খেজের, মস্তান! খেজের আলি, মস্তান! আমাদের খজু, মস্তান! কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়ল গ্রামের মানুষ। আর তখনই খেজের আলির ট্যাপসা মুখখানা মনে পড়ল তাদের। ট্যাপসা মুখের উপর ভোঁতা নাক। ঢেলা ঢেলা চোখ। চোখের উপরে কটা ভ্রু। ভ্রু-র উপরে ভিটে কপাল। বউ জাহেরা বিবি ঠেস মেরে বলে, দেড় বিঘে শরীরের এক বিঘেই তো কপাল! মাথায় কোঁকড়ান হিপ্পি কাট চুল। দুই পাশে মানকচুর পাতার মত খাড়া খাড়া দুটো কান। আর সবকিছুর সঙ্গে বেমানান একটা লম্বা গলা। সে গলার মাঝে একটা হাড় কুঁজের মতো উঁচু হয়ে থাকে। শরীরে যত কেজি মাংস তার তিন গুণ চার গুণ হাড়! গা উদোম হলে বুকের হাড় তো গোনা যায়ই, পেটের খিলও দেখা যায়! ঠ্যাংঠেঙে পা। যখন হাঁটে তখন মনে হয় একটা শামুকখোল পাখি হাঁটছে! দেহে গতরে তো বটেই, বুদ্ধিতেও খেজের আলি খিল আর খুলি! সবাই বলে, খেজেরের মাথায় ধান নেই, শুধু পাতান! বউ জাহেরা তো আরও এক কাঠি উপরে উঠে বলে, পাতান নয়, তুশ আর ভুশি! খেজেরের যখন বিয়ে দেওয়া হল তখন সবাই ভেবেছিল, বউ টিকবে না। এমন আবাং লোকের কেউ ভাত খায়! কিন্তু জাহেরা টিকে গেছিল। শুধু টিকেই যায়নি, একেবারে শিকড় পুঁতে দিয়েছিল। বছর ঘুরতেই ব্যাটার বাপ হয়েছিল খেজের। জাহেরাও ‘কপালের লিখন’ বলে সংসারটায় থেকে গেছিল। তাই বলে ‘ব্যাটার বাপ’ হওয়া আর ‘মস্তান’ হওয়া কি এক? আজ পর্যন্ত একটা পাখি মেরেছে কি তার ঠিক নেই! সেখানে মানুষ মারা! গাঁয়ের লোকে ভাবল, ধুর! এসব গুজব! কোন খেজের আলির কথা বলতে গিয়ে আমাদের খেজের আলির কথা বলছে হয়ত। দুনিয়ায় কি খেজের আলি একটা? যারা খেজেরের সঙ্গে মিশেছে তারা জানে, এক ঘুসি মারা তো দূরের কথা, খেজের কাউকে কোনোদিন গালমন্দ করেনি। সেই খেজের কিনা বড় মস্তান! কথাটা হাওয়ার গতিতে ছড়াল। তাও আবার এ হাওয়া ঝিরঝিরে হাওয়া নয়, ফাল্গুনের আউরিবাউরি হাওয়া! কথাটা জড়িয়ে পেঁচিয়ে যেতে লাগল। কেউ শুনল, মানুষ খুন করেছে খেজের! কেউ শুনল শহরের বড় মস্তানকে খুন করেছে খেজের! কেউ শুনল একটা নয়, আগেও নাকি অনেক খুন করেছে খেজের! অথচ সেইদিনও উলটো করে জামা পরত খেজের। দুটো বোতাম লাগাত তো একটা লাগাত না। মাঝেমধ্যেই বউয়ের চটি ভুল করে পরে ফেলত। বউ জাহেরা যেদিন বলে, আলু আনতে সেদিন হাট থেকে কচু আনে; আর যেদিন কচু আনতে বলে সেদিন আলু আনে! জাহেরা তিড়বিড় করলে খেজের বলে ‘দুটোই তো মাটির তলার জিনিস, আলাদা আর কী আছে।’ শুধু হাট-বাজারের ক্ষেত্রেই নয়, খেজের আগে যে কাজ করত সেখানেও বিস্তর গোলমাল করত। খেজের দর্জিগিরির কাজ করত। এ তাদের বংশের পেশা। তার বাবাও দর্জি ছিলেন, ঠাকুরদাও দর্জি ছিলেন। সেজন্য তার নাম খেজের আলি খলিফা। গর্ব করে বলে ‘দুনিয়ায় ষোলজন খলিফা, আরবের বারোজন আর আমরা চারজন।’ তারা চারজন বলতে তার বাপ, সে বাপের বাপ, বেটা আর সে বেটার বাপ, অর্থাৎ সে নিজে! লোকে যখন তার সেকথা শুনে বলত ‘আরবের খলিফারা তো সাম্রাজ্য শাসন করেছেন, তোরা কী শাসন করিস?’ খেজের তখন তার পোকালাগা দাঁতগুলো খিলখিল করে বলে ‘কেন, বউ। আমরা বউ শাসন করি। বউয়ের চেয়ে বড় দুরূহ সাম্রাজ্য কি আর দুনিয়ায় কিছু আছে?’ লোকে সেকথা শুনে অবাক হয়েছিল, বাবা! খেজের তো খাজাও নয় খাস্তাও নয়, খেজের যে একেবারে খাঁড়া! কিন্তু সে পাকা কথায় তার কারবার আর পেকে ওঠেনি। বাপ-ঠাকুরদার কারবারটা উঠে গেছিল। খেজেরের মাথায় ছিট থাকায় কাপড়ের ছিটের কাজ আর টিকল না। টিকবেই বা কী করে? লোকে প্যান্ট বানাতে দিলে সে প্যান্টের বদলে কোট বানিয়ে দিতে লাগল! লোককে যুক্তি দিল ‘কোটটা আপনাকে খুব মানাবে তাই কোট বানিয়ে দিলাম।’ কেউ জামার একটা পকেট বানাতে দিলে দুটো পকেট বানিয়ে দিল! অদ্ভুত যুক্তি দিল ‘এক পকেটে খচ্চা পয়সা রাখবেন আরেক পকেটে নোট রাখবেন।’ শুধু তাই নয়, কারো কারো পকেটের কাপড়টা আবার অন্য রঙের কাপড় কেটে লাগিয়ে দিল! লোকে গালমন্দ করল ‘জয়বাংলার জামা আমি নেব না, আমার ছিট ফেরত দাও।’ খদ্দেরে ঝামেলা লাগিয়ে দিল। ছিট তো ফেরত দিতে পারল না, নিরুপায় হয়ে ছিটের দাম ফেরত দিল খেজের। এসব করতে করতে একসময় তার পুঁজি শেষ হয়ে গেল। ফলে বাপ-ঠাকুরদার কারবারটাও উঠে গেল! শেষে কী আর করবে? ঘাড়ে কোদাল আর বগলে দাউলি গুঁজে মাঠে গেল খেজের। সেখানেও নানান খিটকেল কাণ্ড ঘটাল! জমি কাদান করতে গিয়ে নিজেই কাদা হয়ে বাড়ি ফেরে! তার সে কাদা-পানিতে ভূত হয়ে যাওয়া শরীরটাকে দেখে জাহেরা বলে ‘এবার তোমার আসল চেহারা বের হয়েছে! আসলে তুমি একটা আস্ত কাদার দলা!’ ইটভাটায় ইট বইতে গিয়েও ছাই-ধুলো মেখে সাদা ভূত হয়ে বাড়ি ফিরত। কে যেন তাকে বলেছিল, ছাই মাখলে আয়ু বাড়ে। তাই সে ইচ্ছে করে ছাই মাখত। তখন কাছের মানুষটাকে চিনতে পারত না জাহেরা। ঘাসের গোড়ায় দাউলি মারতে গিয়ে ফসলের গোড়ায় মারল! এক পাই ভুঁই মারতে গিয়ে গেরস্তর এক প্যাকেট বিড়ি শেষ করে দিল! এমন মুনিষ নিলে তো গেরস্তই ফতুর হয়ে যাবেন! ঘাটে তো মারা পড়লই, এবার মাঠেও মারা পড়ল খেজের। এদিকে বাড়িতে রোজগারপাতি না ঢোকায় বউ খিটমিট করতে লাগল। অগত্যা গাঁ ছেড়ে শহর ধরল খেজের। আর সেখানেই ঘটনাটা ঘটল।
আরো পড়ুন বহু মানুষের প্রার্থনা লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তাই বলে, খেজের মস্তান! বউ জাহেরা হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এক-আধবার তার মনে হল, শাড়ি গুঁজে নাচি। বাঁদরের মত ড্যাং ড্যাং করে নাচি। হেসে গা গড়া দিই। কিংবা খুশিতে পীরের দরগায় গিয়ে শিন্নি মানত করি। চাদর চড়াই। একবার ঘরের চৌকাঠে ব্যাং দেখে এমন লাফ মারা মেরেছিল খেজের যেন এক লাফেই মক্কা পৌঁছে যাবে! যে লোকটা একটা ছুঁচো মারতে পারে না সে লোকটা মস্তান! সত্যি কথা বলতে, বউকেও কোনোদিন এক গাদন দিতে পারেনি খেজের। বরং বউয়ের কাছে কেঁদেছে। যে পুরুষ বউয়ের কাছে কাঁদে সে কীভাবে মস্তান হতে পারে! হিসেবের আল-বিল-পাড়-পগার কিছুই মেলে না জাহেরার। তবে একটা হিসেব খুব সহজভাবে মেলে, সেটা হল খেজের আলির ভূতের ভয়। একবার তো সে জাহেরাকে ভূত ভেবে জ্ঞান হারিয়েছিল। বৈশাখ মাস। জাহেরা ছাদে মেলা কাপড় তুলতে ভুলে গেছিল। পরে মাঝরাতে যখন আকাশ কালো করে মেঘ উঠল, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল, তখন জাহেরা ঘুম থেকে উঠে ছাদে গেল কাপড় তুলতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খেজেরের ঘুম ভেঙে গেল। দেখল, পাশে জাহেরা শুয়ে নেই! ছাদ থেকে কানে ভেসে এল কোনোকিছু হাঁটার ধপ ধপ শব্দ! খেজের সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠল। উঁকি মেরে দেখল, জাহেরা কাপড় হাতে দাঁড়িয়ে আছে! জাহেরা ভূত হয়ে গেছে! আর জ্ঞান থাকেনি খেজেরের। তখনই অজ্ঞান হয়ে গেছিল। তবে মস্তান না হলেও একটা মস্তানি হাবভাব আছে খেজেরের। মাঠেঘাটে যতই লাঙলে-কোদালে মানুষ হোক, বাইরে বের হলে কিন্তু ফিটফাট! আইরন করা প্যান্ট, ইন করা শার্ট! শার্টের উপর গলানো হাফ কোট! কোমরে বেল্ট! চোখে সোনালী ফ্রেমের চেঞ্জার! আর পায়ে শু! শ্বশুরের দেওয়া মোটরবাইকটা যখন হাঁকিয়ে শহরে যায় তখন কারো বাপের ক্ষমতা নেই যে বলে, খেজের আলি একজন জনমুনিশ! আলে-বিলে নয়, একেবারে আইএ-বিএ পাশ! আর একটা ব্যাপারে তার জুড়ি মেলা ভার। সেটা হল মিথ্যে কথা বলায়। এমন করে মিথ্যে কথা বলে, কারো বোঝার ক্ষমতা নেই যে সে মিথ্যা বলছে! তার এই গুণের কারণেই হয়ত ‘বদনাম’-টা ছড়িয়েছে! বদনামই তো? ‘মস্তান’ আবার সুনাম নাকি? এতে পরিবারের দুর্নাম তো হবেই, গাঁয়েরও দুর্নাম হবে। কিন্তু হল তার উলটো! অদ্ভুতভাবে খেজেরের কদর বেড়ে গেল! খেজেরকে সবাই সমীহ করছে! এমনকি গ্রামের সালিশি সভাতেও তাকে ডাকা হচ্ছে! তার কথা শোনা হচ্ছে! আর এসব বেশি করে হচ্ছে, শহরের ওই লোকটি গ্রামে আসার পর থেকে। লোকটির সঙ্গেই তো ঝামেলাটা হয়েছিল খেজেরের। প্রথমে ঠাট্টা-ইয়ার্কি। পরে সে ঠাট্টা-ইয়ার্কি হাতাহাতি, পরে হাতাহাতি থেকে রক্তারক্তিতে গড়ায়। ঘটনাটি ঘটেছিল বহরমপুর শহরের কাশিমবাজারে। খেজের পাটের আড়তে কাজ করত। সেদিনও কাজে গেছিল। ঝামেলার সূত্রপাতে ছিল এক মোড়া পাট। আদিল বলতে চাইছিল, গাড়ির সব পাট বটম পাট। খেজের বলতে চাইছিল, সব পাট বটম নয়, শুধু ওই মোড়াটা বটম। আদিল বলেছিল ‘তুই পাটই চিনিস না।’ খেজের বলেছিল, ‘আমরা পাটের চাষ করি, আর পাট চিনি না!’ এক কথা দু কথা হতে হতে দুজনের মধ্যে মারামারি লেগে গেছিল। আর তখনই আদিলের হাতটা খেজেরের গায়ে উঠে গেছিল। আর যায় কোথায়? খেজের একেবারে মাটিতে পেড়ে ফেলেছিল আদিলকে। খুলিতে বুদ্ধি না থাকলেও দেহে বল আছে খেজেরের। বেকায়দায় পড়ে, টিংটিঙে আদিল বাতিল পাট ছাঁটা কাস্তেটার উলটো পিঠ দিয়ে খেজেরের পিঠে কোপ মারতে গেছিল। সে কোপ ঠেকাতে গিয়ে হাত কেটে যায় খেজেরের। গলগল করে রক্ত পড়ে। মারামারির সেখানেই ইতি হয়। কিন্তু তার রেশ ছড়ায় বহুদূর। খেজের লোক লাগায়। সেসব লোক ওই আড়তেই তাদের সঙ্গে কাজ করে। তারা আদিলকে ভয় দেখানোর জন্য মিথ্যে করে বলে ‘কাকে মেরেছ, আদিল! খেজের আলি তিনটে খুনের আসামী! দু দুবার ব্যাঙ্ক লুট করেছে! ভোটের সময় বুথ জ্যাম করে!’ সেসব কথা শুনে শহুরে মানুষ আদিল ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে থানাতেও যেতে পারে না। সে মীমাংসা করার জন্য লোক ধরে। কিন্তু খেজের রাজি হয় না। সে হুমকি দেয়, খুন করেই এর বদলা নেবে। গোটা কাশিমবাজারে খেজেরের এই মস্তানির কথা রটে যায়। ঝামেলার তিনদিন পরে আদিল হিতানপুরে আসে। খেজেরের হাত-পা ধরে। থত্থর করে কাঁপে। কাঁদাকাটি করে। বলে ‘যত টাকা লাগবে নিয়ে নে। কিন্তু আমাকে জানে মারিস নে।’ খেজের কিছুদিন কাশিমবাজার যাওয়া বন্ধ করে দেয়। আর তাতেই কাশিমবাজারের লোক ভয় পেয়ে যায়। আসলে খেজের ভয়ে কাশিমবাজার যায় না। কিন্তু লোকে সেটা বুঝতে পারে না। তারা ভাবে, খেজের বড় মস্তান। নিশ্চয় কোনো ফন্দি আঁটছে! হিতানপুরের ভীতু খেজের কাশিমবাজারের মস্তান হয়ে ওঠে! ভয়ে আড়তের মহাজন কিছুদিন খেজেরকে টাকাও পাঠান। সেটা কিছুদিন পর অবশ্য বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মস্তান হিসেবে খেজেরের আরও নাম ছড়ায়। জাহেরা কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারে না। সে ভাবে, তাহলে কি সব মস্তানগুলোই তার স্বামী খেজের আলির মতো হয়! শুধু খেজের আলিতেই থেমে থাকে না ব্যাপারটা। গাঁয়ের চুটকে-পুটকে মস্তানরাও খেজেরের নাম ভাঙিয়ে তোলা তুলতে থাকে। টাকার বিনিময়ে নানান ঝামেলার সালিশি করে। খেজের সেসব কিছুই টের পায় না। সে শুধু ভাবে, পাটের আড়তের কাজটাও গেল! এবার আর কী করে খাবে? অভাব-অনটন নিয়ে বউ-স্বামীতে টুকঝুক লেগে থাকে। এমন সময় খবরটা কানে আসে জাহেরার। ছুটে যায় মোড়ে। লোকজনের ভিড়! সবাই একেবারে হুমড়িয়ে দেখছে খবরের কাগজটা। পঞ্চায়েত ভোটের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছে খবরের কাগজে। আর সেখানে হিতানপুর গ্রামে প্রার্থী হিসেবে নাম বেরিয়েছে খেজের আলির! খেজের আলির নাম একেবারে শিরোনামে! তাও আবার যে সে দলের প্রার্থী নয়, একেবারে শাসক দলের প্রার্থী!
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








