দেশের ৭৯ লক্ষ মানুষ প্রাপ্য বিনামূল্যের রেশন পান না। গত বাজেট অধিবেশনে কেন্দ্রীয় খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী রাজ্যসভায় এই তথ্য জানিয়েছেন। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, দেশের ৮১.৩৫ কোটি মানুষের বিনামূল্যে রেশন পাওয়ার কথা, কিন্তু পান ৮০.৫৬ কোটি মানুষ। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুসারে গ্রামাঞ্চলের ৭৫% ও শহরাঞ্চলের ৫০% মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দিতে সরকার বাধ্য। মনে রাখতে হবে, শেষ জনগণনার পর ১৩ বছর কেটে গেছে। অর্থাৎ অবশ্যই সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে। তাই প্রাপ্য বিনামূল্যের রেশন থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা আসলে ৭৯ লক্ষের অনেক বেশি।

কেন্দ্র ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে। রাজ্য সরকারও খাদ্য সুরক্ষা যোজনায় বিনামূল্যে চাল দেওয়ার কথা প্রচার করে। প্রচারের ঢক্কানিনাদে আসল সত্যিটা চাপা পড়ে যায়। সেটা হল, বিনামূল্যে রেশন দেওয়া সরকারের দয়া বা মহত্ত্বের পরিচয় নয়। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুসারে আইনি বাধ্যবাধকতা। সেই আইন চালু করেছিল ইউপিএ সরকার।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একদিকে যখন বিনামূল্যে রেশন দেওয়া নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে প্রচারের প্রতিযোগিতা চলছে, তখন খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে আমজনতার নাভিশ্বাস উঠছে। সরকারি পরিসংখ্যানই স্বীকার করছে, খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ সালে খাদ্যদ্রব্যের মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৭.৫%। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরে সেই মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮.৪%। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মুখে যা-ই বলুক, কাজে এই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে না। নাগরিকের খাদ্যের অধিকার, গণবণ্টন ব্যবস্থা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষিনীতি – সবই একে অপরের সঙ্গে জড়িত। সেসব চলছে কর্পোরেটের স্বার্থে, বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী।

খাদ্যসংকট অবশ্য আজ শুধু ভারতে নয়, বিশ্বব্যাপী। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে, ২০২২ সালে বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি মানুষ পেটভরা পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পাশাপাশি বেড়ে চলেছে বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং খাদ্যদ্রব্য নিয়ে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর মুনাফা। মাত্র দশটা বহুজাতিক সংস্থার দখলে রয়েছে সারা বিশ্বের বীজ বাজারের ৭০%। কীটনাশকের বাজারের অনেকটাও এই কোম্পানিগুলোর দখলে। এই কোম্পানিগুলোই নিজেদের মধ্যে গাঁটছড়া বেঁধে আরও বড় কোম্পানিতে পরিণত হচ্ছে।

ফসল বিক্রির পাইকারি ও খুচরো ব্যবসাও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বড় বড় কোম্পানির হাতে। শপিং মল, অনলাইনে জিনিস কেনাবেচা এদের অন্যতম হাতিয়ার। এদের স্বার্থেই দেশে দেশে নেওয়া হচ্ছে কৃষি নীতি। ফসল উৎপাদন বাড়ানোর নামে বিভিন্ন দেশের জৈব বৈচিত্র্য, দেশীয় বীজে স্থানীয় প্রাকৃতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে বহুকাল ধরে চলা কৃষি পদ্ধতি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কৃষি সংকট আরও বেড়েছে।

ভারতের মত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশের উপর কর্পোরেট দুনিয়ার নজর বহুদিনের। ধান ও গম উৎপাদনে ভারত বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। ডাল উৎপাদনে প্রথম, সবজি উৎপাদনে দ্বিতীয়, দুধ উৎপাদনে প্রথম। জৈব বৈচিত্র্যের বিচারে বিশ্বে ভারতের স্থান অষ্টম। এই বিপুল পরিমাণ শস্য ও জৈব সম্পদের দখল নিতে চায় দেশবিদেশের বড় বড় কোম্পানি। বিপুল পরিমাণ শস্য উৎপাদনের জন্য ভারতে কৃষি উপকরণের বড় বাজার রয়েছে। কৃষি পদ্ধতিকে ওদের মর্জিমাফিক পরিচালিত করতে পারলে সেই বাজারটা দখল করা যাবে। পাশাপাশি রয়েছে খাদ্যদ্রব্য বিক্রির বিশাল বাজার। তাই কৃষিকে অলাভজনক বলে প্রচার করে চাষির ঘরের সন্তানদের সস্তা শ্রমিকে পরিণত করা আর লাভজনক কৃষিক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ আজ পুঁজিবাদী দুনিয়ার কৌশল।

নয়া উদারনীতি গত শতকের নয়ের দশক থেকেই ভারতের কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এই শতকে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল – সবার জন্য খাদ্য এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ। আসল লক্ষ্য অবশ্য খাদ্যসংকট মেটানোর নামে বিশ্বজুড়ে কৃষি ব্যবস্থায় কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানো।

ফলে নেওয়া হয় দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা। প্রথম সবুজ বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল কৃষি উপকরণের বাজার দখল, দ্বিতীয়টার লক্ষ্য উপকরণ থেকে শুরু করে কৃষিজ পণ্য বিক্রি পর্যন্ত সবকিছু দখল করা, ভারতের খাদ্য ভাণ্ডারের উপর দেশবিদেশের বড় বড় কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার কায়েম করা। দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব, ভারত-মার্কিন কৃষি জ্ঞান বিনিময় চুক্তি, বীজ আইন সেই কাজে সহায়ক হয়েছে। এর পরিণামে চাষের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের দেনা বাড়ছে। বেসরকারি ক্ষুদ্র ঋণ কোম্পানিগুলোর ঋণের ব্যবসাও বাড়ছে। কৃষক ফসলের সঠিক দাম পাচ্ছেন না, আবার খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলেছে। রাজ্যেও একই চিত্র।

বেশ কয়েকবছর ধরেই ধান চাষে কৃষকের বিশেষ লাভ থাকছে না, অনেকের বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে। সরকার নিয়মমাফিক প্রত্যেক বছর ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ঘোষণা করে থাকে। সরকারের ধান কেনা নিয়ে প্রচারও কম হয় না। ২০২৪-২৫ মরশুমে কেন্দ্র ধানের এমএসপি ঘোষণা করেছে কুইন্টাল প্রতি ২,৩০০ টাকা। গতবারের থেকে ১১৭ টাকা বেশি। রাজ্য সরকার গত নভেম্বর মাস থেকে ধান কেনা শুরু করেছে। বেশ কয়েক মরশুমে রাজ্য সরকার ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। ২০২২-২৩ মরশুমে রাজ্য সরকারের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ লক্ষ টন, কিনতে পেরেছিল ৫৫ লক্ষ টন ধান। ২০২৩-২৪ মরশুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ লক্ষ টন। কিনতে পেরেছিল ৫১ লক্ষ টনের সামান্য বেশি। এই মরশুমে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে করা হয়েছে ৬৮ লক্ষ টন। প্রবণতা বলছে এবারেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।

আপাতভাবে মনে হয়, কৃষক খোলা বাজারে বেশি দাম পাচ্ছেন বলে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করছেন না। বাস্তবে বেশিরভাগ কৃষক এমএসপির থেকেও কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ সরকারের নীতিটাই ভুলে ভরা। সরকারি নিয়মে জমির মালিকানার কাগজই একজন কৃষকের পরিচয়ের প্রমাণ, কে চাষ করছেন তা প্রধান বিবেচ্য নয়। সরকারের কাছে ধান বেচতে হলে নাম নথিভুক্ত করতে হয়। তার জন্য নিজের নামে জমির পরচা বা বর্গা রেকর্ড, পাট্টা দরকার। না হলে জমির খতিয়ান উল্লেখ করে স্বঘোষণাপত্র জমা দিতে হয়। ফলে ভাগচাষি, চুক্তি চাষি, ইজারা চাষিদের বড় অংশ এসব দিতে পারেন না, আবার চাষ না করেও অনেক জমির মালিক কৃষক হিসাবে নাম নথিভুক্ত করেন। অনেক ক্ষেত্রে ভাগচাষি, ইজারা চাষির ফলানো ধান জমির মালিকই সরকারের কাছে বেচেন। বঞ্চিত হন প্রকৃত চাষি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র কৃষক নাম নথিভুক্ত করাতে পারলেও সরকারের কাছে সরাসরি ধান বেচতে পারেন না। তাঁর নামে সরকারের কাছে বেচেন বড় ব্যবসায়ীরা। সরকার কতজন কৃষকের থেকে ধান কিনেছে তার প্রচার করে, কিন্তু বিক্রেতাদের মধ্যে সকলেই প্রকৃত কৃষক নন।

আবার জমির নথি থাকলেও সরকারের কাছে ধান বিক্রি করা যাবেই এমন নিশ্চয়তা নেই। ধার করলে চটজলদি অভাবী বিক্রির তাগিদ, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের দূরত্ব, কেনার সময়ে কিছু ধান বাদ দিয়ে দেওয়া – এসব নানা কারণে অনেক কৃষক সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারেন না বা করেন না। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে বিক্রি করলে রাজ্য সরকার কৃষকদের কুইন্টাল প্রতি বাড়তি ২০ টাকা দেয়। অর্থাৎ কৃষক ধানের দাম পাবেন কুইন্টালে ২,৩২০ টাকা। অনেক রাজ্যেই সরকার এর চেয়ে বেশি দামে ধান কেনে। সব মিলিয়ে কৃষকদের জন্য কাজ করি বলে সরকার যত প্রচার করে, বাস্তবে প্রকৃত কৃষকরা তাতে অতি সামান্য উপকার পান।

শুধু ধান নয়, সব ফসলের ক্ষেত্রেই এক অবস্থা। যেমন চলতি মরশুমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার হঠাৎ করেই আলুর সহায়ক মূল্য ঘোষণা করল – কুইন্টালে ৯০০ টাকা। দেখা যাচ্ছে বিভিন্নরকম আলু চাষে গড়পড়তা খরচ পড়ছে কুইন্টালে ৭৫০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকা। ভাগচাষি, চুক্তি চাষি, ইজারা চাষির ক্ষেত্রেও তার থেকেও ৩০০-৪০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ লাভ তো দূরের কথা, সরকারি মূল্যে অনেকেরই লোকসান হবে। সরকার মূল্য কম করে ঘোষণা করলে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হয়। তারা সরকারি মূল্যের থেকেও কম দামে কৃষকদের থেকে আলু কেনে।

এই মরশুমে আলুর ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আলু সরকারি দামে বিক্রি করতে গেলে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যেতে হয়। তাতে অর্থ ও সময় – দুটোই খরচ হয়। তাই এই মরশুমে আলু চাষ করে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়লেন। অনেকেই দীর্ঘদিন আলু মাঠে রেখে দিয়েছিলেন ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আসায়। কিন্তু তারও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আলু কেনাকে কেন্দ্র করে ফাটকা কারবার চলে, ঘন ঘন দাম ওঠানামা করে। আলুর বন্ড কেনা নিয়েও ফাটকা কারবার হয়। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক চাষিদের সেখানে বিশেষ জায়গা থাকে না। চটজলদি আলু বিক্রি করে ধার শোধ করে পরের ফসল চাষ করার তাগিদ থাকে। বড় চাষিরা ঝুঁকি নেন দাম বাড়ার আশায়। কিন্তু অনেক মরশুমেই তাঁদেরও ব্যাপক লোকসান হয়। অথচ দেখা যায় বছরের কোনো কোনো সময়ে আলুর বাজার দর আগুন। চাষির লোকসান হয়, গরিব, নিম্নবিত্ত ক্রেতাদেরও নাভিশ্বাস ওঠে। মুনাফা করে ফাটকা কারবারিরা। অনেক সময়েই আলু কম দামে বেচে, পরে চাষিরা নিজেদের জন্য চড়া দামে বাজার থেকে আলু কিনতে বাধ্য হন।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ফসল মজুত রাখার ব্যবসায় কোম্পানির হানাদারি সংকট আরও বাড়িয়েছে। সমবায় সমিতি বা সরকারি হিমঘরের বদলে বাড়ছে বেসরকারি হিমঘরের সংখ্যা। রাজ্যে সমবায় পরিচালিত অনেক হিমঘর বন্ধ হয়ে গেছে। রাজ্যে কয়েক বছর আগেই চুক্তি চাষের আইনি ভিত মজবুত করা হয়েছে। ২০১৪ সালে কৃষিপণ্য বিপণন (নিয়ন্ত্রণ) আইন সংশোধন করে ব্যক্তি মালিকানায় কৃষি বাজার খোলা ও ই-ট্রেডিং অনুমোদন করা হয়। মতলব পরিষ্কার। ফসল কেনার সরকারি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ব্যক্তি মালিকানার সুবিধা করে দেওয়া।

আরো পড়ুন মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণের নীতিই বিপদে ফেলেছে আজ

দেশজুড়ে এভাবেই কর্পোরেট স্বার্থে খাদ্য নিরাপত্তা ধ্বংস করা হচ্ছে। খাদ্যশস্য ঝাড়াই-বাছাই, মজুত, বণ্টনের দায়িত্ব বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বের নামে এ কাজে চলছে। ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া এসবের জন্য চুক্তি করছে কর্পোরেটগুলোর সঙ্গে। এভাবেই কৃষকের থেকে ফসল কেনা, মজুত ও বিক্রির বড় অংশীদার হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা।

শপিং মল থেকে গ্রাম, শহরের মুদিখানার দোকান – সর্বত্র এখন ব্র্যান্ডেড চাল, আটা, ময়দা, ডাল, ভোজ্য তেলে ছেয়ে গেছে। হাতে গোনা কিছু বড় কোম্পানি বাজার দখল করছে। ছোট কোম্পানি বা ব্র্যান্ডবিহীন খাদ্যদ্রব্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। করোনা অতিমারীর সময়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলো কোটি কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। আবার গত ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হিন্ডেনবার্গ রিপোর্টের জেরে আদানি-উইলমার কোম্পানির ফরচুন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দাম কমে গিয়েছিল। এই কোম্পানির অন্যতম অংশীদার আদানি গোষ্ঠী।

কেবল আদানি নয়, বিভিন্ন কর্পোরেট গোষ্ঠীই খুচরো ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ভারতে খুচরো ব্যবসার বিশাল বাজার। যার বড় অংশ হল খাদ্যদ্রব্য। দেশবিদেশের বড় বড় কোম্পানি এখন গাঁটছড়া বেঁধে এই বাজার দখলে নেমেছে। ই-কমার্সের জন্য টেলিকম পরিষেবা, সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও গাঁটছড়া বাঁধা হচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যের মূল্য এখন সরকার নয়, এইসব কর্পোরেট সংস্থার নিয়ন্ত্রণে।

তাদের সেই সুবিধা করে দিতে রেশন ব্যবস্থাকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে খাদ্য ও গণবণ্টন দপ্তরের বরাদ্দ গত বাজেটের থেকে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা কমেছে। এই দফতরের গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনায় বরাদ্দ কমেছে ২,২৫০ কোটি টাকা। মিড ডে মিল, অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়েছে অতি সামান্য। মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় প্রকৃত বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

বিনা পয়সায় খাদ্যশস্য দেওয়ার প্রচারে রয়েছে বড়সড় ফাঁকি। সামান্য পরিমাণ খাদ্যশস্য দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল রেশন কার্ডে অধিকাংশ মানুষই পান সামান্য চাল, গম। রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনায় গমও পাওয়া যায় না, বাকিটা কিনতে হয় খোলা বাজারে। সে বাজার এখন বড় বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। খাদ্য সুরক্ষা আইন আছে, কিন্তু নাগরিকদের পেটভরা, পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কৃষকেরও ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এদিকে রাষ্ট্রনেতারা ভারতকে বিশ্বগুরু করার স্বপ্ন ফেরি করছেন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. অসাধারণ বিশ্লেষণ। জটিল বিষয়কে সোজা সরল ভাষায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার জন্য লেখকের মুন্সিয়ানা তারিফ যোগ্য। এই ধরণের লেখার আরোও প্রয়োজন। একটিই অনুরোধ, এর পরে FPO বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করলে অনেক মানুষের উপকার হয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.