প্রারম্ভিকা

গুরু বলিল, আছে-কে যেমন প্রমাণ করিতে হয়, নেই-কেও তেমনই প্রমাণ করিতে হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শিষ্য জিজ্ঞাসা করিল, যাহা নাই, তাহা প্রমাণ করিব কী রূপে?

গুরু বলিল, যাহা আছে, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে। অথচ যাহা আছে, তাহা অনেকসময় নাই।

শিষ্য কহিল, যেমন?

গুরু বলিল, মরীচিকা আছে অথচ নাই—

শিষ্য বলিল, কিন্তু তাহা তো আলো আর বালির দোষ।

ভিক্ষু বলিল, কিন্তু চক্ষু তাহা বুঝিতে পারিল না কেন? চক্ষু কি বলদ? চক্ষু কি গর্দভ?

শিষ্য অধৈর্য হইয়া বলিল, কিন্তু এ তো মনের দোষ। চক্ষু কী করিবে? মন যাহা বলিতেছে, তাহাই চক্ষু দেখিতেছে।

ভিক্ষু কথা কহিল না। অম্বরপথে অঙ্গুলিনির্দেশ করিল।

‘কী?’ জিজ্ঞাসা করিল শিষ্য।

ভিক্ষু কহিল, ‘উহা আছে না নাই?’

শিষ্য কহিল, ‘উহা নাই’।

ভিক্ষু মাথা নাড়িল। শিষ্য বলিল, ‘আছে?’

ভিক্ষু কহিল, ‘উহা প্রহেলিকা…’

প্রথম দর্শন

আর দেরি করলে চলবে না। শনিবারের মধ্যে প্রিন্টে না ছাড়তে পারলে পরের মাসে পত্রিকা পাওয়া যাবে না। অগত্যা শুভঙ্কর অফিস থেকে তিনদিন ছুটি নিয়ে ছুটল প্রেসে। অগাস্টেই যদি ‘বর্ষা সংখ্যা’ বের করতে না পারে, তাহলে বেইজ্জতির একশেষ। তন্ময়দা তখনই বলেছিল, মিছিমিছি এসবে জড়াস না। কবিতা লিখছিস, কবিতা লেখ। বাংলায় কি লিটল ম্যাগাজিন কম আছে? এসব করা ঝক্কির ব্যাপার। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি করিস। অত সহজ নয়। শুভঙ্কর কথা শোনেনি। তমাল, ইন্দ্রাশীষ আর তপোব্রত বলেছিল, লড়ে যাব। তুই শুরু করে দে। তবু একবছরে চারটে সংখ্যা বের করার পর উৎসাহে ভাঁটা পড়ল। তমাল, ইন্দ্রাশীষ আর তপোব্রতর জীবনে অন্যান্য ব্যস্ততা বাড়ল।

শুভঙ্কর জেদের বশে এগিয়ে গেল। একা।

অ্যান্টনি বাগানের সরু গলির মধ্যে প্রাচীন আমলের অশ্বত্থ বেরনো আধভাঙা বাড়ির তিনতলায় প্রদীপদার ভারতী লেটার প্রেস। লম্বা টানা বারান্দার ধার দিয়ে পরপর খুপরি খুপরি ঘর। তার মধ্যেই একটিতে ডিটিপির কাজ চলে। সকাল থেকে কাজ শুরু হয়ে গেছে। কাজের মধ্যেই মাঝে মাঝে উঠে যাওয়া আছে চা-সিগারেটের জন্যে। একনাগাড়ে কতক্ষণই বা প্রুফ দেখা যেতে পারে? কতক্ষণই বা শানিয়ে রাখা যায় চোখ? ঠিক যখন চোখ তাকিয়ে থাকে, কিন্তু দ্যাখে না, তখনই বিরতি নিতে হয়।

সারাদিন জোরকদমে কাজ করার পর শুভঙ্কর দেখল, যতটা কাজ এগোবে ভেবেছিল, তার চেয়ে বেশি কাজ হয়ে গেছে। শান্ত মেজাজে সে বাইরে টানা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সিগারেট ধরাল। সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের পুরনো বাড়িগুলো থেকে ভেসে আসছে শাঁখের আওয়াজ। নিচের উঠোনটি বেশ ময়লা। তারমধ্যেই কর্পোরেশনের কলের জলে চান সেরে নিচ্ছে কয়েকজন ঠেলাওয়ালা। উঠোনের একধারে গজিয়ে ওঠা পেয়ারা গাছে বসে একটি কাক তার পালক পরিষ্কার করছে। এর মধ্যেই বারান্দার এক কোনা থেকে ঘন্টাধ্বনির সঙ্গে শোনা যাচ্ছে হনুমান চালিসা পাঠ। শুভঙ্কর চোখ তুলল। আকাশ বাদল মেঘে কালো হয়ে আসছে। একঝাঁক বাদুড় উড়ে গেল পাশের বাড়ির ছাদের কিনার ঘেঁষে। ছাদে দড়িতে টাঙানো কাদের কাপড় ঝুলছে কে জানে? ছাদের পাশেই ছাদের ঘর। জানলা খোলা।

অন্ধকার। কয়েক মিনিট অন্ধকার।

আলো জ্বলল।

শুভঙ্কর দেখল একটি ছিপছিপে তরুণী ঘরে ঢুকেছে।

দেখে মনে হল বাঙালি। কিন্তু মফস্‌সলের। গ্রামেরও হতে পারে।

মেয়েটির মাথায় সিঁদুর। হাতে শাঁখা। কানে দুল। গলায় হার।

মেয়েটি শুভঙ্করকে দেখতে পায়নি।

সে ঘরে ঢুকেই তার পরিধানের শাড়ি ছেড়ে ফেলল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন হয়ে গেল।

সে কি গুনগুন করে কোনো গানের কলি গাইছে? অরিজিৎ সিং? শ্রেয়া ঘোষাল?

ওই অবস্থায় সে ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করল।

শুভঙ্করের মনে হল, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছে, শুধু ওই ঘরে আলো আছে। ওই মেয়েটি এ পৃথিবীর নয়। লজ্জা কী বস্তু ও জানে না। নগ্নতা কী বস্তু ও জানে না। ও পারিজাত, ফুটতে জানে। ও প্রদীপ, জ্বলতে জানে। ও মেঘ, ভাসতে জানে। ওকে কে আনল এই শহরে? এইরকম হাজার কেবল-তারে মোড়া আবর্জনা ভরা অপরিচ্ছন্ন ঘিঞ্জি গলির ভেতর, এইরকম আদিম অপরূপও থাকতে পারে?

মেয়েটির শরীরের রেখাগুলো স্পষ্ট নয়, তবু তার যৌবন স্পষ্ট।

তার যৌবনের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে কত প্রাচীন কামস্রোত।

অপরিচিতা দেহাতি তরুণীর শরীর যেন ইন্দ্রনীলমণি, যেন গজমোতির মালা, যেন পদ্মপাতায় রাখা নীলগিরির হীরকখণ্ড। শুভঙ্কর প্রেস ভুলে গেল, প্রুফ ভুলে গেল, নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেল।

এক অতুলনীয় কামনার প্রবাহে তার সর্বাঙ্গ ভেসে যেতে লাগল। হে অঙ্গ, তুমি কামনা ছাড়া আর কিছু বুঝেছ কোনোদিন? হে অঙ্গসকল, তুমি কি শুধু শিশুর মত শুধু বাসনার ক্রোড় চেয়েছ চিরকাল? তোমার কাছে আলোই বা কী, অন্ধকারই বা কী? তোমার কাছে জাগরণই বা কী নিদ্রাই বা কী? হে অঙ্গ, তুমি কেমন মানুষ? অপরিচিতার স্তনমণ্ডলে ছায়া যদি সৌন্দর্য হয়, তবে সে পথে কতদূর যাওয়া যায়? শুভঙ্কর পুত্তলিকাবৎ সেই ডাগর নারীর আধ-ফর্সা শরীরের নিকুঞ্জে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। সে কি চালুক্য মন্দিরের মূর্তি হয়ে গেল? বেলেপাথরের যক্ষ?

সেই যুবতী দেওয়ালে রাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল। শুভঙ্করের চোখ সেই যুবতীর মসৃণ পিঠে, তার কোমরে, তার নিতম্বে, তার পদতলে। সেই যুবতীর আয়নায় কি শুভঙ্করের মুখ দেখা যাচ্ছে? সেই যুবতী কি জানে যে তাকে দেখা হচ্ছে? এবং জানার ফলে কি তার মুখে লজ্জার বদলে চাপা হাসির রেখা ফুটে উঠছে?

নিজের উচ্চাঙ্গের যৌবন প্রদর্শন করে নারীরাও কি আনন্দ পায় না? সুখ পায় না? ছোঁয়া নেই, শুধু দেখা আছে।

যে দেখছে, যে দেখাচ্ছে – দুজনেই বসন্তকাল। দুজনেই পলাশ। পাপ নেই। পুণ্য নেই। স্বর্গ নেই। নরক নেই। শুধু চোখ আছে। শুধু আস্বাদন আছে।

চুল আঁচড়ে যুবতী খোঁপা বাঁধল। অন্তর্বাস পরল।

শাড়ি পরল। নীল পাড়, কমলা শাড়ি। মাথায় কমলা রঙের সিঁদুর লাগাল।

হঠাৎ সে এসে দাঁড়াল জানলার সামনে। শুভঙ্করের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল।

এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না শুভঙ্কর। সে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।

মেয়েটিও কি ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল? আবার ছাদের ঘরটি অন্ধকার হয়ে গেল।

শুভঙ্করের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা স্রোত নেমে গেল। লজ্জার? ভয়ের? অপরাধবোধের? শুভঙ্কর বুঝতে পারল না।

মেয়েটি তো তার ওপরে চিৎকার করল না। মুখের ওপর ঝড়াৎ করে জানলা বন্ধ করল না।

মেয়েটি তো বুঝেছে কী ঘটেছে। তাও কিছু বলল না? তবে কি সে এই দেখাকে অনুমোদন করল?

তবে কি সে নিজেকে দেখাতে চায়? সে বিবাহিত, তার স্বামী রয়েছে, তবু সে নিজের শরীর দেখাতে চায়?

যদি সে এই প্রদর্শন থেকে আনন্দলাভ করে, তবে তা কি ভুল? তা কি নিন্দনীয়? সমাজ একে কেমনভাবে দেখবে? বিচার করবে তো অবশ্যই। কিন্তু সে বিচার কারা করবে? যারা এই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। যারা ঢোসকা, খিটখিটে, চিড়বিড়ে হয়ে গেছে। যারা পায়নি বলে ক্রুদ্ধ। সেইসব আধবুড়ো খোঁচা খোঁচা নীতিবাগীশদের সম্মেলন হবে। তারা খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে বলবে, এসব হল নৈতিক অধঃপতন। সমাজ জাহান্নামে চলেছে। রাষ্ট্র একে কীভাবে দেখবে? রাষ্ট্র আর যৌবনের সম্পর্ক কেমন?

রোমন্থনকাল

গভীর রাত। অথচ শুভঙ্করের ঘুম নেই। সে ঘুমোতে চায় না। সে ভাবতে চায়। তার সর্বাঙ্গে যেন জোয়ার ভাঁটা খেলা করছে। কী এক অসহ্য পুলক তার দেহ মন অধিকার করে রয়েছে। অথচ অঙ্কিতাকে দেখে তো এমন হয়নি তার!

অঙ্কিতার সঙ্গে শুভঙ্করের দুবছরের সম্পর্ক। কিন্তু তাও, শুভঙ্কর অঙ্কিতার কাছে খোলামেলা হতে পারে না। তার একটা বড় কারণ অঙ্কিতার মেজাজ। খুব অল্পেই ভীষণ ক্ষেপে যায় সে। ঝাঁঝিয়ে ওঠে। শুভঙ্কর এটা সহ্য করতে পারে না। তার ফলে ওদের সম্পর্কটা নিয়মিত জয় পরাজয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ঝগড়ায় কে জিতবে? কে কাকে ভুল প্রমাণ করতে পারবে, সেটাই ইদানীং মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের শরীরও কি আর শরীর রয়েছে? সেখানেও কি সম্পূর্ণ সমর্পণ রয়েছে? নেই।

মাধুর্য নেই আর।

প্রসারিত মাঠের ওপর থেকে গুটিয়ে নেওয়া আলোর মত মাধুর্য চলে গেছে।

এখন অঙ্কিতা আর শুভঙ্করের মাঠে ছায়া। কুয়াশার রেখা।

অনেক কথা ইঁদুরের গর্তে চলে গেছে। অনেক কথা পুকুরের সবুজ জলে শ্যাওলা ভেঙে ডুবে গেছে। আজকের কথাও সে বলবে না অঙ্কিতাকে। কী হবে? অঙ্কিতা বন্ধু নেই আর। জাঁদরেল প্রেমিকা হয়ে উঠেছে। সে কিছু বাঁকা ধারালো বঁটির মতো কথা বলবে। চামড়া কেটে যাবে। ভেতর কেটে যাবে। ওষুধ নেই, সারতে সময় নেবে। সারবে কি? সারার নিশ্চয়তা নেই যেখানে সেখানে খাবলা করে আঘাত নেবার কী মানে? তার চেয়ে বেতসের বনে অন্ধকার থাক। শিউলির বনে শেয়াল।

শুভঙ্কর ভাবতে লাগল – তারা দুজনেই আছে, কিন্তু কেউ নেই। এক বিরাট শূন্যতার মধ্যে তার জীবন ক্লান্ত মাছমোরালের মতো উড়ে চলেছে বলেই কি এই দেহাতি যুবতীর রূপ তাকে এইভাবে খাদে ঠেলে দিয়ে গেল?

কোন সত্যের সামনে এসে দাঁড়াল সে? কাউকে না স্পর্শ করেও, কেন তার নিজেকে আজ এত পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে?

গ্রামের মধ্যে চুনকাম করা পুরনো জমিদার বাড়ির স্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়ালে সে নিজের শরীরে যে প্রশান্তি অনুভব করে, আজ সেই প্রশান্তি সে অনুভব করছে।

মেয়েটি তাকে পুলক দিল না প্রশান্তি?

দ্বিতীয় দর্শন

পরের দিনও শুভঙ্করের কাজ চলতে লাগল। অক্ষর, বাক্য ও বানানের সমুদ্র ঠেলে সে অবশেষে কূল খুঁজে পেয়েছে… তার আজ মেজাজ ফুরফুরে। সারাদিন ধরে তার ওই মেয়েটির কথা মনে হতে থাকল।

টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে সারাদিনে বেশ কয়েকবার সিগারেট খেল।

তার চোখ ওই ছাদের ঘরটির দিকে উড়ে যেতে লাগল। না, কেউ তো আসছে না!

জানলা খোলা। গরাদের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে কিছু মলিন কাপড়চোপড় দেওয়াল থেকে ঝুলছে।

দেওয়ালের তাকে কিছু অস্পষ্ট বাসনকোসন। সিলিংয়ে একটা জং ধরা পাখা।

একটা তক্তপোষ। দুটো টুল। এই তার ঘর? এই ঘরে কি মেয়েটি তার স্বামীর সঙ্গে থাকে? কী করে তার স্বামী? বৈঠকখানা বাজারে সাইকেল ভ্যান চালায়? মেয়েটিই বা কী কাজ করে? বাড়ি বাড়ি রান্না করে? ছোট কোনো দফতরে চাকরি? কিন্তু গতকাল তার সঙ্গে যখন চোখাচোখি হল, তখন মেয়েটি কেন চেঁচিয়ে উঠল না?

কেন তাকে বিব্রত করল না? সারাদিন কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল তার।

সন্ধে হল। শাঁখ বাজল।

ছাই রংয়ের আকাশে রহস্যময় ডানা বিস্তার করে বাদুড়ের দল উড়ে গেল শেয়ালদার দিকে।

বৃষ্টি নামল। ঝুপসি পেয়ারা গাছটিতে কয়েকটি চড়ুই বসে ভিজতে ভিজতে কিচির মিচির করতে লাগল।

টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ চটরপটর করতে লাগল।

ডুবে যেতে লাগল পৃথিবীর আর বাকি সমস্ত শব্দ। শুভঙ্কর এসে দাঁড়াল বারান্দায়।

ঘর অন্ধকার। সিগারেট ধরাল সে।

আলো জ্বলল। মেয়েটি ঘরে ঢুকল।

আবার সেই অনাবৃত অরণ্যদেবী। সেই আধ-ফর্সা শরীরের ধারালো ইশারা।

মেয়েটি সারা গায়ে পাউডার ছড়াল। গলায় কম দামী গয়না পরল। কত বয়স হবে মেয়েটির? বাইশ? পঁচিশ?

মেয়েটির ঘর থেকে গানের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। মেয়েটি তার সঙ্গে অঙ্গ দুলিয়ে নাচতে আরম্ভ করল।

একবার শাড়ি পরে নাচল। তারপর শাড়ি খুলে ফেলে ব্লাউজ আর সায়া পরে নাচল।

শুভঙ্কর ভাবল, মেয়েটি কি রিল করছে?

আরো পড়ুন অশ্বজাতিকা

তার মনে হল – একটা দূরবীন থাকলে ভাল হত। পৃথিবীতে কখন যে কোন বেখাপ্পা জিনিসের দরকার পড়ে যায়, তা মানুষ আগে থাকতে বুঝতে পারে না। দূরবীন নিয়ে সাধারণত মানুষজন ঘোরে না। কিন্তু তাও শুভঙ্করের এ কথা মনে হল। মনে হয়ে আক্ষেপ পর্যন্ত হল। নিজেকে চড় মারতে পর্যন্ত ইচ্ছে করল। এই পরম অস্বাভাবিকতা শুভঙ্করের সেই সময়ে স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হল।

সে প্রাণপণে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটি হঠাৎ নাচ থামিয়ে ফোনে কাকে যেন ফোন করল। সে কথা বলতে লাগল।

শুভঙ্কর খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ফিরে এল তার কাজের টেবিলে।

বেশ কিছুক্ষণ কাজ করে সে ঠিক করল যে সে বেরিয়ে যাবে।

আবার সে বারান্দায় এসে সিগারেট ধরাল।

ঘর অন্ধকার। মেয়েটি নেই। নেই। নেই। নেই। নেই। নেই। নেই।

হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। ওই মেয়েটি আবার ঢুকেছে। হলুদ-কমলা রঙের শাড়ি পরে।

সে জানলার গরাদ ধরে সোজা শুভঙ্করের দিকে তাকাল। নাকে নথ?

আঁতকে উঠল শুভঙ্কর। মেয়েটি কি তার জন্যেই অপেক্ষা করছিল?

মেয়েটি তাকিয়ে আছে। শুভঙ্করের বারান্দায় হলুদ আলো জ্বলছে। শুভঙ্করের ভেতরেও কি আলো জ্বলছে? মেয়েটিকে দেখতে ঢলোঢলো। পুরনো বাংলায় মেয়েদের এই ধরনের মুখ দেখা যেত। মেয়েটি কেন তাকিয়ে আছে?

শুভঙ্করের ভাল লাগছে। খুব ভাল। রোমাঞ্চ হচ্ছে। মেয়েটির মুখ প্রসন্ন। সে কি কিছু বলতে চায়? সে তো জানে এই দুদিনে শুভঙ্করের চোখ কতদূর গেছে। সে তো জানে শরীরের সব উত্থানপতন কতখানি দেখা গেছে। তার সঙ্গে শুভঙ্করের কি একটা সম্পর্ক তৈরি হল? এখন সে কোন কথা বলতে চায়?

কিছু বলল না মেয়েটি। মুখে হাসির রেখা টেনে আলো বন্ধ করে বেরিয়ে গেল।

শুভঙ্কর ফিরে এল বাড়ি। রাতে এল অঙ্কিতার ফোন।

কথোপকথন

রাতে অঙ্কিতার ফোন এল—

—কী রকম কাটল সারাদিন?

—ওই আর কী!

—শোন তোকে একটা কথা বলি।

—বল।

—আমাদের এই সম্পর্কটা জাস্ট চলছে না। এটা হচ্ছে না। তুই তোর জগৎ নিয়ে থাক। আমি আমার জগতে থাকি। বেকার ইরিটেশন তৈরি হচ্ছে!

—আরেকটু সময় পেলে হত না?

—নাঃ! ইন ফ্যাক্ট গতকাল আমি অরুণাভর সঙ্গে ডেটে গিয়েছিলাম।

—ওই ননসেন্স ছেলেটা?

—ননসেন্স? আর তুই খুব সেনসিটিভ নাকি? তোর মতো সেলফিশ ছেলে আমি খুব কম দেখেছি।

— তুই কি ওর সঙ্গে—

—এর উত্তর তোকে আর আমি দেব না, শুভঙ্কর!

—অঙ্কিতা, আমিও যে তোর সঙ্গে খুব আনন্দিত ছিলাম, বিষয়টা তা নয় – কিন্তু আমি চেষ্টা করছিলাম।

—কিসের চেষ্টা? আমাদের সম্পর্কটা কি অঙ্ক নাকি, যে চেষ্টা করে সলভ করবি?

—বাদ দে তাহলে! চুলোয় যাক এই আদিখ্যেতা—

—গো টু হেল!

ফোন কেটে গেল। শুভঙ্কর মোবাইলটা খাটের ওপর ছুঁড়ে ফেলল।

রক্তসন্ধ্যা

পরদিন প্রেসে পৌঁছে শুভঙ্কর দেখল পেজ-সেটার বিশু আসেনি। তাকে বারবার আসতে বলেছিল শুভঙ্কর। কিন্তু সে ডুব দিয়েছে। এই দেখে চড়াক করে মাথা গরম হয়ে গেল শুভঙ্করের। সে গলা তুলল—

—প্রদীপদা, আপনি খুব ভালো করেই জানতেন যে আজ বিশুকে কতটা লাগত আমার। তাও ওকে অন্য কাজে পাঠিয়ে দিলেন?

—আরে দাদা, শ্যামল তো রয়েছে। ও করে দেবে।

—কী করে দেবে? ও তো কিছুই জানে না। গত দুদিন ধরে বিশু পুরোটা করেছে। ও সবটা জানত—

—আজকে কাজ চালিয়ে নিন, বিশু কাল আসবে।

—তার মানে আজ পুরো দিনটা নষ্ট হল আমার— টোটাল ননসেন্স! আমার আপনার এই প্রেসে কাজ করানোটাই ভুল হয়েছে।

—আপনি চাপ নিচ্ছেন কেন দাদা—

—চাপ নিচ্ছি কারণ আমার সময়টা নষ্ট হচ্ছে! আপনার নয়! এই রকম আনপ্রোফেশানালি কাজ করলে, আমি আর আপনার সঙ্গে কাজ করতেই পারব না।

চেঁচিয়ে উঠল শুভঙ্কর। প্রদীপদা চুপ করে শুভঙ্করের চিৎকার শুনলেন। তার রুদ্ররূপ দেখে বারকয়েক বললেন, ভুল হয়ে গেছে ভাই। আমি দেখছি কী করা যায়।

এরপর সারাদিন ধরে কাজ নিয়ে বিস্তর ধস্তাধস্তি করল শুভঙ্কর। যে কাজ অন্যান্য দিন করতে দু ঘন্টা লাগে, সেই কাজ আজ করতে প্রায় চার ঘন্টা লেগে গেল। ফলে কাজ বিশেষ এগোল না। সন্ধ্যেবেলা ক্লান্ত হয়ে সে আবার টানা বারান্দায় দাঁড়াল। সিগারেট ধরাল। আজ তার কোনোদিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। রাগে তার শিরা দপদপ করছে। তাও তার চোখ চলে গেল ছাদের ঘরটার দিকে।

অন্ধকার ঘর।

আলো জ্বলছে না। জ্বলছে না। জ্বলছে না। জ্বলল।

মেয়েটি বেগুনি রঙের শাড়ি পরে ঢুকল। আজ সে গান করছে না। সে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদল।

কাঁদতে কাঁদতে শুভঙ্করের দিকে তাকাল। কিছু বলতে চাইল? হঠাৎ উঠে গিয়ে কয়েকটা বাসন দেওয়ালের তাক থেকে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। ঘর ওলটপালট করল। একটা ভারি কিছু ছুড়ে মারল আয়নার দিকে। ঝনঝন করে ভেঙে গেল আয়না। এরপর সে দেখল যুবতী ছাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ছাদে দাঁড়াল। তারপর রেলিংয়ের কাছে এসে সোজা ঝাঁপ দিল নিচে।

ঘটনাটা এত তাড়াতাড়ি ঘটল যে শুভঙ্কর হতবুদ্ধি হয়ে গেল।

কী করবে সে? চেঁচাবে? লোক জড়ো করবে? তাহলে তো প্রশ্ন উঠবে শুভঙ্কর কী করে জানল? পুলিশ আসবে, সাক্ষ্য দিতে হবে। কোথাকার কোন যুবতীর আত্মহত্যার সঙ্গে তার জীবন সে কিছুতেই জুড়বে না। না। অসম্ভব।

সে দৌড়ে ঢুকে গেল প্রেসের ঘরে। হাঁপাতে লাগল।

প্রদীপদা জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে দাদা? শরীর খারাপ লাগছে? জল খাবে?

শুভঙ্কর মাথা নাড়ল। প্রদীপদা জল দিলেন শুভঙ্করকে। জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হবার পর সে বিদায় নিল প্রেস থেকে। এখনও কি অ্যান্টনি বাগানের লোকরা টের পায়নি? কতক্ষণে পাবে কে জানে?

আপাতত তাকে নিজের ঘরে ফিরতে হবে।

বাইরের পৃথিবীটা ঘেঁটে যাচ্ছে।

রাত্রিবেলা বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়ার পর চান করে নিজের ঘরে বসে একটা সিগারেট ধরাল শুভঙ্কর।

গতকাল রাতে অঙ্কিতার সঙ্গে বিচ্ছেদ, আজ বিশুর না আসা, আর একটু আগে ওই যুবতীর আত্মহত্যা – কীরকম যেন গুলিয়ে দিয়েছে তাকে। অস্তিত্বটা ক্রমশ জটিল লাগছে।

বারবার মেয়েটার মুখ তার মনে পড়তে লাগল। পুরনো বাংলার মেয়ের মুখ।

কিন্তু কেন মেয়েটা আত্মহত্যা করতে গেল? এত কীসের দুঃখ ছিল তার?

মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছিল। তার ডাগর রূপ, তার নগ্নতা, তার বেপরোয়া ভাব, তার কামিনী বিভঙ্গ – এই সবকিছু বাতাসের মত তার হাড়ের লোকালয়ে প্রবেশ করে তার শরীরকে একটা গুমোট থেকে মুক্ত করেছিল।

কিন্তু সেই মেয়েটি এইভাবে চলে গেল? মেয়েটির জন্যে হঠাৎই শুভঙ্করের খুব কষ্ট হতে লাগল। মেয়েটির জন্যে তার এত কষ্ট হচ্ছে কেন, এত কান্না পাচ্ছে কেন, সে বুঝতে পারল না। সে নিজের ঘরে ছেলেমানুষের মত মেয়েটির জন্যে কেঁদে ফেলল।

বোবা জানলা

বিশু এসেছে। সকাল থেকেই কাজ দ্রুত গতিতে চলেছে। সন্ধের আগেই শুভঙ্করের কাজ শেষ হয়ে গেল। পত্রিকা প্রিন্টে যাবার জন্যে রেডি। শুভঙ্কর ভাবতে পারেনি যে কাজ আজকেই শেষ হয়ে যাবে। সে ভেবেছিল আরও দুটো দিন লাগবে। কাজ শেষ হয়ে যাবার পর, শুভঙ্করের অনুশোচনা হল। সে প্রদীপদার কাছে ক্ষমা চাইল। প্রদীপদা হাসি মুখে তার হাত ধরে বললেন, এসব মনে রাখতে নেই ভাই। কাজের সময় এসব জিনিস মাঝেমধ্যে হয়।

যাক। কাজ শেষ। সন্ধ্যা নামছে। শুভঙ্কর টানা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিল।

সে ছাদের ঘরের দিকে তাকাল। ঘর অসীম অন্ধকারে ডুবে আছে।

তার মন একধরনের চটচটে অপরাধবোধে ভরে গেল। সে কি চাইলে গতকাল হাঁকডাক করে মেয়েটিকে বাঁচাতে পারত? সেই সময় কি সে পেয়েছিল? তাছাড়া সে কাপুরুষের মত বিপদ বাঁচিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর ঠিক কী হল, তা তো প্রদীপদাকে সে জিজ্ঞেস করেনি! কখন পুলিশ এল? অত উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার ফলে কি মেয়েটির মুখ থেঁতলে গিয়েছিল? কোনো প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি। যুবতীর স্বামীকে কে খবর দিল? সে কি শোকে বিধ্বস্ত হয়ে গেছিল? এসব কথা সে এখনো জিজ্ঞেস করতে চায় না। পাছে প্রদীপদা জিজ্ঞেস করে, তুমি কী করে জানলে ভাই? তুমি ওইদিকে তাকিয়ে কী দেখছিলে? শুভঙ্করের মনে হচ্ছিল মেয়েটির মৃত্যুর জন্যে সেও খানিকটা দায়ী।

আলো জ্বলল।

শুভঙ্কর চমকে তাকাল।

সেই যুবতী আবার ঘরে ঢুকল।

তার চোখাচোখি হল শুভঙ্করের সঙ্গে।

সে হাসল।

নিজের বস্ত্র উন্মোচন করতে লাগল শুভঙ্করের দিকে তাকিয়ে।

শুভঙ্কর স্তব্ধ। নিষ্পলক। হতবুদ্ধি। জারুলের ডালে মাঠপেঁচা। অথবা এমন মলাট যার ভেতর থেকে বইয়ের পাতাগুলো হারিয়ে গেছে।

উপসংহার

ভিক্ষু কহিল, আছে কি?

শিষ্য বলিল, একেবারেই নাই?

ভিক্ষু বলিল, এগোও।

শিষ্য বলিল, বাহিরে যে পথেই যাইতে চাহি না কেন, পৃথিবীর সব পথ আমার দিকেই ফিরিয়া আসিতেছে। কোন পথে যাইব?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.