বিবেক মুখার্জি
মাছ, মাটন, মুসলমানের পর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রত্যাশায় থাকা নরেন্দ্র মোদী আরও একটা ‘ম’ যোগ করেছেন ২০২৪ সাধারণ নির্বাচনের গরম হাওয়ায় – মঙ্গলসূত্র। গত ৫ এপ্রিল অস্তিত্বের লড়াইয়ে লিপ্ত কংগ্রেস দল তাদের ইশতেহার প্রকাশ করার পর থেকেই কোনো অজ্ঞাত কারণে (বা অভাবনীয় কাকতালীয় ঘটনায়) মোদীর অভূতপূর্ব জনমত আদায়ের আলেখ্য ‘ম’ ঘিরেই আবর্তিত হয়ে চলেছে।
২২ এপ্রিল রাজস্থানের জালোর আর বনসোয়াড়ায় নির্বাচনী সমাবেশে মোদী বলেন “ওরা মহিলাদের কাছ থেকে সোনা কেড়ে নিয়ে লোকেদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চায়। কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল তখন মনমোহন সিং বলেছিলেন দেশের সংস্থানে প্রথম অধিকার মুসলমানদের। এরা আপনাদের মঙ্গলসূত্রগুলোকেও ছাড়বে না। আপনাদের টাকাপয়সা নিয়ে নেবে এবং যাদের বেশি বাচ্চাকাচ্চা হয় তাদের দিয়ে দেবে। অনুপ্রবেশকারীদের দিয়ে দেবে… ওরা সবকিছু মুসলমানদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে…”
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মনমোহনের বক্তব্য সম্পর্কে মোদীর এই অভিযোগ যে মিথ্যা তা ইতিমধ্যেই একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রমাণসহ দেখিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু মঙ্গলসূত্র সম্পর্কে যে অদ্ভুত মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী করেছেন, অর্থাৎ বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে মানুষের সোনার গয়না কেড়ে নেবে, তা একটু তলিয়ে দেখা দরকার।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের বয়ান অনুযায়ী, ভারতীয় পরিবারগুলোতে ২১,০০০ টনের বেশি সোনা রয়েছে গয়না হিসাবে। ব্যক্তিগত সোনার মালিকানায় এটাই পৃথিবীতে সর্বাধিক। বনসোয়াড়ায় মোদীর আশ্চর্য অভিযোগের অনেক আগে থেকেই ভারতীয়রা ব্যক্তিগত বা জরুরি খরচ চালাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার জন্যে সোনা বন্ধক রাখছেন। এই অনন্য আর্থিক অভ্যাসের ফলে ভারতে মুথূট ফাইন্যান্স, মুথূট ফিনকর্প এবং মনপ্পুরম ফাইন্যান্সের মত নন-ডিপোজিট নন-ব্যাঙ্কিং ফাইন্যান্স কোম্পানি (NBFC) গড়ে উঠেছে। এই তিনটে কোম্পানি ভারতের স্বর্ণ ঋণের বাজারে সবচেয়ে বড় তিন শক্তি। মুথূট ফাইন্যান্স হল প্রাচীনতম স্বর্ণ ঋণ কোম্পানি, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৯ সালে।
কিন্তু সোনার বিনিময়ে ঋণ নেওয়া বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায় কোভিড-১৯ অতিমারীর সময়ে, যখন মোদী কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে ২৬ মার্চ, ২০২০ তারিখে। তার ফলে বিরাট মাপের বেকারত্ব সৃষ্টি হয় এবং সোনা বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এতটাই বেড়ে যায় যে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার মাসিক বুলেটিনে সোনার গয়নার বিনিময়ে নেওয়া ঋণগুলোকে ‘ডিপ্লয়মেন্ট অফ গ্রস ব্যাঙ্ক ক্রেডিট বাই মেজর সেক্টরস’ শীর্ষক আলাদা বিভাগে প্রকাশ করতে শুরু করে।
২০২০ সালের অগাস্ট মাসে পরিবারগুলোর আর্থিক সংকটকে স্বীকৃতি দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের পরিমাণ সমেত লোন-টু-ভ্যালু (LTV) অনুপাতকে সাধারণ ৭৫% থেকে ৯০% করে দেয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সার্কুলারে বলা হয়েছিল “পরিবারগুলোর উপর, উদ্যোগীদের উপর এবং ছোট ব্যবসার উপর কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও প্রশমিত করার দিকে লক্ষ রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে কৃষিকাজ ছাড়া অন্য প্রয়োজনে সোনার গয়না বন্ধক রাখায় অনুমোদনযোগ্য লোন-টু-ভ্যালু (LTV) অনুপাত ৭৫% থেকে বাড়িয়ে ৯০% করা হবে। এই বর্ধিত LTV অনুপাত মার্চ ৩১, ২০২১ পর্যন্ত চালু থাকবে যাতে ঋণগ্রহীতারা কোভিড-১৯-এর কারণে তাঁদের সাময়িক অর্থের অভাব কাটিয়ে উঠতে পারেন। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এপ্রিল ১, ২০২১ তারিখে বা তারপরে অনুমোদিত নতুন স্বর্ণ ঋণগুলোর LTV অনুপাত হবে ৭৫%।”
তার তিনবছর আগে, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, নোটবন্দির প্রভাবে ভারতীয় অর্থনীতি ধুঁকছিল। বেশি মূল্যের ৮৬% নোট বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। সেইসময় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক স্বর্ণ ঋণের ঊর্ধ্বসীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করে, পাশাপাশি ৭৫% LTV বজায় রাখে। উপরন্তু ২০২৩ সালে যেসব প্রাথমিক (শহুরে) সমবায় ব্যাঙ্ক মার্চ মাসের মধ্যে প্রাইমারি সেক্টর লেন্ডিং (PSL) লক্ষ্য পূরণ করেছিল, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অক্টোবর মাসে তাদের বুলেট রিপেমেন্ট স্কিমের অধীনে স্বর্ণ ঋণ দেওয়ার ঊর্ধ্বসীমা ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করে দেয়। ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় বুলেট রিপেমেন্ট মানে হল ঋণের মেয়াদ শেষে আসল ও সুদ শোধ করে দেওয়া।
নিয়ামক সংস্থা স্বর্ণ ঋণ দেওয়ার শর্তগুলো সহজ করে দেওয়ার ফলে ২০২১ থেকে ২০১৪ আর্থিক বর্ষ স্বর্ণ ঋণ বেড়ে যায় ৬৮.৭২%, অর্থাৎ ৬০,৭২৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয় ১০২,৪৫৮ কোটি টাকা (সারণি ১)। মোদী শাসনে বেকারত্বের উচ্চ হার এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যবস্তুর মূল্যবৃদ্ধির সাপেক্ষে স্বর্ণ ঋণ বেড়ে যাওয়া থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ক্রমশ বেশি বেশি করে পরিবার দিন চালাতে পরিবারের গয়না বন্ধক রাখছে।
আরও একটা তথ্য অর্থনীতি সম্পর্কে সরকারের যাবতীয় কৌশলী বক্তব্যকে অসার প্রমাণ করে, সেটা হল ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) পারিবারিক আর্থিক দায়ের অংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পারিবারিক ঋণ, যাকে আর্থিক দায় বলে হিসাব করা হয়, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালে ছিল জিডিপির ৩৭% (সারণি ২)। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল জিডিপির ৩৯.২%। সেটাই সর্বকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ। পাশাপাশি পরিবারগুলোর মোট আর্থিক সঞ্চয় ২০২৩ আর্থিক বর্ষে নামতে নামতে জিডিপির ৫.১% হয়ে গেছে, যা বহু দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের আর্থিক বর্ষেই সংখ্যাটা ছিল ৭.২%।
গত চার বছরে মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বে স্বর্ণ ঋণের বিপুল বৃদ্ধির সঙ্গে পারিবারিক ঋণকে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে ভারতীয় পরিবারগুলো প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংকটে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। ফলে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে তারা সোনা বন্ধক রাখছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আলাদা রিপোর্ট প্রকাশ শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম স্বর্ণ ঋণ এইভাবে লাফিয়ে বেড়ে যাওয়ার জন্যে দায়ী করেছে উত্তর ভারতে বিভিন্ন NBFC-র ব্যবসার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিকে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ কারণ উত্তর ভারতের বড় বড় রাজ্যগুলো – যেগুলোকে গোবলয়ের রাজ্যও বলা হয় – যেমন বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড এবং মধ্যপ্রদেশ – ভারতের অর্থনৈতিক পিরামিডের একেবারে তলায় রয়েছে। বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যবস্তুর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে গরিব মানুষের উপরেই।
আরো পড়ুন ইনডেক্স অস্বীকার করে অপুষ্টি চেপে রাখা যাবে না
ক্রমশ আরও বেশি সংখ্যক মানুষ ঋণ পাওয়ার জন্য সোনা বন্ধক রাখতে এগিয়ে আসায় শিডিউলড বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলোও এই ঋণ দেওয়ার কারবারে নেমে পড়েছে। KPMG-র এক রিপোর্ট অনুযায়ী নিম্ন মধ্য আয় (২.৫ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা বার্ষিক আয়) এবং নিম্ন আয়ের (২.৫ লাখ টাকার কম বার্ষিক আয়) গোষ্ঠীগুলোই ৭৬% স্বর্ণ ঋণ নিয়েছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বর্ণ ঋণ সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে পরিবারগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণের দায়ের মত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলিয়ে দেখলে দেখা যায় যে মোদীর আমলেই বেশি সংখ্যক ভারতীয় মহিলা তাঁদের মূল্যবান সোনার গয়না বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়েছেন ঋণ নেওয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর নেতৃত্বে অর্থনীতি চালানোর ব্যর্থতার কারণে ঘটা এই অর্থনৈতিক দুর্দশার দায় মূল বিরোধী দলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন, সেটা খুবই বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। এই উত্তর-সত্যের যুগে কংগ্রেস পবিত্র মঙ্গলসূত্র ছিনিয়ে নেবে – মোদীর এই দাবি নির্জলা মিথ্যা।
প্রতিবেদক তৎসৎ ক্রনিকলের এক্সিকিউটিভ এডিটর। বাইশ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, খবরের চ্যানেল এবং ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। স্পোর্টস ইলাসট্রেটেড পত্রিকার প্রাক্তন ম্যানেজিং এডিটর। অপরাধজগৎ, প্রযুক্তি, খেলাধুলো, আমলাতন্ত্র, প্রশাসন এবং পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে লেখালিখি করেন। এই লেখা তৎসৎ ক্রনিকলে প্রকাশিত তাঁর মূল প্রতিবেদনের ভাষান্তর। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







