অন্য রবীন্দ্রনাটকের থেকে মুক্তধারাকে আলাদা করে দেয় দুটি উপাদান! এক, ভিজুয়াল। উত্তরকূটের পার্বত্যভূমিতে সন্ধ্যা নামে, একটি লম্বা রাস্তা চলে গেছে অনন্তের দিকে৷ রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেন, ‘পথ’। অন্য কোনও রবীন্দ্রনাটকে বোধ হয় ভিজুয়ালের গুরুত্ব এত প্রখর নয়: রাস্তার এক বিন্দুতে দাঁড়ালে যদি প্রশ্ন আসে পথের শেষ কোথায়, উত্তর হবে দুটি স্থাপত্যের যুগলবন্দি। এক, যন্ত্ররাজ বিভূতির বানানো আকাশমুখো বীভৎস বিকট হাঁ-করা কারিগরি চিৎকার। দুই, তার পাশেই অবস্থিত উত্তরভৈরবের মন্দির। রবীন্দ্রনাথ শুরুতে খোলসা করেননি, কিন্তু নাটক খুললে দেখা যায়, সেটিই পশ্চিম দিক: সন্ধ্যার আসন্ন আগুনরঙা মেঘের সিলুয়েটে অদ্ভুত ‘আনক্যানি’ অস্বস্তি বহন করে ওই যন্ত্রদানবের ইমেজ। যে পথ গেছে সন্ধ্যতারার পারে, তার শেষ বিন্দুটি হয় মন্দির নয় ওই বিকট যন্ত্রস্থাপত্য।

মুক্তধারাকে যে উপাদান আরও অনন্য করে তোলে, তা এর গঠনগত তফাত। হ্যাঁ, অন্য কয়েকটি নাটকের মতই মুক্তধারাতেও সাদা-কালো ছোপ বোলানো দ্বন্দ্ব: যন্ত্র আর প্রাণের, সত্য আর মিথ্যার, শুভ আর অশুভের – এবং তাতে রবীন্দ্রনাথের পক্ষও নির্দিষ্ট। তাঁর অধিকাংশ নাটকের মতই এখানেও বদলের কোনো নির্মাণ প্রক্রিয়া রবীন্দ্রনাথ দেখান না, দ্বন্দ্বের সমাপন ঘটে এক পরম মুহূর্তে – কোনও ব্যক্তি মসীহার আবির্ভাব দৌত্যে। কিন্তু তফাতের মধ্যে, সেই মসীহা ঈশ্বরপ্রেরিত কেউ নন, অলৌকিক কেউ নন, বরং ঘরের লোক! এই অর্থে, নিরসন খুব একটা আধ্যাত্মিক নয় – দ্বন্দ্বের চেহারাটি অন্তর্লীন, কুমার অভিজিতের বয়ানে তা ফুটে ওঠে মাত্র।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

৪ মাঘ, ১৩২৮, রবীন্দ্রনাথ রানু অধিকারীকে লেখা একটি চিঠিতে কাকতালীয়ভাবে জানাচ্ছেন: ‘আমি সমস্ত সপ্তাহ ধরে একটা নাটক লিখছিলুম— শেষ হয়ে গেছে, তাই আজ আমার ছুটি।’ অতঃপর, ‘এ নাটকটি ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নয়, এর নাম ‘পথ’। এতে কেবল প্রায়শ্চিত্ত নাটকের সেই ধনঞ্জয় বৈরাগী আছে, আর কেউ নেই। সে গল্পের কিছু এতে নেই, সুরমাকে এতে পাবে না।’ এই পথের অনুরণন তো প্রাচ্যসভ্যতার দর্শনস্তম্ভগুলিতে ছয়লাপ: তাওবাদের তাও-এর অর্থই ‘পথ’, ভারতীয় সভ্যতায় ‘চতুর্মার্গ’ থেকে বৌদ্ধদের ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ পর্যন্ত পথের দ্যোতনা৷ ভক্ত কবীরের আয়ুধও সেই ‘পন্থ’। মহাভারতে যুধিষ্ঠির জানান, মহাজন যে পথে গমন করেন, সেই গন্তব্যই ধর্ম। রবীন্দ্রনাথের নিজের রচনা জুড়েই তো পথের পৌনপুনিক উল্লেখ, কিন্তু তার ধরন আলাদা। মানুষের ধর্মে তিনি বলেন, মানুষ যথার্থই অনাগরিক– জন্তুদের রয়েছে খাঁচা, কিন্তু মানুষের রয়েছে পথ। ফাল্গুনী জানিয়ে দেয়, পথই তো ধ্রুব, চলাটাই সব– ‘চলার বেগে পায়ের তলায় রাস্তা জেগেছে।’ কিন্তু এ’ পথ নেহাত ঘূর্ণি হাওয়া আর খ্যাপামির পথ নয়, এ হল অনিবার্য উত্তরণের পথ, মোক্ষের পথ– জহুরি ছাড়া বিশেষ সে’ পথের অনুগামী হয় না। অরূপরতনে নকল রাজা স্বর্ণসিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে নগরের পথে বেরোন, পালে পালে জনতা ভিড় করে, মনে পড়ে যায় তাঁর প্রেমের গানের দু’ লাইন: ‘রাজার পথে লোক ছুটেছে, বেচাকেনার হাঁক উঠেছে’। কিন্তু তা তো ঝুটো পথ– যে ওই মোক্ষম অরূপবীণার খোঁজ রাখে, তার পক্ষেই কোলাহলবৃত্তের বাইরে, মধ্যদিনে প্রাণের আলাপ জমানো সম্ভব, সে-ই পারে গান দিয়ে দ্বার খোলাতে। নাটকের শেষে রাজা-সন্দর্শনে আক্ষরিক অর্থেই পথ মেলে অবশ্য, সে-পথে তুচ্ছ আলো নিবিয়ে দিতে হয়, আমি-কে ডুবিয়ে মিশে যেতে হয় অন্ধকারে।

এই করোনা আক্রান্ত সময়ে কোন রবীন্দ্রচরিত্র সব চেয়ে মানানসই হতে পারে? ভাবছিলাম তা। এমনিতে শিল্পের কোনও দায় নেই প্রাসঙ্গিক থাকার, রবীন্দ্রনাথের তো আরওই না। তিনি শেষাবধি কোনো জাঁদরেল তত্ত্বমুখর দার্শনিকও নন– তিনি শিল্পী, কথার দুনিয়ার অবিসংবাদী ঈশ্বর হয়েও যাঁর আশ্রয় সুরের বাকপথাতীত মাধ্যমে– মধ্য-ষাটে উপনীত হয়ে যিনি পাড়ি জমান অচেতনের গহিনে, আঁকাঝোকায় ভর করে। তবু, এই বিস্রস্ত অবস্থায় একটি সামান্য ভাইরাস যেন গোটা সভ্যতাকে প্রশ্নের সামনে ফেলে দিয়েছে: মানুষী আধুনিকতা, যুক্তি, ভাবাদর্শ, জ্ঞান, সব কিছুই আত্মবীক্ষণে জরিপ করা হচ্ছে– যেন পথের তালাশ– কোন পথে এসছি, কোন পথে চলেছি, যার শেষে উত্তরণের সেই কল্পস্বর্গ? স্বভাবতই, রবীন্দ্র-চেতনায় পথটি একক, ও সরল। এই মুক্তধারাতেই একটি চরিত্র নাটকে কার্যত মহাভারতীয় ঢঙে মাঝেমধ্যে আসে, নামটিও: ‘অম্বা’। তার সর্বাঙ্গে সাদা চাদর-চাপা, কাফনের মত, বাক্যগুলি আয়রনি। প্রথম দৃশ্যেই সে হাজিরা দেয়:

স্ত্রীলোক। সুমন! আমার সুমন! (নাগরিকের প্রতি) বাবা আমার সুমন এখনো ফিরল না! তোমরা তো সবাই ফিরেছ।
নাগরিক। কে তুমি?
স্ত্রীলোক। আমি জনাই গাঁয়ের অম্বা।

কোথায় গেছে তার ছেলে? অম্বা মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে ফিরে এসে দেখে ছেলে নেই।

পথিক। তা হলে মুক্তধারার বাঁধ বাঁধতে তাকে নিয়ে গিয়েছিল।
অম্বা। আমি শুনেছি এই পথ দিয়ে তাকে নিয়ে গেল, ওই গৌরীশিখরের পশ্চিমে— সেখানে আমার দৃষ্টি পৌঁছয় না, তার পরে আর পথ দেখতে পাই নে।

নাগরিক বলে, অম্বা আজকের এই মহোৎসবে যোগ দিক, অবতীর্ণ হোক ভৈরবমন্দিরে! অম্বার জবাব: ‘দেখো, আমি বলি তোমাকে, আমাদের পুজো বাবার কাছে পৌঁচচ্ছে না—পথের থেকে কেড়ে নিচ্ছে।’

পথের ধরতাইয়েই তো এ-নাটকের শুরু৷ বিদেশি পথিক আর নাগরিকের সংলাপে নাটকের ভিজুয়াল অস্বস্তি ঘনিয়ে ওঠে, কিঞ্চিৎ পরে রাজপরিবারের সদস্য বিশ্বজিৎ আসবেন, বলে উঠবেন: ‘যে পথ খুলে যায় সে পথ সকলেরই– যতটা উত্তরকূটের, ততটাই শিবতরাইয়ের।’ কিন্তু অম্বা? পার্বত্য প্রদেশে সন্ধে নামে, এগিয়ে আসে মহোৎসবের রাত, অথচ তার ছেলে এখনও ঘরে ফিরল না। রণজিতের জিজ্ঞাস্য: ‘তুমি কে?’ কমন সিটিজেন অম্বার ঝটিতি জবাব: ‘আমি কেউ না’। কিন্তু: ‘যে আমার সব ছিল তাকে এই পথ দিয়ে নিয়ে গেল। এ পথের শেষ কি নেই? সুমন কি তবে এখনো চলেছে, কেবলই চলেছে—পশ্চিমে গৌরীশিখর পেরিয়ে যেখানে সূর্য ডুবছে, আলো ডুবছে, সব ডুবছে?’ পশ্চিম পাহাড়ে বিকট যন্ত্রের আবডালেই তো সূর্যাস্ত ঘনায়, রণজিৎ বলেন, সুমন বাঁধ-বাঁধার কাজে গিয়েছিল, ফিরবে হয়তো সন্ধে হলে– তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, তা-ই তো হবে তার ‘পরম দান’। প্রগতি, সভ্যতা, উন্নয়ন, সমষ্টি, রাষ্ট্রের নামে এই পরম দানের স্তোক অম্বাকে ও অম্বাদের ভুলিয়ে রাখে। প্রগতির পথ, সভ্যতার পথ, উন্নয়নের পথ কি অম্বা-র অপেক্ষাকে মনে রেখেছে?
অম্বা। সুমন! বাবা সুমন! যে পথ দিয়ে তাকে নিয়ে গেল সে পথ দিয়ে তোমরা কি কেউ যাও নি?
অভিজিৎ। তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে?
অম্বা। হাঁ, ওই পশ্চিমে, যেখানে সূয্যি ডোবে, যেখানে দিন ফুরোয়।

এই সেই পথ? উত্তরভৈরবের মন্দিরে আজ রাতে আরতি?

নাটকের শেষে অম্বা আবারও আসে, তুঙ্গ ইমানেন্সের মুহূর্তে। তত ক্ষণে বাঁধ ভাঙার তোড়জোড় চলছে, জল উপচে আসছে পথের দু-ধারে। রবীন্দ্রনাটকের বিচারসভায় পার্থিব রাজারা বরাবরই ছাড় পেয়ে যান, বিসর্জনে কারণটা জয়সিংহর জবানে খোলসা করাই ছিল: রাজা যেন সেই চির-মঙ্গলময় সত্যের প্রতিমূর্তি, চার পাশের মন্ত্রণালয় যতই শঠ, অসৎ ও কুহকী হোক না কেন! শৃঙ্খলে আস্থাবান রবীন্দ্রনাথ, কেন্দ্রই এক মাত্র ধরে রাখতে পারে ব্যবস্থাকে – নৈরাজ্যে গা-ভাসিয়ে যক্ষপুরীর গরাদ ভাঙাটা শ্রেয় বিকল্পের দিকে নিয়ে যায় না। এই দুনিয়া মিশে যায় সেই পরম দুনিয়ায় – অস্পষ্ট অবোধ্য গুহালিপি নয়, চিনে নিতে হবে সেই আলোকোজ্জ্বল রাজ্যের ভাষা: ‘ধর্মবিধি বিধাতার – জাগ্রত আছেন তিনি, ধর্মদণ্ড তার রয়েছে উদ্যত নিত্য; অয়ি মনস্বিনী, তাঁর রাজ্যে তাঁর কার্য করিবেন তিনি।’

কিন্তু, পথ? পথ যেখানে গিয়ে মিশেছে, তার এক দিকে দেবতার শৃঙ্খল। অন্য দিকে, মানুষই হয়ে উঠেছে দুনিয়াদারির নতুন মালিক। সে যন্ত্র বসাচ্ছে, বাঁধ তৈরি করছে, নদীর জলকে ছিনতাই করে নিচ্ছে মাপ মত। পথ তো একার ঘর আর সকলের গন্তব্যকে মিলিয়ে দিতে পারে! ইতিহাসের মুক্তি আসবে কীসে, আধুনিকতার উকিলরা এই নিয়ে বিস্তর সালিশি চালিয়ে গেছেন। আধুনিকতার পরত চড়লে মোক্ষ আর ব্যক্তির মালিকানা থাকে না – হয়ে ওঠে ভাবাদর্শের রেখাচিহ্ন৷ তার এক দিকে বসত করেন পূর্বনির্ধারিত ঈশ্বর, অন্য প্রান্তে মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করে, ঈশ্বর হয়ে ওঠার – সেখানেই যেন ইতিহাসের মুক্তি। যক্ষপুরীতে বেচারি ফাগুলাল কেন যে বারো ঘণ্টার জায়গায় ষোলো ঘণ্টা খেটে মরে, কারণটা সে নিজেও জানে না। সেই অন্ধকার ব্যূহে পালোয়ানের গতর আধখানা– সভ্যতা-নিষ্পেষিত মাকড়সাপ্রতিম ঊনমানবে পরিণত হয়েছে সে। পথে তো আরও পা পড়ে, অগম্য মহাপ্রস্থানের মত শ্রমিকদের ভিড়ঠাসা মিছিল – বড় শহর থেকে হাইওয়ে চলে গেছে ‘পশ্চাদপদ’ গ্রামের গভীরে৷ অপেক্ষা এঁদের জন্যও থাকে। পথ যেখানে মিশেছে, রবীন্দ্রনাথ দেখান, সেখানে সূর্য নিভছে। যন্ত্রের উৎকট সিলুয়েটে আকাশ আগুনরঙা ও ভয়াল৷ ইতিহাসের গিঁট কোথায় পাক খুলে যাবে জানা নেই– অথচ আসন্ন রাত্রি মহোৎসবের।

‘দিবসের শেষ সূর্য উচ্চারিল পশ্চিম সাগরতীরে, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়/কে তুমি? পেল না উত্তর।’

গনেশ পাইন - রক্তকরবী জলরং
আরো পড়ুন

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.