১। একটু একটু করে চা খাচ্ছে দুজন মাঝবয়সী। একজন ধরিয়েছে সিগারেট। ছোট্ট ছোট্ট টান। দেখে মনে হয়, তাড়া নেই। কারোরই। চমৎকার ঝলমলে একটা দিন। ওদের দুজনের চোখমুখও। চিন্তামুক্ত মানুষের মুখ যেমন। ওরা নাকি তবু আত্মহত্যা করবে ঠিক করেছে, খানিক পরেই।
অ) আত্মহত্যা বিষয়ে জানতে ২ দেখুন।
আ) ওদের বিষয়ে জানতে ৫ দেখুন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২। বৃষ্টি হলে কলকাতা শহরে আত্মহত্যা কমে যায়। বলেছিলেন বেলাল চৌধুরী। আমরা মিলিয়ে দেখিনি, কথাখানা বিশ্বাস করছি। কেননা, মূলত আমরা আত্মহত্যার পক্ষে নয়; বৃষ্টি অর্থাৎ জল অর্থাৎ জীবনেরই পক্ষে। মানুষ আত্মহত্যা কেন করে তা অত্যন্ত সিরিয়াস বিষয়। না জেনে কিংবা অল্প জেনে তা নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। ফেসবুকে অনেকেই বলে থাকেন, না বললেও পারেন। সব বিষয়ে যে কথা বলতেই হবে, আর সকলকেই যে অন্যান্যদের পরামর্শ দিতে হবে, এরকম ভুল ধারণা দিনের পর দিন জীবনে বয়ে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না। তবে সবথেকে বিপজ্জনক ব্যাপার হল, চটজলদি মনোযোগ কাড়তে আত্মহত্যার সম্ভাবনা ভাসিয়ে দিয়ে আড়ালে বসে মজা দেখা – ‘আসি’। এর দরুন যেদিন পালে বাঘ পড়ার গল্পটি সত্যি হবে, সেদিন আফসোসের শেষ থাকবে না।
অ) আত্মহত্যা বিষয়ক চর্চা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলে ৩ দেখুন।
আ) আত্মহত্যা বিষয়ক প্র্যাঙ্ক সম্পর্কে কৌতূহলী হলে ৮-অ দেখুন।
৩। পালে বাঘ পড়ার গল্পখানা একটা জিনিস সাফ সাফ বুঝিয়ে দেয়। যে মানুষ সাধারণত অন্যের বিপদে ছুটে যায়। এমনকি বাঘের মুখে পড়তে হবে জেনেও। অর্থাৎ মানুষ স্বভাবত সহমর্মী। এখন, এই সহমর্মিতার চর্চা ভীষণভাবে রাজনৈতিক। তত্ত্ব বলুন বা আদর্শ, কোনোকিছু দিয়েই আর আজকের মানুষকে এককাট্টা করা যাচ্ছে না সেভাবে। বহুকাল মানুষ জানত, একেবারে আদর্শ কোনো অবস্থায় সহজে পৌঁছানো যায় না। তবে, চেষ্টাটা করা যেতে পারে। এই ভাবনাটা জমাট বেঁধে গেলে মুশকিল একটাই, মানুষে মানুষে দূরত্ব ক্রমশ ঘুচতে থাকে। ফলত অসাম্যও। অন্তত সেই কমানোর দিকেই মানুষের মন থাকবে। তাতে গোলমাল, টাকাওলাদের। এমনধারা চলতে থাকলে তারা আর তেমন টাকাওলা থাকবে না। টাকা নেই তো ক্ষমতাও নেই। অতএব পালটা তত্ত্ব এল, এইসব ভাবনায় মারো গুলি। নিজের চরকায় তেল দাও, আর আখের গোছাও। তুমি গুছিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠলেই বলা যাবে, ওসব সংগ্রাম-টংগ্রাম ফালতু। মানুষ চাইলেই হড়কে এ ক্লাস থেকে ও ক্লাসে গিয়ে চমৎকার শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তুলতে পারে। এই করতে করতে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। সহমর্মিতার এখন ভাঁড়ে মা ভবানী। আর ওটি নেই বলেই, ঘৃণা বিদ্বেষের বাড়বাড়ন্ত। অতএব এখন গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে মানুষকে বলতে হচ্ছে যে, বাপসকল, সহমর্মী হয়ে ওঠো। আর এই কাজে মানুষকে নাকি খুব সাহায্য করছে বাঘ। শোনা যায়, দিল্লিতে একবার নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সময় নেতা-মন্ত্রী-বিশিষ্টদের পালে একখানা চিতাবাঘ পড়েছিল। আমাদের ধারণা, মানুষ আর তার সহমর্মিতার পরীক্ষা নিতেই চিতাটি সেখানে গিয়েছিল। মোদ্দা কথা তাহলে এই যে, পালে বাঘ পড়া গল্পের বাঘটিও আদ্যন্ত রাজনৈতিক।
অ) এই কচকচানি ভালো না লাগলে ৫ দেখুন।
আ) রাজনৈতিক বাঘ নিয়ে বাকি কথা ৪-এ।
৪। বাঘ অনেক ক্ষেত্রে কাগজেরও হয়। তাদের ন্যাজ দেখা যায় না। তবে তারা নিজেরা ভাবে যে, ন্যাজ একখানা আছেই। এইখান থেকেই গোলমালের শুরু। চলতে ফিরতে তারা ন্যাজখানা এর ওর গায়ে তুলে দেয়। প্রমাণ করতে চায় বাঘপনা। তা এমন বিনা ন্যাজে বাঘগিরি ফলালে লোকে ভয় পাবে কেন! কাগজের বাঘ তাতে আরও রেগে যায়। সে তখন নখ দিয়ে আঁচড়ায়। দাঁত দিয়ে কাটে। দাঁত-নখ তো সত্যি। মানুষ মূলত জন্তু। ভিতরে থেকে তা গরগর করে। বেরিয়ে এলে অনেক মানুষকে অকারণে জখম করে। তাতেও এদের সাধ মেটে না। এরা তখন এদিক ওদিক তাকিয়ে, চোখ বন্ধ করে টুক করে রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে। তারপর সানন্দে মানুষ খেতে শুরু করে। মানুষের ঘর খায়, মাটি খায়, চাকরি খায়, জমিতে লোনা জল ঢুকিয়ে ধর্ষকাম তৃপ্ত করে। মানুষ প্রথমে ভয় পায়, পরে বিরক্ত হয়ে ওঠে। এদিকে, এইসব কাগুজে বাঘ মুখে বলে, এমন লড়াই নাকি করবে যে ইতিহাস মনে রাখবে। ইতিহাস নাকি তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে বলে ঢেঁকুর তোলে। তা হয় বটে! পুনরাবৃত্তের পুনরাবৃত্তি। অতএব, প্রহসনের। মানুষ সেসব দেখে মুচকি মুচকি হাসেও।
আসল বাঘ এতদিনে জেনে গেছে যে, তাকে যে কেউ শিকার করতে পারে। হয়ত বেগ পেতে হবে, তবে শিকার সম্ভব। কাগুজে বাঘ তা জানে না। জানলেও বিশ্বাস করে না। কাগুজে বাঘ শিকার সম্পর্কে অনেকের ধন্দও আছে। কী তার পদ্ধতি, কৌশল হতে পারে, তা নিয়ে দিস্তে দিস্তে লেখা হয়। আমরা অবশ্য জানি যে, লিখে-টিখে শেষমেশ কিছু হয় না। খেপে যেতে হয়। মানুষ তো তার ঘরদোর পরিষ্কার রাখতে ভালোবাসে। আবর্জনা বিদায়ের ব্যবস্থা তার ভালোই জানা আছে। ব্যাস, এটুকুই।
অ) সাজা বাঘের হম্বিতম্বিতে বিরক্ত হলে ১১ দেখুন।
আ) বাঘের হাতে ওরা পড়ল কী করে, জানতে ৫-এ।
৫। ওদের মধ্যে একজন স্ত্রী, অন্যজন পুরুষ। দুজনেই পড়াশোনায় ভাল। ভাল বলতে, ওই যেমন বোঝায় আর কী! রেজাল্ট ভাল, চাকরিও পেয়েছে। ভালর এই গড় ধারণায় অবশ্য গোলমাল আছে। ভাল রেজাল্ট অর্থাৎ কৃতী মানেই মানুষ ভাল, এমন ভাবা বোকামি। পড়াশোনা করলেই গাড়িঘোড়া চড়বে এ-ও বড় একটেরে বিচার। গোলমাল পড়াশোনার ধারণাতেও। তবে, রেজাল্ট আর চাকরি দেখে যাঁরা ভাল বিচার করেন, তাঁরা আসলে গীতা অমান্য করেন। সেই যে, মা ফলেষু কদাচন। ফল-টল সব তাঁর হাতে সঁপে দিয়ে শুধু কাজ করে যেতে হবে। এ বড় উদার চিন্তা। মানে, আপনি যদি মাথার ভিতর একটা চিপে এটা লাগিয়ে নেন, আর সেটা ক্রমাগত টিক টিক করে বাজতে থাকে, তাহলে দেখবেন, অধিকার আদায় ইত্যাদি নিয়ে কোনোদিনই আর আপনি তেমন মাথা ঘামাবেন না। অথচ অভিভাবকরা ফলের আশা করেন। ফলের আশায় পুজোও দেন। অভিভাবকরা কি তাহলে ধর্মবিরোধী? টিভিতে এই নিয়ে কোনো ঘন্টাখানেক অনুষ্ঠান হয় না। ওই গীতাই বলছে সকাম প্রার্থনায় ঈশ্বরলাভ হয় না। কিন্তু ঈশ্বর কে চায়! নিষ্কামে অতএব মানুষের মন নেই। মানুষ ফলেরই প্রত্যাশা করে। তাই এমন পড়াশোনাই তার পছন্দের যেখান থেকে রেজাল্ট ভাল হলে চাকরি মেলে। ওরা দুজনও সেই ভালর দলে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সমাজ যেরকম ভাল পেলে খুশি হয়, ওরা সেরকমই।
অ) তাতে আপনার আপত্তি থাকলে ৬ দেখুন।
আ) ওদের সঙ্গে আপনার দেখা হবে ৭-এ।
৬। দেখুন, আপত্তি তো থাকতেই পারে। গোটা সমাজটাকে তো আর পি সি সরকারের ম্যাজিকলাঠি বুলিয়ে পালটে ফেলা যায় না। তা অনেকদিনের কাজ, অনেক মানুষের কাজ। সমাজ তার খুশি মত ভাল লোক তৈরি করে নেয়, যাতে বেশি বেগড়বাই না হয়। মানুষ কিন্তু আরও চালাক, বুঝলেন? বুঝে হোক বা না-বুঝে, দুর্গাঠাকুরের কাছে পুষ্পাঞ্জলি দেয় – সকাম। যেখানে বলা হয়, এটা দাও, ওটা দাও। নিষ্কাম পুষ্পাঞ্জলিতে শুধুই প্রণতি। এদিকে হরেকরকম কর্মের মধ্যে, যা কাম্য, অর্থাৎ যার সঙ্গে কিছু চাওয়া যুক্ত হয়ে আছে, তাতেই আপত্তি তুলেছিল গীতা। এই আপত্তি আসলে কর্ম আর ভক্তির মধ্যে একরকমের আপোসচিহ্ন। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য এ নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল, নিষ্কাম কর্মকে শাসক ও শোষিতের প্রেক্ষিতে দেখা। তাঁর মতে, এই তত্ত্বটি শাসকদের জন্য খুবই উপযোগী। কর্তব্য করে যাও, অথচ প্রতিদান চাইবে না এবং ভক্তিও অচলা থাকবে – এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে? রামকৃষ্ণবাবুর বক্তব্য, এতে শোষণের মতাদর্শই দৃঢ় হয়। এখন এই মতের পালটা থাকতেই পারে। তবে, আজকের ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, যুক্তিটি অত্যন্ত পোক্ত। অতএব সেটিকে এড়ানো সম্ভব নয়। বরং সেই ভাবনা ধরেই দেখা যায় মানুষ কীরকম চালাক। কাম্য নাকচ করা তত্ত্ব থাকলেও, মানুষ শেষমেশ কাম্য নাকচ করেনি। বরং বলেছে, সৌভাগ্য দাও, আরোগ্য দাও। বলা যায়, যা তার অধিকার, তা সোচ্চারে শাসকের কাছে চাইতে না পারলে, দেবীর কাছে একান্তে চেয়েছে। সন্তানকে দুধেভাতে রাখার কামনা, কোনো তত্ত্ব এসেই মুছে দিতে পারে না। সাধে কি আর মানুষের উৎসব! যা সে চায়, আর যা তাকে চাইতে দেওয়া হয় না, তার মাঝে সে টেনে আনে উৎসবকে। শাসকের আন্তরিক অভিপ্রায়কে অগ্রাহ্য করেই এগিয়ে যাওয়া। কেউ এর পালটা কথাও বলতে পারেন। গল্পের আপত্তি নেই। আমাদের মোদ্দা কথা এটুকুই যে, মানুষ ভাল থাকতে চাইতেই পারে। সেটা তার অধিকার। এবং যা সে দেবতার কাছে চাইছে, একদিন শাসকের কাছেও চাইতে পারে। চেয়েও থাকে।
অ) অধিকার নিয়ে কিছু কথা ৮-এ।
আ) ওদের গল্পটা কদ্দূর গড়াল জানতে ৭ দেখুন।
৭। ভাল রেজাল্টের দরুন চাকরি দুজনেই পেয়েছিল। ছাপোষা মানুষ। নিজেদের মত ঘর গুছিয়ে নিয়েছিল। ‘দে লিভড হ্যাপিলি এভার আফটার’ গোছের ব্যাপার। এমনিতে খুচখাচ ঝগড়া ছাড়া সংসারে ঝামেলা কিছু ছিল না। তবে, সবকিছুর দাম বাড়ছিল বলে চিন্তা একটু ছিলই। তা ছাড়া সঞ্চয়ও সেরকম নেই। এলআইসি নাকি মিউচুয়াল ফান্ড, এইসব ভাবতে ভাবতেই হাত ফাঁকা হয়ে যায়। অসুখবিসুখ লেগেই থাকে। তবে, মোটের উপর সুখের সংসার বলতে হয়। কেননা উপার্জন বাঁধা। ফলত অসংখ্য পরিবারের মত অনিশ্চয়তার দিনরাত ওদের কাটাতে হয়নি। বেশ চলছিল, বছর কয়েক। তারপর একদিন জানল, দুজনের চাকরিই নাকি ন্যায্য নয়। আদালত বলছে। কাগজ বলছে। টিভি বলছে। যোগ্য, অযোগ্য – সব এক ঠোঙায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল হারামি কেউ। কিংবা হারামি কেউ কেউ। এখন হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট। এখন তারিখ আর তারিখ। এখন ক্রমাগত নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের পালা। অথচ, ওরা দুজনেই জানে, জ্ঞানত কোনো অন্যায় করেনি। অন্য কেউ করে থাকতেই পারে। গায়ের উপর জোর করে এক বালতি অন্ধকার ঢেলে দিলে আর গা বাঁচানো যায় না।
চাকরি যখন পেয়েছিল, কেউ কাউকে চিনত না। এখন অল্পবিস্তর দুজনেই দুজনকে চেনে। শরীরে, মনে। সেই চেনাটাকেই যেন অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। পরস্পরের কাছে ওরা কবুল করেছে যে, কেউ অন্যায় করেনি। তবু সন্দেহ। চিরচিরে। নিজেদের ভিতরটায় ছুরি বিঁধছে। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। হল। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সিস্টেম দুর্বৃত্ত হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে পড়ে আছে ওরা দুজন। ভাঙা অট্টালিকায় আটকে পড়া দুই কবুতর। ওরা যে অন্যায় করেনি, সেটাই আর বিশ্বাস করতে পারছে না। কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবেও না। আদালত বললেও না। কাগজ, টিভি বললেও না। এমনকি ওরা নিজেদের বলা কথাকেই অবিশ্বাস করতে শিখে যাচ্ছে। খুব দ্রুত।
অ) পরিস্থিতি গুরুতর, তা কীভাবে আরও জটিল হচ্ছে দেখুন ৯-এ।
আ) অবশ্য এ-সব কথা ভালো না-লাগলে একেবারে ১০ দেখুন।
৮। একজন যোগ্য মানুষের চাকরি কেন যাবে? তার থেকেও বড় কথা, একজন অযোগ্যকে কেন চাকরি দেওয়া হবে? কেন টেবিলের তলায় কেরামতি? চাকরি করে একজন মানুষ সসম্মানে মাথা উঁচু করে বাঁচবেন, এটা কি তাঁর মৌলিক অধিকার নয়? কয়েকজন এসব বলাবলি করছিল। বলতে না বলতেই তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া কঙ্কাল। মানুষ ভূতের গল্প ভারি ভালোবাসে। কঙ্কাল অতএব সস্তা এবং বিশ্বাসযোগ্য। কঙ্কাল ধরিয়ে দিয়ে বলা হল, এই চাকরির নামে, শিক্ষার নামে কী কী অতীতে হয়েছে। তার তুলনায় বর্তমানের যা কিছু তা নস্যি! নস্যি আজকাল আর অনেকেই নেন না। বড় একটা দেখা যায় না। নস্যির তুলনাটাও কঙ্কাল। তবু চলছে। কিন্তু, যে কথাটা কিছুতেই ভোলা যায় না, যে, দুজন মানুষ নিজেদের এই যে অবিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলল, সে পরিস্থিতির জন্ম দিল কে? একজন, দুজন? এক বছর, দুবছর? চৌত্রিশ বছর, পঁচাত্তর বছর? নাকি আরও অতীত? দুজন যদি আত্মহনন করেই ফেলে, তাহলে কি মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি হবে? চমৎকার! সে অধিকার রাজনীতিকে কে দিল? এই অন্তহীন রসিকতার কি বিকল্প নেই?
অথচ দেখুন, আপনার হাতে এখনো বিকল্পের অপশন আছে।
অ) বিকল্পকে দ্বিধানে বেঁধে ফেলা মূলত একটা আত্মহত্যা প্রকল্পই। প্র্যাঙ্কটি কীভাবে আপনার সঙ্গেও হতে পারে বুঝতে ৯ দেখুন।
আ) গল্পের শেষ জানতে ১০ দেখুন।
৯) ওরা এখন ভালই জানে, ওরা আর মানুষ নেই। রাজনীতির হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছে। মিডিয়ার কাছে পণ্য। প্রতিবেশীর কাছে হাস্যাস্পদ। এমনকি নিজেদের কাছেও অবিশ্বাস্য। এখন ওরা আর কী করতে পারে? যেদিকেই যাক না কেন, ওরা আসলে নানা রকমের রাজনীতিকেই শাঁসজল পাইয়ে দেবে। ওরা মরে গেলে, বিরোধী বলবে, শাসকের দুর্নীতি দুটো জলজ্যান্ত মানুষকে খেয়ে ফেলল। ওরা বেঁচে থাকলে শাসক বলবে, এই বেঁচে থাকাটুকু পরোক্ষে শাসকেরই বদান্যতা। কেননা শাসক তাদের বেঁচে থাকার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে চাইছে। বিচারের জন্য যতদূর যেতে হয়, ততদূর যেতে তারা রাজি। শুধু বিরোধীরা তা করতে দিলে হয়! বিরোধীরাও কি চাইছে যে, দুজন মানুষ সসম্মানে বেঁচে থাকুক? মুখে অন্তত তা-ই বলছে বটে। তবে, মুখ-মন যদি সর্বদা এক হত, তাহলে আর ঠাকুর রামকৃষ্ণ সেটিকে সাধনা বলতেন না। অতএব সন্দেহ একটা বিকট গন্ধ হয়ে ঘুরেই বেড়ায়।
এবং ওরা বুঝতে পারে, বেঁচেই থাকুক আর মরেই যাক, এই বাঁচা আর মরার মধ্যে ওরা কোথাও মানুষ নেই। দুজন মানুষ তাদের রক্তমাংস, বোধবুদ্ধি নিয়ে এই সিস্টেমটার বর্জ্য হয়ে গিয়েছে মাত্র। তাহলে?
অ) তাহলে আপনার খারাপ লাগলে ১১ দেখুন।
আ) অন্যথায় ১০ দেখুন।
১০। দ্বিতীয় আর এক কাপ চা খাওয়ার আগে ওরা তাকাল পরস্পরের দিকে। দুজনেই দুজনকে পড়ে নিতে চেষ্টা করল। এমন করে তারা আগে কখনো পাঠ করেনি নিজেদের। শুভদৃষ্টি। তারপর দুজন দুজনকেই বলল, আমি জানি তুমি আমাকে অবিশ্বাস করো। তবু, তোমাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। আসলে কিছুই বলল না মুখে। তবে, পরক্ষণেই তারা বুঝতে পারল, এই অবিশ্বাসের দরুন কে আসলে জিতে যাচ্ছে বা যেতে পারে। কাকে জিতিয়ে দেওয়া হবে যদি তারা নিজেদের উপর বিশ্বাস হারায়। যদি তারা অন্যায় না করেই থাকে, শুধু গ্লানির হাত থেকে বাঁচতে যদি আত্মহত্যা করে, তাহলেও অন্যায় থেকে তাদের পরিত্রাণ নেই। এমনকি, পাঠক, আপনিও গোপনে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন যে, অন্যায় তারাই করেছিল।
তাদের মনে পড়ে একজন প্রতিবেশীর কথা। রাষ্ট্র বদলে ফেলতে যুবকবেলায় তিনি আন্দোলনে নেমেছিলেন। রাষ্ট্র বদলায়নি। তিনিও সেই রাষ্ট্রের থেকে কিছুমাত্র সাহায্য নিতে চাননি। কায়ক্লেশে দিনযাপন করেছেন। সেই জেদের খেসারত দিতে হয়েছিল তাঁর ছেলেপুলেকে।
ওরা দুজনেই ভাবে, এখন তাদের আত্মহত্যার খেসারত কে দেবে? বোধহয় সময়টাই। যে সময়টাকে শুনতে হবে, তার ভিতর অজস্র মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে। নইলে এমন সিদ্ধান্ত নিল কেন? সবাই পালিয়ে যাচ্ছে মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে। দায়িত্ব এড়াতে এড়াতে এক মস্ত গাড্ডার ভিতরই পড়ছে। কিন্তু ওঠার জন্য হাত বাড়াতে এত দ্বিধা! সেই একই রাস্তা যদি তারাও ধরে, তাহলে আর ভবিষ্যৎকে বলার কিছু থাকে না।
আরো পড়ুন বস্তাবন্দি টাকা আর নষ্ট যৌবন: আন্দোলনকারীর বয়ান
অতএব তারা আবার পরস্পরের দিকে ঘন, নিবিড় বিশ্বাসে তাকাল। এবং এবার তাদের মুখ চিন্তায় ভরে গেল। তারা দ্রুত কাপের চা শেষ করতে চাইছিল। একজন ঘন ঘন সিগারেটে টান দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বোঝাই যাচ্ছে তাদের কোথাও একটা যাওয়ার আছে। খুব তাড়া আছে।
অ) এই পর্যন্ত জেনে সন্তুষ্ট হলে, হে পাঠক, বিদায়!
আ) তবে, এক্ষেত্রে আপনার কী করণীয় জানতে ১১ দেখতে পারেন।
১১। সেক্ষেত্রে পুরো গল্পটি আপনিই বদলে ফেলতে পারেন। একটু ভাবুন।
*গল্প বলার এই ধরনটি ফরাসি কবি-ঔপন্যাসিক রেমন্ড কুইনিউয়ের থেকে নেওয়া। তাঁর কাছে ঋণ।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








