স্বপন পাণ্ডা
ভাদ্র মাস।
আমাদের শব্দসঙ্গমের চরম ঋতু।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সামনেই পুজো, পুজোটা কিছু না, লেখাই আমার পুজো, আমার প্রেম প্রকৃতি সব। অথচ কিছুতেই শব্দগুলি দাঁড়াচ্ছে না। ভালোবাসার তুঙ্গ মুহূর্তে যদি দরজায় কেউ জোরে জোরে কড়া নাড়ে, রাত গভীরের মোবাইল ফোনে সেকেন্ডে সেকেন্ডে কেউ কল করে, ভালোবাসা ঘাবড়ে গিয়ে উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে একেবারে হিমবাহ, লেখাটাও তো তাই। নিশ্ছিদ্র ধ্যান, নিরবচ্ছিন্ন শান্তি ছাড়া কি শব্দে শব্দে বিবাহ, সঙ্গম, নবজন্ম সম্ভব! কয়েকদিন যাবৎ এক তুমুলতম অশান্তির ঘূর্ণির মধ্যে আটকে।
এবারের একমাত্র উপন্যাস, বরাতজোরে বর্ষার মধ্যে নামিয়ে ফেলেছি। তিন-চারটে গল্প, উড়িষ্যার একটা অফবিট সমুদ্রসৈকত নিয়ে ভ্রমণকাহিনি, ছোটদের জন্য দুটো গোয়েন্দা গল্প হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও ছ-সাতটি গল্প (এর মধ্যে তিনটে অবশ্য অনলাইন পুজো সংখ্যার জন্য), দুটো বড় গল্প, অকালপ্রয়াত গল্পকার বন্ধুর লেখাপত্র স্মৃতি-টিতি নিয়ে ব্যক্তিগত গদ্য, কথা দেওয়া আছে, লিখতেই হবে। কিন্তু কী করে লিখতে হয় যেন ভুলে যাচ্ছি। এমন সব সংকটে প্রিয় বন্ধু, আত্মার সোদর ভাই, আত্মারাম বিশ্বাস আমার বল-ভরোসা। যত-যতবার চড়ায় আটকে গেছি, ও ঠিক আমাকে আটক-মুক্ত করেছে। এই কদিনে সেও বিশেষ সাড়া দিচ্ছে না, কোনো হেলদোল নেই তার।
আসলে, বয়েস হচ্ছে। যত বয়েস বাড়ছে, ততই আজকাল ছোটদের বড় ভয় পাচ্ছি। বড়দের কথা বিশেষ গায়ে মাখি না। কিন্তু, ছোটদের কথা একেবারে বুকের মধ্যে ধম করে বাজে। নয়-নয় করে একশ নব্বই-বিরানব্বইটা গল্প হয়ে গেল, তিন-চারটে নভেলেট, দুটো অণুগল্পের বই, বাইশ খানা উপন্যাস, দুটো প্রবন্ধের বই, ছোটদের জন্যও কম লিখিনি, সাত-আটটা হয়েছে, আরও হবে। তৈরি করেছি শখের গোয়েন্দা চরিত্র (দীপক চ্যাটার্জীর আদলে) ব্যাপক চ্যাটার্জী, তারপরেও, হ্যাঁ, তারপরেও আত্মবিশ্বাস ঠিক নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না।
তাই, শ্রীআত্মারাম বিশ্বাস ভাইকে বলছি, বারবারই বলি, তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বচ্ছর ধরে কলম ঘোরাচ্ছ, এত কিসের ভয় তোমার? কাকে? পাবলিশার কি আমাদের কম পড়িয়াছে?
ও হাসে। মাথা নিচু করে বলে, ঠিক। তবে, সেটা কোনো ব্যাপার নয়।
তাহলে? কী ব্যাপার? বলে ফেলো।
মাথা চুলকে (চুল অবশ্য মাথায় তেমন নেই, ওই ব্রহ্মতালু থেকে পেছন দিকে এক-দু গুছি কাঁচা-পাকা, ওটাই চুলকোয়) আত্মারাম বলে, আসলে ইয়ে, সত্যি বলতে কি, তোমার লেখা, বিশেষ কেউ তো আর তেমন পড়ছে না।
এসব শুনলে ভীষণ অপমানিত লাগে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেই ছেলেটি তো এই কথাই বলতে চেয়েছে। তুমি নিজের লোক, তুমিও অভিমান-অভিমান ভাবটা চেপেচুপে, স্বাভাবিকের চেয়ে এক পর্দা ওপরে গলা তুলে বলি, মাথা তোমার ঘেঁটে গেছে দেখছি। তুমি আমার আপন লোক, আজ তুমিই যদি টলে যাও, কোথায় দাঁড়াবো? প্রত্যেকটা লেখা শেষ হলে এতদিন সাবাসি দিয়েছ, তোমারই ভরসায় পাবলিশার ধরেছি। এখন অবশ্য ওরাই আমায় ধরে। এ কি কম?
ও মিচকি হাস্যে বলে, তা ঠিক, তবে এখন…
এখন কী? তুমি কি দেখোনি, আগে পাবলিশাররা আমায় বাতিল করত, এখন, যদিও তারা খুব ছোট, তবু দেখেছ তো, কাউকে কাউকে আমিই আজকাল বাতিল করি। একথা মানছি, বড় ঘর থেকে কখনো আমার ডাক আসেনি, আর এ বয়েসে, আসবে বলেও মনে হয় না। তবে ইদানিং ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা যেভাবে বই ছাপাছুপিতে এগিয়ে আসছে, যা সম্মান ওরা দিচ্ছে, দশ বচ্ছর আগে তো ভাবাই যেত না!
বড় ঘরের জন্য চাপা কষ্ট যে ভেতরটায় কুরকুর করে না, তা নয়। তোমার কাছে তো লুকোবার নেই। দু-চারটি দীর্ঘশ্বাস ঘনিয়ে-ব্যথিয়ে উঠলেও, আমি বাবা ছোটদের সঙ্গেই মোটামুটি সুখে-শান্তিতে আছি।
ও ফুট কাটল, কত বিক্রি হয় তোমার ঠিকঠাক জানো? পিওডি-র জমানা, তিরিশ কপি ছেপেই সেকেন্ড এডিশান, সাত-আট জায়গায় বই ঘুরছে তোমার, রয়ালটি …
আমি খাদে গলা নামিয়ে ওকে সদ্গুরু-ভঙ্গিতে বলি – এডিশান রয়ালটি এগুলো কোনো বড় কথা নয়, আসল কথা হল সাহিত্য ….
এইবার ও আমায় চেপে ধরে। সেটাই তো বলতে চাচ্ছি, সাহিত্য… কেউ পড়ে না, খালি ছাপে ছাপে আর ছাপে, না ছাপলে, মাথা খারাপ হয়ে যায়, এই রে, সবাই আমায় ভুলে মেরে দিলে না তো!
আমি প্রাণপণে কথা ঘুরিয়ে দেবার কৌশল খাটাই। একটা বাচ্চা ছেলে, ফেসবুকে কী লিখল না লিখল, অমনি তুমি কেঁপে গেলে ভ্রাতা আত্মারাম! কী বলেছে? আর ও কি শুধু আমায় বলেছে নাকি! আমি রিপিটেশান করে যাচ্ছি? কানাগলিতে আটকে গেছি? আর না লিখলেও বাংলা সাহিত্যের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না? খাদ থেকে সামান্য উঠে গিয়ে টেনে টেনে কথাগুলোকে একের পর এক প্রশ্নচিহ্ন ধরে দাঁড় করাতে করাতে গড়ে তুলতে থাকি প্রতিরোধ, প্রশ্নের ব্যারিকেড। কাজ হয় না। ও সেই আড়চোখে তাকিয়ে থাকে, ছুঁড়ে দেয় জ্বালা-ধরানো আধ-ব্যাঁকা হাসি।
পরশু রাত থেকে কী বোর্ডে, আমার চির-বিশ্বস্ত আঙুলগুলি ঠিকঠাক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। ল্যাপটপের সাদা পর্দায় বর্ণমালাগুলি অনামিকার আলতো চাপে যেমন নেচে নেচে শব্দে সমর্পিত হয়ে বাক্যপ্রবাহের দিকে যতির বাঁকের পর বাঁক পার হয়ে ছুটে যায়, একটার পর একটা জ্যান্ত প্যারা তৈরি করে পর্দা ভরে পাতার পর পাতা সাদা-কালোর মোজাইক গড়ে ওঠে, কাল থেকে হচ্ছে না হচ্ছে না হচ্ছে না। শব্দ ফুটছে ঝরছে, ঝরে পড়ছে মৃত পিঁপড়ের মত। যতি বসছে, পরের মুহূর্তেই এলিয়ে পড়ছে। একটা ঠিকঠাক বাক্য দাঁড় করাতে পারছি না। ক্ষিপ্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করি, ফের কিছুক্ষণ পরে খুলি, আবার দক্ষিণ অনামিকার নাচের জন্য অপেক্ষা করি, কিন্তু তার কোনো সাড় নেই, যেন কী বোর্ডের সঙ্গে তার কোনোদিন দেখাই হয়নি, এমন ভাব। কোথায় গেল আমার সেই অব্যর্থ লিখন-জঙ্গমতা! ডাইনে থেকে বাঁয়ে কালো পুরুষ্টু পিঁপড়েদের সার-সার জয়যাত্রা কেন মুখ থুবড়ে পড়ল! পিঁপড়েরা আসছে, হারিয়ে যাচ্ছে, কারও সঙ্গে কারও মিলমিশ হচ্ছে না দেখে দলছুটদের সবগুলোকে টিপে থেঁতলে মেরে ফেলছি মেরে ফেলছি… সামনে ফাঁকা সাদা পাতা, ল্যাপটপের শূন্য পর্দা যেন ফাঁকা মাঠ, মাঠের মধ্যে আমি একা, একাকী। আত্মারাম বিশ্বাস মুচকি হাসে। আমি জানি, ওর চূড়ান্ত অসহযোগের কারণেই আমার এই আকস্মিক বন্ধ্যাত্ব। অথচ ভাদ্র মাস। এখন শব্দসঙ্গমের চরম ঋতু!
টানা কয়েকদিন বৃষ্টির পর কাল থেকে শরতের আকাশ, নরম রোদ, আমাদের এই চারতলার জানলা দিয়ে কিছুদূর অব্দি বাধাহীন। প্রকৃতির কত কত বর্ণনা লিখে গেছি এতকাল, আজ এক প্যারা শরৎকালও জাগিয়ে তুলতে পারছি না। ভাবলাম গল্প যখন আসছে না, একটু চারপাশটা লিখে রাখি। হচ্ছে না। সকাল থেকে বসে আছি তো বসেই আছি। আত্মারাম বসিয়ে রেখে কোথায় যে উধাও হল! কে যেন বলেছিল, রাইটার্স ব্লক। আমি কি ব্লকড হয়ে পড়লাম আত্মারাম?
লেখাটিকে ভালোবেসে কত কত রাত তো জেগেছি, ভোরের আলো ফুটছে, রাতের গভীরে, ব্রাহ্ম মুহূর্তে কে যেন চিরকালের মত চলে যাচ্ছে গঙ্গার দিকে, হরিবোলের ধুনে চমকে উঠে কিছুক্ষণ জন্ম-মৃত্যু নিয়ে শ্মশানবৈরাগ্যের ভাবে বুঁদ থেকেছি… লেখা শেষ হয়ে আসছে, কলকাতা জাগছে, একটু পরেই গঙ্গায় জোয়ার উঠে আসবে, নিমতলায় ‘চিতা বহ্নিমান’। চিতাগর্ভ থেকে নাভিকুন্ডর মালসা হাতে উঠে আসবে সন্তান। সোপান-পরম্পরা বেয়ে নেমে যাবে জাহ্নবীজলে, এক ডুবে গঙ্গামৃত্তিকার শীতল বুকে গুঁজে দেবে উষ্ণ-নাভি…
পাঁচতলা এই ফ্ল্যাটবাড়ির পাশ দিয়ে বড় রাস্তা, কিছুটা গিয়ে মোড়ের মাথায় বাঁদিকে ঢুকে পড়েছে। ওই মাথা থেকেই একটা সরু গলি পাঁচ-সাতশো মিটার এঁকেবেঁকে আহিরিটোলা ঘাটের আশেপাশে গিয়ে ফের বড় রাস্তায় মিশে গেছে। বাঁদিকে নিমতলা মহাশ্মশান। একটা ভাবের আবেশ কুয়াশার মত ঘনিয়ে ওঠার আগেই পাশ থেকে আত্মারাম বলে ওঠে, চিতা বহ্নিমান, ফাল্গুনী মুখুজ্যের উপন্যাস মনে পড়ে? তপন-তপতীর জন্য কেঁদে ভাসিয়েছিলে তো একদিন। আজ? আমি বলি, ওসব অল্প বয়েসের আবেগ, কেন মনে করাও, কী বলতে চাও?
বলতে চাই, একদিন যে বই হাতে হাতে ঘুরত, তোমার মত গ্রাম্য তরুণেরা স্বপ্ন দেখত অমন ঘোর-লাগা প্রেমের, তার চিতা জ্বলে জ্বলে কতদিন আগেই নিভে গেছে। ভেবে দেখ, তবু তো কয়েক দশক জেগেছিল ওই চিতা। ছিল বহ্নিমান। তোমাদের লেখা? কোন্ চরিত্র মনে রেখেছে কে? প্রেম মৃত্যু বিরহ, গরিবগুর্বোদের বাঁচা-মরা, কষ্ট পাওয়া, যাকে বলে হিউম্যান সাফারিংস, কী এমন লিখতে পেরেছো যে, লোকে তোমায় মনে রাখবে? ছোকরা, তোমার শেষ দুটো উপন্যাস নিয়ে যা লিখেছে, ভেবে দেখো, শুধু তোমাকে নয়, এই সময়ের সব্বাইকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কাঠগোড়া? এত নরম করে বলছ? ও কি একেবারে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়নি!
‘বাংলা কথাসাহিত্যে জঞ্জাল ও ঘুমপাড়ানি গুলির বাস্তবতা’ শিরোনাম দিয়ে লম্বা এক লেখায়, ছেলেটি লিখেছে ‘দুটি উপন্যাসই শব্দের জঞ্জাল। কোথাও শিল্পের ‘শ’-টুকুও নেই। বস্তুত, এই সব অতিপ্রজ লেখকদের এবার নিজে থেকেই থেমে যাওয়া উচিত। তা না হলে পাঠক ওঁদের বুক তাক করে এবার ঘুমপাড়ানি গুলি ছুঁড়ে দেবে! প্রকৃত প্রস্তাবে, বহু আগেই এঁরা ফুরিয়ে গেছেন। জুকারবার্গকে ধরে প্রাণপণে টিকে থাকার জন্য, লাজলজ্জার মাথা খেয়ে রোজ ফেসবুকে নিজের ছবি, নিজের হাবিজাবি লেখার কোটেশন, কোন্ ‘পফেসর’, কোন্ ইয়ার-দোস্ত কী বলেছে না বলেছে সব ফলাও করে ছেপে ছেপে ‘নালায়েক’ পাঠককে কব্জা করতে চান। মনে করিয়ে দিই, সাহিত্যের কোনো চোরাগলি নেই, আছে শুধু রাজপথ।” কী ভাষা! কী উদ্ধত অপমানকর মন্তব্য! আত্মারাম, তুমি কি সত্যিই মনে করো …
আমার মনে করা না করায় কী আসে যায়! উত্তেজিত না হয়ে, বরং ভেতরের দিকে খানিক তাকাও। না পারলে, এই তো, শরতের সকালটা একবার ভালো করে দেখে নাও। কতদিন তো কিছু দেখ না। সেই যে কবি বলিয়াছেন, ‘হেঁটে দেখতে শিখুন’ ওটা সত্যিই দেখা দরকার। ওতে চেতনা-চৈতন্যে শিশিরকণা জমে। লেখা তখন হয়ে ওঠে, তাকে আর বানিয়ে তুলতে হয় না। অনেকদিন পর ঝলমল করছে চারদিক। তোমাদের ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তায় নিত্যদিনের বাজার জমে উঠেছে, জোর কদমে কেনাবেচা চলছে। চারতলা থেকে নামো, তুমি নামো। লোকজনের কথা, আহা কত সুরের কত ঢংয়ের কথা সব শোনো, তাদের হাঁটা-চলা ঘাড় ঘোরানো, তাকানো, নিচু হয়ে কেনাকাটা দরদাম স্টাডি করো, বেচনদারের মজার মজার মন্তব্য শোনো। মোড়ের মাথায় চলে যাও, ঢুকে পড়ো তোমারই আজন্ম চেনা সরু গলিপথে। দুধারে বস্তি, কলে গঙ্গার জল নামছে, কলতলাটার পাশে দাঁড়াও। গলি রাস্তার বাঁদিকে মোহন ময়রার দোকান, কচুরি জিলিপি ভেজে ভেজে বারকোশে রাখছে, ওই শিল্পও কম নয়। আর একটু এগোলেই ঘাট, ছলছল করছেন সকালবেলার জোয়ারময়ী গঙ্গা, বাঁ দিকে মহাশ্মশান, চিতা জ্বলছে নিবছে। মৃতরা উড়ে যাচ্ছে ধোঁয়া হয়ে ওপারে হাওড়া-শালকের দিকে। ওই মৃতদের ছাই-ধোঁয়ার গা ঘেঁষেই লোকজন দিব্যি সাবান ঘষে ঘষে চান করছে, দাঁত মাজছে, গুলতানি মারছে। শরতের নির্ভার মেঘের মত এই মানব-প্রকৃতিকে দেখে এসো একটু, কিন্তু ওতে মজে গেলে চলবে না, এগুলো পরিপার্শ্ব মাত্র। পরিপার্শ্ব ছাড়া যেমন ছবির গড়ে ওঠা মুশকিল, তেমনি লেখার জন্য এই কাঠামোটা দরকার। কাঠামোয় চালচিত্র জাগাও। এতে চোখ আঁকবে প্রাণ সঞ্চার করবে তোমার কল্পনা। কল্পনার পৌরুষে এই অতি তুচ্ছ সব নশ্বর দৃশ্য হয়ে উঠবে অবিনশ্বর…
ওরেব্বাস! রীতিমত লেকচার রেডি করে এসেছ দেখছি। লিখিত প্রবন্ধ নাকি? একদা ছিলে বন্ধু, সোদর ভাই বলে ভেবেছি, এখন দেখছি তুমি তো আর সেই ভাইটি নাই, এক্কেরে আমার সাতকেলে মুরুব্বি-মাস্টার! যা যা বললে, এসব কবেই লিখে ফৌত করে দিয়েছি, ভুলে গেছ? আমার লেখা অন্য কেউ পড়বে কি, তুমিই তো দেখছি পড়োনি! আর শোনো, হাঁটাহাঁটি করলেই লেখা হয় না। অনেককেই তো হাঁটতে দেখলাম। দু-চার পা হেঁটেছে, দু-চার দিন কোথাও বেড়াতে গেছে, দু-চার মাস, দু-এক বচ্ছর চাকরিবাকরি করেছে, বেতনপত্র তুলে শাঁসে জলে মাখোমাখো হয়ে বেঁচেছে, বাড়ি তুলেছে, ফ্ল্যাট কিনেছে, আবার, পুজো সংখ্যা ঈদ সংকলন বইমেলা সংকলনে বছর বছর একই ধাঁচার ডজন ডজন গল্প উপন্যাস নামিয়ে চলেছে… এবং তারা পুরস্কারও বাগিয়ে নিচ্ছে, নিতেছে, তবু শান্তি নেই। রোজ ছবি ছাপা চাই, লেখা চাই, কোথায় গেল, কী বলল, কে পড়ল, কী বলল। তার বেলা? ওদের ছবি ছাপা-লেখার তলায় দেখবে, কমেন্টের আবর্জনা উপচে পড়ছে অনবদ্য… অসাধারণ লিখলেন দাদা আপনি তুলনাহীন, আমার প্রণাম নেবেন… কী দেখার চোখ আপনার স্যার, সুন্দর বিশ্লেষণ… আপনি প্রকৃত সাহিত্যিক, সমৃদ্ধ হলাম ভাই, এখন তিয়াত্তর চলছে, আপনি অনুজের মত, অভিনন্দন জানাই… সেই আপনি ত্রিবেণী এলেন, সেই আপনি চাপড়া এলেন, সেই আপনি ঝাড়গ্রাম এলেন, পুরুল্যা এলেন, জলপাইগুড়ি এলেন, কাঁথি এলেন, দীঘা এলেন, সেই আপনি সোনামুখী এলেন, চিত্তরঞ্জন এলেন, কচুয়াখালি এলেন, খাকুড়দা এলেন, জানতে পারলে দেখা করতাম দাদা, আপনার লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক আমি, প্রণাম নেবেন… কিছু বলবে না প্রিয় আত্মারাম?
আমি না বললে কে বলবে? তুমি না আমার সোদর ভাই। শোনো, লেখা যখন আসে না, অপেক্ষা করতে হয়। ওই ফাঁকে ঢুকে পড়তে হয় বইয়ের মহারণ্যে। অরণ্যই পথ দেখায়। মহা মহা লেখকেরাও অনেক সময় আটকে যান, ওই তুমি যাকে ‘ব্লক’ বলছ, তাই। তখন, তাঁরা শুধু পড়েন আর পড়েন, পড়তে থাকেন। নোট করেন, ডায়েরি লেখেন, অনুবাদ করেন, আরও কত রাস্তা। তা না করে, অন্য লেখকদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে, তাদের খ্যাতি-প্রতিপত্তি-পুরস্কারের কষ্টার্জিত বালতিতে চোনা ছুঁড়ে দিয়ে নির্ভার হতে চাওয়া একেবারে অসুস্থতার লক্ষণ বলে মনে করি। অসূয়া ত্যাগ করো। আমার সাফ কথা, শোনা না-শোনা তোমার ব্যাপার। যাকে একটু আগে ‘বাচ্চা ছেলে’ বলে তুচু করছিলে, তাকেই কেন এত ভয় পেতে যাবে, কে সে? কী বলল না বলল কী আসে যায়। একটা ছোট্ট বই হাতে আছে, একটু শুনবে?
আরো পড়ুন উপন্যাস, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?
তিরিশ বছর আগে, একটা কুড়ি বছরের ‘বাচ্চা’ ছেলে, কলেজের ছাত্র, কয়েকজন লেখকের ইন্টারভিউ নিয়েছিল, তারপর সেই নোটবই তার হারিয়ে যায়। তিরিশ বছর পরে, এখন তার বয়েস পঞ্চাশ। কবিতা লেখে, গল্প লেখে, পেশায় অসমসাহসী সাংবাদিক; নতুন বইদের একটু জায়গা করে দেবে বলে একদিন সে তার ইস্কুলের বইখাতাগুলো জাস্ট সের দরে বেচে দেবে ঠিক করল। ধুলো মেখে ওগুলি বার করতে গিয়ে হাতে এল তার সেই ভুলে যাওয়া হারিয়ে যাওয়া নোটবই। ভাবল এসব এখন কে আর পড়বে? শেষপর্যন্ত, অল্প বয়েসের সেই প্রথম ভালোবাসাটিকে সে ঝেড়েঝুড়ে, কপি করে ছাপতে দিল, এটাই সেই বই। একটু শুনে রাখো …
প্রশ্ন: আপনার কোনো হতাশা আছে?
উত্তর: নাঃ, ফ্রাস্ট্রেশন অনেক উপকার করেছে আমার। এই ফ্রাস্ট্রেশন থেকেই আমি এক কোটি ব্রাত্যজনের মুখপাত্র হয়েছি। এই ফ্রাস্ট্রেশন থেকে আমি পেয়েছি ‘ট্রমা’। ‘ট্রমা’ বোঝো? ভেতরের ব্যথা। এই ‘ট্রমা’ আমাকে দিবাস্বপ্ন তৈরি করতে শিখিয়েছে। না, দিবাস্বপ্ন মানে আকাশকুসুম নয়। মেকিং ড্রিমস। ট্রমাকে ড্রিমে পরিবর্তন করা শিখিয়েছে। যন্ত্রণা থেকে ঘুমের আড়ালে চলে যাওয়া। দুর্যোধন জলস্তম্ভে লুকিয়ে ছিল কেন? সে গদা হাতে আবার কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে নামতে পারবে বলে।
বইটা পড়েছি, মেলায় কিনেছিলাম। এটা অমিয়ভূষণের সাক্ষাৎকার না? অবশ্যই, এই তো মাথা খুলছে…জেনো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানো চলবে না, জলস্তম্ভে লুকিয়ে থাকো। মহাভারতের ধর্মাধর্ম জয়-পরাজয় মনে রাখার দরকার নেই, এই আত্মগোপন পর্বটুকু যাপন করো। পাণ্ডবেরাও কিন্তু দীর্ঘ অজ্ঞাতবাসে নিজেদের প্রস্তুত করছিলেন, তৈরি হচ্ছিলেন মহাযুদ্ধের জন্য। দেবেশদা একদিন তোমায় বলছিলেন না ‘অজ্ঞাতবাস ছাড়া অন্তর্ঘাত ঘটানো যায় না’। ভুলে গেছ? ভেতরের ব্যথা নিজেই নিজের প্রসবকাল নির্ধারণ করে নেবে। ভাদ্রমাস, শব্দসঙ্গম কীসব অশ্লীল ইঙ্গিত, মরীয়া হয়ে পাঠকের মজলিশে পেশ করছিলে, ছিঃ! আত্মারামের কথাগুলি আত্মার দেওয়ালে যেন এক-একটা বিষতিরের মত বিঁধে যাচ্ছিল। ভাবলাম, অনেক হয়েছে, এবার থামবে। কিন্তু না, ফের ওই বইয়ের আর এক পৃষ্ঠা খুলে পড়তে থাকে…
প্রশ্ন: কবিতা আধুনিক পাঠকের জীবনের কতখানি কাছাকাছি? জনপ্রিয় কবি, না জনপ্রিয় কবিতা, আধুনিক পাঠককে কাছে টানে?
উত্তর: আমি কবিকে সামাজিকভাবে আর পাঁচটা মানুষের মতই দেখি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের মত কবিও আছেন। এদের যেমন সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে, কবিরও আছে। মানুষ মাত্রই সমাজের হিতকর কিছুর পক্ষে, অহিতের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। কবিও তাই। কবিতাকে অবশ্যই আধুনিক পাঠকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকতে হবে। যদি তা না থাকে তবে গ্রহণীয় নয়। আর জনপ্রিয় বিষয়টা করে তোলা হয়। সাবানের বিজ্ঞাপনের মত তো কবিতার বিজ্ঞাপন হয় না।
বুঝেছি, এটা মণীন্দ্র গুপ্ত। নরম করে একেবারে ব্রহ্মতালু তাক করে, এমন ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ আর কে করতে পারেন!
আত্মারাম, সত্যি করে বলো তো, একটু আগে যে বললে, আমার লেখা কেউ পড়ে না… বাচ্চা ছেলেটা আমার দু-দুটো উপন্যাস একেবারে টান মেরে মাটিতে পেড়ে ফেলল …. আমি কি খাটিনি? রাত জেগে জেগে ….
আত্মারাম আমার দক্ষিণ অনামিকাটির শীর্ষাগ্র ছুঁয়ে গলা নামিয়ে বলল, লেখা নিয়ে তোমার উত্তেজনাকে শমিত করতেই ওসব বলেছি; আর ছোকরা কী বলল না বলল একদম ভুলে যাও। ভুলে যাও ফেসবুক লাইক কমেন্ট আহা উহু হুহু হুহু কুহু কুহু… সব বোগাস। মামুন হুসাইন তোমার বন্ধু না? ফেসবুকে আছে? নিক্রোপলিস লেখক কি কোনো লাইক-কমেন্টের পরোয়া করে? আর, খুব তো শহীদুল জহিরের কথা বলো। সে কি কস্মিনকালে ফেসবুকে ছিল? বোধহয় ফেসবুক ভূমিষ্ঠ হবার আগেই উনি মাটি নিয়েছেন, তাহলে? অথচ দেখো, যারা তাকে কখনো দেখেনি, মেশেনি, আড্ডা দেয়নি, চা খায়নি, আহা উহু হুহু করেনি, সেই এপার-ওপারের ছেলেমেয়েরাই আজ তার দোস্তো, সখা; তার ভূর্জপত্রগুলি তাদের হাতে ভাসতে ভাসতে কালের যাত্রায় উদ্দাম উধাও…।
বহস বলো বাহাস বলো অনেক হল, এবার থামো, একটু ঘুরেই আসি….আত্মারাম বিশ্বাসের হাত ধরে আমি উপর থেকে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নামতে থাকি, নামতে থাকি….
কৃতজ্ঞতা: আমার মনে হয়; সব্যসাচী সরকার (সাক্ষাৎকার সংকলন, ২০২৪)
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








