আজকে নায়িকাদের নিয়ে যে মুচমুচে গসিপ কলাম তা কিন্তু সিনেমার অতীত সম্পর্কে কিছুমাত্র ইঙ্গিত দেয় না। ইতিহাসের কী আশ্চর্য কৌতুক যে, ১৮৯৫ – যে বছর সিনেমা প্রথম প্রদর্শিত হল, রবীন্দ্রনাথ সে বছরই লিখেছিলেন ‘মানভঞ্জন’ নামের গল্পটি। সেটিই ছিল নক্ষত্র ব্যবস্থা বা স্টার সিস্টেম সম্পর্কে একধরনের আলোকসম্পাত। আমাদের আদিপাঠ। ‘গোপীনাথ যাহাকে দাসখত লিখিয়া দিয়াছে তাহার নাম লবঙ্গ— সে থিয়েটারে অভিনয় করে— সে স্টেজের উপর চমৎকার মূর্ছা যাইতে পারে— সে যখন সানুনাসিক কৃত্রিম কাঁদুনির স্বরে হাঁপাইয়া-হাঁপাইয়া টানিয়া-টানিয়া আধ-আধ উচ্চারণে “প্রাণনাথ” “প্রাণেশ্বর” করিয়া ডাক ছাড়িতে থাকে তখন পাৎলা ধুতির উপর ওয়েস্ট্কোট-পরা, ফুল্মোজামণ্ডিত দর্শকমণ্ডলী “এক্সেলেন্ট” “এক্সেলেন্ট” করিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে।’ গল্পের নায়িকা গিরিবালা কাহিনির অন্তঃপুর থেকে আলোকিত মঞ্চে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সে অন্তত মধ্যবিত্ত ছিল। বাংলা ছায়াছবিতে নারীর আগমন এত সুষম ছন্দে হয়নি। অবশ্য সমাজতাত্ত্বিকরা বলবেন সিনেমা নিজেই আমাদের সামন্ততান্ত্রিক জীবনযাপনে আধুনিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিলমোহর। সুতরাং পর্দানশীন অসূর্যম্পশ্যা নারী যে পর্দায় প্রতিফলিত হতে থাকল তা উনিশ শতকের পরিপ্রেক্ষিতে মস্ত একটি বিপ্লব। সে বিপ্লব আমরা টের পেয়েছিলাম যখন এই গিরিবালারই চরিত্রে কেশব সেনের নাতনি সাধনা বসু অভিনয় করলেন। কলকাতা তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরকম দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে তখনো পর্যন্ত চলচ্চিত্রের ইতিহাস উচ্চবর্গীয়ের ছোঁয়া পায়নি। যাঁরা অভিনেত্রী ছিলেন তাঁরা হয় পাতাল থেকে উঠে আসা ‘শস্তা’ রমণী, নয়ত ফরসা রং বলেই ফিরিঙ্গি – অ্যাংলো ইন্ডিয়ান।
যেমন কলকাতায় ম্যাডান কোম্পানিতে যাঁরা অভিনয় করতেন সেই সীতা দেবী, বা ইন্দ্রা দেবী ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান – যথাক্রমে নিনা স্মিথ ও এফি হিপোলেট। দর্শকরা যেহেতু প্রধানত শহুরে হিন্দু, সেহেতু এঁদের দিশি নাম দেওয়া হত। যেমন সে যুগে সবচেয়ে নাম করেছিলেন কলকাতার পেশেন্স কুপার। নির্বাক যুগের গোড়ায় কমপক্ষে তিরিশটি ছবির নায়িকা হয়েছিলেন তিনি। সে যুগে গ্রাম থেকে শহরে আসা নাগরিক চলচ্চিত্রকে ভাবত একধরনের প্রদর্শনশালা – নারীরা স্বভাবতই ভ্রাম্যমাণ ‘অবজেক্টস অন ডিসপ্লে’। ফলে ফিরিঙ্গি নায়িকাদের শরীরী বিভঙ্গটুকুই ছিল যথেষ্ট। আর দেশি মেয়েরা আসত নামহারা ও রহস্যময় নরক থেকে। যেমন মিস গওহর। ১৯১০ সালে লাহোরে তাঁর জন্ম। নিয়তি তাঁকে টেনে নিয়ে এল কলকাতায়। মাত্র ন বছর বয়সে বিল্বমঙ্গল ছবিতে অভিনয় করেন। পরে চন্দুলাল শাহ তাঁকে বক্স অফিসের রানি করে তোলেন। গওহর শুধু আমাদের চলচ্চিত্রে প্রথম পৌরাণিকতা বাদ দিয়ে সামাজিক চরিত্র প্রতিষ্ঠা করেননি, তাঁর জনপ্রিয়তা এতদূর পৌঁছেছিল যে তিনি সে যুগের একটি প্রতিযোগিতায়, ১৯২৯ সালে, গ্ল্যামার সম্রাজ্ঞী মিস সুলোচনাকে ৭৫১ ভোটে হারিয়ে দেন। পাঠক শুনলে অবাক হবেন, এই সুলোচনার মাইনে বম্বের গভর্নরের থেকেও বেশি ছিল। সুলোচনার আসল নাম রুবি মেয়ার – তিনিই বিশের দশকের সর্বোত্তমা। কিন্তু উল্টোদিকে অন্ধকারও ছিল। এইসব নটীরা বেশিরভাগই আসতেন লাল আলোর এলাকা থেকে – নব্য বাবু অথবা প্রযোজকদের রক্ষিতা হওয়া ছাড়া তাঁদের গতি ছিল না। যৌবন অন্তে অনিবার্য পরিণতি ছিল নিষ্ঠাবতী আশ্রিতা হিসাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবার্চনা। যেমন ১৯২২ সালের চূড়ান্ত সফল ছবি বিষবৃক্ষ-তে যিনি কমলমণির ভূমিকায় অভিনয় করেন সেই নীরদাসুন্দরী। হতভাগ্য জন্ম, বস্তিজীবন, যাতে বিয়ের পরে কোথাও চলে যেতে না পারেন তাই নাম কা ওয়াস্তে বিয়ে হয়েছিল রুপোর আমপাতার সঙ্গে। তারপর অভিনয় পর্ব। অবশেষে নটী বিনোদিনীর বিষয়ে যেমন রামকৃষ্ণ কাহিনি, নীরদাসুন্দরীকেও কৃপা করেন সারদামণি। সেই যুগের শেষ স্বাক্ষর বোধহয় আমাদের আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে চুনীবালা দেবী হিসাবে। আজ যখন সত্যজিৎ রায়ের জন্মের শতবর্ষ পেরিয়ে গেল, তখন আমার মনে হয় পথের পাঁচালী ছবির চুনীবালা দেবী সত্যজিতের নট নটীর তালিকায় শীর্ষে থাকবেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এমনকি তুলসী চক্রবর্তীকে মনে রেখেই আমি এই দাবি করছি। বস্তুত একটু দীর্ঘ দৃষ্টিপাতেই বোঝা যায়, ইন্দির ঠাকরুন পথের পাঁচালীর কোনো অভিনেত্রী নন, চরিত্র নন, এমনকি বুড়ি পিসিমাও নন। বরং তিনি নিসর্গের – বাংলার আকাশ ও প্রান্তরের, কাশবনের সম্প্রসারণ। আমাদের জীবনের মধ্যে একমাত্র রূপকথা। সত্যজিতের জীবনের অবিস্মরণীয় মিথোলজি। একদা কার্ল ড্রেয়ার যেমন তাঁর কিংবদন্তিপ্রতিম ছবি প্যাশন অফ জোয়ান অফ আর্ক-এ রেনি জঁ ফ্যালকোনেত্তিকে খুঁজে পেয়েছিলেন, যে নায়িকা একটিমাত্র ছবিতে অভিনয় করেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গিনী, আত্মহত্যা করা সত্ত্বেও।

তেমনই চুনীবালা। তাঁর স্বল্পকালীন স্থিতি পথের পাঁচালীকে অমরতার দরজায় পৌঁছে যেতে সাহায্য করেছে। বাঙালির যেমন বেহুলা আছে, সে যখন স্বর্গে ইন্দ্রের সভায় নাচতে শুরু করে, তার পায়ে ঘুঙুরের মত কেঁদে ওঠে বাংলার নদী-মাঠ-ভাঁটফুল, বাঙালির তেমন ফুল্লরা আছে। দারিদ্র্যে সে যে কী ঐশ্বর্যময়! আবার তেমনই বাঙালির ইন্দির ঠাকরুনও আছেন। প্রান্তিক, বাল্যবিধবা, হয়ত অবাঞ্ছিত কিন্তু তিনি আছেন বলেই আমরা সৌন্দর্যের সহবাস করি। বিভূতিভূষণ তাঁকে বল্লালী অভিসম্পাত বলে ১৬ পাতার মধ্যেই শেষ করেছিলেন। কিন্তু সত্যজিৎ এই চরিত্রটিকে আশ্চর্যভাবে গুরুত্ব দেন। পথের পাঁচালী ছবিতে যে কাশবনে বা ধানক্ষেতে সুন্দরের চোখের পাতা নড়ে উঠেছিল, এই যে আড়বাঁশির সুর বর্ষা ও হেমন্তকে বিদায় জানিয়ে আমাদের রক্তে বাজতে শুরু করল – তা তো সময়ের দাগ মুখে নিয়ে, ইতিহাসের লোলচর্ম ধারণ করে এই প্রাচীনার জন্যই।
পথের পাঁচালীতে সবই সুন্দর। খালি আপাতভাবে ইন্দির ঠাকরুন আমাদের চোখের মায়া নন। আর সেইজন্যেই তিনি নয়নে নয়নে থেকে যান, কারণ তিনি না থাকলে অপুর জীবনে চন্দ্র-সূর্য ওঠা সফল হত না। তিনি বাড়তি। হয়ত কেউই তাঁকে চায় না। কিন্তু তিনি ফোকলা হাসি না হাসলে কাশফুলের নিষ্পাপ শুভ্রতা ফুটে উঠত না। যে দৃশ্যে বুড়ি, ঝরা শুকনো নারকেল ডাল টানতে টানতে উঠোনে ঢুকে সর্বজয়ার কর্কশ কণ্ঠে ঝগড়া শুনে সবাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছে – কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দরকারি মনে করছে না, ‘ধুত্তেরি’ জাতীয় একটা শব্দ উচ্চারণ করে বুড়ি আবার বেরিয়ে গেল, সেই তাৎক্ষণিক আপত্তিটুকু পথের পাঁচালীকে ধ্রুপদী অমরালোকে পৌঁছে দেয়। আমাদের দৈনন্দিনে দুর্গা আর ইন্দির ঠাকরুন একই প্রতিমার দুটি ভিন্ন দিক থেকে আলোকচিত্রণ।
কী যে আশ্চর্য! চুনীবালা দেবী নিজে বাংলার আত্মা ধারণ করেছিলেন বলেই হয়ত আরও এক বিখ্যাত বাঙালি ঋত্বিক ঘটকের মত তাঁরও ভাল লাগেনি পিসিমার মৃত্যুর দৃশ্যটি। ঋত্বিক বলেন ‘ভালো লাগে না বুড়ি মারা যাওয়ার দৃশ্য, বরং বলা চলে মৃতা বুড়িকে অপু দুর্গার আবিষ্কার করার দৃশ্য।’ আর সত্যজিৎ লেখেন ‘চুনীবালার কোনটাতেই আপত্তি ছিল না। কেবলমাত্র ইন্দিরের মৃত্যুর দৃশ্যটি ছাড়া। তিনি বললেন, বইয়ে আছে বুড়ি চণ্ডীমণ্ডপে মরছেন। আপনি দেখাচ্ছেন বাঁশবনে। ধার্মিক বুড়িকে কি বাঁশবনে মরাটা ভালো দেখায়?’ আসলে এই জিজ্ঞাসা বা ওই আপত্তি আসে বাঙালি চেতনার অনেক গহন থেকে। এমনকি স্বয়ং কমলকুমার মজুমদার যে পথের পাঁচালীকে মেনে নিতে পারেননি তার কারণ অনুপুঙ্খের এই টাল খেয়ে যাওয়া।
আরো পড়ুন পথের পাঁচালী — একটি আদ্যিকালের সমালোচনা
চুনীবালা দেবীর হদিশ দেন রেবা দেবী – পথের পাঁচালীর সেজ ঠাকরুন। সত্যজিৎকে জানতে হয়, যে সেই নির্বাক তারাসুন্দরী, নগেন্দ্রবালার যুগে যাঁরা পতিতা হয়েও মঞ্চ আলো করে থাকতেন, তেমন একজন পুণ্যশীলা চুনীবালা। সত্যজিৎকে তিনি বঞ্চিত করেননি। এমনকি ছেঁড়া থান কতখানি ছেঁড়া হবে, পুরনোটা কতটা পুরনো তা সত্যজিতের ভ্রান্তি হলে চুনীবালাই ঠিক করে দিতেন। ‘আমার ডান হাত যে ভিজে ছিল সেদিন’, ‘এ শটে তো আমার গায়ে চাদর থাকবে’, ‘আমার পুঁটুলি কি ডানহাতে ছিল, না পুঁটুলি বাঁহাতে’, ‘বঁটি ডান হাতে’ – এই ধরনের কথা প্রায়ই সত্যজিৎকে সতর্ক করার জন্য চুনীবালা বলে দিতে পারতেন, একথা সত্যজিৎ নিজেই লিখছেন। ‘চুনীবালার কন্টিনিউয়িটি গার্ল লাগত না। ধর্মে-কর্মে-মজ্জায় তিনি অভিনয়কে গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি পথের পাঁচালীর একমাত্র গান হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল/পার কর আমারে – এও তো চুনীবালারই উদ্ভাবন।’
মনে পড়ে সেই নৈশ মুহূর্তটি। ইন্দির ঠাকরুন রাক্ষসের গল্প বলছেন, দেওয়ালে তাঁর ছায়া পড়েছে: সত্যজিৎ রায় ইভান দ্য টেরিবল থেকে একটি অসামান্য কম্পোজিশন আয়ত্ত করে নিবেদন করলেন। কিন্তু আমাদের কেবল মনে হতে থাকে এ তো সেই ঠাকুরমার ঝুলি। যেখানে কাঁসর ঘন্টা, যেখানে পরতে পরতে বিস্ময়।
আসলে ইন্দির ঠাকরুন যেমন, তাঁর মত অনেকেই ছিলেন, যাঁরা আমাদের সংসারের বাঁধা আঙিনায় থেকেও নেই। সেই অদৃশ্য মাঙ্গলিক ছোঁয়া না থাকলে আলো আকাশ বাতাস এত মধুময় হয়ে উঠত না। কী নিঃসঙ্গ মৃত্যু এই মানুষজনের! কখনো বৃন্দাবনে বাঁকাবিহারী মন্দিরের সামনে, কখনো পুকুরপাড়ে টাল হারিয়ে ঢিপ করে পড়ে যাওয়া। কিন্তু ইতিহাস আমাদের জানায় ইন্দির ঠাকরুন বা বাঙালির পরিত্যক্ত হিন্দু বিধবার শরীরে এত চট করে আঘাত লাগে না, সময়ের ঝাঁকুনি তারা মেনে নিতে পারে। সত্যজিৎ বলেন ‘এই কঠিন পরীক্ষায় চুনীবালা কীভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তার প্রমাণ পথের পাঁচালীতে রয়েছে। এবং এই দৃশ্যের শেষে তাঁর মানসিক পরিতৃপ্তি ও শারীরিক গ্লানির যুগপৎ বিচিত্র অভিব্যক্তি আমার চিরকাল মনে থাকবে।’
চীনে কলমের আঁচড়ের মত ইন্দির ঠাকরুন হয়ে চুনীবালা দেবীর এই অভিনয় আমাদেরও চিরকাল মনে থাকবে। তিনি নিজে অসুন্দর না হলে পথের পাঁচালীর কাশবন এমনভাবে হেসে উঠতে পারত না। ভাগ্যিস তাঁর দাঁত ছিল না। ভাগ্যিস তাঁর চামড়ায় জরা উল্কি এঁকে দিয়েছিল – তাই ষাটেও তিনি এমন তরুণী, এমন উপমারহিতা, এতই সুন্দরী যে মনে হবে তিনিই রূপসী বাংলা – আমাদের আত্মার প্রতিমা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








