্ত্রহীন গণতন্ত্রের সম্যক উপলব্ধি যদি দর্শককেও দ্রোহী করে তোলে?

আরো পড়ুন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ শিল্প তো নয়ই, প্রচারও নয়

#

কুমারেসনের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকও কি বোঝে না, যে কোনো একটা পক্ষ বেছে নিতেই হবে? হয় রাষ্ট্র, নয় প্রতিরোধ। হয় ক্রমশ নিরাজনৈতিক চেতনা জাঁকিয়ে বসার ধূসর সময়ে রাষ্ট্রের চাপানো বাচন ছাড়া কোনোকিছুই তেমন স্পষ্ট নয়। নিরাজনীতি এসেছিল অরাজনীতির স্বাদু মোড়কে – সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, সংস্কৃতিতে। ধীরে ধীরে শাসকের রাজনীতিকে পুষ্ট করেছে, জনতোষী মতামতকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে নিরন্তর। ভেট্রিমারানের চলচ্চিত্ররা তেমন স্বাদু বিষের গ্লাস ভেঙে তেতো বড়ি গিলিয়ে দেয়। যদি চেতনায় সামান্য বিরুদ্ধমত তৈরি হয়। যদি পক্ষ গুলিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় চেষ্টাকে নাকচ করে জেগে থাকা যায়। যদি… দ্বিতীয় পর্ব আসবে। পেরুমল আরএসএর শীর্ষ প্রতিনিধির চোখে চোখ রেখে কয়েকটি কথা বলে। কী বলে? জানা জরুরি। পেরুমলকে নগ্ন করে অত্যাচার করা হচ্ছিল যখন, তার বয়ান নকশাল কমিউনিস্ট দোপদী মেঝেনের বাচনকে মনে করায়। পেরুমলের কাটা কাটা কটি কথা পুলিসের সাজানো উপপাদ্যের ‘আমরা জানি…’ প্রমাণ পরিসরকে প্রত্যাহ্বান জানিয়ে দেয়। না, প্রথাগত নির্মাণের ছাঁদে ভেট্রিমারান ‘স্যান্ডউইচ তত্ত্ব’ উগরোননি। নিপীড়িত আদিবাসী জনগণকে নেহাত বোকাসোকা, রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষিত, নকশালদের দ্বারা ব্যবহৃত বলে দেখানো হয়নি। ভাথিয়ারের চোখে আগুন ছিল। কুমারেসনের চোখে তার আঁচ ছড়ায়। দ্বিতীয় পর্বের হাওয়া সে আগুনকে কোন অভিমুখে নিয়ে যায়, সেটাই দেখার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.