১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মহেশ ভাটের ছবি কাশ, জনপ্রিয় সিনেমার এক ব্যর্থ নায়ক ও তার স্ত্রীর প্রেম-অপ্রেমের আখ্যান। সেই বেদনাবিধুর ছবিতে দুজনের মাঝখানে ছিল এক শিশুসন্তান। তার আসন্ন অনুপস্থিতি ছবিটিকে শেষপর্যন্ত এক ট্র্যাজিক অথচ শান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। এখন ২০২৪। মাঝের এই চার দশকে পৃথিবী আমূল বদলে গেছে, সিনেমাসহ সমস্ত শিল্পমাধ্যমের ভোল পালটে গেছে। জঁ লুক গোদারের মত দিকপাল স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেওয়ার আগে সিনেমার মৃত্যুই ঘোষণা করে গেছেন। এ যুগে প্রথমে দারুণ সফল, তারপর ‘আর্ট সাইকেলের নিয়মে’ ব্যর্থ এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যে বিশ্বাস করে সিনেমা স্রেফ দুরকম – ভাল আর খারাপ, এবং তার সফল অধ্যাপিকা স্ত্রীর সন্তানহীন জীবন অনেক বেশি জটিল তথা রোমাঞ্চকর হতে বাধ্য; সে শিল্পীর মনোজগতেই হোক বা বহির্জগতে। বলিউডি ছবি বানাতে গেলে দর্শককে কিছুটা শ্বাস ফেলার জায়গা দিতেই হয়। মহেশের সেই বাধ্যবাধকতা ছিল। নাটকের নির্দেশক অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে সৌমিত দেবের কলমে বিজনে বিষের নীল নাটক, ইরা লেভিনের ডেথট্র্যাপ নাটকের স্বীকরণ হলেও, থ্রিলারের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে আজকের মানুষের একাকিত্ব, ঈর্ষা, অবসাদ, অবদমিত কামনা বিষয়ক রোমহর্ষক সন্দর্ভ।

বিজনে বিষের নীল টানটান নাটক, দর্শককে পলক ফেলতে দেয় না – এসবই ঠিক কথা, তবে আলাদা করে না বললেও চলে। দর্শককে সচকিত রাখতে যেসব কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোও নাটকের দর্শকদের কাছে যে খুব অভিনব তা নয়। যা অভিনব তা হল অভিনেতাদের, বিশেষত দুই মুখ্য চরিত্র সুদর্শন ব্যানার্জি আর মায়া চৌধুরীর ভূমিকায় যথাক্রমে অর্ণ আর উপাবেলার, ব্যক্তিগত জীবন আর অভিনয়ের সীমা মুছে দেওয়ার দুঃসাহসিক প্রয়াস। মঞ্চসজ্জায় নিজেদেরই অল্পবয়সের অন্তরঙ্গ ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া সেই দুঃসাহসের কণামাত্র। সংলাপের এবং অভিব্যক্তির অন্তরঙ্গতায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের সামনে থেকে মুছে যায় রসিকতা আর হিংসার, প্রশংসা আর বিদ্রুপের, বাস্তব আর কল্পনার, ভালবাসা আর ষড়যন্ত্রের সীমারেখা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সিনেমার দুনিয়ায় একসময় গগনচারী, অধুনা পরপর তিনটে ফ্লপ ছবির পর দূরে নিক্ষিপ্ত নির্দেশক চরিত্রের অবসাদ আর ঈর্ষা শরীরে ফুটিয়ে তুলতে অর্ণ যে চঞ্চল পদচারণা, বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত এবং ক্রমাগত গা চুলকে যাওয়ার অবতারণা করেছেন তা বিস্ময়কর। নাটকের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর গা চুলকানোর যন্ত্রটাই যখন শিষ্য কণিষ্কের (অর্পণ ঘোষাল) হস্তগত হয়, তা চরিত্রগুলোর পালটাতে থাকা মানসিকতার চমৎকার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।

সুদর্শনের উকিল তলাপাত্র (সুমিত) এবং শালী হৈমন্তীর (তনুজা) চরিত্র এই নাটকে কেবল হাস্যরস উদ্রেককারী নয়, প্লটে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তবু নাটকের তিনটে পায়া সুদর্শন, মায়া আর কণিষ্কই। মূলত তাদের বিষেই নীল হয়ে থাকে মঞ্চ। ফলে অর্পণের সুদূর মফস্বল থেকে আসা ডোমসন্তানের অভিনয় এক চুল এদিক ওদিক হলে নাটকের বারোটা বাজতে পারত। বস্তুত চরিত্রটা বেশ জটিল। কারণ কণিষ্ক একদিকে আজন্ম হীনমন্যতার শিকার, অন্যদিকে তার মধ্যে আছে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সে বোকা সাজতে জানে। সুদর্শনের প্রতি তার যেমন শ্রদ্ধা আছে, তেমন তাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবল খিদেও আছে। কণিষ্কের মধ্যে আত্মসমর্পণ আছে, আবার আক্রান্ত হলে দ্বিগুণ আক্রোশে প্রত্যাঘাত করার সাহসও আছে। মুখে আপাত সরল হাসি ঝুলিয়ে রেখে এই বৈপরীত্য তুলে ধরার কাজটা চমৎকার করেছেন অর্পণ।

আরো পড়ুন লক্ষ্মণের শক্তিশেল: বেঁচে থাক বাঙালির নিজস্ব রামায়ণ

উপাবেলা মায়ার চরিত্রের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার পারিবারিক ক্ষমতার বিন্যাসে নারী হিসাবে সুদর্শনের নিচে থাকলেও, সেই নতিস্বীকার যে আসলে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা অন্যের হাতে জমা রাখা – তাও ধরিয়ে দিয়েছেন ঋজু অভিনয়ে, বিশেষত শেষাংশে।

অভিনেতাদের যোগ্য সঙ্গত করেছে আবহসঙ্গীত এবং আলোকসম্পাত। তবে মঞ্চের পিছনের পর্দার যে সিনেমাসুলভ ব্যবহার নটধা নাট্যদলের অন্য নাটক নক্ষত্র শিকার-এরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তা এখানে কোনো কোনো সময়ে বাহুল্য মনে হয়েছে। নাটকের শুরুতে সুদর্শনের মনোজগৎ, তার সিনেমারুচি বোঝাতে ওই পর্দা যথাযথ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু সর্বদা নাটকে যা চলছে তার লাগসই উদ্ধৃতি ওই পর্দায় ফুটিয়ে না তুললেই বোধহয় ভাল হত। ব্যাপারটা দর্শকের নিজের মত করে দৃশ্য ব্যাখ্যা করে নেওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো কখনো। হয়ত এমন দমবন্ধ করা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে মনোযোগ দিতে গিয়ে দর্শক গভীরতর বক্তব্য খেয়াল না-ও করতে পারেন – এমন আশঙ্কা থেকে ওই উদ্ধৃতিগুলো পর্দায় দেখানো হয়েছে। কিন্তু কেনই বা নির্দেশক নিজেকে শিক্ষক আর দর্শককে দুর্বল ছাত্রছাত্রী বলে ভাববেন? হাত ধরে পরীক্ষা বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়া তো নির্দেশকের কাজ নয়। তিনি এবং তাঁর সহশিল্পীরা নিজেদের যা বলার আছে, যা করার আছে, তাই তো করবেন। বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দর্শককেই নিতে হবে। সবাই নিজের মত করে বুঝে নেবেন, সবাই হয়ত সবটা বুঝবেনও না। কে ঠিক বুঝলেন, কে ভুল বুঝলেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও তো শিল্পে স্থির করে দেওয়া নেই। মঞ্চে যা দেখা যাচ্ছে আর দর্শক যা দেখছেন, দুয়ে মিলেই তো নাটক। দুয়ের খানিক তফাত থাকলে ক্ষতি কী? দর্শকের বিনোদনের কথা বেশি ভাবতে গিয়েই বোধহয় দ্বিতীয়ার্ধ ঈষৎ দীর্ঘায়িতও হয়েছে। এইটুকু অনুযোগ রইল।

তৎসত্ত্বেও একথা না বললেই নয় যে, বর্তমান কালপর্বে আমাদের সকলের ভিতরেই যে জমা হয়েছে অনেক বিষ, সেই বিষে নীল হয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, বাইরে থেকে দেখাও যাচ্ছে না সবসময় – এই তেতো সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছে বিজনে বিষের নীল। এত কাছ থেকে সেই ভয়ানক সত্যকে দেখা গেছে এই নাটকে, যে যাঁরা সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে নিয়ে দেখতে যাবেন তাঁদের জন্য বিধিসম্মত সতর্কীকরণ হিসাবে বলা যায় – মনে হতে পারে আপনাদের ঝগড়া আড়ি পেতে শুনে নিয়েছেন নাট্যকার ও অভিনেতারা। সুতরাং কেবল থ্রিলারের অভিনয় দেখার রোমাঞ্চ নয়, আয়নার সামনে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ানোর অস্বস্তিও এই নাটক দেখার প্রাপ্তি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.