সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে, নবকুমার ও কপালকুণ্ডলা যখন ‘অনন্ত গঙ্গাপ্রবাহমধ্যে’ বসন্তবাতাসের তাড়নায় বিক্ষিপ্ত ঢেউয়ের মালায় ডুবতে ডুবতে ভাসতে ভাসতে চিরতরে হারিয়ে গেলেন, বঙ্কিমবাবু পাঠকের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে উপন্যাস শেষ করে দিলেন – তারা, ‘কোথায় গেল?’ আট বছর পর, দামোদরবাবু তার জবাব দিতে গিয়ে লিখে ফেললেন কপালকুণ্ডলা-র উপসংহার মৃণ্ময়ী। সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের বিবেচনায়, দামোদরের রচনা, স্রেফ ‘বয়স্ক বালকভুলানো উপকথা’। কোথায় বঙ্কিম, আর কোথায় দামোদর! এই অব্দি পড়ে পাঠক যখন উঠি-উঠি ছাড়ি-ছাড়ি করছেন, তাহলে এবার খোলসা করে বলি, বঙ্কিম দামোদর কপালকুণ্ডলা নবকুমার, এসব নিয়ে কোনো নতুন কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই, আমি আসলে নস্কর পরিবারের কথা শুরু করতে চাই। তারা, কবে, কোথা থেকে যাত্রা শুরু করে, আমাদের এই এঁদো পেয়ারাবাগান গলিতে এসে থিতু হল, সেইটুকুতেই আমার আগ্রহ। এই বংশের কীর্তিমান পুরুষ শ্যাম নস্কর ওরফে কর্তামশায়, মৃত্যুর পরেও যিনি এতদঞ্চলে আজও ‘কর্তাভূত’ নামে শ্রদ্ধেয় এবং প্রাতঃস্মরণীয়, তিনিই এ গল্পের নায়ক। এ গলির সর্বপ্রাচীন পুরুষ রামরাম মুখুয্যে অবশ্য বলেন, যত শ্রদ্ধেয় হোন না কেন, ভূতকে প্রাতঃস্মরণীয় বলাটা ঠিক না, ওতে নাকি ‘সিদ্ধরস’-এর কৌলীন্য ভঙ্গ হয়, তাই ওঁর পরামর্শ প্রাতঃস্মরণীয় না বলে, লেখো রাতঃস্মরণীয়, ব্যাকরণে একটু ভুল যদি হয় হোকগে, রসের সিদ্ধি যেন অনাহত থাকে। এহো শিরোধার্য। এবার তাহলে কর্তাভূতের ইতিহাসের আলো-আঁধারিতে ঢোকা যাক।

‘সপ্তগ্রামের এক নির্জন ঔপনাগরিক ভাগে নবকুমারের বাস। এক্ষণে সপ্তগ্রামের ভগ্নদশায় তথায় প্রায় মনুষ্যসমাগম ছিল না; রাজপথসকল লতাগুল্মাদিতে পরিপূরিত হইয়াছিল। নবকুমারের বাটীর পশ্চাদ্ভাগেই এক বিস্তৃত নিবিড় বন।’ পাঠকের মনে পড়বে, এরপরই বঙ্কিম একটি খালের উল্লেখ করেছেন, যা আধ কোশ দূর থেকে প্রান্তর পার হয়ে এসে নবকুমারদের বাড়ির পেছন দিক দিয়ে তার প্রবাহ নিয়ে ওই নিবিড় বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ওই খাল আসলে সরস্বতী ও ভাগীরথী মধ্যে প্রবাহিত, আর নস্করদের পূর্ব-পূর্ব পুরুষের ভদ্রাসন ছিল ওই খালের ওপারে, বনের যেখানে শুরু, ঠিক সেইখানটিতে। আদতে তারা ছিল পেশাদার ফৌজি বংশ। প্রথম দিকে তারা লড়ত পাঠানদের হয়ে, পরে তারা যোগ দেয় ভুরশুটের মহারাজার সৈন্যদলে। সব শেষে, শোনা যায়, মুঘল আমলে তাদের বেশ পদোন্নতি ঘটে। নস্কর বংশের প্রথম নামজাদা পূর্ব পুরুষ হিসেবে, যাঁর নাম রতিকান্ত নস্কর প্রণীত নস্কর বংশাবলী-তে পাওয়া যাচ্ছে, তিনি হলেন বনমালী নস্কর। সরস্বতী নদীতে ততদিনে পলি জমতে শুরু করেছে, বনের পাশ দিয়ে বহে চলা খালে আর তেমন জোয়ার-ভাঁটা খেলে না, সপ্তগ্রাম ততদিনে পরিত্যক্ত জনপদ হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তবু বনমালী তখনো সপ্তগ্রাম ছাড়েননি, কারণ তিনিই ছিলেন, সপ্তগ্রামের বণিকদের রক্ষাকর্তা, সেনা-সহায়ক। নবকুমারের বৃত্তান্ত যখন চলছে, তখন নস্করদের বাড়িটি প্রায় পরিত্যক্ত। দাস-দাসী নিয়ে একা বনমালীই শুধু আছেন, বাকিরা হুগলীতে। কালের লিখন পড়তে ওস্তাদ বনমালী, আগেই ওখানে গঙ্গার ধারে বিশাল জমি কিনে নব-ভদ্রাসন তৈরির উদ্যোগ শুরু করে দিয়েছিলেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নবকুমারের পিতা মহাশয় ধ্রুবচন্দ্র শর্মা ও খালের ঠিক ওপারের প্রতিপত্তিশালী রাজকর্মচারী বনমালী নস্করের মধ্যে শোনা যায় ভালই সৌহার্দ্য ছিল, তাঁদের, আজকের লব্জে খালপারের পড়শি বলাই যায়। আর সেই সূত্রে নবকুমারও নিশ্চয় বনমালীর বিশেষ স্নেহের আশয় ছিলেন। গঙ্গাসাগর যাত্রার আগে সেকালে সবাই আত্মীয়-প্রতিবাসীদের সঙ্গে একরকম শেষ দেখার মত দেখা করে যেতেন। সকলেই জানেন, নবকুমার, যুগের একটু ব্যতিক্রম। তিনি মনে হয় না, ‘খুড়া মহাশয়, গঙ্গাসাগর চললেম’ বলে বনমালীকে বিদায় জানাতে যান। তবে সাগরযাত্রা, সহযাত্রীদের মুখাৎ নবকুমারের ব্যাঘ্রোদরে প্রবেশ, বিস্ময়করভাবে নববধূসহ প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি সমস্ত সংবাদই বনমালীর কর্ণগোচরে ছিল বলে মনে করা হয়। উপন্যাসের শেষের নাটকীয় বৃত্তান্ত সম্ভবত তিনি পরেরদিন অবগত হন এবং কাপালিকের সন্ধানে সমস্ত বনে লোকলস্কর পাঠিয়ে তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করে, একটি তাম্র কমণ্ডলু আর পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষের একগাছি মালা মাত্র হস্তগত করেন। আত্মপ্রসাদের সঙ্গে তিনি এও ঘোষণা করেন যে, অপরাধীকে না পাওয়া গেলেও, তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র তো বাজেয়াপ্ত করেছি!

বনমালীর অধস্তন চতুর্দশ পুরুষ রামলাল এবং তস্য পুত্রই বিখ্যাত শ্যামলাল; সংক্ষেপে শ্যাম নস্কর। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে, পেয়ারাবাগানে যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ আসে, হিসেব করে দেখা গেল, তখন তাঁর বয়েস, মাত্রই বিরাশি; উনি, একসময়, তাঁর পিতার মত, একশো এক বছর বাঁচবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কালান্তক যম এসে ইচ্ছাটি মুড়িয়ে দিয়ে গেলেন। যদি অস্বাভাবিক মৃত্যু না হত, আমাদের বিশ্বাস, তিনি পারতেন, একশো একের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাবার মতই বিজয়ীর হাসি হাসতেন। হল না। এ দুনিয়ায় জন্ম মৃত্যু বিবাহে কারই বা ইচ্ছা পূর্ণ হয়!

শ্যামলালকে লাট অঞ্চলের জঙ্গলে কারা হত্যা করে, পুরোপুরি হত্যা করে, নাকি তার অর্ধমৃত দেহ বস্তাবন্দি করে মুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়, জানা যায় না; বহু খানাতল্লাসি করেও অপরাধীদের হদিশ মেলেনি। তবে গভীর জঙ্গলে, হেতালের ঝোপে কয়েকগাছি লাঠি, দুটি কাতান আর একটি বেঁটে শাবল পুলিশের হস্তগত হয়, সকলগুলিতে ছিল রক্তচিহ্ন। দুর্দান্ত পুরুষের এমন অপঘাত-মৃত্যুর ভেতর দিয়েই যেন, নস্কর পরিবারের অন্তিম ঘনিয়ে আসে।

আরো পড়ুন মধু-গোবিন্দের জীবন

শ্যামলালের বস্তাবন্দি দেহ পাওয়া যায় মুড়িগঙ্গার চরে। শ্যামলাল ভাসতে ভাসতে ডুবতে ডুবতে সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে চড়ায় জিরোচ্ছিলেন। তখন রাত্রিকাল, আকাশে ছিল একাদশীর চাঁদ। মাছমারা নৌকোর জেলেরা জোছনার আলোয় ভাবল, নৌকাডুবির কোনো দিশাহারা মনুষ্য বোধহয় চড়ায় একা একা বসে কাঁদছে, চলো উদ্ধার করে আনি। পুলিশ অবশ্য ময়না তদন্ত করে জানিয়ে দেয়, শ্যামলাল নস্কর সম্ভবত খুন হয়েছেন একাদশীর দিন তিনেক পূর্বে। মাছমারারা কিন্তু বারবার বলেছে, বস্তার ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল বলেই তারা নৌকো ভিড়িয়েছিল, এ কখনো মিথ্যে হতে পারে না। আর তখন থেকেই শ্যামলাল হয়ে যান কর্তাভূত।

গণনা করে দেখা গেছে, কর্তাভূতের প্রথম আবির্ভাব ঘটে ঠিক খুনের রাত্রেই। শ্যামলাল গিন্নি স্বামীর গলাখাঁকারির আওয়াজ পান রাম ভিলার সিংদরোজার ঠিক বাইরে। উনি তখন দোতলার শোবার ঘরে, জানলার পাশে বসে আকাশে চাঁদ দেখছিলেন, ভাবছিলেন দশদিন হয়ে গেল, কর্তার তো কোনো খপর নাই, এত দেরি তো হয় না। আর তখনই কর্তার গলা পেয়ে তিনি নিচে নেমে আসেন, চাকরদের বলেন, কর্তা এসেছেন শুনতে পাও না? এত ঘুম! মানুষটা দূর দেশ হতে এসে কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছেন!

কোথায় কী!

জোছনার আলোয় চারদিক থমথম করছে।

হুগলি থেকে নস্কররা ঠিক কোন সনে ‘সুতালুটি’ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে, এ বিষয়ে রতিকান্তের গ্রন্থ নীরব। তিনি শুধু কিছু অনুমান গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। সুতানুটির নস্কররা সম্ভবত, বংশীধারী নস্করের পুত্র গিরিধারী নস্করের আমলে হুগলির ভদ্রাসনের অধিকার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়ে ভালমত অর্থের বিনিময়ে সুতানুটিতে এসে বসতবাটি নির্মাণ করে, এবং বিদেশিদের কুঠী ইত্যাদির সুরক্ষার কাজ ছাড়াও নানা কাজ-কারবারে জড়িয়ে পড়ে। সম্পন্ন পরিবার আরও ধনে-সম্পদে পরিপূর্ণ হতে থাকে। কিন্তু এই লক্ষ্মীমন্ত বাটিতে শ্যাম নস্কর মশায় যখন প্রকট হলেন, সেই ১৮৭৯ সনে, শরিকি মামলা-মোকদ্দমায় জেরবার পরিবারে হুড়মুড়িয়ে হঠাৎ শনির উদ্দাম নৃত্য শুরু হয়ে যায়। শ্যামলালের বাবা রামলাল অভিমানে পরিবার ত্যাগ করেন। তিনিই পেয়ারাবাগানে একলপ্তে ডাঙা-জল মিলিয়ে বিশ বিঘা জমি অল্প দামে কিনে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও বিধবা পিসিকে নিয়ে এখানে বসতি স্থাপন করেন উনিশ শতকের একেবারে শেষের বছরে। এই হল গিয়ে পেয়ারাবাগানে নস্করদের আগমন বৃত্তান্ত।

দীর্ঘজীবী রামলাল, কঠোর পরিশ্রমে নব উদ্যমে এতদঞ্চলে মূলত মৎস্যচাষ মারফত প্রচুর ধনার্জন করেন। সেই পিতৃব্যবসায়ে যুবক পুত্র শ্যামলাল হয়ে ওঠেন প্রধান সহযোগী। পিতার মৃত্যুর পরে লাট অঞ্চলে প্রচুর সম্পত্তি কিনে, জঙ্গল আবাদ করিয়ে প্রজা বসিয়ে অর্থলাভের নতুন নতুন পন্থা বার করেন শ্যামলাল। পেয়ারাবাগানের মধ্যস্থলে, পুরনো বাটি সংস্কার করে নির্মাণ করেন ‘রাম ভিলা’। ওটি লোকের মুখে মুখে কীভাবে যেন হয়ে যায় নস্কর ভিলা। আর ওই ভিলা এখন পরিত্যক্ত, শ্যামলালের তিন ছেলেমেয়ের বিবাদে-বিসম্বাদে সম্পত্তি আজ আদালতের আওতায়। শ্যামলালের অপঘাত-মৃত্যুর পর থেকে এ পরিবারে ফের শনির উদ্দন্ড নৃত্য। বংশগরিমা ভূলুণ্ঠিত। বাড়িটি পরিত্যক্ত হলেও, লোকে অবশ্য কখনো ভোররাতে, কখনো মাঝরাতে, চাঁদনি রাতে বা অমাবস্যার অন্ধকারে দীর্ঘদেহী বলবান বৃদ্ধ শ্যামলালকে প্রায়ই দেখতে পায়। লোকজনের বক্তব্য, অপদার্থ ছেলেগুলি তো মানুষ হল না, বিষয়সম্পত্তিও ধরে রাখতে পারলে না, তাই বুড়ো বয়েসে অগত্যা তাঁকেই ভিলা পাহারা দিতে হয়। রামরাম মুখুয্যে নাকি তাঁকে দু-একবার মহাকালী মন্দিরের সামনেও প্রত্যক্ষ করেছেন। একমনে হাত জোড় করে মাকে ভোররাতে রোজ নাকি প্রণাম করতে ভিলা থেকে বাইরে চলে আসেন। এসবই অবশ্য ‘ছেলেভুলুনি গল্প’ বলে ধরাই ভাল।

রতিকান্ত নস্করের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ঊর্ধ্বতন প্রথম ঐতিহাসিক দুর্দান্ত পুরুষ, বনমালীরও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। রতিকান্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন – ‘বনমালী নস্কর মহোদয়ের মৃত্যু স্বাভাবিক নহে, আশ্বিনের এক অপরাহ্নে নৌকা সহযোগে সালিখা যাইবার সময় কোতরং সন্নিহিত ভাগীরথীতে আত্মবিসর্জন দেন বলিয়া কথিত। তাঁহার গলিত বিকৃত শব দুই-তিন পর চুঁচুড়ার কনকশালি ঘাটে প্রাপ্ত হয়। হুগলির ফৌজদার তারেক মহম্মদ খাঁ, প্রিয় মিত্র বনমালীর দেহ, বনমালীর সুযোগ্য পুত্র বংশীধারীর হাতে অর্পণ করেন, অপিচ নিজে উপস্থিত থাকিয়া দাহকার্য সম্পন্ন করেন। মাঝিমাল্লারা ছিল পলাতক। তাহারা কেন পলাইল, তৎপশ্চাৎ কী হইল না হইল, কিছুই জানা নাই। ইতিহাস এইখানে নীরবতা অবলম্বন করিয়াছে।’

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.