সৃজনী শবনম চৌধুরী
“দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে…”। খড়্গপুর আইআইটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পোশাক বিধি সংক্রান্ত যে নির্দেশিকা ছাত্রছাত্রীদের ইমেল মারফত পাঠানো হয়েছিল, সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে এখন তা আমাদের চোখের সামনে। তা নিয়ে বিস্তর হইচই হচ্ছে।
প্রায় সমস্ত আইআইটিতেই প্রতি বছর সমাবর্তনে নারী, পুরুষের জন্য এক ধরনের পোষাক বিধি থাকে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কথা ভেবে সে বিধি বানানো হয় না। সেই নির্দেশিকায় মোটামুটিভাবে ছেলেদের সাদা কুর্তা-পাজামা আর মেয়েদের সাদা শাড়ি অথবা সালোয়ার-কামিজ পরে আসতে বলা হয়। কিন্তু খড়্গপুর আইআইটির এবারের নির্দেশিকা একেবারেই আলাদা। এই ‘পরিবর্তন’ ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে যেমন অস্বস্তিকর ও অপমানজনক, তেমন তাদের পকেটের পক্ষেও অসুবিধাজনক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
নির্দেশিকাটি থেকে স্পষ্ট যে কোন পোশাক শোভন, কোন পোশাক ভারতীয়ত্বের সঠিক প্রতিফলন ঘটায় তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট মতামত রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের উপর নির্দ্বিধায় তারা সেই মত চাপিয়ে দিতে চায়। তাই শুধু পোশাকের ধরন আর রং বেছে দিয়েই কর্তৃপক্ষ নিশ্চিন্ত হতে পারেনি, অন্তর্বাসের (ছেলেদের ভেস্ট ও মেয়েদের পেটিকোট) রং পর্যন্ত ঠিক করে দিয়েছে। শুধু দেশ কেন, পৃথিবীর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজের ছাত্রছাত্রীদের এভাবে অপমান করেছে বলে জানা নেই।
মেয়েদের হাতকাটা ব্লাউজ কিংবা ব্লাউজের সঙ্গে ঝুলে থাকা লটকানও বোধহয় তাদের ‘সহি’ ভারতীয় হয়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে। তাই সেসবও ঘেঁটি ধরে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ওই নির্দেশিকায় ছেলেদের কুর্তার ঝুল, কলারের মাপ থেকে শুরু করে জুতোর গড়ন, মেয়েদের শাড়ি পরার ধরন – সব বলা আছে।বাড়িতে হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে প্রায় কারোর পক্ষেই এত নিখুঁত সাজগোজ করা সম্ভব নয়। নতুন জামাকাপড় কেনা ছাড়া গতি নেই। মাত্র একদিনের এই অনুষ্ঠানের জন্য অনেকগুলো টাকা খরচ করা কতজনের পক্ষে সম্ভব? নাকি যাদের সেই বিলাসিতা করার সামর্থ্য নেই আইআইটি কর্তৃপক্ষ তাদের সেইসব ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ভাবতেও রাজি নয়?
অথচ এরপরেও সোশাল মিডিয়া অথবা খবরের কাগজের বাইরে এ নিয়ে কোনো হইচই নেই। যাঁদের ওপর এই পোশাক বিধি চাপানো হল, সেই ছাত্রছাত্রীদের এসব নিয়ে প্রায় কোনো বক্তব্যই চোখে পড়ল না। বাইরে থেকে অনেকেই হয়ত এই অবস্থা দেখে খুব হতাশ কিংবা বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু যারা কোনো না কোনোভাবে এই ধরনের তথাকথিত এলিট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তারা ভালভাবেই জানে যে এর চেয়েও কত নৃশংস, কত অপমানজনক ঘটনা দিনের পর দিন এসব জায়গায় ঘটে চলে এবং প্রায় কেউই টুঁ শব্দটি না করে নির্বিকারে সেসব মেনে নেয়।
গতবছর এরকম সময়ে ফয়জান আহমেদ নামক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রটিকে খুন এবং নারকীয়ভাবে সেটা ধামাচাপা দেবার ঘটনাও তো সেই একই জিনিস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। শোনা যায়, ক্যাম্পাসে ফয়জানের বন্ধুরা প্রথম যখন ব্যাপারটা জানতে পারে তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং তদন্তের দাবি জানায়। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা যাতে ক্যাম্পাসের বাইরে আসতে না পারে আইআইটি কর্তৃপক্ষ তার জন্যে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়েছিল। বস্তুত যে কোনো ছাত্রবিক্ষোভের গলা টিপে মারার ক্ষমতা দেশের সমস্ত শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই আছে। কারণ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মত ছাত্রছাত্রীদের ঐক্য কোত্থাও নেই।
আরো পড়ুন ফয়জান আহমেদের খুন সংক্রান্ত প্রতিবেদন
এদেশে নাকি একসময় ছাত্রছাত্রীরা খেটে খাওয়া মানুষের দাবি আদায়ের লড়াইয়ে পাশে দাঁড়াতেন। সেসব কাহিনী ঠোঙা হয়ে গেছে। এখন প্রতিটি ছাত্র বা ছাত্রী জানে, যত অন্যায়ই হোক, মুখ খুলতে গেলেই চিহ্নিত হয়ে যেতে হবে। তার ফল কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তাও সবার জানা। বরং এর উল্টো পথে হাঁটলে কিছু প্রাপ্তিযোগ হলেও হতে পারে।
তাই দিনের পর দিন সবকিছু দেখেও না দেখা, বুঝেও না বোঝার অনুশীলন চলতে থাকে। ক্রমশ নিজের লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য দরকারে পাশের জনকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার নীতি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। তাই উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিতে পরিকল্পিতভাবে গবেষণার পরিকাঠামো ধ্বংস করা, উচ্চশিক্ষায় লাগামহীন ফি বৃদ্ধি, মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যয় বরাদ্দ প্রায় বন্ধ করে দিয়ে জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া – এসব নিয়ে আর কোথাও কোনো লাগাতার প্রতিবাদ, আন্দোলন হয় না। বরং আন্দোলন হয় জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার দাবিতে, বাড়তে থাকে সংখ্যালঘু ও দলিতদের প্রতি বিদ্বেষ এবং ঘৃণা।
জানি না এই আত্মবিস্মৃতি আর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার চোরাবালি থেকে কীভাবে উঠে আসবে আজকের ছাত্রসমাজ। শুধু স্থিরভাবে জানি, এদেশের মরণঘুম ভাঙানোর জিয়নকাঠি আর মরণকাঠি দুই-ই তাদের হাতে।
নিবন্ধকার হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







