দেবজিৎ ভট্টাচার্য
যে কোনো জনমুখী আন্দোলনের আগাপাশতলা কাজে লাগে। আগা লাগে আন্দোলনের সঠিক সময়, নির্ভুল পথ নির্ধারণে আর তার পাশতলা আন্দোলনের রাজনৈতিক জোর কেমন হবে তা তৃণমূল স্তরে ঠিক করে, আগাকে নির্ভুল পথে এগোতে সাহায্য করে। এই দুয়ের মধ্যেকার ভারসাম্য যে কোনো আন্দোলনকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। আন্দোলনে যখন তৃণমূল স্তরের জনগণ পাশতলা থেকে আগাতে স্থান পায়, তখন সেই আন্দোলন সমাজের গুণগত মান পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তার আগের কিছু আন্দোলনের এই আগা ও পাশতলার উপরে ভর করে। সেইসময় তিনি কদিন, কেমনভাবে অনশন করেছিলেন – তা সমাজে যতটা না প্রভাব ফেলেছে, তার তুলনায় সমাজ অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছে তিনি কথা রাখেননি বলে। ফলে আবার নতুন আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। তবুও তিনি বারবার ফিরে যান অতীতে। ছায়ার সাথে যুদ্ধ করেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে। বিরোধী সাজেন, সমাজকে ভুলিয়ে দিতে চান যে তিনি ও তাঁর দল গত ১৩ বছর ধরে শাসকের ভূমিকায় আছে।
রাজ্যে এক যুগ পরে একটা আন্দোলন সমাজের প্রায় প্রত্যেক অংশের মানুষের সমর্থন পেয়ে গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এইসময় মমতা ও তাঁর দলের ভয় থেকে উদ্ভূত কার্যকলাপ, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে এই আন্দোলন সমাজের পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটাতে খানিক সফল। তাই জয়নগর সমেত নানা জায়গার সাধারণ মানুষ ন্যায়ের দাবিতে পথে নামতে পেরেছে। ফলে বিরোধী সাজবার ভঙ্গি কাটিয়ে মমতা এখন সরাসরি শাসকের ভঙ্গিমায়; শক্ত হাতে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা যন্ত্রের ব্যবহারে দক্ষতা দেখাচ্ছেন। এর বিরুদ্ধেই ৭০ দিনের বেশি জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন চলল। সেই আন্দোলন শাসক মমতাকে কতটা জ্বালাতন করেছে তা কয়েকদিন আগের লাইভ স্ট্রিমিংয়ে স্পষ্ট দেখা গেছে। সেখানে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিপুষ্ট শাসকের ভূমিকায় তাঁর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্র হল জনগণের সেই নিষ্ঠুর পিতা, যে না কারোর কথা শোনে, না বোঝে। বরং নিজে যা মনে করে সেটাই ঠিক ভাবে, সেটাই করে। এখানে অধিকার কোথায়, জনগণ শাসককে নির্বাচন করেছেন নাকি জনগণকে শাসক বেছে নিয়ে রাজ্যে থাকতে দিয়েছে, সেটাই প্রশ্ন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এসব ছোট ও মাঝারি বিষয় অনেকে না-ই মনে রাখতে পারেন। কিন্তু সমাজ এসব মনে রাখে, সিংহভাগ মানুষ এইসব স্মৃতি ধরে রাখেন। এগুলোই সামাজিক চেতনায় বৈরিতাহীন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে, প্রভাব ফেলে, গেড়ে বসে। আবার এগুলোই জনগণের মধ্যে বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করে। ফলে আজকের জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনে নতুন করে উঠে এসেছে নির্মম বাম জমানার আন্দোলনের কথা, অথবা নিকৃষ্ট বিজেপিশাসিত রাজ্যের ভয়াবহ ঘটনা, যা সমাজ মনে রেখেছে কিংবা রাখছে। সঙ্গে দেখা গেছে জনগণের নতুন অংশের মধ্যে প্রতিবাদী, বিদ্রোহী চেতনার আনাগোনা। এটাই এই আন্দোলনের, সমাজের পাওনা। তবে শাসক মমতা এবং তাঁর দল এখনো বাম ও বিজেপি কবে কোথায় কী করেছে তাকে ঢাল করে নিজেদের বর্তমান থেকে জনগণের নজর ঘোরানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই বারবার শাসক বাম এবং শাসক বিজেপির নিষ্ঠুরতার কথা তুলছে। কিন্তু সেসব কথা আর তেমন প্রভাব ফেলছে না। কারণ আন্দোলন সমাজে চারিয়ে গেছে। এই আন্দোলনের মধ্যে মানুষের বর্তমান দমনপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার অভিলাষ ফুটে উঠছে।
জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের দুটো পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় আন্দোলনের শুরুর দিন থেকে (১৪ আগস্ট) স্বাস্থ্য ভবনে ধরনা পর্যন্ত; দ্বিতীয় পর্যায় সরকারকে শেষ সুযোগ দিয়ে অনশন চালু করা থেকে অনশন তুলে নেওয়ার দিন পর্যন্ত। প্রথম পর্যায়ের আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততায় সমাজের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ভাঙার আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তা দ্বিতীয় পর্যায়ে খানিকটা অথবা অনেকটা কম দেখা গেছে। তা থেকে বেশকিছু ব্যাপার নির্ধারিত হল – কী করা যাবে আর কী করা যাবে না। ফলে প্রথমে এই আন্দোলন নিয়ে রাষ্ট্রের যে ভয় তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা খানিকটা কমে গেল। আন্দোলন মধ্যবিত্তের বাইরে খানিক গণভিত্তি হারাল। শহুরে গণ্ডির মধ্যে আটকে গেল, শাসকশ্রেণির পক্ষে যায় এমন সংস্কার প্রচেষ্টাও আন্দোলনের মধ্যে লক্ষ করা গেল। যেমন প্রধানত নিজেদের দাবিকে দুর্নীতি ও হুমকি সংস্কৃতি বাইরে না আনা, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলা, গরিব জনগণের সেবার স্বার্থে এই হাসপাতালগুলোকেও সরকারের অধীনে আনার প্রস্তাব না দেওয়া।
আরো পড়ুন আমার রাত জাগা তারা: একটি টালিগঞ্জি হুজুগ ও হুতোমি বিসম্বাদ
ফলে এই আন্দোলনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা সমাজের অন্যান্য পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষের পরিসর কমেছে। যে মূল দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হল, তা আঘাত করেছে আন্দোলনের দর্শনে। বস্তুনিষ্ঠ বিবেচনার তুলনায় আবেগের ভূমিকা আন্দোলনে বেশি হয়ে গেছে। এই সুযোগ শাসক মমতা হাতছাড়া করেননি, রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগিয়েছেন। একদিকে সংবাদমাধ্যম তুলে ধরেছে একের পর এক অর্ধসত্য, যেমন কারা কারা এই কদিনে বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করে বাড়তি টাকা কামিয়েছে। এই অর্ধসত্য আন্দোলনকে অনেকটাই কালিমালিপ্ত করেছে। আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে এইসব দোষ দূর করতে হবে।
এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তবেই আন্দোলনের নানা সামাজিক, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার গণ্ডি ভেঙে বেরনো সম্ভব হবে। মধ্যবিত্ত বাদে অন্য শ্রেণির দাবিও সমাজ থেকে উঠে আসবে। আন্দোলনের দাবিতে শ্রমজীবী, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দাবি যুক্ত না থাকলে, তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া কী করে সফল হবে? উল্টে শাসক মমতার হাতই শক্ত হবে।
যাঁরা স্থিতাবস্থার পক্ষে, তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন ‘কী পেলে আন্দোলন করে?’ তখন উত্তর কী হবে? উত্তরহীনতার সুযোগ শাসক দল নিতে চাইবে। এখন যা করছে, কাল তা আরও জোর দিয়ে করে ভয়ের রাজত্বই টিকিয়ে রাখতে চাইবে। ক্ষমতাবলে প্রমাণ করবে – সবটাই ছিল চক্রান্ত। অতএব ভবিষ্যতে আর আন্দোলন করে সাধারণ মানুষের লাভ নেই।
১৯৮৩ সালের আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তাররা বলেন, সেই আন্দোলনের ফলে সরকারি হাসপাতালে ব্লাড ব্যাঙ্ক, এক্স-রে, ইসিজি পরিষেবা চালু হয়েছিল। ওষুধের অভাব খানিকটা মিটেছিল, তাঁদের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়নি। ব্যর্থ যে হয়নি তা আজকের আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তার এবং জনগণকে দেখলে অনুভব করা যায়। এই আন্দোলনকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে সেদিনের সেই আন্দোলন। এখন দেখার, এই আন্দোলনের আগাপাশতলার উপরে ভর করে ভয়ের শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিনা।
নিবন্ধকার গবেষণামূলক শ্রমিক পত্রিকা ‘বিবাদী’-র সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








