ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময় ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের পক্ষে। যা জেনে এসেছি তা-ই চিরসত্য – এরকম অবৈজ্ঞানিক ভাবনা এক ধরনের কুসংস্কার। মাও সে তুং বলতেন, যা পুরনো, তা-ই ঐতিহ্য নয়, তা যদি হয় তাহলে তা নিঃসন্দেহে নতুন দেশ গড়ার পক্ষে বিপজ্জনক। ফলে ইতিহাস কোন চিরসত্য, স্থবির বস্তু নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যে একদা যাঁকে মহামানব ভাবা হত, পরবর্তীকালে গবেষণা করে তাঁর অনেক ত্রুটি সামনে এসেছে। লেনিন, জোসেফ স্তালিন, মাও সবাইকে নিয়েই তো নতুন নতুন গবেষণা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি ভাঙা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। তিনি সেদেশের কালো মানুষদের পক্ষে ছিলেন না – এই অভিযোগে। ব্যক্তির কথা যদি বাদও দিই, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও কম প্রশ্ন উঠছে না। ফলে শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন চলবে না – এই মৌলবাদী চিন্তা অত্যন্ত বিরক্তিকর।বাংলাদেশে বিতর্ক এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। গত আড়াই মাস ধরে এমন অনেক জিনিসকে বিতর্কের বিষয় করে তোলা হচ্ছে যেগুলো কোনো বিষয়ই নয়। তবে সম্প্রতি আটটা জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে যেভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, তা আগের কোনো ব্যাপারে হয়নি। মূলত তিনটি দিবস বাতিল নিয়ে হইচই পড়ে গেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও।

বর্তমান সরকারের শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যা ও সংবিধান দিবসকে ছুটি ঘোষণা ও জাতীয় দিবসের পুরনো সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করা নিয়েই যাবতীয় গণ্ডগোল। বাদবাকি অন্যান্য জাতীয় দিবস এতদিন কেন ছিল, তা নিয়ে বরং প্রশ্ন তোলা উচিত। শেখ সাহেবের স্ত্রীর মৃত্যু যতই মর্মান্তিক হোক না কেন, তা জাতীয় শোক কেন হবে তা বোঝা সত্যিই কঠিন। নতুন সরকার সাহসের সঙ্গে যে প্রশ্ন তুলেছে, তা কিন্তু ইতিহাসের যথার্থ প্রশ্ন। পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ হওয়া কোনো একমাত্রিক বিষয় নয়। শেখ মুজিব ইতিহাসের প্রয়োজনেই নেতা হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে নিশ্চিত তাঁর অবদান রয়েছে। কিন্তু তিনিই স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনক – একথা মোটেও সত্য নয়। আওয়ামী লীগ গড়ে তোলা, ভাষা আন্দোলন, এমনকি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সাফল্য, কোনোটার সময়েই মুজিব ‘কাল্ট ফিগার’ ছিলেন না। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুর পরে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে শেখ মুজিবের হাতে আসে। ততদিনে নিজের প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন মওলানা ভাসানী। তাঁর নতুন দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পতাকার নিচে তখন সমবেত হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববাংলার বাম, প্রগতিশীল শক্তি। ন্যাপের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মূল বিরোধ ছিল আমেরিকার প্রশ্নে। এখন যে লীগ সমর্থকরা জুলাই অভ্যুত্থানকে মার্কিন ষড়যন্ত্র বলে মড়াকান্না কাঁদছেন, তাঁদের মনে করিয়ে দিই, ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত লীগ ছিল পুরোপুরি আমেরিকা ঘেঁষা। মুক্তিযুদ্ধের আসল কাণ্ডারী তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে শেখ মুজিবের বিরোধিতা ছিল নানা বিষয়ে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল, শেখ মুজিব ছিলেন মূলত দক্ষিণপন্থী আর তাজউদ্দীন চিরকাল বাম ঘরানার রাজনীতিক।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জেলবন্দি মুজিবকে মুক্ত করায় মুখ্য ভূমিকা ছিল ভাসানীর। তিনি দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে না তুললে শেখ সাহেবকে যে জেলেই থাকতে হত তা তো শ্যাম বেনেগালের সরকারি মুজিববন্দনাতেও স্বীকার করা হয়েছে। শেখ সাহেব অবশ্য জেল থেকে বেরিয়েই ভাসানীর ঋণ স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিলেন – মওলানা ভাসানীর বয়েস হয়ে গেছে, এখন তাঁর রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত। শুনতে খারাপ লাগতে পারে, তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে মুজিবকে নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম বলুন বা পরবর্তী সময়ে নানা দেশের গণআন্দোলনের নেতাদের দেখুন। সূর্য সেন, বাঘাযতীন, ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্র বসু বা মাও, হো চি মিন, ফিদেল কাস্ত্রো কিম্বা চে গুয়েভারার কৃচ্ছ্রসাধনের পাশে শেখ মুজিবের ত্যাগ, তিতিক্ষা নিতান্তই সাধারণ, ম্লান। ধানমন্ডির প্রাসাদোপম বাড়িতে বসে দামি চুরুট খাওয়ার সঙ্গে সর্বত্যাগী বিপ্লবী ভাবমূর্তি কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। শেখ সাহেব ছিলেন মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নবোত্থিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। যে জাতির ৯০% ছিলেন গ্রামীণ সর্বহারা, তাঁদের আসল জননেতা হলেন ভাসানী। ১৯৬৯ সালের তীব্র গণআন্দোলনের সময়ে ছাত্রদের বড় অংশ স্লোগান তুলতেন ‘জাতির পিতা মওলানা ভাসানী যুগ যুগ জিও।’

আরো পড়ুন বাংলাদেশ: জেগে থাকা স্মৃতি

বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক – শেখ সাহেবের এসব খেতাব তো আওয়ামী লীগের দেওয়া। মুজিবের ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ভাবমূর্তি নির্মাণের মধ্যেই তো ছিল ফ্যাসিবাদের বীজ। রক্ষীবাহিনীর উদ্দেশ্যই তো ছিল হাজার হাজার বাম কর্মী, সমর্থককে খুন করা। সাতের দশকে দুনিয়া জুড়ে যে বামপন্থী রাজনীতির বিকাশ, তাকে ঠেকাতেই প্রোডাক্ট হিসাবে শেখ মুজিবকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা সমূলে বিনাশ করে স্বৈরতান্ত্রিক পথে যাত্রার মুখ্য স্থপতি নিঃসন্দেহে শেখ মুজিব। তাঁর অনুসৃত পথকেই আরও নির্মম, নিষ্ঠুর করে তুলেছিলেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। ভারত, বাংলাদেশ দুই ভূখণ্ডেই দেখি, শোকজ্ঞাপনের একমাত্র পথ ছুটি ঘোষণা করা। ৭ মার্চের ভাষণের জন্য ছুটি তো আগে ছিল না। মাত্র তিনবছর আগে, ২০২১ সালে, তা আরম্ভ হয়েছিল। ৭ মার্চকে গৌরবান্বিত করার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা দল, একজন নেতাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি – এই মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠা করা।

একাধিক বিতর্ক এখন শুরু হয়েছে। মতিয়া চৌধুরী মৃত্যুর পরে কেন যথাযথ সম্মান পেলেন না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাল্টা প্রশ্ন উঠতেই পারে যে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কুশীলব ভাষা মতিনকে আওয়ামী লীগের সরকার কতটা স্বীকৃতি দিয়েছিল? ৩ নভেম্বর তাজউদ্দীন ও তাঁর তিন সহযোগীকে জেলের ভিতর যেভাবে খুন করা হয়েছিল তার কথাও কি কখনো সোচ্চারে স্বীকার করত আওয়ামী লীগ?

ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন হোক। কিন্তু ভয় হয়, কারণ সবসময় ক্ষমতাসীনরা নিজের সমর্থনে ইতিহাসকে ব্যবহার করে থাকে। ছুটি বাতিলে আপত্তি নেই, শেখ মুজিবকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও অন্যায় নয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আবেগ শুধু একটা দলের নয়। ওই যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। ১৯৪৮ সাল থেকেই তার প্রেক্ষিত গড়ে উঠেছিল। মওলানা ভাসানী পাকিস্তানের শাসকদের হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘আমরা কি পাকিস্তানের গোলাম?’ তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁর সেদিনের ভাষণ পড়তে পড়তে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। এইসব চেপে রাখা ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে আসুক। তখন তারাই সিদ্ধান্ত নেবে, কে তাদের জাতির সত্যিকারের জনক।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.