গণতন্ত্র কোনো বইয়ে লেখা, বড় বড় নেতাদের বক্তৃতায় থাকা ভারি কথা নয়। গণতন্ত্র আসলে দৈনন্দিন জীবনের প্রতি ক্ষেত্রের চর্চার বিষয়। রোজ গণতন্ত্র পালনের সুযোগ না ঘটলে ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ’ শুধু কাগুজে তকমা হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে এই কথাগুলোই মনে হয়। ছোট থেকে বড় – সমস্তরকম গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর উপর বুলডোজার চালিয়ে গণতন্ত্রের নতুন মডেল হাজির করতে চাইছে তৃণমূল সরকার।

এই রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে কোনো প্রার্থী মানুষের ভোটে জিতলেও সে বিজয়ীর সার্টিফিকেট না-ও পেতে পারে। এই রাজ্যে ২০১১ সালের পরে পরেই নিষিদ্ধ হয়ে যায় পুলিসকর্মীদের ইউনিয়ন করার অধিকার। এমন রাজ্যে ছাত্রদের ইউনিয়ন করার অধিকারও যে তৃণমূল সরকার কেড়ে নেবে এতে আর আশ্চর্য কী?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমরা প্রায়শই বলি, ছাত্ররা সমাজের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ছাত্ররা শুধু ভবিষ্যৎ নয়, ব্যাপকভাবে বর্তমানও বটে। বর্তমান সমাজের ছবিটা ঠিক কেমন দাঁড়াবে, তা নিয়ে ছাত্রদের অনেককিছুই বলার রয়েছে। কিন্তু সেই বক্তব্য রাখার জায়গা কোথায়? ছাত্র সংসদ আসলে সেই জায়গা, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মতামত রাখতে পারে, নিজেদের মধ্যে থেকেই পছন্দমত প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, অনেকক্ষেত্রে ভোটাধিকার পাওয়ার এক-দু বছর আগেই সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্র সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ ঘটে কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। ‘আমার মতামতেরও একটা মূল্য আছে’ – এই সামান্য অনুভূতিই গণতন্ত্রের বুনিয়াদি কথা।

ছাত্র রাজনীতি একজন মানুষের সামগ্রিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়া বা না হওয়ার বিষয় নয়। রাজনৈতিক চেতনার নির্মাণ ও অবস্থান নির্ণয় মানুষের জীবনের স্বাভাবিক দিক। এই চেতনা তৈরি করতে ছাত্র সংসদ ও তার বছর বছর নির্বাচন অন্যতম কার্যকরী পথ। ছাত্রদের কাছে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের মতাদর্শ ও বক্তব্য নিয়ে পৌঁছবে; তা নিয়ে তর্কবিতর্ক হবে, সবমিলিয়ে রাজনৈতিক মতামত তৈরি হবে।

এই স্বাভাবিক ধারণাটাই বাংলায় তৃণমূল সরকার তালগোল পাকিয়ে দিয়েছে। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা – এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল – থেকে ছাত্র প্রতিনিধিদের বাদ দিয়েছে সরকার। তারপরই অনিয়মিত করে দেওয়া হয়েছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। অবশেষে ২০১৭ সালের জুন মাসে West Bengal Universities and Colleges (Composition, Functions and Procedure for Election of Students’ Council) Rules, 2017 আরোপ করে ছাত্র সংসদের বদলে কাউন্সিল মডেল আনার আইনি ভিত্তি তৈরি করে ফেলে এই তৃণমূল সরকার। দলিলে বলা হয় “With effect from the date of effect of these rules, any association or body of students or union in any college or in any University by whatever name called shall, henceforth, be known as the Students’ Council.” [3.1]।

এই কাউন্সিল মডেলের তীব্র বিরোধিতা শুরু হয় চারিদিকে। তাই একে পুরোপুরি প্রত্যাহার না করে নিলেও চারিদিকে ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের চাপে ২০১৯-২০ সালে রাজ্যের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়,প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, ডায়মণ্ডহারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়) নির্বাচনের নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকার। সেখানে কাউন্সিল নয়, ছাত্র সংসদ নির্বাচনই হয়। কিন্তু রাজ্যের আরও ২৩ স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং কয়েকশো কলেজে সেই ২০১৭ সালের পর আর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি।

অথচ বছর বছর এই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদের তত্ত্বাবধানে ফেস্ট, সোশাল হচ্ছে নিয়মিত। ছাত্র সংসদের জন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টাকা বরাদ্দও বন্ধ হচ্ছে না। তাহলে এইভাবে সংসদ চালাচ্ছে কারা? শেষ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কারোরই এই ছ-সাত বছরে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকারই কথা নয়। তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়াই ছাত্র সংসদ চলছে?

এখানেই আসল সংকট। যে ছাত্র সংসদ ছাত্রদের কাছে নিয়ে আসত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার খোলা হাওয়া, তা বেশিরভাগ জায়গায় এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ধরনের স্বৈরাচারী, সামন্ততান্ত্রিক অচলায়তন। যে ছাত্র সংসদ ছাত্রদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি হওয়াই দস্তুর ছিল, যে ছাত্র সংসদ ছিল ছাত্রদের নিজস্ব দাবিদাওয়া নিয়ে লড়াই আদায়ের মঞ্চ, তৃণমূল সরকারের জমানায় তা এখন হয়ে উঠেছে এক দল দুর্নীতিবাজ মস্তানদের আড্ডাখানা।

আরেকটু তলিয়ে দেখলে একটা সমাপতনও চোখে পড়ে। নয়া শিক্ষানীতির তোড়জোড় শুরু হওয়ার কাছাকাছি সময়েই কাউন্সিল মডেলের সরকারি নির্দেশিকা তৈরি হয়। এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা যাতে সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ায় সুযোগ না পায়, এ আসলে তারই রাজ্যস্তরের নীল নকশা নয় তো?

 

২০১৬-১৭ সাল নাগাদ কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য টাকা দিতে না পেরে আত্মহত্যা করা চৈতালি পাত্র, অম্লান সরকারদের কথা আমরা নিশ্চিত ভুলে যাইনি। কলেজে ভর্তি হতে গেলে ইউনিয়নের দাদাদের একটু-আধটু টাকা তো দিতেই হয় – এই মানসিকতা জনমানসে তৈরি করে ফেলেছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ

 

ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার রাজনৈতিক প্রকল্প আজকের নয়। এই শতকের গোড়ায় বিড়লা-আম্বানি কমিশনও তাদের সুপারিশে জানিয়েছিল, ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। এমনকি হালের নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিও সযত্নে এড়িয়ে গেছে ছাত্র সংসদের প্রসঙ্গ। ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চাওয়ার আসল অর্থ হচ্ছে দেশ বা রাজ্যে যারা ক্ষমতায় রয়েছে তাদের রাজনীতিই যাতে তারা মেনে চলে, তার প্রচ্ছন্ন নির্দেশ। তার সঙ্গে সরকারবিরোধী কোনো কথা উঠে এলে সেটাকে রাজনীতি করা বলে দাগিয়ে দিয়ে সেই বিরুদ্ধ মতকে অস্বীকার করা।

তৃণমূল সরকার ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কার্যত গোটা শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। অবশ্য ভেঙে পড়েছে বলা ভুল, ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর ছাত্র সংসদগুলোকে টাকা রোজগারের একরকম কেন্দ্র করে তোলা হয়েছে। ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য টাকা দিতে না পেরে আত্মহত্যা করা চৈতালি পাত্র, অম্লান সরকারদের কথা আমরা নিশ্চিত ভুলে যাইনি। কলেজে ভর্তি হতে গেলে ইউনিয়নের দাদাদের একটু-আধটু টাকা তো দিতেই হয় – এই মানসিকতা জনমানসে তৈরি করে ফেলেছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ (টিএমসিপি)। তার সঙ্গে আরও নানা ফান্ডের নামে কলেজে ভর্তির ফি বাড়িয়ে লুঠের ব্যবস্থাও ক্রমে তৈরি হয়েছে এই সময়ে। এর ফলে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ কি তৈরি হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদের সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের বড় জায়গা ছিল ছাত্র সংসদ এবং তার নির্বাচন। সেটাকেই তাই তুলে দিতে হত।

এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই প্রথমে আনা হয় কাউন্সিল মডেল, চারিদিকের প্রতিবাদে পিছু হটে প্ল্যান বি হিসাবে ক্রমেই অনিয়মিত করে দেওয়া হয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। গণতান্ত্রিক অভ্যাস থেকে ছাত্রদের দূরে সরানোর সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে অনিয়মিত করার এই আর্থিক দিকটাও লক্ষণীয়।

অন্যদিকে ছাত্র রাজনীতি আসলে বৃহত্তর রাজনীতিতে কর্মী জোগানোর একটা পথ। বামপন্থী, ডানপন্থী – সব রাজনৈতিক দলের জন্যই এটা বাস্তব। এমনকি আমাদের রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, যিনি ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রায় তুলে দিয়েছেন এই রাজ্য থেকে, তাঁর উত্থানও ছাত্র রাজনীতি থেকেই। বামপন্থী দলগুলোতে তো এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। একথা আসলে তৃণমূল খুব ভাল করেই বোঝে। সেই কারণেই রাজ্যের সুস্থ ছাত্র রাজনীতির পরিসর নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনগুলোকে ক্যাম্পাসে প্রায় গায়ের জোরে ঢুকতে না দেওয়া এই ধ্বংসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তৃণমূল কংগ্রেসের সামগ্রিকভাবে বিরোধীবিহীন রাজ্য তৈরির রাজনীতির সঙ্গে এটা সাযুজ্যপূর্ণ। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, নিজেদের ক্ষমতায় ছাত্র রাজনীতি দিয়ে তৃণমূল কিন্তু নিজের কর্মীবাহিনী তৈরির কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। টিএমসিপি করার অর্থ দাঁড়িয়েছে কলেজে কলেজে বিভিন্ন পথে লুঠ হওয়া টাকার ভাগ পাওয়ার ব্যবস্থা করা।

 

কলকাতা, মালদা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদের মত বেশ কিছু জেলায় ভরা বাম আমলেও বহু কলেজে বছরের পর বছর ছাত্র সংসদ চালিয়েছে টিএমসিপি। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সিতেও বাম আমলে স্বাধীন ও নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর যথেষ্ট দাপট ছিল।

 

এমনকি এই নিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও বাদ যায় না। গেল বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজোর টাকার ভাগ বাঁটোয়ারার অভিযোগে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয় কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসে। বাংলার রাজনীতিকেই টাকা লুটে নেওয়ার যন্ত্র বানিয়ে ফেলার যে তৃণমূলী প্রকল্প, তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই ভেঙে ফেলা হয়েছে গণতান্ত্রিক, সুস্থ ছাত্র রাজনীতির পরিসরকে। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রদের একটা অংশকে টাকা এবং ক্ষমতা আকর্ষণ করছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। ফলত ছাত্র রাজনীতি, যেখানে মতাদর্শ ও ভাবনার লড়াই বড় জায়গা, তা ক্রমেই টাকা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের বদ্ধ ডোবা হয়ে উঠেছে।

বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ছবিটা এরকম ছিল না। বাম আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে দুই ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের সংঘর্ষ বা গোলমাল ছিল না, তা একেবারেই নয়। বেশ কিছু সময়ে মতাদর্শ ও তর্কের লড়াই নয়, বরং হাতাহাতি, মারামারিই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে কলেজ চত্বরে। কিন্তু তাই বলে সব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিরোধীদের একেবারে উৎখাত করা বা নির্বাচনটাই বন্ধ করে দেওয়া ছিল ভাবনার অতীত।

এমনকি কলকাতা, মালদা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদের মত বেশ কিছু জেলায় ভরা বাম আমলেও বহু কলেজে বছরের পর বছর ছাত্র সংসদ চালিয়েছে টিএমসিপি। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সিতেও বাম আমলে স্বাধীন ও নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর যথেষ্ট দাপট ছিল। তৃণমূল আমলে এই স্বাধীন সংগঠনগুলো ভেঙেই যাদবপুর, প্রেসিডেন্সিতে তৈরি হয় টিএমসিপি। অতি বড় বামফ্রন্টবিরোধীও দাবি করতে পারবেন না, বাম আমলে ছাত্র সংসদ ছিল টাকা লুঠের প্রতিষ্ঠান। খুঁজে দেখলে ইউনিয়নের থেকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে গরিব ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করার উদাহরণও পাওয়া যাবে রাজ্যজুড়ে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্র রাজনীতির জন্য ক্ষেত্র সুনিশ্চিত করতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকার। তাই শুধুমাত্র যে এসএফআই, এআইএসএফ, পিএসইউ, এআইএসবির মত সংগঠনই ক্যাম্পাসে তাদের কাজ চালিয়ে গেছে তা নয়। সিপি, টিএমসিপি এবং বিভিন্ন স্বাধীন, নকশালপন্থী সংগঠনও বেড়ে উঠতে, কাজ চালাতে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মীদের তৈরি করে যেতে পেরেছে সমানতালে।

২০১১ সালের পর থেকে এই ছবি দ্রুত বদলায়। ২০১৩ সালে ছাত্র সংসদের দাবিতে মিছিলে গিয়ে প্রাণ দিতে হয় এসএফআই নেতা সুদীপ্ত গুপ্তকে। সেই বছরেই মূলত বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের ক্রমাগত আন্দোলনের চাপে শেষপর্যন্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকার। কিন্তু এমন নির্বাচন হয় যে, টিএমসিপির দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গার্ডেনরিচে হরিমোহন ঘোষ কলেজের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান একজন পুলিসকর্মী। এই টুকরো টুকরো ছবিগুলো গোটা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও ক্যাম্পাস গণতন্ত্রের বৃহত্তর ছবিটা স্পষ্ট করে।

কিন্তু এটাই কি একমাত্র বাস্তব? এর মোকাবিলার কি কোনো চেষ্টা নেই? অবশ্যই আছে। সেই ২০১৭ সাল থেকেই বাম ছাত্রসংগঠনগুলো ক্রমাগত নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পালটা লড়াই চালিয়ে গেছে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, সেটা যথেষ্ট নয়। তাই কার্যত বিনা প্রতিরোধে তৃণমূল নিজের কাজ করে গেছে। এর কারণ দেখতে চাইলে অনেক কিছু সামনে আসতে পারে, কিন্তু এককথায় বললে একে সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

২০১১ সালের পর থেকে দেখলে মূলত কয়েকটা পর্যায়ের ছাত্র আন্দোলন চোখে পড়বে। প্রথমে ২০১২-১৩ সাল নাগাদ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন। তারপর ২০১৭ সালে ছাত্র কাউন্সিলের সরকারি নির্দেশিকা ও আইন পাস করার সময় থেকে কাউন্সিলের বিরুদ্ধে এবং ইউনিয়নের পক্ষে আন্দোলন। ২০২০ সালে চারটে বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে এই আন্দোলনে খানিক ভাঁটা পড়ে। যদিও দেশ বাঁচানোর ডাক দিয়ে এই সময়ের ছাত্র আন্দোলন আসলে মিশে গিয়েছিল সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে, তৈরি হয়েছিল ‘স্টুডেন্টস এগেনস্ট ফ্যাসিজম’-এর মত সম্মিলিত ছাত্র আন্দোলন, পরবর্তীকালে করোনার সময়ে যা খানিক ধাক্কা খায়। তবে দিল্লির কৃষক আন্দোলন যথেষ্ট উৎসাহ জুগিয়েছিল ছাত্রদের। সেখান থেকেই আরও উৎসাহ নিয়ে ২০২০ সালের শেষদিক থেকে শুরু হয় ক্যাম্পাস খোলার আন্দোলন।

২০১১ সালের পর থেকে প্রথমদিকে প্রত্যেক বাম সংগঠনের সদস্যসংখ্যা কমতে থাকলেও ক্রমে ২০১৭-১৮ থেকে সেই ছবি খানিক বদলায়। এর সঙ্গে তৃণমূলের প্রত্যক্ষ হামলা থেকে বাঁচিয়ে সংগঠনের কাঠামো কলেজ ক্যাম্পাস থেকে এলাকাভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক করে তোলে এসএফআইয়ের মত সংগঠন। অন্যরাও প্রায় সেভাবেই টিকিয়ে রাখে নিজেদের অস্তিত্ব। ফলে সংগঠন টিকিয়ে রাখার কাজটা হয় ঠিকঠাক, কিন্তু ক্যাম্পাসের সঙ্গে যোগাযোগ খানিকটা ছিন্ন হয়।

২০১৭-১৮ থেকে ইউনিয়নের দাবিতে আন্দোলন এবং ২০২০-২২ সাল অবধি টানা ক্যাম্পাস খোলার আন্দোলন অনেক ছাত্রদেরই আবার বাম ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত করতে পেরেছে। লকডাউনে রেড ভলান্টিয়ার্সের মত উদ্যোগও অনেক ছাত্রছাত্রীকে বাম রাজনীতির আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। সদস্যসংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে দেখলে সত্যিই ছাত্র সংসদের জন্য আন্দোলন থমকেই আছে। ছাত্র সংসদের জন্য আন্দোলন দেশ জুড়ে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়, দুটোকে একসঙ্গে জুড়ে নিতে হবে।

আরো পড়ুন ক্যাম্পাসে শস্তা, বাধ্য শ্রমিক তৈরি করার কল রাজ্য শিক্ষানীতি

র‍্যাগিংবিরোধী আন্দোলন চলাকালীনই ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে আদালতে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে রাজ্য সরকার। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় দ্রুত সারারাজ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও নির্লজ্জ তৃণমূল সরকার সেই রায়কেও পাত্তা দেয়নি। তাই শুধু আদালতের চাপে হবে না। আসল চাপ তৈরি করতে হবে সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের পথেই। দিল্লির কৃষক আন্দোলন উদ্দীপনা জুগিয়েছিল পুরো দেশের সবরকম গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন থেকে আরেকটু শেখার এবং ভাবনাচিন্তা করার রসদ জোগাড় করা যায় হয়ত।

তার সঙ্গে শেষ ছবছর যাদবপুরে এবং শেষ চারবছর প্রেসিডেন্সিতে রয়েছে এসএফআইয়ের ইউনিয়ন। সেখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ, উল্লেখযোগ্য কাজও হয়েছে এই বছরগুলোতে। আম্ফানের সময় ছাত্রদের সাহায্য করা, করোনার সময়ে ভ্যাক্সিনেশনের ব্যবস্থা, অনলাইনে ক্লাসের জন্য স্মার্টফোন এবং রিচার্জ করানোর ব্যবস্থা, গরিব ছাত্রদের জন্য স্কলারশিপ, ইউনিয়নের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব পেশ, ছাত্রদের প্রতিদিনের বিদ্যায়তনিক সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা, ফি বৃদ্ধি আটকানো, নতুন কোর্স চালু করতে বাধ্য করা, কোর্স বন্ধ হওয়া আটকানো, নিয়মিত সিআর মিটিং বা জিবি করে ছাত্রদের মতামত নেওয়া – এমন বিবিধ কাজ রয়েছে যা ছাত্রসংসদের প্রকৃত কাজ কী হতে পারে, সেই মডেল তৈরির জন্য যথেষ্ট।

তাই একদিকে রাস্তার আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়ানো, অন্যদিকে টিএমসিপির মডেলের বিকল্প গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের মডেল নিয়ে ছাত্রদের কাছে পৌঁছে যাওয়া, তাদের কথা শোনা, তাদের কাছে নিজেদের কথা পৌঁছে দেওয়া এই কাজগুলো সাময়িকভাবে থমকে থাকা ইউনিয়ন আন্দোলনকে বেশ খানিকটা জল বাতাস দিতে পারে। কারণ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, ক্যাম্পাস অভিমুখে আন্দোলন ছাড়া বাম ছাত্র রাজনীতির পরিসর ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেওয়াই যায়। পাঁচের দশকে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন বিপিএসএফের অনেকটা সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি হয়েছিল স্টুডেন্টস হেলথ হোমের মাধ্যমে। সেটা শুধুমাত্র একটা চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল না, ছিল ‘স্বাবলম্বী আন্দোলন’-এর ফসল। ওই স্বাবলম্বী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বহু ছাত্রই ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতিতে আসেন। কংগ্রেসি আক্রমণের দৌলতে সেই সময়টা কিন্তু খুব সহজ ছিল না।

এখনো রাজ্যের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামো বাঁচাতে প্রাণপণে রক্ষা করতে হবে ছাত্রদের ইউনিয়নের অধিকার। আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করে আনতে হবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দেশিকা। বাংলায় তৃণমূলের দৌলতে তৈরি হওয়া অচলায়তনের জানলাগুলো খুলতেই হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.