মূলধারার অর্থনীতিতে এটা মোটামুটি স্বীকৃত যে মূল্যস্ফীতি প্রতিহত করার প্রধান এবং সম্ভবত একমাত্র উপায় হল টাকার যোগান কমানো। যেহেতু টাকার যোগানের মধ্যে ব্যাঙ্ক ঋণকেও ধরা হয়, তাই মনে করা হয় টাকার জোগান কমানোর সবথেকে ভাল উপায় হল সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া। মূল্য নিয়ন্ত্রণের এই ব্যবস্থা ছাড়া আরও নানারকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে চলে। তবে সেসব এখন গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মূলধারার অর্থনীতিতে মনে করা হয়। আমাদের দেশে অবশ্য অন্যান্য ব্যবস্থাগুলো এখনো গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিককালেও আমদানিকে উৎসাহ দেওয়া তথা রফতানি নিয়ন্ত্রণ করা এবং মজুতদারির উপর নিয়ন্ত্রণ, সরকারের বিপণন ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশে যে গণবন্টন ব্যবস্থা বহুকাল ধরে চালু আছে তারও অন্যতম উদ্দেশ্য হল দেশের একাংশের মানুষকে মূল্যস্ফীতির প্রকোপ থেকে রক্ষা করা।

তাই এটা বলাই যায় যে শুধুমাত্র সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে – এরকম চরমপন্থী নীতি ভারতে গৃহীত হয়নি। তবে এই ধরনের মৌলবাদী নীতি থেকে ভারত পুরোপুরি মুক্ত – এমনও বলা যায় না। কারণ ২০১৫ সালে গৃহীত আর্থিক নীতি কাঠামো (monetary policy framework) অনুসারে ভারতে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪% (+/-২%)। লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করতে কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু এই নীতির সমস্যা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশের বেশি হলেই সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তার ফল যা-ই হোক না কেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত কয়েক দশকের মূল্যস্ফীতির মাত্রা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ভারতে মূল্যস্ফীতির সব থেকে বড় কারণ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। এটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক, কারণ যে কোন জিনিস এবং তার কাঁচামাল উৎপাদনে জ্বালানি তেল অপরিহার্য উপাদান। আবার শুধু যে উৎপাদন পদ্ধতিতেই তেলের ব্যবহার হয় তা নয়, যে কোন জিনিস তৈরির কাঁচামাল বা উৎপাদন সামগ্রী একত্রিত করতে এবং উৎপাদিত দ্রব্য উপভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতেও তেলের ব্যবহার হয়। কিন্তু যেহেতু তেলের সিংহভাগই আমদানি করতে হয়, তাই এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি মেনে নেওয়া ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই। এমন ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম পরাতে হলে একমাত্র উপায় হল তেলের উপর কর কমানো। যদিও সে পথে বেশি এগোলেও সমস্যা হতে পারে, কারণ তেলের উপর কর সরকারের আয়ের একটা বড় উৎস। কর কমিয়ে আয় কমলেও ব্যয় কমানো সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি বাড়বে, আর এটা মোটামুটি স্বীকৃত যে সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার একটা বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ধরা যাক, দেশে মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে বাইরে থেকে আমদানি করা তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদনকারীরা তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের উৎপাদিত জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় হয়ত তাদের বিক্রির পরিমাণ কিছুটা ধাক্কা খাবে। এমতাবস্থায় যদি সুদের হার বেড়ে যায়, তাহলে সেটা হবে গোদের উপর বিষফোঁড়া। কারণ তাতে তাদের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে, যেহেতু বেশিরভাগ উৎপাদনকারীই উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে ব্যাঙ্ক ঋণের উপর নির্ভর করে। ফলে তাদের ব্যবসা আরও মার খাবে। এভাবে বেশিদিন চলতে থাকলে অনেক কোম্পানিই হয়ত ব্যাঙ্ককে দেয় সুদ বা আসল ঠিকমত দিতে পারবে না। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যাঙ্কে অক্রিয়াক্ষম সম্পদের (non-performing assets) পরিমাণ বাড়তে থাকবে। এমন পরিস্থিতি অনেকগুলো কোম্পানির ক্ষেত্রে হলে সরকারের উপর ঋণ মকুব করার চাপ বাড়বে, কারণ একসঙ্গে অনেকগুলো কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ধাক্কা যে কোনো সরকারের পক্ষেই সামলানো মুশকিল।

সুদের হার বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপরেও, কারণ আজকাল অনেকেই ঋণ নিয়ে বাড়ি, গাড়ি ইত্যাদি কেনে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যতই আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়ুক, সরকার কখনোই তার ঋণ মকুবের কথা ভাবে না। অর্থাৎ এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে সরকার বড় বড় কোম্পানির ঋণ মকুব করে আর সাধারণ মানুষ চড়া হারে সুদ দিতে থাকে। অবশ্য সব কোম্পানিই যে সত্যি সত্যি আর্থিক সমস্যায় পড়ে বলে ঋণ মকুব হয় এমন হয়ত নয়। কিন্তু তেমন সম্ভাবনা থাকে বলেই তাদের পক্ষে ঋণ মকুবের দাবি করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

এখন দেখা যাক, সুদের হার বাড়লে আর কী ঘটতে পারে। আমাদের দেশে যে ঋণের আদানপ্রদান হয় তার একটা বড় অংশের গ্রহীতা হল সরকার। বস্তুত আমাদের দেশের বিভিন্ন সরকারের যে আয়, গড়ে তার প্রায় ৩০% চলে যায় সুদ দিতে। সেই সুদের ভারও বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। তবে সমস্যা শুধু সেটাই নয়। সুদের হার বাড়লে সরকারের খরচও বেড়ে যায়, ফলে সরকারের বাজেট ঘাটতি বেড়ে যায়। ফল সেই মূল্যস্ফীতি।

এটাও মোটামুটি স্বীকৃত যে, যে কোনো অর্থব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বৃদ্ধি আর মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। যেখানে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বেশি হয় সেখানে তুলনামূলকভাবে কিছুটা মূল্যস্ফীতিও ঘটে। তবে এটাও ঠিক যে মূল্যস্ফীতি খুব বেশি হলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা অবশ্যই কাম্য। যা কাম্য নয় তা হল মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণকে উপেক্ষা করে সুদের হার বৃদ্ধিকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র হাতিয়ার হিসাবে ধরে নেওয়া।

আমাদের দেশে অনেক সময় মূল্যস্ফীতি হয় কৃষিজ পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার ফলে। যদি এমন হয় যে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ প্রাকৃতিক কারণে কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়া, সেক্ষেত্রে সুদের হার বাড়িয়ে মানুষের কৃষিজ পণ্যের বা খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা কমানো সম্ভব নয়। মানুষ যেমন করেই হোক পেট ভরানোর চেষ্টা করবে। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় মানুষ ঋণ নিয়েও খায় আর সুদের হার বাড়লে কম খাবার খাবে, তাহলে সেইভাবে মূল্যস্ফীতি কমলে মানুষের কী লাভ? যদি মূল্যস্ফীতি হয় মজুতদারির কারণে এবং সেই মজুতদারিতে ঋণের ভুমিকা থাকে, তাহলে হয়ত কিছুটা লাভ হতে পারে। তবে ভারতের পরিস্থিতিতে সেটা কতটা বাস্তবসম্মত তা পরখ করার প্রয়োজন আছে।

আরো পড়ুন বাজার অর্থনীতি ও ফাটকাবাজির চাপে আলু চাষি বিপন্ন

উন্নত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার এবং মূল্যস্ফীতির হার এমনিতেই একটু কম থাকে। অতিমারি পরবর্তী পরিস্থিতিতে অবশ্যই কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছে। যা-ই হোক, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কাঠামোগত কারণে মূল্যস্ফীতি থাকে একটু উপরের দিকেই। তবে কিছু উন্নয়নশীল দেশে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণের নীতি গৃহীত হলেও সেটা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, সুদের হার বাড়িয়েই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এই যুক্তির পক্ষে বিশেষ প্রমাণ নেই। তবুও কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে সারা পৃথিবী জুড়েই এই যুক্তি স্বীকৃতি পাচ্ছে। আর ভারতের ক্ষেত্রে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক নিয়ে সেভাবে কোনো গবেষণাই হয়নি।

ভারতে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণের নীতি গৃহীত হয়েছিল রঘুরাম রাজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর থাকার সময়ে তাঁরই পরামর্শে। তবে এরকম নীতি কিছুটা অঘোষিতভাবে আগে থেকেই চালু ছিল। রঘুরাম যখন একে ঘোষিত নীতি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বললেন, তখন সেটা কোনো আলাপ আলোচনা বা তর্ক বিতর্ক ছাড়াই নিঃশব্দে গৃহীত হয়ে যায়। রঘুরাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করেছেন বা পড়িয়েছেন, তাই তিনি যা বলছেন তা অমোঘ – এই ছিল এমন সিদ্ধান্তের পিছনে অলিখিত যুক্তি। কিন্তু অর্থশাস্ত্র যে প্রকৃতিবিজ্ঞান নয়, একই তত্ত্ব ব্যবহার করে আমেরিকা এবং ভারত – দুটো দেশ থেকেই চন্দ্রযান উৎক্ষেপণ করা গেলেও একই তত্ত্ব দিয়ে আমেরিকা এবং ভারত দুই দেশেরই অর্থব্যবস্থা পরিচালনা করা যায় না, কারণ ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো যেমন আলাদা, অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোও আলাদা – এই ব্যাপারটা খুব একটা স্বীকৃতি পায় না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. […] মূলধারার অর্থনীতিতে এটা মোটামুটি স্বীকৃত যে মূল্যস্ফীতি প্রতিহত করার প্রধান এবং সম্ভবত একমাত্র উপায় হল টাকার যোগান কমানো। যেহেতু টাকার যোগানের মধ্যে ব্যাঙ্ক ঋণকেও ধরা হয়, তাই মনে করা হয় টাকার জোগান কমানোর সবথেকে ভাল উপায় হল সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া।Read more […]

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.