স্বপন পাণ্ডা
মারী মারী মহামারী দেবী নমস্তে
দু’হাজার কুড়ি সালের বোধহয় মে মাসের এক সকালবেলায়, শহরের দক্ষিণপাড়া বাজারে অজ্ঞাতনামা কোন্ লেখকের হ্যান্ডবিল, কে বা কারা যেন ‘হাতে হাতে বিলি করছিল, জানা যায় না। লেখক নিজেই কি এগুলি গোপন রাজনৈতিক ইস্তাহারের মতো ছড়িয়ে দিচ্ছিল, তাও জানা যায় না। শয়ে শয়ে হ্যান্ডবিল বাজারের ধুলোয় লুটোয়, কেউ ছোঁয় না। কাগজেও যে মারীবিষ; খবর কাগজই লোকে ভয়ে ঘরে ঢোকায় না, কার হাতে কী আছে খোদা মালুম। কিছু লোক তবু থেকেই যায়, ‘দেখি শালার কাগজে কী লিখেছে, কিসের হ্যান্ডবিল’ – এইভাবেই এটি আমাদিগের হস্তগত হয়। টেঁসে যদি না যাই, একদিন রসিয়ে রসিয়ে শেষ একখান সিটি বুলেটিন তো লিখতে হতে পারে ভেবে, অ্যাদ্দিন ফিনফিনে হলদে এই কাগজ খানকতক গুছিয়ে-টুছিয়ে রাখা। তো এই তার একখান নমুনা:
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
হে দেবী করোনা!
তব হস্তে কাঁটাযুক্ত মুদ্গর, তুমি বড় বড় মানুষদিগের দেশে দেশে যথা ইচ্ছা বিচরণ করো, ধ্বংস করো, উহারা ভোগী, উহারা পাপী। উহাদের ধ্বংসই বিধেয়।
কিন্তু মা!
হামরা গরীব দীনদুখী ভারতবাসী আছি। পশু-মাংস রপ্তানিতে বিশ্বে আমরা ফার্স্ট; তবে নিজেরা ঠিক আমাদের গোমাতার মতোই নিরিমিষ।
বাদুড় কুকুর সোনা ব্যাঙ কুনো ব্যাঙ আরশোলা ইঁদুর ছুঁচো ইত্যাদি ভক্ষণের চিন্তামাত্র করি নাই। আমরা কেবল ডাইল ভাত পুঁই পলতা কলমি নটে শুশনি সজনে ইত্যাদি শাক, রুটি পরাঠা ঢোকলা পোহা ইডলি দোসা অলাবু করলা ভিন্ডি বৈতাল খাইয়া থাকি।
আমাদিগের আশ্রয় – তাগা তাবিজ দোয়া দরুদ মাদুলি জলপড়া পাতাপড়া ঝাড়িফুঁক …
বনে-জঙ্গলে লোকালয়ে শ্মাশানে প্রাপ্ত শিকড়-বাকড় এবং অবশ্যই নিশিন্দার রস। এ-রসে নিরাময় হয় না এমন রোগ সম্ভবেই না।
এদানিং মহামারীকালে গোমূত্র গোময় আর আত্মমূত্র পানের মহিমাও জনগণ কিঞ্চিৎ উপলব্ধি করিতে আছে।
জাতি হিসাবে আমরা মা, বড় চরিত্রবান। পুত্রের জন্য শুধু আমরা ভার্যা করি, তার বাইরে খালি মাতৃবৎ পরদারেষু; মা-বহিনদিগে নজর দিই না, নজর কদাপি যদি পিছলে পিছলে যায়, তাহলে সে নিশ্চিত আমাদের তির্যক দৃষ্টিদোষ। আমাদের নজর কেবল মাতৃপদ। সবকিছুতে মধুর শব্দ আমাদিগের ‘মাগো’ ‘আম্মাগো’ ইত্যাদি। সংযত করো মা, এই লৌহ মুদ্গরের কাঁটা হত্যে রক্ষা করো মা, আম্মাগো, হে করোনাম্মা!
আমাদিগের দশ মহাবিদ্যা, কালী তারা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী ভৈরবী ছিন্নমস্তা বিদ্যা ধূমাবতী বগলা মাতঙ্গী; তুমি করোনাম্মা, আমাদের মহাবিদ্যা একাদশ। তোমার তরে মা একটি স্তব রচনা করেছি, তুমি গ্রহণ করো:
স্তবকুসুমাঞ্জলি
জয় জয় দেবী চরাচরসারে
কদম্বকুচযুগ কণ্টকহারে
মুদ্গর উদ্যত দক্ষিণহস্তে
মারী মারী মহামারী দেবী নমস্তে (অজ্ঞাতনামা)
করোনার প্রথম ঢেউ তখন মুগুর পিটিয়ে পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে। শহর জুড়ে আতঙ্ক। তার মধ্যেই উত্তরপাড়া বাজার থেকে খবর আসে, এই স্তবটি যে রচেছিল, সে নাকি মরে গেছে। পুব পাড়া বললে, মরবে কেন, লোকটি দিব্য টিকে আছে। এখনও নাকি এমন কত হ্যান্ডবিল কবিতা গান সে লিখেই চলেছে। সরকার খুশি। ভাবছে, তাকে কী একটা পুরস্কারও নাকি দেবে। লেখক জীবিত, এ দাবি সমর্থন করলেও, পশ্চিমপাড়া, উত্তরকে পাল্টা শোনাল, লোকটি মোটেও সুবিধের নয়, নানা সময় শহরের নানা দিকে সে আজব সব কথিকা কবিতা ছড়া মজার লেখা নিজেই ছাপিয়ে ছাপিয়ে বিলি করে ঠিকই, তবে সরকার কিছুতেই তাকে পুরস্কার দেবে না। তুমি হাটে-বাজারে মহান সিটি গবমেন্টের নিন্দেমন্দ করে বেড়াবে, লেখায় লেখায় চিমটি কাটবে নেতাদের ইশারা করে থুতকুড়ি ছেটাবে, আর সরকার তোমায় চড়াবে ফুলের মালা? এ কখনও হয় নাকি? হয় না হয় না। শোনা গেছে, সিটি ওয়েস্ট ওয়েলফেয়ার কমিটি নাকি লোকটিকে চিহ্নিত করার জন্য হুলিয়া জারি করেছে। ধরতে পারলেই প্রথমে খুচরো গাঁজা অস্তর এই সব মামলা ঠেসে দিয়ে তারপর মোক্ষম রাষ্ট্রবিরোধী আইনে তাকে চেপে ধরে সবক শেখাবেই শেখাবে।
আমরা দক্ষিণপাড়ার লোক, নানা দিকের ভাসা ভাসা কথা শুনি। ভালো যে বুঝব, তেমন এলেম তো নেই। ভয়ে ভয়ে একদিন হ্যান্ডবিলটি আমাদের প্রিয় মাস্টারদাকে দেখাবার জন্য নিয়ে যাই। প্রথম লকডাউনের পর এই আমাদের সাক্ষাৎ। করোনায় শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনেই হাপিস। নিজেও আই ডি হাসপাতালে টানা একমাসের বেশি এই যায় এই যায় অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে ধুঁকতে ধুঁকতে। বুকে দম নেই। বিড়ি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, এখন শুধু দুবেলা চাইনিজ যন্ত্রে মুখ-নাক ঢুকিয়ে ভেপার টানে। বলল, বুকের ছবি পেটের ছবি মাথার ছবি পিঠের ছবি, ছবির পর ছবি তুলছে আর ডাক্তাদের মুখ ঝুলে পড়ছে, শুরু হল বিস্তর ওষুধ ইঞ্জেকশন বুকে দম দেবার যন্ত্র, সে যে কি বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা, যার হয়েছে সে বুঝবে, আর কেউ না। পাপাইদা বলল, তারপর? তারপর আর কিছু তো মনে নেই রে ভাই। কবে কবে পনের না ষোল দিন কাবার, পরে শুনলাম, আমি নাকি কোমায় … একদিন রাত্তিরে, রাত্তির না দিন অবশ্য ঠিক বুঝতে পারিনি, নীল আলো, পা থেকে মাথা সাদা আলখাল্লা ঢাকা, মুখে পট্টি একটা মেয়ে, তার দস্তানা-হাতটি আমার মাথায় রেখে বলল, শুনছেন? বোধহয় বললাম, হুঁ। ও বলল আশ্চর্য কথা, আপনি বেঁচে গেছেন। এমন কেন বলছে, কী হয়েছে আমার সে-সব চিন্তার ক্ষমতা তখন তো নেই, কোনো রকমে দম নিয়ে নিয়ে বললাম, আমি কি সত্যি মরেই যাচ্ছিলাম … তার দস্তানা হাত দিয়ে সে আমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলতে থাকে, কাঁনছেন কেন, আহা কাঁনবেন না। আমরা তো আছি। তার হাতের ঢলঢলে শাঁখা-পলা দস্তানা আর ওই নরম নরম কথায় আমি কাঁদছিলাম। ওষুধ দিল, আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। তোদের সঙ্গে ফের দেখা হবে, নিজের বাড়িতে বৌ-মেয়ের কাছে আবার ফিরতে পারব, এমন ভরসা আমার ছিল না রে। ঠাকুরের দয়া … এমন একটা করুণ সিনেও পল্টুর ফুট কাটা থামানো গেল না, চোখে ঝিলিক তুলে বললে, তুমি তো ঠাকুর মানতে না মাস্টারদা, প্রত্যেক পুজোর সময় চাঁদার খাতা দেখালেই বলতে, একদম মানি না, একদম না। চাঁদা না দিলে পাড়ায় হ্যাঙ্গাম করবি, টিউশন পড়তে আসা ছোট মেয়েগুলোর পেছনে লাগবি, তাই; নইলে … আরো বলতে, পুজো-আচ্চা ফাচ্চা নয়, ঠিক আছে উৎসবের জন্য দিচ্ছি … মাস্টার বললে, এর জবাব এখন দিচ্ছি না, কাহিল আছি, যা ভাগ তোরা, আমার ওষুধ খাবার সময় হল। বললাম, হ্যান্ডবিল নিয়ে কিছু … উনি দেখল নেড়ে চেড়ে পড়ল, বলল, আমি বলার কে ? যার ইচ্ছে সে লিখেছে, যার ইচ্ছে পড়বে, না পড়বে তো দলা পাকিয়ে রাস্তার নর্দমায় ছুঁড়ে দেবে, তোদের এত চুলকানি কিসের র্যা? এই তো গুরু ফর্মে ফিরছে পাপাইদা, আজ না হয় কুড়ি বলে পাঁচ রান, কালকেই ফিফটি হাঁকাবে, দু চারদিন পরে সেঞ্চুরি। চলো দত্তদাকে বরং ধরা যাক।
আমরা সব যোগেনের ছবি।
ব্যাঁকা হাত ব্যাঁকা মুখ তোবড়া গাল লে ভুক্কড়…
করোনা সবেমাত্র চীন থেকে ইতালি না কোন দেশ হয়ে যেন ভারতের আকাশে ঢুকে পড়েছে। তার বিষ-কালো ডানাটা যেই মেলল, কদিনের মধ্যেই ফৌত এক হাজার! সারা দুনিয়ায় তখন বোধহয় দু লাখ ছাড়িয়ে মৃতেরা তড়বড়িয়ে ছুটছে তিন লাখের দিকে। আমাদের এই শহরে তখন সবে কুড়ি বা একুশ। চাপা আতঙ্ক। লক ডাউন। বড় রাস্তা, ছোট রাস্তা, গলি, তস্য গলি সব ঢ্যারা কাটা, রেড জোন। এলাকার দোকান বাজার একটু খোলে, ফের বন্ধ হয়ে যায়। চায়ের ঠেক মালের দোকান, শপিং মল ধোপা নাপিত বিউটি পার্লার বেশ্যাগলি ইট বালি সিমেন্ট সব বন্ধ। পকেট ফাঁকা। লোকে বলাবলি করছে, গবমেন্ট সংখ্যায় চুপি করছে, মরেছে আদতে ঢের বেশি। পার্টি অফিসে বাপিদা এদিক ওদিক তাকিয়ে পট্টি একটু তুলে বিড়ি টানতে টানতে বলল, চুপ; ওপর থেকে অর্ডার আছে স্পিকটি নট। কিচ্ছু জানতে চাইবি না। মনে রাখবি, সরকার যেটুকু জানাবে সেইটেই ট্রু, বাকি সব ফল্স। তোদের মত হাভাতেগুলোর জন্য সকাল-বিকেল অফিস খুলছি, মাগনায় চা-বিস্কুট পাচ্ছিস। হেবি রিস্ক নিয়ে মাসীর দোকান ঘন্টা দুই খুলিয়েছি। গবমেন্ট কিন্তু পই পই করে বলে দিয়েছে, ঝাঁপ বন্ধ। লকডাউন উঠলে আমরা জনগণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ব, এখন না। শকুনের মতো শালা চ্যানেলগুলো গলিতে গলিতে ক্যামেরা কাঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খবর হয়ে যাবি সব। মুখে পট্টি, মাথায় ফেট্টি; ভ্যালভ্যাল করে চার দিকে তাকাই, টাকা কোথায় টাকা? টাকার সোর্স সব খটখটে। পাপাইদা বলল, এখন হাত পাতলেও ঝামেলা, কথা বলতে গেলেও ঝামেলা; গুয়ের পোকার মতো করোনার বিষপোকা রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছে, হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে, লোকের গায়ে এঁটুলির মতো সেঁটে আছে, সামনে আর একটা লোক এলেই ব্যস, তার কাঁধে গিয়ে চাপবে, সেখান থেকে তার পুরো ফ্যামিলি, সেখান থেকে পাড়া ফ্ল্যাটবাড়ি সব ফিনিশ! বাপের জন্মে এমন খতরনাক জিনিস দেখিওনি, শুনিওনি। সবাই জানেন, আমাদের পল্টু লেখাপড়া জানা ছেলে। ও বলছিল, একশ বছর আগে কোন্ দেশে কী মহামারী এসেছিল, কত কত লোক মরেছিল, এই মহামারী আর সেই মহামারীর তুলনা … বাপীদা এক ধমক দেয়, চুপ বে, বকর বকর করবি না একদম; মাস্ক পরে নে বলছি, মাস্ক খুলে মহামারি বেত্তান্ত কপচাচ্ছে, নিজেও ছবি হয়ে যাবি আমাদেরও দেখছি ছবি করে ছাড়বি … তারপর তো করোনার উদ্দণ্ড নেত্য, আমাদের শহরেই দুশো ছাড়িয়ে গেল!
লোকে বলে, একসময় আমরাই ছিলাম এ শহরের শনি-অবতার, কেউ কেউ আবার ঘেন্না করে বলত, বিষ্ণুর বাইক-অবতার। পুবে পশ্চিমে দক্ষিণে উত্তরে কাঁহা কাঁহা না ছুটে গেছি। আমাদের গর্জমান বাইকের ধোঁয়ায় নাকি বুড়োরা কেশে কেশে হিক্কা তুলত, বাচ্চাদের স্বপ্ন-দেয়ালা চটকে দিয়ে চলে যেতাম আমরা, কোন্ পাড়ায় ঠিক মনে নেই, মেয়েরা বলাবলি করছে শুনেছিলাম, পিউয়ের ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ করে দে, এই হারামিরা পাড়ায় ঢুকেছে মানে জানবি সব পোয়াতির পেট খসে পড়বে! আহা কী দিন ছিল, কী ভয়ই না পেত পাব্লিক! আর আজ কেউ শালা গ্রাহ্যিই করছে না। আমাদের যে হাতে মেশিন চমকাত, সে হাত এখন গুটিয়ে বেঁকিয়ে ভয়ে ভয়ে পকেটে চালান করে দিয়েছি।
রামবাগানের দত্তদের লতায়-পাতায় কী যেন হয় আমাদের দত্তদা। উনি বলল, আমরা নাকি সব যোগেনের ছবি। ওর ছবিতে নাকি সব ব্যাঁকা হাত ব্যাঁকা মুখ তোবড়া গাল লে ভুক্কড় লোকজন। জানতে চাই, কে যোগেন, যোগেনটা কে? দত্তদা বললে, সে মস্ত আর্টিস্ট, বেলেত ফেরতা। আমার বন্ধু। বিলেতে পাক্কা এক মাস ও আমার কাছেই তো ছিল। এসব করোনা-ফরোনা পাতি জিনিস, কত কী দেখেছি সেসব বলতে গেলে হাঁ হয়ে যাবি; মাস্ক খুলে বিরাশি বছরের দত্তদা আমাদের চেয়েও বেশি ছোকরা হয়ে ফট করে মাস্ক নামিয়ে ফস করে গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে মহাকালী মন্দিরের বাইরের বেঞ্চে জমিয়ে গল্প ফেঁদে বসতেই, আমরা কয়েকজন ফটাফট মাস্ক পরে নিয়ে স্যানিটাইজারের কচি শিশি বার করে দত্তদার দিকে বাড়াই, দাদা সিগারেট খাচ্ছেন, হাতটা একটু … ওসব তোদের জন্য, আমি ইউজ করি না। বাড়িতে ঝামেলা, মাস্ক নিয়ে বেরোতেই হয়, রাস্তায় নামলেই খুলে ফেলি, মরতে ভয় পাইনাক। ভয় কিসের? জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে, আরে কাদের সামনে বলছি এসব … পল্টু চট করে বলে দেয়, এটা মাইকেল, দত্তদা; ক্লাস এইটে ছিল। দত্তদা খুশ্। এবার আমরা হ্যান্ডবিল বার করে মেলে ধরি। পড়ে-টড়ে দত্তদা সিগ্রেটের টুকরো চটির তলায় পিষে দিয়ে বললে, অ, তা বাবা তোরা কি তাহলে করোনা আম্মার পুজো-মোচ্ছবের তালে আছিস নাকি? সাবধান। পুলিস ধরবে। পাপাইদা বলল, বড়বাবুকেই তো আমরা কালীপুজো শনিপুজো সবতাতেই চিফ গেস্ট করি, ও কোনো পব্লেম না। এবার রাজি হবে না, দেখিস, তোদের সিটি গভর্ণমেন্ট একেবারে হুড়কো ভরে দেবে। কেন দাদা, একটা নতুন মা তো পাচ্ছি, যা ক্যাচাল চলছে, এ-গলি সে-গলি এ-পাড়া ও-পাড়া, শহরের হেন জায়গা নেই লোক মরছে না, সরকার বলছে মাত্র শত খানেক ঠিকঠাক, বাকি একশ পঁয়তাল্লিশ নাকি গোলমেলে মড়া। ধাপায় গোবিন্দপুরে যেখানে পারছে পুঁতে দিচ্ছে জ্বালিয়ে দিচ্ছে, মড়ারা নিজের বাড়ির লোকজনও দেখতে পাচ্ছে না, তাই একটা পুজো একটু শান্তি …. …. ধুত্তোর শান্তি, শান্তি কোথায় পাবি, ওরে শান্তি আছে কোথায়? সব চীন আর আমেরিকার খেলা, আমরা নস্যি নস্যি। তবে হ্যান্ডবিলটি তোর খাসা, যে লিখেছে, বলতেই হবে এলেমদার লোক …
দত্তদা বাজারে না কোথায় চলে যেতেই, আমরা উত্তর দক্ষিণের মেন রাস্তার দিকে হাঁটা লাগাই এবং যেতে যেতে পাপাইদাকে চেপে ধরি, হঠাৎ পুজোর কথা পাড়লে কেন, মতলব কী? সত্যি সত্যি পুজো লাগাবে নাকি? পাপাইদা বলল, দ্যাখ, হাত একদম খালি, একটা পুজো-আচ্চার হাওয়া তুললে, লোকজন ভয়ে ভয়ে আছে তো, চাঁদা-ফাঁদা এখন না করবে না, পার্টি তো ডাইরেক্ট এসব করতে বলবে না, থানাও পুরো ঘেঁটে, দেখা যাক … চল বড়দার কাছে যাই … কিন্তু মেছোহাটার পেছনে বড়দার আপিসে ইয়াব্বড় তালা, অগত্যা ফিরে আসি। আর একদিন …
করোনা বিষয়ে রেডিও ধানিলঙ্কা: আর না করোনা – বিপদে মোরে রক্ষা করো …
হ্যালো ফ্রেন্ডস্ কেমন আছো সব্বাই ভালো তো! তোমাদের ভীষণ ভীষণ প্রিয়, আমি রেডিও ধানি লঙ্কা থেকে জকি নীল বলছি। আমার সঙ্গে আছে মেঘলা আকাশ …। প্রথমে পেশ করছি করোনার আপডেট। শুনে যেন কেউ ভয় পেয়ো না:
মাননীয় সিটি গভর্ণমেন্ট পই পই করে বলে দিয়েছেন, নো ফিয়ার মাই ডিয়ার, করোনাকে আমরা জয় করবই। বিশ্বের তাবড় তাবড় সায়েন্টিস্টরা দিন-রাত এক করে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য প্রাণপাত করছেন, হামারা ভারতও পিছিয়ে নেই। মহামন্ত্রী সাবধান করে নিয়েছেন, কিছু দিন, মাঝে কিছু দিন সাবধানে থাকতে হবে, নো টেনশন, কেউ ভয়ভীত্ হবেন না। তিনি রামায়ণের লক্ষ্মণের গন্ডীর কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এই গণ্ডী হল, সোস্যাল ডিসট্যানসিং, দূরে দূরে থাকো, গন্ডীর বাইরে যেও না, অগর কোই অ্যায়সা কিয়া তো করোনা-রাবণ খিঁচকে লে যায়গী। ইয়াদ রখনা …
কবি বলেছেন, ইতিহাসে মাঝে মাঝে শীত অসারতা নেমে আসে। শীত চলে গিয়ে একদিন বসন্ত আসবেই। আসবে না কি ফ্রেন্ডস্ ? তোমরা কী বলো?
সো আমাদের ওয়েট করতে হবে ফ্রেন্ডস্। এবার আপডেট জানাচ্ছি, এক মিনিট প্লিজ। রেডি? মেঘলা আকাশ, এবার তুমি আমাদের শ্রোতাবন্ধুদের একটু করোনার খবরাখবর জানিয়ে দাও। ও সিওর, হ্যালো ফ্রেন্ডস্, সব সময় মাস্ক পরে থাকুন, স্যানিটাইজার হাতে মাখুন, বাইরে অপ্রয়োজনে একদম বেরোবেন না, বেরোলে ফিরেই হালকা গরম জলে ডেটল মিশিয়ে চান করে নিন, সব জামাকাপড় ভালো করে কেচে নিন। জ্বর বুঝলেই ফিভার ক্লিনিকে চলে যান, নয়তো সিটি গভর্ণমেন্ট-এর হেল্প লাইন নম্বরে ফোন করুন। ইগনোর করবেন না একদম।
আজকের খারাপ খবর, সারা পৃথিবীতে ইতোমধ্যে করোনার শিকার হয়েছেন, তিন লাখ সতেরো হাজার নশো নিরানব্বই। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু আমেরিকায়, একানব্বই হাজারেরও বেশি মানুষ ওখানে প্রাণ হারিয়েছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত ক্ষিপ্ত, বিচলিত। তাঁর মতে এর জন্য দায়ী একমাত্র চীন। সময় হলে তাদের কড়া সবক শেখাবেন তিনি। ওদিকে চীন এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানিয়েছে, করোনা এমন কিছু ব্যাপার নয়, মাত্র চল্লিশ পয়সার অ্যান্টাসিড আমরা আবিষ্কার করেছি, ওটা খান, তিনবার করে গরম লিকার চা পান করুন এবং আমাদের আবিষ্কৃত যন্ত্রে দুবার করে ভেপার নিন। করোনা মিলিয়ে যাবে।
থ্যাংকু মেঘলা, এবার আমাদের সিটি ও পুরো কান্ট্রির সিনারিও আমি জানাচ্ছি। ভারতে আজ পর্যন্ত করোনার শিকার তিন হাজার পাঁ চ শো পঞ্চান্ন! ওয়েল, আর আমাদের শহরে করোনার বলি হয়েছেন দুশো পঁয়তাল্লিশ। হাসপাতালে বেড নেই অক্সিজেন নেই নো ডক্টর নো মেডিসিন, বহু ডাক্তার নার্স ইতোমধ্যেই নিজেরাই করোনার শিকার হয়েছেন, তাঁরাও আতঙ্কিত। হরিবল্ সিচুয়েশন! সরকার বলেছে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য গ্রান্ট করা হচ্ছে বিশেষ ভাতা। দেশের মহামন্ত্রী আজ অনেকদিন পর ভার্চুয়াল থেকে রিয়াল হয়ে নিজের বাসভবনে মুখে রঙিন গামোসা বেঁধে মন্ত্রীদের সঙ্গে মিটিং করেছেন, ডাক্তার ও সরকারী জ্যোতিষীদের পরামর্শে তাঁদের পারস্পরিক দূরত্ব রাখা হয়েছিল টেন ফিট অ্যান্ড একটা ব্যাপার দেখ মেঘলা, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কিন্তু একানব্বই হাজার লোক মরে গেলেও মুখে মাস্ক পরছেন না। সাহস আছে বলতে হবে। দ্যাখো নীল, উনি বরাব্বর হেব্বি ডাকাবুকো, আমার খুব ফেবারিট। করোনাকে তুড়ি মেরে সব মিটিং করছেন মাস্ক না পরে, গটগট করে হাঁটছেন, ডিসট্যান্স মেনটেন করার বালাই নেই। সাংবাদিক বোধহয় জানতে চেয়েছিল, আমেরিকায় কত মৃত্যু আশা করছেন, হাও মেনি ডেথ য়ু এক্সপেক্ট স্যার? ওঁর স্মার্ট অ্যানসার, পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার। সেটা আজ একানব্বই ছাড়িয়ে গেল, লোকে ওখানে ওকে বলছে, এই শতাব্দীর সেরা জোকার পেসিডেন্ট। উনি কিন্তু অবিচল, টেরিফিক লোক …
আপাতত নিজের দেশে নিজের শহরে ফিরে আসি। কামরূপ কামাখ্যা কালীঘাট তারাপীঠ তিরুপতি মাদুরাই কাশী বিশ্বনাথ বৃন্দাবনের রাধাগোবিন্দ মন্দির, সব এখনো অনির্দিষ্ট কাল থাকবে। বন্ধ থাকবে সমস্ত মসজিদ ও গির্জা। ট্রেন বাস কিচ্ছুটি এখন চলবে না। চলবে শুধু অ্যাম্বুলেন্স আর মৃতদেহ সৎকারের গাড়ি। আমাদের সিটি চিফ মিনিস্টার অবশ্য কাল থেকে ফুলের বাজার মিষ্টির দোকান সব খুলে দিয়েছেন, সকালে তিন ঘন্টার মধ্যে সব বেচা-কেনা সারতে হবে। পরে সময় বাড়বে। আমরা মিনিস্টারের অডিও বার্তা শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরছি, সাংবাদিকদের আজ তিনি বলেন –
আমি কমিটি করে দিয়েছি, করোনার ডেথ নিয়ে ওরাই সব বলবে। অনেক ডাক্তার খুব অ্যান্টি কাজ করছে, ভেরি ব্যাড। যা ইচ্ছে লিখে দিচ্ছে। এটা মানছি না। আরে কারো হার্ট ফাংশান করছে না, মরে গেল, লিখে দিল করোনা। কেউ নিউমোনিয়ায় টেঁসে গেল, লিখে দিল করোনা, কারো লাংসের পব্লেম, মরে গেল, অমনি করোনা করোনা করোনা … এসব কল্লে হবে? রাবিশ। সব ভুল হিসেব দিচ্ছে। এবার কমিটি করে দিলাম। আর ভুলভাল হিসেব মানবো না। দুশো পঁয়তাল্লিশটা ডেথ হয়েছে, ঠিক; তবে এদের অনেকের বডি ফাংশানে গোলমাল ছিল। অ্যাকচুয়ালি করোনায় এক-দেড়শোর বেশি ডেথ না। মিষ্টির দোকান ফুলের বাজার সব খুলে দিলাম, মানুষ খাবে কী? এগুলোও তো দেখতে হবে। করোনার ভয়ে হাত গুটিয়ে গরিব মানুষ কদ্দিন বসে থাকবে। আমরা খুব মানবিক। সেন্ট্রাল টাকা দিচ্ছে না, কখনও কোনো ভালো কাজে দেয় না। আমরা তবু কাজ চালিয়ে যাবো। করোনাকে ভয় পাবেন না। বাড়িতে থাকুন। সরকার আপনাদের পাশে অলয়েজ আছে থাকবে, নো প্যানিক।
কী বললেন ? রেশন পাচ্ছে না? আমরা মাসে ৫ কেজি করে চাল ৬ মাস ফ্রি করে দিয়েছি। ৯০ পারসেন্ট পাচ্ছে, ১০ পারসেন্ট পাচ্ছে না। দু এক জায়গায় গোলমাল হয়েছে। আমি এজন্য ফুড সেক্রেটারিকে সরিয়ে দিয়েছি। কাউন্সিলাররা রেশন দোকান থেকে চাল গম তুলে নিয়ে নিজেরা দান খয়রাতের ছবি ছাপছেন হাসি হাসি মুখে ? ওসব চলবে না। আমি অ্যালাও করছি না। যারা করবে পানিশ করবো।
বিরোধীরা গেল গেল করে ভয় দেখাচ্ছে নানা জায়গায় ব্যাগড়া দিচ্ছে। এদের তো ওই-ই কাজ। আরে বাবা এখন পলিটিকসের সময় নয়, মানুষের পাশে থাকুন। সারা বছর পড়ে আছে যত ইচ্ছে করবেন পলিটিকস। নমস্কার …
তো ফ্রেন্ডস্ এই ছিল আজবের করোনা আপডেট। আগামীকাল ঠিক এই সময় শুনতে ভুলবেন না, নীল ও মেঘলা আকাশের ধারাবাহিক রেডিও আলোচনা: আর না করোনা … বিশ্বকবির গান দিয়ে শেষ করছি আজকের অনুষ্ঠান। শুভরাত্রি …. বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা-আ/বিপদে আমি না যেন করি ভয় …
মেছোহাটার কুলপতি নস্করের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা
রেডিও বন্ধ করে বড়মা বলল, শুনলি?
পল্টু বলল, দুনিয়া জুড়ে এমন মহামারী, লাখ লাখ লোক মরে গেল, আরও কত লাখ, কত কোটি মরবে কে জানে, এরা এমন ন্যাকা ন্যাকা বাংলা আর ইংরেজি পাঞ্চ করে রগড় করে এসব বলছে কেন বড়দা?
ও’রম না বললে লোকে শুনবে না রে পাগলা, বেওসা … যাকগে চিফ মিনিস্টার কী বললেন শুনলি কিনা তাই বল?
শুনলাম। গা-হাত-পা তো ঠাণ্ডা মেরে গেল বড়দা, পাপাই একটু হতাশ হতাশ … বড়দা খৈনি ডলতে লাগল আর কুতকুতে লাল চোখে আমাদের মাপতে লাগল … এসময় সে কথা বলবে না।
এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, মেছোহাটার বড়দা মানে বুঝতে হবে কুলপতি নস্কর, শর্টে কুলু নস্কর; তস্য ভাই বুলু নস্কর হল গিয়ে আমাদের দক্ষিণপাড়ার বাঁ দিগর, অর্থাৎ এই খালধার মেছোহাটা সুতোহাটা চিংড়িঘাটা ইত্যাদি মৌজার এমএলএ। আমরা বলি, এমএএল। তবে বুলুদা এমএলএ হলে কী হবে, কুলুদার হাতে আসল পাওয়ার, ও হল গিয়ে এলেকার পার্টি পেসিডেন, পল্টু বলে, কুলুদা হল গিয়ে তোর মণ্ডল মহা সভাপতি। এতদঞ্চলে যে কুড়ি-বাইশটি মাছের ঘেরি, তার কন্ট্রোল বড়দার হাতে। একসময় আমরাও এসব ঘেরি-ফেরি পাহারা দিয়েছি। পাহারা দেওয়া মানে, না, ঠিক পাহারা-ফাহারা কিছু না; রাতের দিকে বাইক বাহিনি নিয়ে শুধু টহল দিতাম। কোথাও একটু চমকে দিলাম, কাউকে দু-চার ঘা দিয়ে শীতের রাতে ঘেরির জলে ঠেলে দিলাম, কোথাও একটু অল্প মারদাঙ্গা, কারও ঘেরিতে হালকা বিষ ঢেলে তাকে একটু কুলুদার ভাষায় ‘লোকশিক্ষে’ দিলাম, কাউকে তুলে পার্টি অফিসে আটক করে তার কাপড়ে-চোপড়ে করিয়ে সকালে ছেড়ে দিলাম, এইসব ছোট-মোট কাজ আর কি। এক ঘেরির মালিক কিছুতেই কুলুদার আন্ডারে আসতে চাইছে না, কী করা যায়! তো আমরা শহরের অন্য এলেকায় মার্ডার হয়ে যাওয়া একটা ছেলেকে তুলে এনে ওর ঘেরিতে ছুঁড়ে দিলাম। এখানেই আমাদের ঘেরি-জীবন শেষ। অনেক কেস-ফেস হল, পার্টির উকিল বললে, এক বচ্ছর আর মেছোহাটা ঢুকবি না, আমি সব সাল্টে দেব। ছোড়দার নির্দেশে তখন থেকেই আমরা নতুন টাউন এলাকায় বাপিদার আন্ডারে। এখানেও কাজ বলতে ওই মারদাঙ্গা, সিন্ডিকেট বানানো, দরকার পড়লে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, অফিস-ফফিস গুঁড়িয়ে দিয়ে ওখানে গাছ লাগিয়ে ছবি তোলা। কাগজে টিভিতে সেসব ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছেলেরা আছে, পল্টু ভোডা গদাই পাবনা … গবমেন্ট বলল, হেথায় কোনো সিন্ডিকেট নাই। আমরা অ্যান্টি সিন্ডিকেট। এই দেখুন বিরোধীদের তৈরি করা সব ছাতার মাথা সিন্ডিকেট তুলে দিয়ে আমাদের ছেলেরা কেমন গ্রিন রেভল্যুশান ছড়িয়ে দিয়েছে দেখুন। ততদিনে ভেতর দিকে লুকিয়ে ফের নতুন সিন্ডিকেট আমরা তৈরি করে ফেলি।
আমরা দুগ্গা থেকে শনি সব পুজো লাগাই, বাবা লোকনাথের ছেলেমেয়েদের জন্য রাত জেগে গুড়-বাতাসা-ছোলা ভেজা-সরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, শ্রাবণ মাসে বাবা তারকনাথের জন্য করি, রমজান মাস জুড়ে এ-পাড়া ও-পাড়ায় এ-ক্লাব ও ক্লাবে ইফতার অ্যারেঞ্জ করি, ঈদে খুব কোলাকুলিও করি, আর বড়দিন এলে তো পোয়া বারো … বুলুদা বাপিদা কুলুদা অনেক কাজ দেয়, এই ধরো কে বড় রাস্তার ধারে আলো দেবে, সাউন্ড দেবে কে, কে ডেকরেট করবে, স্টল ভাড়া আদায় থেকে বহুত কাজ, বারো মাস ছত্রিশ পার্বণ আমাদের লেগেই আছে। অবশ্য মাঝে মাঝে ঝ্যামেলা-ঝঞ্ঝাট বাধলে খুন-খারাবার জন্য মেছোহাটায় আমাদের আসতেই হয়।
খৈনির নেশা একটু জমতেই ঢুলু ঢুলু চোখে বড়দা বলল, সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না, লাগা লাগা লাগা, জয় করোনা মাঈ কি …. আমরা নড়ে চড়ে বসি। আজ আমরা ফুল টিম। ভোডাফোন বুক পকেট থেকে বার করে একটা হলদে মতো কাগজ বড়দাকে দেয়, মন দিয়ে পড়ে বড়দা ওটা পাপাইদাকে ধরিয়ে বলে, রামঠাকুরকে বলে দে, সামনের অমাবস্যায় মায়ের পুজো, এই পদ্ধতি মেনে পুজো করব, মালটা কোথায় পেলি রে ভোডা? ভোডা যা বলল সে এক বিশাল কাহিনি। গুছিয়ে ছোট করে বলতে গেলে লিখতে হয়: সুদীর্ঘকাল যাবৎ শহরের উত্তরপাড়া বাজারের পাশে সততার সঙ্গে তার ছোট মেসোমশায় বাংলা মদ্য বিক্রয় করেন। পারিবারিক ব্যবসা। লকডাউনে প্রথম সপ্তাহ ঝাঁপ ফেলে দিতে হয়েছিল। তবে সাটার নামার আগেই কয়েক পেটি দ্রব্য তিনি শুণ্ডিপল্লীতে নিজগৃহে গুদামজাত করেন এই মহতী উদ্দেশে যে, এমন অনেক মাননীয় গ্রাহক আছেন, যাঁদের নাকি ডাক্তারের নির্দেশে প্রত্যহ শোবার আগে ঔষধ-জ্ঞানে কিঞ্চিৎ পরিমাণ মদ্য (বিলাইতি উত্তম। আকালে বাংলাও অনুমোদিত) গ্রহণ না করলে হৃদযন্ত্র অচল হয়ে যেতে পারে, কারও কারও নাকি লিভার-ফাংশানে গোলমাল … কারও নাকি ডায়াবিটিসে … কারও নাকি ব্রেন স্ট্রোক … সে যাই হোক, অনেক নিরুপায়ের উপায় হিসেবে এই গোপন মদ্যভাণ্ডারটি গড়ে তোলেন মেসোমশায়। লকডাউনের দশম রাত্রে মুখে মাস্ক হাতে দস্তানা মাথায় টুপি একদল দুষ্ট এসে দরজায় কড়া নাড়ে। অথচ তখন সরকারের নির্দেশ মোতাবেক কারও বাড়িতে কড়া নাড়া, ঘণ্টি বাজানো সর্বৈব গর্হিত, সরকার কিন্তু বলে দিয়েছিল, এমনটি যারা করবে, তারা মানুষের শত্রু, তারা বিদেশি করোনা-চক্রের দালাল, ন কিসিকো ঘর বুলাওগে, ন কিসিকা ঘর যাওগে, আনা-জানা বন্ধ …
মেসোমশায় সরজার ফুটো দিয়ে অচেনা লোকজন দেখে ওপার থেকে বললেন, কী চাই?
মদ।
মদ নেই। লকডাউন উঠলে বাজারে আসবেন। বাড়িতে নয়।
মদ আছে।
মদ নেই।
মিথ্যে কথা বলে কী লাভ? করোনায় যদি … কার কাজে লাগবে আপনার ওই এগারো পেটি মাল?
মেসোমশায় ঘাবড়ে যান। বাড়িতে মদ আছে, শুঁড়িবাড়িতে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে দিয়ে একথা কেউ বলতেই পারে, কিন্তু ঠিক এগারো পেটির খবর এরা পেল কোথা থেকে?
নাছোড় দুষ্টের দলটি এবার নির্দেশ পাঠায়; দরজা হালকা করে খুলে আগে এই বান্ডিলটা নিয়ে রাখুন, একদম স্যানিটাইজ করা সব নোট। চাইলে আর একবার স্প্রে করে নেবেন। এক পেটি।
অগত্যা দরজা খুলতেই হয়, টাকা নিতেই হয়, মদ দিতেই হয়। পরের দিন ঠিক একই কায়দায় আরেক দল আসে। এক ভাষা, এক দাবি। টাকা নিতেই হয়, মদ দিতেই হয়। পরপর এগারো দিন ধরে – দরজা খুলতেই হয় টাকা নিতেই হয়, মদ দিতেই হয় … । সবগুলো টাকার বান্ডিল একই হ্যান্ডবিল দিয়ে মোড়া।
আমাদের মহামান্য বড়দা কুলপতি নস্কর, পাপাইদার থেকে হ্যান্ডবিলটি নিয়ে, একবার মাথায় ঠেকিয়ে পল্টুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, আমি আছি। আমি আছি মানে বুলু আছে বুলু আছে মানে তোদের বাপিদাও আছে। দুটো দিন টাইম দে সব ছকে দেব।
গিয়াছে প্রাণ? দুঃখ নাই। আবার তোরা মানুষ হ …
লোকটা তাহলে বেঁচে আছে?
এখনো হ্যান্ডবিল ছেপে বিলি করে চলেছে?
ছাপছে কোথায়? কোন্ গোপন ছাপাখানায়?
গবমেন্ট বলছে খতরনাক লোক, ধরতে পারলেই জেলে ঢোকাব, কিন্তু ধরতেই পারছি না। ওদিকে পার্টির মাথারা, এই যেমন কুলপতি নস্কর, ওই হ্যান্ডবিল মাথায় ঠেকিয়ে বলছে ‘আমি আছি। তোরা এগিয়ে যা।’
কাল নাকি সিটি পুলিশ মন্ত্রী (কবি, ছড়াকার, পদ্যশ্রী, নাট্যশ্রী, গীতশ্রী, সুরশ্রী, শিল্পাচার্য এবং সর্বঘটস্য কাঁঠালী কদলী) টিভিতে বলেছেন, ‘এটি নতুন কিছু না। এই মহা দুঃসময়ে মিডিয়ার উচিত মানুষের পাশে থাকা। খুচরো গুজবকে পল্লবিত করে পরিবেশন করবেন না। মানুষের চৈতন্য খিঁচড়ে যাবে। আরে বাবা, দুনিয়ায় যেখানেই মহামারী, সেখানেই এমন কত গুজব, কত অন্ধবিশ্বাস ডালপালা মেলে দেয়। হাসতে হাসতে মহামারী তখন ওই সুযোগে, অতিকায় শকুনের মত ডানা ঝাপটায় আর শিকার করে (উনি দুই হাত ডানার মুদ্রায় মেলে দিয়ে শকুনের উড়ে চলা দেখান)। ইগনোর ইট। আমরা সদা সতর্ক। নানা এলেকা থেকে রিপোর্ট আসছে, আমরা দেখছি। আর একটা কথা, আমাদের সামর্থ্য সীমিত, রাতদিন আমরা একটা যুদ্ধের মধ্যে আছি, স্কুল কলেজ ক্লাব, সব হাসপাতালে কনভার্ট করছি, বিনে পয়সায় মানুষের চিকিৎসা হচ্ছে, করোনাকে ঠেকানো যাচ্ছে না, মানুষ মরে যাচ্ছে ঝরে যাচ্ছে খসে যাচ্ছে, আমরা বিনে পয়সায় তাদের সৎকারও করে দিচ্ছি, আর কত করব? আর আপনারা খালি এসব ফালতু ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছেন, পারেনও বটে। ডিসগাস্টিং।’
আমরা লে ভুক্কড়, এসব প্যাঁচের কথার কিছু বুঝতে পারছি না। কোথাও একটা তো গাবজাল আছে, কোথায়? মাস্টারদা বলল, না বোঝার কী আছে? আরে বাবা, সর্প হইয়া দংশি আমি দিয়ে ওঝা হইয়া ঝাড়ি। মানে? মানে অতি সিম্পল, গবমেন্ট হল গিয়ে তোর ওঝা, আর তোদের পার্টিই হল গিয়ে সাপ, একই অঙ্গে দুই রূপ। তোরা সাপের দলে। পল্টু পাপাই ভোডাফোন পাবনা সব্বাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে, আমাদের তুমি সাপ বললে? আমরা সাপ? ছিঃ মাস্টারদা, তোমাকে কত … মাস্টারদা মাস্ক খুলে হাসতে থাকে। কথা ঘুরিয়ে দিতে পল্টুকে বলে একটু জোরে জেরে হ্যান্ডবিলটা পড়ে শোনা বেটা। পল্টু রাগী রাগী গলায় পড়তে থাকে:
গিয়াছে প্রাণ? দুঃখ নাই। আবার তোরা মানুষ হ!
হে মাতঃ! হে করোনাম্মা! কী খেলা না দেখাচ্ছ মাগো! কতবার না কত রূপে তুমি এসেছ, কিন্তু এমন মারীবিষ পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। দুনিয়ার দুই শত দেশ আজ স্তব্ধ। কেন মা?
চীনের বদমাসি, বাদুড়ের চক্রান্ত, আমেরিকার গোয়ার্তুমি; উড়নচণ্ডি ইউরোপ আর ধ্যানধূর্ত ভারত; জানি আমরা সবাই পাপী। তোমাকে গ্রাহ্যি করিনি বলে আজ লক্ষ-কোটি লোক রাস্তায় পার্কে হাসপাতালের গেটে অ্যাম্বুলেন্সে মরে লাট। কফিন বানাবার লোক নেই, কবর খোঁড়ার লোক নেই, মড়াকে কাঁধ দেবার ছেলে-ছোকরা নেই, মড়াকে শ্মশানে পৌঁছে দেবার জন্য গাড়ি নেই, মরে গিয়ে মরে গিয়ে লাশের ওপর লাশ লাশের ওপর লাশ তার ওপর লাশ, রাতের অবিরল অন্ধকারে কাশী থেকে রাজগৃহ ওই সব লাশ সার সার বস্তাবন্দী হয়ে ভেসে ভেসে আসছে, পতিতপাবনী গঙ্গার চরে চরে একটু জিরিয়ে নিয়ে ফের তাদের ভেসে চলা – লক্ষ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে এই নরদেহ, এই মানব-শরীরের তুমি এমন হাল করলে মা। দেহ ভেসে যায় অলকানন্দা জলে! শরীর শরীর শরীর! তোমার কি মন নাই মা!
এই অব্দি পড়ে পল্টু থামল, আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে বলি – আল বাল ছাল … ও ভুরু কুঁচকে বলল, পড়ছি –
মা তুমি অঞ্জলির কথা একটু শুনবে? এই শহরের সমস্ত ক্লেদ জমা হয় যে জলাভূমিতে, ওর পাশের বস্তিতে থাকে। তার বাপ। কর্কট। শেষ দশা। কেউ ভর্তি নিল না। কোনো চিকিৎসা পেল না। দম বন্ধ হয়ে আসছে, পেট ফুলে ফুলে উঠছে, বুক উঠছে নামছে, থেকে থেকে হিক্কা। গাঁজলা। প্রতিবেশীরা ভয়ে কেউ এল না, দরজা-জানলা আরও শক্ত করে এঁটে দিল। পাড়ার কার একটা মাল বওয়ার ভ্যান লকডাউনে ঝিমোচ্ছিল। মা মেয়ে ধরাধরি করে ওতে তুলল। মা মেয়ে, ওরা ভ্যান চালাতে জানে না, একজন ঠেলছে আরজন টানছে। রাস্তা কি আর ফুরোয়! ঘন্টাখানেক ভ্যান টেনে ওরা একটা হাসপাতালে এল। ডাক্তাররা ছুঁলই না। ততক্ষণে বাপ মরে কাঠ। অঞ্জলি যাকে দেখে তার পা লক্ষ করে ছুটে যায়, আর তারা, এর ছোঁয়া লাগার ভয়ে এদিক ওদিক পালায়। দারোয়ান লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে এসে দফা হয়ে যেতে বলে। অঞ্জলি তখন আর বাপ নয়, বাপের একটা ডেথ সার্টিফিকেট চায় শুধু।
আরো পড়ুন দুর্গোৎসবের আমোদ
হাসপাতাল শাসন করে যে দুষ্টমণ্ডল, তারা চায় তেল সোনা বাংলার খনি। ওরা কোথায় পাবে? খুব পাতলা, অতি পলকা, তবু এক টুকরো সোনা দিয়েছিল বাপ, কোনো এক কালে। সদ্যমৃত সেই বাপ, হাসপাতালের নগ্ন চাতালে ভ্যানরিক্সায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিমূঢ়। অঞ্জলি শান্ত হাতে তার পিতৃদত্ত কর্ণাভরণ খুলতে থাকে … তারপর কী হল? জেনে লাভ নেই। হাসপাতালে আসবার সময় অঞ্জলির বয়েস ছিল বাইশ। এখন তার বয়েস বাষট্টি …
না। কোনো কাগজে টিভিতে এ বৃত্তান্ত নেই। কিন্তু এমন কত অঞ্জলির খবর তো বেরোয়। পার্টি আবার বাড়িতে চড়াও হয়ে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে হুমকি দিয়ে গেছে, মুখ খুললেই রেশন বন্ধ।
আল বাল ছাল – এবার আমরাই চেঁচিয়ে পল্টুকে থামাই। মাস্টারদা বলল, আহা মন্দ তো লেখেনি, পড়ুক না। পল্টু পড়ে যেতে থাকে –
দুঃখের কথা আর শুনবে মা? এটা অবশ্য খবরও হয়েছিল। এই শহরেই। করোনা-আক্রান্ত নব্বই বছরের বৃদ্ধা মাকে দুই গুণধর ছেলে নদীর চরের বাবলা বনে বিসর্জন দিয়ে চলে গেল, কেউ টের পেল না। চিল-শকুন এসে পুলিশকে নাকি খবর দিয়ে গেছে। সৎকার-বঞ্চিত এই বৃদ্ধার জন্য আমাদিগের চোখে একটু জলের রেখা অন্তত দিও।
সরকার আমায় খুঁজছে। পাচ্ছে না। আমি নাকি সরকার মশায়ের খুব বদনাম করে বেড়াচ্ছি। বেশ। এবার তাহলে মাননীয় সিটি গরমেন্টের যাতে খুব সুনাম হয়, সেজন্য এখানে তোমার একটা পূজা পদ্ধতি লিখে রাখছি মা। এই বিধি মেনে দিকে দিকে ওরা তোমার পূজা করুক। তুমিও অরাজি হয়ো না। এই দমবন্ধ সময়ে একটু হাসি-মশকরা হোক না, করোনা মহোৎসবে লোকে একটু মেতে উঠুক না, এতে সরকার পার্টি পার্টির পেটো সবারই শ্রীবৃদ্ধি। শহরকে বড় ভালোবাসি মা। নগর-দেবতা ও তোমাকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত। আমাদিগকে মানুষ হইবার আশীর্বাদ করিও।
অথ করোনা মাতার পূজা পদ্ধতি
এতক্ষণে আমরা খুশির চেঁচান চেঁচাই, পড়ে যা পড়ে যা। ভোডাফোন বলল, পল্টু এতক্ষণ কী সব যে পড়ে গেল, কুলু নস্কর ওসব পড়েইনি, এই পূজা-ফুজার জায়গাটা ঘুরে ঘুরে পড়ছিল, আমি দেখেছি। পল্টু রিপিট করে –
অথ করোনা মাতার পূজা পদ্ধতি
১. মহামারীর মহাদেবী মাতা করোনার পূজার কোনো নির্দিষ্ট তিথি নাই। ইনি সর্বতিথি সুলগ্না।।
২. পূজাকাল: রাত্রির প্রথম প্রহর। শনি ও রবিবারের রাত্রিতে দেবীর আবাহন ও পূজা বিধেয়।
৩. শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণ পুরোহিত কিম্বা এদানিং মহিলা পুরোহিত দ্বারা যেভাবে সুচারু রূপে পূজাকার্য চলিতে আছে, তেমনি চলিবে।
৪. পুজোপকরণ: ঘট, আম্রপল্লব, সশীষ ডাব, তেরো রকম ফুল, তেরো রকম গোটা ফল, সামান্য কাটা ফল, তেরো গাছি ঝিম কালো সূতা, তেরোটি দূর্বা, তেরোটি তাম্বুল ও গুবাক।
এই পূজায় কদম্ব বা সূর্যমুখী ফুল নিবেদন করিতে পারিলে ফল ভালো হয়।
৫. আবাহন মন্ত্র: ওঁ হ্রীং করোনামাতায়ৈ নমঃ বলিয়া দেবীকে আবাহন করিবে। পুষ্পাঞ্জলির শেষেও এই মন্ত্র চলিবে।
৬. পূজা বিধি: দুর্গা, কালী, বিপত্তারিণীর পূজা বিধি অনুসরণ করিবে। কারণ, যিনি বৈদিক দেবী হৈমবতী, তিনিই দুর্গা কালী করোনা। ইনি একাদশ মহাবিদ্যা। সব দেবীই শিষ্টপালয়িত্রী এবং দুষ্টদলনী। একদা, অসুরদিগকে পরাজিত করিয়া ইন্দ্রাদি দেবতার মনে দম্ভ জাগ্রত হয়েছিল, দেবী সেই দম্ভ চূর্ণ করিতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। মাতা করোনা সেই প্রাচীন বৈদিক দেবীর নবরূপ পরিগ্রহ করিয়া ধরাধামে অবতীর্ণ।
৭. বিসর্জন: সব দেবী হইতে এইখানে মাতা করোনা স্বতন্ত্র। বিসর্জনকালে উদ্দণ্ড নৃত্যগীত চলিবে না। ‘পুনরাগমনায়চ’ কদাপি ভুল করিয়া বলিও না। ‘আসছে বছর আবার হবে’-টবে বলিয়া উল্লাস করিবে না। বলিবে, মা, মাতা করোনাম্মা! আমাদের সকল পাপ হইতে ত্রাণ করিও, আর ধরাতলে তোমার ভীষণা ভয়ঙ্করী মূর্তি ধারণ করিয়া আসিও না। যদি একান্তই আসিবে, তোমার রক্ষাকালী রূপ ধরিয়া আসিও।
৮. প্রসাদ: ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলমান-কেরেস্তান-দলিত-আদিবাসী, সকল মনুষ্যমাত্রই করোনা দেবীর পূজায় অংশগ্রহণ করিবে ও প্রসাদ পাইবে। ফল-মূল-সন্দেশ-বাতাসা-খৈ-মুড়কি-নাড়ু ইত্যাদি ব্যতীত, খিচুড়ি ভোগ ও ব্যাঞ্জনাদি দেবীকে নিবেদন করিবে।
করোনা মাতা পূজা পদ্ধতি সম্পূর্ণ হইল
হুম, মানতেই হবে ভাই, পূজা-পদ্ধতি যাকে বলে একেবারে অভিনব; মাস্টারদা একথা বলতেই পাপাইদা রগড় করে মাস্টারের পা জড়িয়ে ধরবে বলে এগোয়, আর মাস্টার, ‘ছুঁস না ছুঁস না’ বলে চেয়ার থেকে উঠে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে যায়। ঘর থেকে মাস্টারদা বলল, করোনা রুগির সঙ্গে মজা করিস না, বুক একেবারে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। তোরা পূজা লাগা, এবার আমি ভালো মনেই চাঁদা দেব। পল্টু বলল, ‘উৎসব’ বলে ঢ্যামনামো করবে না তো? না রে ভাই, আমার শিক্ষে হয়ে গেছে।
আমরা হ্যান্ডবিল পকেটে ঢুকিয়ে মহা উৎসাহে এবার কুলপতির ভাই বুলু নস্করের বাড়ির দিকে রওনা দেব। বাপিদা ফোনে বলল, সেও যাবে। তারপর? আমরা মিটিং করব, পোগ্রাম বানাবো – সামনে অ-নে-ক কাজ, এ শহরে করোনা মাতার পূজা আমরাই তাহলে চালু করে দিচ্ছি, ‘অল্পবয়স্ক পাব্লিক’কে এসব খাওয়াতে বেশি টাইম লাগে না … জয় করোনাম্মার জয় …
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








