ছোটবেলায় একটি গল্প শুনেছিলাম। এক শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের ‘দেশ’ শব্দটি নিয়ে বাক্য রচনা করতে দিয়েছেন। একজন ছাত্র লিখল “বহু মানুষ দ্বেষের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।” খাতা দেখার সময় মাস্টারমশাই বানান ঠিক করতে গিয়ে থমকে গেলেন। ছাত্রের অনিচ্ছাকৃত ভুল তাঁকে আবার ভাবতে বাধ্য করলো। সত্যিই তো! দ্বেষ না দেশ? দুটোই তো ঠিক।
দেশ আর দ্বেষ – সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ। আমাদের আজকের শাসকরা এই দুটি শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে বেশ ওয়াকিবহাল। দেশের নামে মানুষের মধ্যে দ্বেষ ছড়ানো তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। শ্রেণি, ধর্ম, জাত, লিঙ্গ, সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে হিংসার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। আরএসএসের হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নকে সফল করার নানা কৌশলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে সবসময় ভয়ে রাখা। পক্ষান্তরে বুঝিয়ে দেওয়া বারবার, যে তোমরা আলাদা, তোমরা অন্য, তোমরা অধস্তন। হিংসার রকমফের হয় অনেক। কখনো তা সরাসরি শারীরিক আঘাত হিসাবে নেমে আসে, কখনো আবার সূক্ষ্মভাবে দেওয়া বার্তা ঘটতে চলা হিংসার পূর্বাভাস নিয়ে আসে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কয়েকমাস আগে ভারত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার কাউন্সিলে (UNHRC) পাকিস্তান প্রস্তাবিত “ধর্মীয় হিংসা”-বিরোধী রেজলিউশনকে সমর্থন করেছে। প্রসঙ্গ সুইডেনে কোরান পোড়ানো। খুব ভালো খবর। বিশেষ করে এইরকম একটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারত-পাকিস্তানের একসঙ্গে আসা সত্যিই বেশ আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে যখন এমাসেই দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে ঘটা করে গণতন্ত্রের মাতৃক্রোড় হিসাবে ভারতবন্দনা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো নিয়ে খুব জরুরি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই সমস্ত ঘটনা শুধুই সাম্প্রদায়িক বলে তাৎপর্যপূর্ণ তা নয়। বরং তারা যে ইঙ্গিত বহন করে সেগুলি অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।
জুন মাসের শেষদিকে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে তিন মুসলমান ট্রাক চালক আর দুই সাফাইকর্মীকে বীভৎস মারধর করে বজরং দলের গুন্ডারা। তাঁদের অপরাধ? তাঁরা গবাদি পশুর দেহাবশেষ নিয়ে কাছের এক বিড়াল-কুকুরের খাবার তৈরির কারখানায় যাচ্ছিলেন।
এটি যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝবেন। পূর্বাশ্রমে অজয় সিং বিস্ত নামধারী এক গেরুয়া বসন পরিহিতি ব্যক্তি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই নানাভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে ওই রাজ্যে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে চলেছেন। “রামজাদা-হারামজাদা” বা “৭০-৩০”-এর মত উক্তি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বারবার, কিন্তু অজয় বিস্তের জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বগামীই থেকেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত ছ বছরে উত্তরপ্রদেশের সমাজ আর সরকারে বিপুল সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটেছে। আরএসএসের গণভিত্তি মজবুত হওয়ার সাথে সাথে তাদের সাম্প্রদায়িক কর্মসূচির প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বেড়েছে। সম্প্রতি সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা রাজনৈতিক কর্মীদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নিদান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই কর্মীদের অধিকাংশই মুসলমান। বুলডোজার রাজনীতির আঁচ গতবছর দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরীতেও পড়েছিল। দানবিক রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে মানুষ ব্যারিকেড হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যা যা ঘটছে, তা যে কোনো দেশের সরকার ফেলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু ভারতবর্ষ ভারতবর্ষই। জুন মাসেই কাঁওয়ারি যাত্রার সময়ে মুসলমান সন্দেহে হিমাচলে এক বৃদ্ধ দম্পতির গাড়ি ঘেরাও করে তাঁদের চূড়ান্ত হেনস্থা করা হয়। মনে রাখা ভাল, এই কাঁওয়ারিয়ারা এক বিশেষ নিম্নবর্ণের মানুষ। ব্রাহ্মণ্যবাদের এহেন ব্যাপ্তি ভীতিপ্রদ বললে কম বলা হয়। উত্তরাখণ্ডের পুরোলা শহরে মে-জুন মাস জুড়ে মুসলমান ব্যবসায়ীদের ভাতে মারার চেষ্টা চলেছে। এক মুসলমান যুবক বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক হিন্দু মেয়েকে অপহরণ করেছে, এই ছুতোয় শহরের সমস্ত মুসলমানদের উপর বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের উগ্রপন্থীরা আক্রমণ শানাচ্ছিলেন। প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণ না করে মুসলমানদের বলেছে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। এতদিন মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে অন্তত সরকারি রাখঢাক ছিল। এখন প্রশাসনও নির্লজ্জ; বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মেকি পরিসরেও নগ্ন।
হরিয়ানার নুহতে একইভাবে মনুষ্যত্বের মাথা হেঁট হয়েছে অগাস্টের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। মুসলমানপ্রধান এলাকায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের মত সংঘ পরিবারের সংগঠনগুলি উস্কানিমূলক মিছিল করে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে কিছু ঝামেলা হয়। প্রত্যুত্তরে গুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নির্বিচারে মুসলমান ব্যবসায়ী ও কর্মীদের উপর তাণ্ডব চলে। সাফ ফতোয়া জারি হয়, কেউ মুসলমান কর্মী দোকানে নিয়োগ করলে তাঁকে বয়কট করা হবে। বেছে বেছে গরিব মুসলমানদের দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। প্রচুর মানুষ ঘরছাড়া হন, অতি কষ্টে প্রাণটুকু নিয়ে বেঁচে ফেরেন।
আরো পড়ুন পরিকল্পিত দাঙ্গা: কীভাবে এবং কেন?
উত্তরপ্রদেশের একটি স্কুলের শিক্ষিকা ছাত্রদের শেখালেন তাদের মুসলমান বন্ধু ঠিক তাদের মত অতটা মানুষ নয়। তাকে দলে দলে চড় মারাটাই নিয়ম। শাসক দলের কোনো প্রথম সারির নেতা এই নিয়ে কিছু বলেননি। কারণ তাঁদের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই এইসব ঘটনা ঘটে চলেছে আমাদের দেশে। সাম্প্রদায়িক হিংসার চেনা চিত্রনাট্যেই ২০২৪ নির্বাচনের রণতূর্য বাজিয়ে এই দেশ দখল করতে চাইছে বিজেপি-আরএসএস।
চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও মহা সমারোহে নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধন হল দিল্লিতে। ভারতমাতার বাধ্য সন্তানরা যথারীতি খুব খুশি। সর্বাধিনায়ক জি-২০ মঞ্চে চওড়া বুকের জয়গান করে এসেছেন। নতুন সংসদ এই আত্মম্ভরিতার মূর্ত প্রতীক। সেখানে চন্দ্রযান ও বৈজ্ঞানিক চেতনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বহুজন সমাজ পার্টির সাংসদ দানিশ আলি ইসরোর বৈজ্ঞানিকদের সাধুবাদ জানাতে উঠেছিলেন। ওটুকুতে থেমে গেলে অসুবিধা ছিল না, কিন্তু তিনি দেশের গরিমা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইসরোর বাজেট ঘাটতির কথাও উল্লেখ করে ফেললেন। ফলে আজকের ভারতে তাঁকে সংসদের মধ্যে দাঁড়িয়েই “কাটওয়া”, “আতঙ্কবাদী”, “উগ্রবাদী”-র মত মধুর শব্দ শুনতে হল। বীর হিন্দু সৈনিক, দক্ষিণ দিল্লির সাংসদ রমেশ বিধুরী কাজটা খুব যত্ন করে সম্পন্ন করেন। রমেশকে তাঁর শৌর্যের পুরস্কার হিসাবে রাজস্থানে আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। এ দেশে এটাই নিয়ম, এটাই ভবিষ্যতের দস্তুর হবে – এই বার্তা দেশের সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেল।
এই দ্বেষ সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কতটা চারিয়ে গেছে তার মর্মান্তিক প্রমাণ পাওয়া গেল কয়েকদিনের মধ্যেই। দেশের রাজধানী দিল্লিতে গণেশ মন্দিরের প্রসাদ চুরি করতে পারে এই সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন ইসার আহমেদকে পিটিয়ে মারা হল। পুলিসের দাবি এই খুনের লক্ষ্য সাম্প্রদায়িক নয়। কিন্তু এতে তো সন্দেহ নেই যে চোর বলে সন্দেহ হলেই মানুষকে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে মারার পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে দেশে। গত কয়েক বছরে যে গণপিটুনির সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশে তার ফল মিলছে।
যে কোনো জাতিভিত্তিক পিতৃভূমির ভাবনার মূলে রয়েছে হিংসা ও বিদ্বেষ। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে সবসময় সংখ্যাগুরুই থাকতে হবে। তাই প্রয়োজন সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমাগত অত্যাচার – মারধোর করা, ঘরছাড়া করা, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো। অবশ্য আরএসএস নেতারা জানেন, কাল হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি হলেও হিটলারি কায়দায় মুসলমান গণহত্যা সম্ভব নয়। পুঁজির স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও ভারতবর্ষের শ্রমনির্ভরতাই এর কারণ। তাই তাঁদের উদ্দেশ্য মুসলমানদের উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পায়ের তলায় রাখা। তাঁদের ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা। মুসলমান শ্রমিক কৃষক যাতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে হিন্দু ভাইবোনদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বেশি মজুরি, ফসলের উচিৎ মূল্য, সুলভ শিক্ষা, উচ্চমানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইত্যাদির দাবিতে আন্দোলনের পথে হাঁটতে না পারেন। সাম্প্রতিককালে এই দেশ নানা প্রান্তে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুরদের জোরালো শ্রেণিসংহতি দেখেছে। বিজেপি সরকার ভাল করেই জানে, এ আগুন বাড়তে দিলে তাদের বিপদ। হিন্দু-মুসলমান, মন্দির-মসজিদ লড়াই জারি রেখে গরিবগুরবোদের ভুলিয়ে রাখাই একমাত্র রাস্তা।
একমাত্র খেটে খাওয়া মানুষের শ্রেণিসংহতির মধ্যে দিয়েই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই, কারণ তাঁদের খিদে এক, দুঃখ এক, যন্ত্রণা এক। এক ভাই আরেক ভাইয়ের প্রতি সমব্যথী হয়ে এক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবেন – ইতিহাস এই বিশ্বাস গড়ে দেয়। দেশটা থেকে যাবে, দ্বেষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে – এই ভরসা থাকুক।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









[…] […]