আসামে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসাবে ২৫ মার্চ, ১৯৭১ তারিখটিকেই বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট। অর্থাৎ আসাম চুক্তি অনুসারে নাগরিকত্ব আইনের ৬ক ধারা বলবৎ থাকছে। এককথায় বলা যেতে পারে, সেই রাজ্যে নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ নিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রইল। কিন্তু এনআরসির তালিকায় বাদ পড়া ১৯ লক্ষাধিক মানুষের এতে আশ্বস্ত হওয়ার কারণ নেই।
অসম সম্মিলিত মহাসংঘ ও ইন্ডিজেনাস ফোরাম আসাম ১৯৫১ সালকে নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ করার জন্য মামলা করেছিল। সেই মামলায় প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় সহ পাঁচজন বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গত ১৭ অক্টোবর এই রায় দেন। আদালতের মতে, নাগরিকত্ব আইনের ৬ক ধারাই আসামে নাগরিকত্বের সমস্যার আইনি সমাধান সূত্র।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সারা দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাগরিকত্ব আইনের ভিত্তিবর্ষের থেকে আসামের ভিত্তিবর্ষ আলাদা কেন – এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই জাগবে। এক দেশ এক আইনের প্রচারক বিজেপি সেই ধুয়ো তুলেই ৬ক ধারাকে অবৈধ বলে দাবি করে। আসাম চুক্তির ষষ্ঠ দফা রূপায়ণে বিপ্লব শর্মা কমিটির সুপারিশ অনুসারে ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে সে রাজ্যের বিজেপি সরকার। জমি কেনাবেচায় ভূমিপুত্রের সংজ্ঞা হিসাবে ১৯৫১ সালকেই তারা ভিত্তিবর্ষ করেছে। এনআরসি নিয়ে যখন জটিলতা চলছে, তখন বিজেপি সরকারের এইসব পদক্ষেপে সমস্যা আরও বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে সেই সিদ্ধান্ত হয়ত আসাম সরকার বদলাতে বাধ্য হবে। নাগরিকত্ব আইনের ৬ক ধারা এবং ১৯৭১ সালকে ভিত্তিবর্ষ করার কারণ বুঝতে আসাম চুক্তির প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির প্রেক্ষাপট
আসামের সীমানা ও জনবিন্যাস বারবার বদলেছে। আজ আসাম বলতে যে ভূখণ্ড বোঝায় তার বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রাজার শাসনাধীন ছিল। যাঁদের মূলবাসী বলে দাবি করা হয় সেই অহোমরা মাত্র সাত শতক আগে (ত্রয়োদশ শতক) বার্মা-থাইল্যাণ্ড থেকে আসামে এসেছিলেন। মুসলমানদের আগমনও একই সময়ে। ১৮২৬ সালে বার্মার সঙ্গে ইয়ান্দাবু সন্ধি অনুসারে ব্রিটিশরা আসামের শাসন ক্ষমতা পায়। ১৮৭৪ সালে সিলেট, কাছাড়, গোয়ালপাড়াকে আসামের সঙ্গে জুড়ে আসাম কমিশনার প্রভিন্স গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর অবশ্য সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে যায়। এই জেলাগুলিতে কিন্তু বাংলাভাষীরাই মূলবাসী, যাঁদের বড় অংশ মুসলমান। গোয়ালপাড়া ও কাছাড় বর্তমানে একাধিক জেলায় বিভক্ত।
পাশাপাশি ব্রিটিশরা প্রশাসনিক কাজের জন্য বাংলা থেকে অনেককে আসামে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় জঙ্গল কেটে চাষযোগ্য জমি তৈরি করতেও বহু মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়, যাঁদের সিংহভাগ বাংলাভাষী মুসলমান। তাঁদেরই এখন চরুয়া, মিঞা ইত্যাদি সম্বোধন করা হয় এবং অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাঁওতাল, ওঁরাও সহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চা বাগান বা অন্যত্র শ্রমিকের কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল।
আসামে মুসলমান মাত্রই অনুপ্রবেশকারী বা বাংলাভাষী মাত্রই বাংলাদেশ থেকে আগত – এই প্রচারের সত্যতা নেই। আবার সাঁওতাল, ওঁরাও ইত্যাদি আদিবাসী যেহেতু ব্রিটিশ আমলে সেখানে গিয়েছিলেন, সেহেতু আসামে তফসিলি উপজাতির তকমা পান না। বোড়োদের সঙ্গে তাঁদের প্রাণঘাতী দাঙ্গা, একতরফা গণহত্যা আজও ঘটে। আসামের এই জনবিন্যাসের ইতিহাস না বুঝলে, সারা দেশের চেয়ে আসাম তথা সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাতন্ত্র্য বিচার না করলে, বিজেপির প্রচারকেই সঠিক বলে মনে হবে।
অসমিয়া জাতীয়তাবাদের জমি কিন্তু বিজেপি নয়, তৈরি করেছিল কংগ্রেস। বিজেপি তাকে হিন্দুত্ববাদে রূপান্তরিত করতে চাইছে মাত্র। ব্রিটিশ আমলেই ভাষা, ধর্ম, জনজাতির ভিত্তিতে ভেদাভেদ দেখা দেয়। দেশভাগের পর প্রধানত ভাষাকে কেন্দ্র করে আসাম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে মদত দেওয়া হতে থাকে। ভাষাকে কেন্দ্র করে ঘটতে থাকে সংঘর্ষ, প্রাণঘাতী দাঙ্গা। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে অনেক বাঙালি উদ্বাস্তু হয়ে আসামে আসতে থাকেন। ১৯৫১ সালে তাই একমাত্র আসামেই জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত মানুষের স্রোত অব্যাহত ছিল। আগে থেকেই আসামে বহু বাঙালি ছিলেন। তার উপর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাভাষীদের প্রবেশের স্রোতে অসমিয়ারা নিজের রাজ্যে পরবাসী হয়ে যাবেন বলে আশঙ্কিত হন। ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের কেন্দ্রীয় নীতি ছিল তাঁদের আশঙ্কার অন্যতম কারণ। কংগ্রেস সেই আশঙ্কাকে মূলধন করে অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে মদত দেয়। আসামের রাজনীতি তাই স্বাধীনতার পর থেকেই ভাষাভিত্তিক পরিচয় সত্তা ঘিরে আবর্তিত হয়ে চলেছে। এনআরসি তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
শুধুমাত্র এনআরসি নয়। ১৯৫০ সালের দি ইমিগ্রেশন (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট এবং ছয়ের দশকে প্রোজেক্ট অফ প্রিভেনশন অফ ইনফিলট্রেশন (পিআইপি) প্রয়োগ করে লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষী মুসলমানকে পূর্ব পাকিস্তানে বিতাড়িত করা হয়। অনেক বাংলাভাষী মুসলমান উচ্ছেদের ভয়ে অসমিয়াকে খাতায় কলমে মাতৃভাষা হিসাবে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। ১৯৬৪ সালে গঠিত হয় ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। ফরেনার্স আইন অনুসারে অভিযুক্তকেই নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি জমা দিতে হয়। অর্থাৎ অভিযোগকারীকে অভিযোগের সত্যতা নয়, অভিযুক্তকে নির্দোষ হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। সেইসময় কংগ্রেস সরকার গঠিত এই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালকেই কাজে লাগাচ্ছে আজকের বিজেপি সরকার।
১৯৭৮ সালে আসামে এই পরিচয় সত্তার রাজনীতি কিছুটা ধাক্কা খায়। সেবার আসামে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয়। বামপন্থী বিভিন্ন দল মিলিয়ে ২৩টি আসন পায়। এতজন বাম বিধায়ক আসামে পরে আর হয়নি। পরিচয় সত্তার বিপরীতে শ্রেণি রাজনীতির সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে ভাষিক ও ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতি আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে মঙ্গলদই লোকসভার উপনির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হয়। বিদেশিদের নাম তালিকায় রয়েছে অভিযোগ করে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) ও অসম গণ পরিষদ (অগপ) ‘বাংলাদেশি খেদাও’ স্লোগান দিয়ে হিংস্র আক্রমণ শুরু করে। বাঙালি, বিশেষত মুসলমানদের উপর, আক্রমণ হয়; গণহত্যা চলে। শেষপর্যন্ত ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে আসাম চুক্তির মাধ্যমে তখনকার মত মিটমাট হয়।
৬ ক ধারা ও পরবর্তী পরিস্থিতি
আসাম চুক্তি অনুযায়ী সে রাজ্যে নাগরিকত্বের ভিত্তি ঠিক হয় ২৫ মার্চ, ১৯৭১। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে যাঁরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসামে এসেছেন তাঁদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গণ্য করা হবে। এই ভিত্তিবর্ষের কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। তারজন্য ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ৬ক ধারা যুক্ত করা হয়। ওই ধারা কেবল আসামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
যদিও ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ এরপরেও কমেনি। আসাম চুক্তির পর বিধানসভা ভোটে জেতে অগপ। ১৯৮৭ সাল থেকে পৃথক বোড়োল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে একের পর এক গণহত্যা ঘটতে থাকে। আক্রমণের লক্ষ্য মুসলমান, সাঁওতাল, ওরাওঁ জনগোষ্ঠী। ১৯৯৭ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন আসামে ভোটার তালিকা সংশোধনে ডি-ভোটার বিষয়টি যোগ করে। বিদেশি বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তি মাত্রেই ডি-ভোটার হিসাবে চিহ্নিত হন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা দেশের নাগরিক বলে প্রমাণিত না হবেন, ততক্ষণ তাঁদের ভোটাধিকার থাকবে না – এই ব্যবস্থা করা হয়। আগেই বলা হয়েছে, এই প্রমাণ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকেই দিতে হবে। নথির জটিলতায় অনেকেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে এসে থাকলেও, এমনকি বহু পুরুষ ধরে এখনকার আসাম ভূখণ্ডে বাস করেও নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারেননি। প্রশাসনও যে এক্ষেত্রে সহযোগিতা না করে বিদেশিদের সংখ্যা বেশি দেখাতেই ব্যস্ত, তার প্রমাণ বারবার মিলেছে।
অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার আসামের মত সারা দেশেই এনআরসি করার জন্য ২০০৩ সালে বিধি জারি করে। সেই বিধিতে কেবলমাত্র আসামের জন্য ৪ক ধারা যুক্ত করা হয়, যা আসলে নাগরিকত্ব আইনের ৬ক ধারার অনুসারী। রাজনৈতিকভাবে আসাম চুক্তির বিরোধী হলেও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতায় ৬ক ধারাকে এনডিএ সরকার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল। ২০০৪ সালের ভোটে এনডিএ হেরে যায়, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশজোড়া এনআরসির কাজ স্থগিত হলেও ২০০৫ সালে কেন্দ্রের ইউপিএ, আসামের কংগ্রেস সরকার এবং আসুর বৈঠকে ১৯৫১ সালের এনআরসি নবীকরণের সিদ্ধান্ত হয়। যদিও অশান্তির জন্য তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৪ সালে এক জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আসামে এনআরসি নবীকরণের নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রে ততদিনে ইউপিএ সরকারের বদলে এসে গেছে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। ২০১৮ সালের ৩১ অগাস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত নতুন এনআরসি থেকে ১৯,০৬,৬৫৭ জনের নাম বাদ পড়ে। যার মধ্যে ১২ থেকে ১৪ লক্ষ হলেন হিন্দু বাংলাভাষী।
বিজেপির নীতি সাপ হয়ে কাটা, ওঝা হয়ে ঝাড়া
চূড়ান্ত তালিকা কিন্তু অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাদের মতে বিদেশি অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যাটা প্রায় ৪০ লক্ষ। আবার বাদ যাওয়া মানুষের মধ্যে সিংহভাগ হিন্দু হওয়ায় মুসলমান অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বিজেপির প্রচারও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এনআরসিকে বিজেপি বড় ইস্যুতে পরিণত করতে চেয়েছিল। কেবল আসামে নয়, দেশজুড়ে এনআরসি করার বিষয়টি তারা আবার সামনে নিয়ে আসে। আসাম নাগরিক মঞ্চ দাবি করেছিল, ২০১৪ সালে যাঁরা ভোটার পরিচয়পত্র পেয়েছেন তাঁদের সকলকে নাগরিকত্ব দেওয়া হোক। আসামে সেই সময়ের কংগ্রেস সরকার সহমত হয়ে সুপ্রিম কোর্টে এফিডেভিটও জমা দেয়। ২০১৬ সালের আসাম বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস হারে, ক্ষমতায় আসে বিজেপি। ওই রাজ্যে সেই প্রথম বিজেপি সরকার গঠন করে। এনআরসিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিতে তারা ততদিনে জমি অনেকখানি শক্ত করেছে। তাদের জোটসঙ্গী অগপ দ্রুত জমি হারিয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এসেই আসাম সরকারের সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া সেই এফিডেভিট প্রত্যাহার করে নেয়।
আসামের সংসদীয় রাজনীতিতে বিজেপির দ্রুত উত্থান ঘটলেও, সংঘ পরিবার কিন্তু তলে তলে অনেকদিন ধরেই সক্রিয়। বাংলাদেশি খেদাও আন্দোলনে অগপ ও আসুর নাম প্রকাশ্যে এলেও চুপিসাড়ে তখন থেকেই তারা কাজ করে গেছে। লক্ষ্য ভাষাগত বিদ্বেষকে মুসলমান বিদ্বেষে রূপান্তরিত করা। সেই কাজে তারা আজ অনেকখানি সফল।
আরো পড়ুন মিঞা মিউজিয়াম বন্ধ: কোথায় শুরু, কোথায় শেষ?
২০১৮ সালের চূড়ান্ত এনআরসি থেকে বাদ যাওয়া মানুষের সিংহভাগ হিন্দু হওয়ায় বিজেপি সিএএ নিয়ে আসে। শুরু করে এনআরসি এবং সিএএ গুলিয়ে দেওয়ার খেলা। আগে এনআরসি, না আগে সিএএ? অমিত শাহ কথিত ‘ক্রোনোলজি’ আরও জলঘোলা করে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি বারবার বলেছিল, আগে নাগরিকত্ব আইন সংশোধিত (সিএএ) হবে, তারপর এনআরসি হবে। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরেই সিএএ সংসদে পাশ করানো হয়। এনআরসি আর সিএএ-কে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। বিজেপি সেটাই করতে চায়। দেশজুড়ে সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন এবং করোনা অতিমারীর জন্য এ নিয়ে বিজেপিকে সাময়িকভাবে চুপ করে যেতে হয়েছিল। কিন্তু এবছরের মার্চ মাসে এই সংক্রান্ত বিধি চূড়ান্ত করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার। সংশোধিত আইন অনুসারে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে যাঁরা পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন। তবে মুসলমানরা পাবেন না। অর্থাৎ নাগরিকত্বের সঙ্গে যেমন ধর্মীয় পরিচয় জুড়ে দেওয়া হল, তেমন নাগরিকত্বের ভিত্তি হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪।
স্বাভাবিকভাবেই আসাম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ২০১৯ সাল থেকেই সিএএ-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, যার চাঁদমারি বাংলাভাষীরা। দেশজুড়ে চলা এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে কিন্তু এর কোনো যোগ নেই। এইসব রাজ্যের সিএএবিরোধী আন্দোলনের মূল প্রেরণা এনআরসির প্রতি সমর্থন। আবার এনআরসিতে নাম না ওঠায় শঙ্কিত ওইসব রাজ্যের হিন্দুদের বড় অংশ সিএএর ভরসায় রয়েছেন।
একদিকে সিএএর মাধ্যমে নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ ২০১৪ করে দেওয়া, অন্যদিকে আসামে নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ ১৯৫১ সাল করার চেষ্টা। বিজেপির এই দ্বিচারিতার কারণ কী? অসমিয়া ও বাংলাভাষীদের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরি করতে তারা কেবল এনআরসি চায় তাই নয়, ভিত্তিবর্ষেরও পরিবর্তন চায়। ১৯৭১ সাল ভিত্তিবর্ষ হলে যদি ১৯ লক্ষের বেশি মানুষের নাম বাদ যায়, তাহলে ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ করলে অনেক বেশি মানুষের নাম বাদ যাবে। এতে অসমিয়ারা যেমন বিজেপির উপর সন্তুষ্ট হবে, তেমন আসাম চুক্তি অবৈধ প্রমাণ করতে পারলে কংগ্রেসকেও কোণঠাসা করা যাবে। তাই নাগরিকত্ব আইনের ৬ক ধারা বিজেপি বাতিল করতে চাইছে।
এর ফলে অসমিয়া ও বাংলাভাষীদের মধ্যে আবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। তা শুরু হলেই বিজেপি হিন্দু বাঙালিদের ত্রাতা সাজবে। সিএএ দেখিয়ে বলবে যে তাঁদের ভয় নেই। যদিও সিএএ অনুসারে আবেদন করলেই নাগরিকত্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এনআরসিতে বাদ যাওয়া হিন্দু বাঙালিরা খড়কুটোর মত ওই আইনের উপরেই ভরসা রাখবেন, বাঙালিদের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন বাড়বে। অসমিয়ারা যেমন আসাম চুক্তি বাতিল হলে বিজেপির উপর সন্তুষ্ট হবেন, তেমন হিন্দু বাঙালিরাও সিএএর জন্য বিজেপির প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য হবেন। দুই পক্ষের কাছেই কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা কমবে। এই হল বিজেপির ছক। পরিণামে ভাষা ও ধর্মকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষের রাজনীতি বাড়লেও বিজেপির কিছু আসে যায় না। সারা দেশে তারা এমনটিই চায়। এর ভয়াবহ পরিণাম আমরা মণিপুরে দেখতে পাচ্ছি।
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সম্মান জানিয়ে বিজেপি পিছু হটবে – সে ভরসা নেই। ইতিমধ্যেই আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ওই রায় সম্পর্কে হালকা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সরাসরি বিরোধিতা যদি নাও করে, বিজেপি বেনামে নানা সংগঠনকে আসরে নামাবে। পরোক্ষে মদত দেবে কেন্দ্র আর রাজ্যের ডবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকার। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আসাম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের জাতিসত্তাভিত্তিক বিদ্বেষের রাজনীতিকে একমাত্র প্রতিহত করতে পারে রুটিরুজির লড়াই। শ্রেণি রাজনীতিই এর একমাত্র প্রতিষেধক।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







