একবার কবিতা অনুবাদ নিয়ে আমি বুলগেরিয়ার প্রথিতযশা রবীন্দ্র অনুবাদক আলেক্সান্দার শুরবানভকে একটা মস্ত প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তরে নানা কথার মধ্যে উনি উদ্ধৃত করলেন বুলগেরিয়ার আরেক বিখ্যাত কবি আতানাস দালচেভকে। দালচেভ বলেছিলেন, সাহিত্য অনুবাদ বলতে উনি দেখতে পান একটি কাচের জানালা; রাস্তার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে কিন্তু তাতে ঘরের ভিতরকার ছায়াও মিশে থাকছে। এক ঝলকে মনে হতে পারে, এই উক্তি আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্ট কথিত বিখ্যাত বাক্যবন্ধটির (“Poetry is what gets lost in translation”) বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু, দ্বিতীয়বার ভেবে দেখলে মনে হয়, দুটি ধারণাই দুই প্রান্ত থেকে একই বিন্দুর দিকে এগিয়ে চলেছে। ফ্রস্ট অনুবাদে অপচয়ের কারণে হা-হুতাশ করেছেন, দালচেভ সেখানে এক অর্জনের কথা (আশঙ্কা?) ধরিয়ে দিয়েছেন। আদর্শ অবস্থায় কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত নয়। তবু, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী?

পৃথিবীর বাকি প্রত্যেকটা মানুষ যে দাবি করবেন, সে দাবি আমিও এখানে করে ফেলি। কবিতার অনুবাদ হয় না। মর্ম, ব্যঞ্জনা বা যা যা গভীর পরিবহণযোগ্য অনুভূতির কথা আছে – তার অধিকাংশই মূল ভাষায় লিখিত কবিতার শব্দার্থের ওপর ঠেস দিয়ে থাকে। বড়জোর, এক কুশলী অনুবাদক কবির অভিপ্রায়টিকে ধরবার প্রয়াস করেন। জাক দেরিদা যাকে বলেন “protocols of a text”, সেই এলাকায় তিনি প্রবেশ করেন। শব্দের আভিধানিক অর্থ থেকে সরে এসে শব্দের অর্থ নির্দিষ্ট সাহিত্যকর্মটির নিরিখে বিচার্য হয়ে ওঠে – ইত্যাদি। কিন্তু এরপরেও, যে মহৎ সাহিত্যকর্ম নিজের ভাষাকেই এগিয়ে দিচ্ছে অনেকদূর পথ, তার যাত্রাপথ অনুবাদে আর কী ধরা পড়বে?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই সমস্ত কথাই শান্তভাবে মেনে নেওয়া যায়, যদি না প্রশ্ন জাগে কবিতা থাকে কোথায়?

ছবির অনুবাদ হয় না। দরকার পড়ে না। সঙ্গীতের হয় না, দরকার পড়ে না। নাচের হয় না, ভাস্কর্যের হয় না – খালি দরকার পড়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে। তার একমাত্র কারণ কি এটা নয় যে, চারুকলার অন্যান্য সমস্ত শাখার আবেদন অনেকটাই visceral, কিন্তু সাহিত্য আমাদের ভাষানির্ভর? আর পৃথিবীতে অনেক ভাষা, তাদের প্রত্যেকটিরই objective grammar রয়েছে, সবার পক্ষে সব জানা সম্ভব নয়। এরপরে, আসে সেই প্রশ্নটি। কবিতা কোথায় থাকে? তার শব্দে? নাকি, কবিতা থাকে তার লিখিত শরীরের বাইরে?

হয়ত, বাইরেই, নইলে মূল যে যে শব্দ নিয়ে একটি কবিতা জন্মগ্রহণ করল, তা সে যেভাবেই হোক না কেন – অনুবাদের পরে – সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন প্রেক্ষিতে কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারত না। তাহলে অনুবাদ যে হয়, তা কীসের হয়? তাকে আমি ধাক্কা বলতে পারি কি?

আরো পড়ুন বাংলা শব্দগুলো যথাসময়ে আমার মনের বাগানে ফুটে উঠেছে

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, তাঁর ‘Translating into English’ শীর্ষক প্রবন্ধে অনুবাদ প্রক্রিয়াকে “the most intimate act of reading” বলে ডেকেছেন। অনুবাদের তাড়নায় একটি ভাষা থেকে এক অনুবাদক তাঁর সম্পূর্ণ অস্তিত্ব দিয়ে অন্য একটি ভাষায় লিখিত শব্দের কাছে অন্তরঙ্গভাবে পৌঁছতে চাইছেন। সেসময় তাঁর সমস্ত চেতনা, বোধ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে কবির ইশারায় ও রহস্যে। এই ধেয়ে যাওয়া একরকমের প্রেমে পড়ে ধেয়ে যাওয়াই মনে হয়। কিন্তু, সাধারণভাবে আমরা কবিতা পড়ি নিজের জন্য। সেখানে আমিই নায়ক, ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র। সমস্ত আলো আমার দিকে চলে আসে। যে বেদনা কবিতায় আছে তা আমায় আমার জীবনের প্রতি সচেতন করে তোলে, আমি ভেসে যাই নিজের জন্য, কবিতা আমাদের ভাল লাগে আমাদের নিজেদের জন্য – নিজেদের হৃদয়ের জন্য। এইটিও কিন্তু “intimate act of reading”-এর নামান্তর। এই একটি কারণেই কবিতার অর্থস্তরের শেষ থাকে না, কবিতার রূপের শেষ থাকে না।

’Twas brillig, and the slithy toves
      Did gyre and gimble in the wabe:
All mimsy were the borogoves,
      And the mome raths outgrabe.

উদ্ধৃতিটি, সবাই জানেন, ল্যুইস ক্যারল বিরচিত ‘Jabberwocky’ কবিতার প্রথম স্তবক। একটি তথাকথিত ননসেন্স কবিতা। ১৮৭১ সালে Through the Looking-Glass গ্রন্থে প্রকাশ পায়। যদি এই নির্দিষ্ট কবিতাটি পাঠের সুখটি নিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করি, তাহলে নানা উত্তর মনে ভিড় করে। কিন্তু সব মিলিয়ে ব্যাপারটি জটিল হয়ে ওঠে। কবিতাটি কিন্তু শব্দার্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং, অর্থবিপর্যয়টিই কৌতুকের লোটাকম্বল। এই কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলির কোনো প্রচলিত অর্থ নেই – তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমার কাছে অনুবাদ সংক্রান্ত সমস্ত ধ্যানধারণা বিপর্যস্ত হয়ে যায় সত্যজিৎ রায়ের জন্য। তিনি ‘Jabberwocky’ অনুবাদ করে ফেলেন। নাম দেন – জবরখাকি।

বিল্লিগি আর শিঁথলে যত টোবে
গালুমগিরি করছে ভেউ-এর ধারে
আর যত সব মিমসে বোরোগোবে
মোমতারাদের গেবগেবিয়ে মারে

শুধু প্রথম স্তবকটি নিয়েই কথা বলা যেতে পারে – বা কিছুই বলা যেতে পারে না। কেননা অনুবাদ সম্পর্কিত সমস্ত যুক্তিগ্রাহ্য সীমা এখানে লঙ্ঘিত। প্রশ্ন এই যে, অনুবাদ এ হল, তবে কীসের হল? ধ্বনির কি অনুবাদ হয়? প্রয়োজন পড়ে? যদি তার নির্দিষ্ট কোনো সাংকেতিক অর্থ থাকে তবে তা অন্য ভাষায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পৃথিবীতে কোনো আর্তনাদের ভাষান্তর দরকার পড়ে না। অট্টহাসিরও না। মূল কবিতায় ইংরেজি ব্যাকরণ স্বীকৃত কয়েকটি শব্দ আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলি বাকি অদ্ভুতুড়ে শব্দমালার সঙ্গে জুড়ে একটি অসম্ভব বুনন তৈরি করেছে – যাতে আমাদের হাসি পায়, কিন্তু কেন সেটা জিজ্ঞেস করতে মন চায় না। কিন্তু, সত্যজিৎ-কৃত অনুবাদ আমাদের সেই প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়। এ কথা ঠিক, উনি বাংলা অক্ষরে ‘Jabberwocky’-কে জন্ম দিয়েছেন, বাংলা গঠনেই। কিন্তু, brillig যে বিল্লিগি, আর gimble in the wabe যে ভেউ-এর ধারে গালুমগিরি – দ্যোতনাগুলি আসছে কোথা থেকে? মেনে নিতে হয় আসছে পুরোপুরি অন্য ডাইমেনশন থেকে। অর্থের অনুবাদ এ জগতে হয়, কিন্তু, অর্থহীনতার? যে কবিতা অর্থহীনতাকে ধারণ করে সাধারণত, তার অনুবাদও কিন্তু সেই পরিচিত শব্দাশ্রয়ীই হতে হয়। অনেকটা পরোক্ষভাবে অনূদিত কবিতায় সেই আঁচ আসে।

কিন্তু এখানে সত্যজিৎ চূড়ান্ত প্রত্যক্ষ। যেন হাসির পাল্টা হাসি – সমান তীব্রতায়। মনে হয় প্রতিধ্বনি – তা মূল আওয়াজকে ছাপিয়ে যায় না, কিন্তু অনেকদূর অব্দি নিয়ে যায় শব্দের জন্মসংবাদ। অনুবাদের শ্রেষ্ঠ রূপ আমার কাছে এটুকুই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.