গল্পটা শুরু করা যাক বাড়ির পুবদিক থেকে। পুবদিক খোলা উঠোন, উঠোনের একদিকে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে সজনা, পেয়ারা, নিম, তেঁতুল গাছ। খস ডুমুর আর পলাশ গাছকে জড়াজড়ি করে তেলাকুচা লতার জঙ্গলের প্রাচীর। তার একটু সামনে মনসা গাছ। দখিনদিকে রান্নার উনুন, মুরগির ঘর, মুরগির ঘরের পিছনে জ্বালানি কাঠ, ভাঙা বালতি, ছেঁড়া প্লাস্টিক, আরও কিছু প্রয়োজনীয় ভেবে রাখা বাতিল জিনিস। ছোট একটা খুটে পাঁঠা বাঁধা। মাঝে মাঝে ছিক ছিক করে মুতছে। এলাকায় একটা উৎকট গন্ধ। মনসাপুজোর জন্য রাখা মানতের পাঁঠা। সে মনসাপুজোর মানত পাঁঠা না হলে এতক্ষণ মাঠে হাওয়া খেত, ঘাস খেত। পাঁঠাটার সামনে ঘাস দেওয়া। সে দিকে পাঁঠাটার নজর নেই, সে মুখ উঁচু করে আকাশের দিকে কিছু দেখছিল।
মুরগির ঘরের সামনে তখন ভিড়। প্রথমে খলবল করতে করতে বেরিয়ে পড়ল ছানা থেকে একটু বড় হওয়া মুরগিগুলো। এরা এখন আর মায়ের পিছু পিছু ঘোরে না। বেরিয়েই উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল। ডিম দেওয়া মুরগি বেরলো তারপর। শেষে মোরগটা। বেরিয়ে ডাক দিল জোরে। একটু বড় হওয়া ছানা মুরগিগুলো তখন খাবারের থালার পাশে ভিড় জমিয়েছে। কুড়ো, খুদ ভাতে ফ্যান দিয়ে মাখা। সাথে আগের দিনের বাসি ভাতের অল্পস্বল্প কিছু।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মুরগির খুল্লার ভেতর থেকে মাথা বের করে আনল বুধনি। নাঃ, একটাও ডিম নেই। সে মুরগির ঘরের দিক থেকে হাঁসের ঘরের দিকে গেল। বারোখানা হাঁস তার। চারখানা মাদি ডিম দিচ্ছে। এখানেও যদি ডিম না থাকে, মাদিগুলোকে আটকে রাখতে হবে। নাহলে পুকুরপাড়ে, ঝোপে ঝাড়ে বনে বাদাড়ে যেখানে পারবে ডিম দিয়ে দেবে। মাস্টারের বাড়ি থেকে ডিম চেয়েছে রবিবারে। বুধনি একটা একটা করে হাঁসগুলো বের করছিল।
এমন সময়ে বাড়ির মধ্যে এল সরকারি দিদিমুনিরা। এইসব বাড়ির মধ্যে আসতে হলে কলিং বেল বা সদর দরজা পার করার দরকার হয় না, সরাসরি ঢুকে গেলেই হয়। বাড়ির সীমানা বলে একটা জিনিস থাকলেও সে প্রাচীর আবৃত নয়। সরকারি দিদিমুনিদের সাথে মাস্টারের বউও ছিল। মাস্টারের বউ আইসিডিএস দিদিমুনি। বুধনির ছেলেটার বয়স চার, বয়সের তুলনায় রোগা। বছরের বেশিরভাগ সময়ে রোগে ভোগে। কয়েকমাস আগে থেকেই খাতায় মার্ক হয়েছে ‘লাল বাচ্চা’ হিসাবে। লাল বাচ্চা মানে মাত্রার বেশি অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চা। বুধনিকে মাস্টারের বউ সেন্টারে ডেকে পাঠিয়েছিল কয়েকবার। বুধনি যায়নি। গেলে কী কী বলবে, তা জানে বুধনি। সেন্টার থেকে হোমে পাঠানোর কথা বলেছে, শরীরের যত্নের জন্য। হোমে বাচ্চা তো একা যাবে না, তার মাকেও যেতে হবে। দু-তিন মাসের ধাক্কা। এতদিন বাড়িতে না থাকলে কি চলে? ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে না-ও বলতে পারে না। বাচ্চা যে দিনে দিনে রুগ্ন হয়ে যাচ্ছে তা তার থেকে ভাল আর কে বোঝে! সরকারি দিদিমুনিদের দেখে তাই সে উদাসই থাকল, বলা ভাল মুরগির ঘরের সামনে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
হাঁসগুলো প্যাঁক প্যাঁক করে উঠোন ভরিয়ে দিয়েছে। উনানশালের এক পাশে গামলা ভর্তি আমানি খাচ্ছিল বামাপদ, বুধনির শ্বশুর। বামাপদর কোল ঘেঁষে বসে আছে সুরজ। চুলগুলো রুক্ষ, পেটটা ফোলা, নাকে সিকনি। উদোম শরীরে একটা কালো প্যান্ট আর কালো ডোর। হাতের বাহুতে মাদুলি, গাছ বাঁধা। সুরজ এখন সরকারি খাতায় লাল বাচ্চা। আমানির থালা থেকে মুখ না তুলে বামাপদ বুধনিকে ডাকল। সরকারি লোক এলে চেয়ার দেওয়া প্রথা, চেয়ার না থাকলে একটা টুল, তাও না থাকলে মাদুর…
সরকারি দিদিমুনিদের দলের একজন দেখতে বেশ ওজনদার। গলায় দাপটও আছে।
– আমরা বসতে আসিনি, বুধনি। বাচ্চাটিকে সেন্টারে পাঠাও। তোমাদের জন্য আমরা বদনাম করতে পারব না।
সে ব্লকের প্রতিনিধি। বিডিও সাহেবের নির্দেশ, যে করেই হোক লাল বাচ্চা সংক্রান্ত খবর পাঁচ কান হয়ে মিডিয়ার কাছে পৌঁছনোর আগে হোমে পাঠাতে হবে মা-ছেলেকে। অপুষ্টি/অনাহারে মৃত্যু সংক্রান্ত ব্যাপারে জেলা আগেই নাম পুড়িয়েছে। মিডিয়ার নজর থাকে সবসময়। এত প্রকল্পের পরও যদি অপুষ্টি সমাজে বেঁচে থাকে তাহলে, বিডিও সাহেবের প্রমোশন অনিশ্চিত।
সরকারি দিদিমুনির উত্তর দিতে এগিয়ে এল বামাপদ।
– আমাদের ছ্যালা আমরা বুঝব। সরকারি লোক তুমরা, আসিছ, ভালো কথা। এখন ফিরত যাও, কাগজে যা মুনে লাগে লিখো।
মাস্টারের বউ বলে – কী বলছ খুড়া? তারা তো তোমার ভালোর লেগেই এসেছে, তুমিই গরম হছ।
– সে তুমরা যায় বলো, আমি নুনুকে এখন হোমে পাঠাব না। হোমে পাঠিয়ে নুনু* বাঁচবেক না।
ব্লকের দিদিমুনি গরম হয়। ছোট জাতের এই একটা সমস্যা। একবার কিছু একটা বুঝলেই হল। তোদের ভালর লেগে সরকার আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিছে, ব্লক থেকে টোটো করে গাঁয়ে আসতে কোমরের হাড় খুলে গেলে, এখন উনি বলছেন ছেলে হোমে পাঠাব না। তা কেনে পাঠাবি না শুনি?
যাকে নিয়ে এই উত্তেজনা, সে সম্ভবত ভয় পেয়ে বামাপদর পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। হাত এঁটো, কিছুক্ষণ আগে বামাপদর খাওয়া আমানিতে ভাত খুঁজতে গিয়ে হাত এঁটো করেছে। বামাপদ সুরজকে কোলে তুলে বলে, নুনুকে পাঠালে নুনুর মাকেও পাঠাতে হবে। মাকে পাঠালে ঘরের কাজ কে করবে? পরব মাথার উপর। ঠাকুরে চাইলে নুনু এমনিই ভাল হয়ে যাবেক।
ব্লকের দিদিমুনি রাগে ফেটে পড়তে চাইছিল, কিন্তু বামাপদ বেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। মনসার থানে ঠাকুরের গায়ে রং করা হচ্ছে সকাল থেকে। আহা, সে রং করা দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায়। পদ্মের উপর বসা, মাথার উপর সাপের ফনার পাঁচটা লকলকে জিভ। কদিন পরে জমে উঠবে পরব।
দিদিমুনির রাগ গিয়ে পড়ল বুধনির উপর। বুধনির হাতে দুটো হাঁসের ডিম। মাস্টারের বউকে যখন সামনে পেয়েছে, তখন হেঁটে আর তার বাড়ি কেন যাবে? এখানেই ধরিয়ে দেবে। সে ডিম দেওয়া ও টাকা নেওয়ার জন্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, না হলে তার অনেক কাজ। তিন বালতি কাপড় নিয়ে যেতে হবে বাঁধে (পাড়ার পুকুর), ঘরদোর গোবর লেপা দিতে হবে, ঝুল ঝাড়তে হবে, রান্নাঘরের বাসনকোসন যা আছে সব পরিষ্কার করতে হবে। পরব বলে কথা! এবার পাঁঠা মানত। ছেলের দিকে যদি মা মুখ তুলে চায়! কোনো নিয়মে ভুল রাখা যাবে না!
ব্লকের দিদিমুনি বলে – কেমন মা তুই? ছেলে না খেয়ে মরে যাছে, তোর ছেলেকে নিয়ে ব্লকের লোকের ঘুম নাই, মিটিং হচ্ছে, জেলাতেও খবর গেছে, আর তুই নিশ্চিন্ত হয়ে আছিস? এতগুলা হাঁস-মুরগি দেখলাম, ডিমগুলো কী করিস? সব বেচিস? সব না বেচে এক-দুটোটা ছেলেকেও তো খাওয়াতে পারিস।
বুধনি হাঁস মুরগির ডিম বেচে ঠিকই, না বেচে তার উপায়ই বা কী? ছেলের লেগে ডাক্তারে ভিটামিন লিখেছে। বাজারে নতুন ডাক্তার বসেছে, আরোগ্য মেডিকেল হলে। ব্যাঙ্ক থেকে লক্ষ্মী ভাণ্ডারের হাজার টাকা তুলে, ডাক্তার দেখিয়ে ব্লাড টেস্টের টাকা দিয়ে ওষুধ কেনার টাকা কুলোয়নি। মেডিকেল হলের লোকটা বলল, একটা কম দামের ভিটামিন আছে। সেটা খাওয়ালেও শরীরটা সারবে অল্প। পনেরোটা ডিম বেচতে পারলে টাকাটা উঠে আসত।
এ গেল এখনকার কিসসা। ডিম বেচে কতকিছুই করতে হয়। এতকিছু কি আর দিদিমুনিরা জানে?
বুধনি বলে, খাওয়াই তো, কিন্তু হজম হয় না। ছ্যারায়। শরীলের গতিক ভালো না। ডাক্তার সিরাপ লিখেছে, বুলেছে, খাওয়ালে ঠিক হবেক।
– তাহলে তোরা যাবি না হোমে? বিডিও সাহেবের অর্ডার শুনবি না?
বুধনি চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে – আমি গেলে সংসারটো চলবেক কী করে দিদিমুনি। ঘরে কে আছে? আমি চলে গেলে হাঁড়ি চড়বেক না। আরও কটি পেট আছে, হাঁস মুরগি আছে। পরবের সময় মেলা কুটুম বাটুম আছে, তারা কি ফাঁকা বাড়িতে আসবে? বছরকার পরব দিদিমুনি। একটা পরব আমাদের না করলেই না।
রাতে ঘুম আসে পাহাড় সমান। সারাদিন বালতি ভর্তি কাপড় কাচা, উঠোন নিকানো, রান্না করা। ‘বারের উপোস’ করে এসব কাজ করতে শরীর আইঢাই করে। চান না হলে মুখে কিছু দেওয়া যায় না। কাজ না শেষ করে চান করা যায় না, চান করে যখন লুচির থালা নিয়ে বসে, তখন বমি আসে। ভাত খেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ভাত খাওয়া যাবে না। এক টুকরো পেয়ারা মুখে দিলে মুখের সাড় আসে। একটু জল দিয়ে চিড়া গুড় মেখে খায়। খেতে খেতে ছেলেটা এসে বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাক্ষসের মত ব্লাউজ ধরে টানে। শুকনো বুকে কী পায় কে জানে, চুষতে থাকে। দাঁতের কামড়ে শুকনো বুকে ব্যথা লাগে। মাঝে মাঝে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আবার মায়া হয়, টেনে নেয়। বুকের দুধটুকু ঠিকভাবে পায়নি ছেলেটা। জন্মানোর সময়েও ছিল রুগ্ন। বাপের মুখও দেখেনি। বাপ থাকলে হয়তো এত অযত্ন হত না। ছেলের মুখ দেখলে বাপ কী শুধরাত না?
বুধনি একা একাই বা কী করত?
ভাল লোকটা দিনের দিন কেমন যেন হয়ে গেল। মদ খেয়ে সারাদিন মাতাল। সংসারে এক পয়সা আনে না। উপরি টাকার খাঁই। বাপের বড় সোহাগের ছেলে। তিনবার মরা বাচ্চা বিয়ানোর পর শাশুড়ির হয়েছিল মেয়ে। মেয়ে হবার পর আবার মেয়ে। ডাক্তার বলেছিল আর বাচ্চা হলে মারা যাবে মা। তবু বাচ্চা হল – সুরজের বাপ। মা মনসার কাছে জোড়া পাঁঠা মানত করে ছেলে হল। মা মরল কবছর বাদে। বামাপদ নাম রেখেছিল লখিন্দর। মা মনসার কাছে মানত করে পাওয়া ছেলে। কোল থেকে নামাত না বামাপদ। স্কুলে মাস্টারের মার খেয়ে ছেলে বলল – আমি আর স্কুলে যাব না।
বুধনি এল লখিন্দরের সাথে। ফোনে ফোনে কথা হয়ে পিরিতি। বামাপদ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বউ ঘরে তুলল। বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে শুধু বউ এল, সাথে না ঘটিবাটি, না নগদ। বুধনির বাপের ঘরে কেউ নেই। দেবেই বা কে? বাপ-মা মরেছে ছোটতে। দাদা-বৌদি তাড়াতে পারলে বাঁচে। বুধনি অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। কোন সংসার আছে, যেখানে ঝামেলা নাই? অশান্তি নাই? দাদার বাড়ি বেশি দিন থাকবে না সে ভেবেই রেখেছিল। দাদা বৌদিও চাইত বিদায় করতে। কন্যাশ্রীর টাকাটুকু কাউকে দেয়নি বুধনি। লখিন্দরের সাথে চলে আসার সময়ে ব্যাংক থেকে নগদ তুলে নিয়ে এসেছিল তা কেবল বুধনি আর লখিন্দর জানে। প্রথম প্রথম কত সোহাগ! মোটরসাইকেলের পিছনে বসিয়ে ঘুরে বেড়াত। নবকুঞ্জের মেলাতে গিয়ে চাউমিন খেত এক প্লেটে। সোহাগে ভুলে গিয়ে বুধনি ভুল করল। কন্যাশ্রীর টাকা তুলে দিল লখিন্দরকে। বলল – ব্যবসা করো, মুদির দোকান দাও। না হলে বিকালে চপ-চাউমিন ভাজো। পয়লা আষাঢ় চাউমিন, মাংসের পকোড়ির দোকানের পুজো হল। লখিন্দরের দোকানে বসে লোকে পকোড়ি খেল। বুধনির চোখে তখন উথলে পড়া সংসারের স্বপ্ন।
সেইবারই ভুল হল।
মনসাপুজোর দিন। থানে কত লোক। সারারাত পুজো হবে। পুজোর মানতের পাঁঠা বাঁধা সারে সারে। থানের পাশে ইট দিয়ে বানানো অস্থায়ী উনুন। এই থানের নিয়ম, বলির পাঁঠার মাংস বাড়িতে আনা যাবে না। খেতে হবে থানে বসেই। মেয়েদের সেখানে যাওয়া মানা। পুরুষমানুষের পুজো নেবে দেবী। পুরুষমানুষের পুজো না হলে কি পুজো হয়? চাঁদ সদাগরের কাহিনী কথক ঠাকুরের মুখে শুনেছে। মা মনসার দুঃখের কিসসা। দেবী হলে কী হবে, তাদের মতই দুঃখের জীবন তার। জগৎ সংসারের বাপ অমন ভোলাক্ষ্যাপা মহাদেব, সেও পরিচয় দিল না। সৎ মায়ের অত্যাচারে চোখ গেল। সোনার বরন গায়ের রঙ হলেও স্বামী ছেড়ে গেল রাগে।
সারারাত চলে পুজো। পুজোর থান থেকে দূরে বসে থাকে মেয়েরা হাত জোড় করে। মা, ক্ষমা করে দিও মা। ভুল কিছু হলে ক্ষমা করে দিও। খিচুড়ি, লুচি, ফল, মিষ্টি, পান, সুপারি দিয়ে সাজানো হয়েছে ভোগের থালা।
কী সৌভাগ্য!
ঢাক কাঁসর বাজতে শুরু করলে কিছু পরে মা মনসা এল লতা (সাপ) হয়ে। বুধনির পাঁঠাকে ছোবল দিল। সাপে কাটা পাঁঠা মায়ের প্রসাদ মায়ের জন্য উৎসর্গ না করে, হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাল বুধনি। বামাপদর নিষেধ শোনেনি।
সবাই বলল, মেয়ের বুদ্ধি দেখো! মায়ের লেগে মানত করা পাঁঠা, মা নিজে এসে ভোগ খেয়ে গেল, সে পাঁঠা চিকিৎসা করে! মায়ের জিনিস মা যা ভালো বুঝত করত! কী অবস্থা করে দেখো। বুধনি মা মনসার রাগ বোঝেনি। বিষহরি মা, বিষ নিতে যেমন জানে, ঢালতেও জানে। যদি বিষ উগরে দেয় সংসারে, তাহলে সংসার ছারখার হতে সময় লাগবে না। অমন বণিক চাঁদ, তার ঘর করেছে ছারখার। রাজা মানুষ ফকির হয়ে ঘুরেছে রাস্তায়। আমরা তো কোন ছার।
দশ হাজার টাকা নগদ পেয়ে লখিন্দরের মন রাজার পারা। বেহুলার জন্য লাল ঝলমলে শাড়ি এল। বন্ধুদের সাথে মদ খেল দেদার। মনে ফুর্তি আর ফুর্তি।
কাজিয়া ঝগড়া শুরু সেই থেকে। বুধনি যত আঁটে তত উড়ে লখিন্দর। বাপের বার্ধক্য ভাতার টাকা তার পকেটে এল। শেষে দোকানের ক্যাশবাক্স। রোজই হিসেব গরমিল হয় বুধনির। মাংসের পকোড়িতে পচা মাংস বেরলো। চাউমিনের খদ্দের কমল। বুধনির শরীরও আইঢাই। পেট বড় হচ্ছে দিনে দিনে। দোকানের ঝাঁপ কোনোদিন খোলে, কোনোদিন খোলা হয় না। লখিন্দর মদের ঘোরে পড়ে থাকে রাস্তার ধারে। চেনা লোকে চিনতে পারলে ফোন করে বামাপদকে।
বামাপদর রাগ গিয়ে পড়ে বুধনির উপর। মা এসে নিজে খেয়ে গিয়েছে যে ভোগ, সে প্রসাদ বিক্রি করার পাপ এসব।
বুধনি মাকে বলে – মা, তুর মনে কি দয়া হয় না? এত নিঠুর কেনে তুই?
বামাপদ বলে – মেয়েমানুষের বুদ্ধি। মায়ের প্রসাদ কেড়ে নিলে মা রাগ করবে না? মা যেমন ভাল তেমনি রাগী।
মনসাতলায় দুধ রেখে আসে বামাপদ। বুধনির দুধভাতের বাটি দেখে খিদে চড়চড় করে বাড়ে। চোখ লোভ সংবরণ করতে পারে না। মনসা তলে গিয়ে আবার ফেরত আসে। নিজের উপর ক্ষোভ হয়, এ কী কাজ করতে যাচ্ছিল সে! মায়ের জন্য রাখা বাটি এঁটো করছিল! সরকারি কেন্দ্রের খিচুড়ি গপগপ করে গিলতে গিলতে লাউগাছের মাচা দিয়েছে।
সেদিনও এমনই একটা দিন ছিল।
হাঁড়িতে ভাত ফুটছিল। বুধনি আর বুধনির শ্বশুরের সংসার। তবু বুধনি চাল নিত চারজনের। পেটেরটার যেন সবচেয়ে বেশি খিদে। সকালে খিচুড়ি খেয়ে দুপুর হতে না হতে আবার খিদেতে পেট চড়চড়। রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবত লখিন্দর যদি আসে।
সেদিন বুধনির রান্না করতে শখ জেগেছিল খুব। বাঁধ থেকে গুগলি তুলে নিয়ে এসেছিল। পাড়ার দোকান থেকে ধারে এনেছিল তেল, মশলা। ঘরে পাকা কুমড়ো ছিল যেটা, সেটা এনে ডুমো ডুমো করে কাটছিল। ভাতের হাঁড়িতে ভাত। এমন সময়ে লখিন্দর এল। লখিন্দরের দিকে তাকানো যায় না। কতদিন চান করেনি কে জানে? মাথার চুল রুক্ষ, চোখে পিচুটি, দাঁত হলুদ। জামা যেটা পরা ছিল সেটা, ধুলো কালিতে মাখামাখি। হাতে বিপত্তারিণীর লাল সুতোর রং কালো হয়ে গেছে। বিপত্তারিণীর বথ করে বড় আশা নিয়ে হাতে সুতো বেঁধেছিল বুধনি, ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। বাহিরমুখো স্বামী আবার ঘরে ফিরবে, কোল ভরে আসবে সোনার চাঁদ, স্বামী ছেলেকে নিয়ে ঘর করবে। সেসব হয়নি। বরং লখিন্দরের মদের নেশা বেড়েছে আরও। আগে তবু সপ্তাহে একবার ঘরে আসত, এখন তাও না।
লখিন্দরকে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি বুধনি। জ্বালানোর জন্য ডাল ছিল, তাই তুলে লখিন্দরের পিঠে বসিয়ে দিল। ভেবেছে প্রত্যুত্তর আসবে। লখিন্দরের পালটা মার দেওয়ারও শক্তি নাই। ঘরে উঠার মুখে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ছে। বুধনির যেন জ্ঞান হারিয়েছে। লখিন্দরের চুল ধরে টেনে চড় ঘুষি দিয়ে স্বাভাবিক করতে চাইছে, যেমন তার দেখা পুরুষমানুষ হয়। তার চোখে পুরুষমানুষ খাটবে বেদম, খাবে থালা ভর্তি, রাতে বউয়ের উপর চড়বে, ছেলেকে ঘাড়ে বসিয়ে মাঠে যাবে, মাসে এক দুবার বউয়ের পিঠে কাঠ ভাঙবে অকারণ, আবার মেলায় নিয়ে যাবে।
বুধনির চেঁচামেচিতে পাড়ার মেয়ে-মরদ জড়ো হয়েছে। বুধনির হুঁশ নাই। বুকের কাপড় এলোমেলো। উঁচু হওয়া পেট নিয়ে লখিন্দরের উপর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কে যেন এসে বুধনিকে ধরল, কুয়ো থেকে জল তুলে বালতি দিয়ে লখিন্দরের মাথায় ঢালল, ভাত নামাল, লখিন্দরকে খেতে দিল। লখিন্দর উঠানে উবু হয়ে বসে সে ভাতের থালা থেকে গপগপ করে খেতে শুরু করল। বুধনির হুঁশ এল তখন। লোকটা শুধু ভাত খাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে দোকান থেকে ডিম আনল দুটো। ভেজে পাতে দিতে যাবে, তখন লখিন্দর এঁটো থালার পাশে ঘুমিয়ে গেছে আবার। বুধনি পাশে বসে হাহুতাশ করে। বামাপদ মনে মনে দোষ দেয় বুধনিকে, মুখে কপালের। মুখে বলে – মা গো, ভুল ত্রুটি ক্ষমা দে মা। জোড়া পাঁঠা দেব। এমন করে সংসারটা শেষ করে দিস না।
আরো পড়ুন লাপতা লেডিজ প্রত্যাশা জাগায়, পূরণ করে না
এসব চোখের সামনে ভাসে বুধনির। সেই দিন কটা শেষ। তারপর আর লোকটাকে দেখেনি বুধনি। সারারাত উঠানেই পড়ে ছিল। বুধনি কাছে গিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ঘরে চলো। খুব লেগেছে? মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। ঘরে চলো।
চোখ মুছে পাড়ার দোকান থেকে গন্ধ সাবান এনে ডলে ডলে সাফ করল। চুল কেটে নিয়ে এল নাপিতের কাছ থেকে। সোমবার শিবের নামে উপোস দিল। সোহাগ করল কত। দরকার হলে ঘরে তালা দিয়ে রাখবে তবু, ঘর থেকে বাইরে যেতে দেবে না। লখিন্দর ভাল মানুষের মতো ঘরে রইল কটা দিন। বুধনি পেটের বাচ্চার দিব্যি কাটাল তাকে দিয়ে, যেন আর ঘর থেকে না চলে যায়। বলল, ঘরে থাকো, মদের নেশায় আর যেয়ো না। যেমন করে হোক পেটের ভাতটুক জোগাড় করে লিব আমি।
আহা রে! বুধনির স্বপন! বুধনির সংসার! এর চেয়ে বেশি স্বপন বুধনি দেখতে শেখেনি। ভাতের হাঁড়ি থাকুক আর স্বামী ছেলে ঘরে থাকুক। এই তো বুধনির জগতের স্বপন।
কিন্তু তা আর হয় না।
হাসপাতালে বাচ্চা হল। ছেলে দেখল না বাপকে। হাসপাতালের দিদিমুনি নাম দিয়ে দিল সুরজ। তিনদিনের মাথায় এসে ভাত রাঁধতে বসল বুধনি।
দোকানটা বিক্রি করে চলেছিল কিছুদিন। কিছুদিন চলে জঙ্গলের কাঠ দোকানে বিক্রি করে। ধান লাগানোর সময়ে মাস্টারের জমির ধান লাগিয়ে চলে কিছুদিন। মাস্টারের ছেলের বউমা প্রধান। ছেলে অসীম মাহাতো ছেলে খারাপ না। কাকি বলে কথা বলে। চেষ্টা চরিত্র করে বুধনির জন্য ‘সরকারি সাহায্য’ থেকে হল হাঁস-মুরগি, লক্ষ্মী ভাণ্ডার। অসীম বলে – ভোটটা আমার কথাতে দিও। তুমাদের সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। আমি তুমাদের খারাপ চাইব কখনো?
খারাপ, ভাল জিনিসটা ঝাপসা লাগে। অসীম যখন ‘সুবিধা পাইয়ে’ দেওয়ার জন্য রেশন কার্ড, আধার কার্ড নিয়ে যায়, তখন অসীমকে দেবতা মনে হয়। আবার যখন অসীমদের জমিতে ধান লাগাতে যায়, বাড়ির বাইরের চাতালে বসে মুড়ি আর আলুর তরকারি খায়, তখন অসীমদের খুব দয়ালু মনে হয়। আবার অসীম যখন দোকানটা নিয়ে নিয়েছিল তখন খুব খারাপ মানুষ মনে হয়েছিল তাকে। নগদ দাম দিয়েছিল, তবু খারাপ মনে হয়েছিল অসীমকে।
বুধনি খারাপ, ভাল জানে না। জেনেই বা কী করবে?
পুজো শুরু হয়ে গেলেও মনসার থানে যেতে পারেনি। ছেলেটার ধুম জ্বর এসেছে সন্ধ্যা থেকে। রাতের নিহর লেগে বাড়বে আরও। ছেলেকে থানে নিয়ে যাওয়া মুশকিল, আবার ঘরে একলা ফেলে যাওয়া যায় না। জ্বরের জন্য ট্যাবলেট আনলে ভাল হতো, কিন্তু কে আনবে? বামাপদ একটু আগে পাঁঠাটাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। গান বাজছে জোরে। শব্দের আঘাতে জ্বরের মধ্যেই কেঁপে উঠছে সুরজ। ছেলেটা কি মারা যাবে? লখিন্দর ছেড়ে গেছে। বামাপদর দুচক্ষের বিষ বুধনি, এবার ছেলেটা মরে গেলে কার দুয়ারে যাবে? একলা মেয়েছেলের লেগে কি কোনো দুয়ার আছে? প্রতিষ্ঠা পেতে মা মনসাকেও পুরুষের দুয়ারে ঘুরতে হয়েছে, আর বুধনি কোন ছার। বুধনি অসহায় হয়ে বসে আছে। কী করবে এখন? চীৎকার করবে? চেঁচামেচি করে পাড়া মাথায় করবে? ভাবতে পারছে না আর। বাইরে গুম গুম আওয়াজ উঠছে – জয় মা মনসা।
বুধনি সুরজকে কোলে তোলে। রোগাসোগা ছেলেটাকে কোলে তুলতে পারছে না। ভারি লাগছে। এত ভার এই প্যাকাটির মতো শরীরে কীভাবে যে আসল, বুঝতে পারছে না বুধনি। কিন্তু থামলে হবে না। ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। একলা হলেও ছেলেটাকে বাঁচাবে সে। বুধনি হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করছে ছেলেটার শরীর নিয়ে।
বুধনির কোমরে জোর আসছে… অসীম জোর…
* পুরুলিয়ায় ছোট ছেলেমেয়েদের নুনু বলে ডাকা হয়
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








